মাজহার সরকারের পাঁচটি কবিতা

মাজহার সরকারমাজহার সরকার
Published : 2 Oct 2022, 03:20 PM
Updated : 2 Oct 2022, 03:20 PM

দুধবনে একা

কোন এক সাবেক রাতে মুঠোতে হলপল করে উঠলো দুটি গমের দানা। গড়াতে গড়াতে ত্বকের স্বৈরিণী অগ্নি সংযোগ করলো। সে আগুন ঘিরে ফেললো চারপাশ থেকে। গিলে ফেললো। একসময় গমের দানা থেকে ফুলে ওঠলো দুটো বনরুটি। হয়ে গেলো অফুরন্ত সবুজ শস্য। সে শস্যে জীবন পেলো মানুষ। জীবন বড় হলো। প্রেমের চেয়ে বড় হয়ে গেলো জীবন। একটা পাকা গমক্ষেতে আর্তনাদ করে উঠলো সোনার স্বভাব, মুষ্টি খুলে চালনামাত্র সন্তান ডাকে পিছে। শিসার সৌন্দর্যে বরফ মেখে আগে সমস্ত রাত্রির মুহূর্ত ভালোবাসার উপযোগী করে বাসা বানায় তারা। তারপর ফুলের মতো পেটে একটা পাখি যদি এসে টুইটুই করে জ্বলে একফোঁটা পানির স্রোতে সেইদিন পেতল পূর্ণিমা রাতে তার বেণীতে টেনে আনে ব্যথার রেলগাড়ি। ক্রন্দনের অরণ্যে রক্তদ্রোণ সুবর্ণ হতে হতে পৃথিবীর সমস্ত কথা বলেছিলাম কেবল দুটি গমের দানার কুসুমে। প্রশংসার প্রজাপতি কেবল জিহ্বার স্ফোটে ডিম ছেড়ে দুধকমল চোখে দেখে গৌরীকাজলের ভূমিহীন চাষা দুটো গমের দানায় শিশুর নিদ্রামগ্ন গালের মতো বাগান করলো আন্তরিক সবজির। আজ সে ক্ষীরের রাজা তৃণের আগ্রহে দুটি গমের দানার সঙ্গীতে বেড়ে উঠছে, দুটি বনরুটি দুটি আন্তরিক মানচিত্রের মতো উত্থিত পতাকা হয়ে পাকা গমক্ষেতে বাতাসে শন শন করে ডাকছে।

হৃৎপিণ্ডের ওপর রাখো স্তন

মৃত্যু খরচ করে সময়ের কাছে নুয়ে দেখেছিলাম একটি পাথর গড়িয়ে চলছে তার নারীকে ফেলে। রাতের গন্ধের কাছে ফুলের বর্ণনায় একাকী নদীটি কাটে স্রোতের বিনুনি। বলেছিলাম ভালোবেসে ভিজিয়ে দাও, তোমার ভেড়াগুলো ছেড়ে দাও আমার বুকে, ওরা চরিয়ে যাক আমার এই ঘাসের শোধে রাখালের লাঠিটা দিয়ে জাগিয়ে নাও সবুজ আগুন। বলেছিলাম কলসী ভরে জল দেবো, নদী পার করতে ঘাড়ে নেবো, তুমি ডাকলেই দাঁড়িয়ে যাবো। বুদ্ধির ভাষা ছেড়ে সুবিনীত সাত সুর বিনয়ের টোকা দেবো কানের লতিতে, নাকটা কামড়ে দেবো। পৃথিবীর কোন প্রেমই টেকেনি, কিছু কাহিনী ছাড়া মূলত সব চুমুর দাগ মুছে গেছে আমাদের গাল থেকে, আলিঙ্গণ ছুটে গেছে, হরিণ নেমে গেছে হরিণীর পিঠ থেকে, বৃষ্টি নেই, একদিন সূর্য দেয় সব শুকিয়ে। এইসব প্রেম অরণ্যের সব সান্ত্বনা শুষে নিয়ে সুস্বাস্থ্য দিয়েছিল পরবর্তী বংশধরে, তোমার জানু চেপে পিতা হলো একের পর এক সুকান্ত ইলিশ। কিন্তু প্রেমের নিশ্চয়তা কেউ দিলো না। তোমার পেটে পিচকিরির মতো ডিম ছড়ালো, কিন্তু বিস্মরণসফল নির্বিকল্প কোন মুক্তিপন্থা আবিষ্কার হলো না। কি ব্যর্থ মানুষ, এখনও দাঁড়িয়ে আছি, দাঁড়িয়েই আছি নগরসমাপ্ত সব ভাষ্যহীন ক্রন্দন ক্রমশ প্রেমের বিম্বে ফিরিয়ে আয়ুর দর্পন। বলেছিলাম, আমার হৃৎপিণ্ডের ওপর রাখো স্তন। বলেছিলাম ঠোঁটের ওপর নামিয়ে আনো মুখের রক্তপোস্টার। মিছিলের মুখে চন্দ্রোন্মাদ ধ্বনিতে ত্রিভুজ জাগাই, মানচিত্র ছোট করি দাঁতে কেটে। শ্রুতির পাথরে নিই উত্থিত সৌধ, প্রাচীন জলে গড়িয়ে দুই পাহাড় পেরোনোর পর ঝর্ণার জ্যোতি আজ নামুক কুয়াশাসাগরে।

ইশতেহার

চারদিকে সুসংবাদ ছড়িয়ে দাও মুহূর্মুহু করতালিতে মূর্ছাহত আদম পাহাড়ের চূড়ায় এসেছে। আজ পৃথিবীর সব মানুষকে ডাকো, শত চেষ্টার পর আজই প্রথম বেদনাহত শিশিরে আগুন ধরেছে। রক্তবিন্দুকে এখন ভোরের কুয়াশা মনে করে তৃষ্ণা মিটাতে পারো। এই মৃত্তিকার ওপর একবারও বিচলিত না হয়ে কপোলের ভৎর্সনা মুছে সসম্মানে দাঁড়াও। দেখো...নিষ্কৃতির শেষ আনন্দ আজ প্রার্থনা হয়ে ক্ষুধার তন্ত্রীতে কবুল হয়েছে। হাসো, স্বপ্নের প্রতিষ্ঠা নিয়ে এই উৎসব উজ্জ্বল করো। বিশ্রাম ছেড়ে ঘরের কপাট খুলে দাঁড়াও। ভালোবাসার ঢলাঢলি ছেড়ে বীজ বপন করতে মাঠে নেমে যাও। হে অধীর শ্রোতাবর্গ, রূপের সমর্থন আজ ফুলের গন্ধ নিয়ে জনের শরীরে ভাসছে, তাকে চিহ্নিত করে এগোও।

ঘোড়ার পিঠে চড়ে যারা এতোদিন পাতকুয়োর খোঁজ করেছিলে তারা দেখো হাতের তালুতে এক ফোঁটা প্রস্রবন নিয়ে এসেছি। পরিতৃপ্ত মহিষের নিদ্রা ঠেলে একে রোপন করো দৃষ্টিতে। মহোত্তম সঙ্গীতের মতো মিছিলে চিৎকার তুলো, তোমরা আসলে প্রত্যয়ী প্রেমিক সবুজ হৃৎপিণ্ড নিয়ে ঘোরাফেরা করছো। কিন্তু প্রজ্জ্বলনের অস্ত্র সোনালি ফসলের সপক্ষে চালাতে আজ এই বদান্যতার দুই হাত তোমাদের খুব প্রয়োজন হয়ে গেছে। ধরো, সন্তানেরা উচ্ছ্বসিত হবে, রুষ্ট নারীরা ফিরবে পুরনো সঙ্গীতে, তুচ্ছ প্রেমে তরুণেরা আর মাথাব্যথা করে ফেলবে না। আর কোন উপমার মৃত্য হবে না আলোর অভিবাদনে, উত্থান ব্যাহত হবে না দীর্ঘ হবে, উত্তাপ শুষে নেবে উপেক্ষার সব রঙ। চারদিকে সুসংবাদ ছড়িয়ে দাও, পাথরে ধুলোর সাহস সঞ্চারিত হয়েছে। যারা ঘরহীন আছো তোমাদের উৎসব সফল হয়েছে শক্তির নির্মাণে।

এগিয়ে এসো, সুন্দরতম ফুলটিকে পাহারা দাও। আজ এই স্বাক্ষর সৌভাগ্যের পাঠে আয়তন পেলো প্রশস্ত সাগরের। রক্তকণাকে এখন ভোরের সূর্য মনে করে তার নিচে এসে দাঁড়াতে পারো। গায়ে চাদর টেনে ঘুমোতে যেতে পারো, বনভূমির রহস্যে স্মরণ করতে পারো বিগত যাত্রার হাসি। আজ সব শঙ্কাকে হত্যা করে মাঠের কিনারায় মাটিচাপা দিয়ে পুঁতে দিয়েছি একটি স্নিগ্ধ শেফালি। আজ সব প্রতিবেশীকে ডাকো, উপস্থিত মুসা লাঠির আঘাতে নির্গত করেছেন জীবনের বিরাট উপকরণ। তরুণীর প্রত্যাখ্যাত বুকে লাল ডালিম ফেটে পড়বে, পুরুষেরা ছোট্ট সবুজ ফলের মতো ঝুলে থাকবে জলগুল্মে, শাসনের শৃঙ্খল ক্ষয়ে স্নায়ুর কম্পনে আজ এনেছি দুর্লভ অনুরাগ। ঘিরে দাঁড়াও সবটুকু আলোড়ন নিয়ে, বণ্টন করো দেহকে প্রান্তর করে, কুড়িয়ে তুলো আঁখিপাতে প্রাণের এই ঘোষণা।

ভালোবেসে দূরে কেনো আছো?

যদি স্বাক্ষরিত সব প্রাণ সত্যিই উপমা হতো, রাত্রি সঞ্চয় করে বানানো হতো প্রার্থিত স্তম্ভ, প্রিয়তমোর আগমনে খবরের আগে তার নাভীর ঘ্রাণ পৌঁছে যেতো স্নায়ুর নিজস্ব ইচ্ছায়, চুলের গুচ্ছগুলো ছাড়াতে ছাড়াতে পিঠ উদোম করে আঙুল চালাতাম। মৃদু হেসে পাশে বসে আগে বলতাম, ‘আমিই আপন’। আজ সত্যি এমন প্রেম নেই, যার কারণে ঘর ছেড়ে দৌড়ে দরজার কাছে যাবো, চৌকাঠে দাঁড়িয়ে পড়ে দূরে পথে একটি ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ শোনার প্রত্যয়ে কুপি হাতে অন্ধকারকে পলকে পলকে চমকিত করবো। যদি প্রিয়তমোর পায়ের সুগন্ধী ধান হয়ে ছড়িয়ে পড়তো মৃত্তিকায়, আমি তার পাতার রঙ হয়ে একদিন বিদ্যুৎ আরেকদিন আগ্রহের পুস্পস্তবক হাতের পেছনে নিয়ে সামনে দাঁড়াতাম। যদি ‘কাছে এসো’ বলতেই পৃথিবীতে আমরা প্রেমকে নির্মাণ করতে পারতাম, রক্ত ও নিশ্বাসের শব্দের আরও ঘনিষ্ঠতা পেতাম, প্রিয়তমোর চোখে লুকিয়ে পড়তাম ক্ষোভে আর প্রতিবাদে লাফিয়ে আসতাম কোলে, সম্মিলিত গমের অঙ্কুরে সেদিন গরম রুটির স্বাদ পাওয়া যেতো।

যদি প্রিয়তমোর স্তনের দুটি বিন্দুকে দ্বিগুণ বিজয় ভেবে যুদ্ধের রহস্যে লিপ্ত হতো তরুণেরা, আমিও শয্যা পেতে সমুদ্রে একটি দ্বীপ হয়ে জাগতাম। আজ তেমন নির্জন কক্ষই নেই যে একটি পূর্ণ চুমু খাওয়া যায়, সাড়া নেই যে বুকভরে ভালোবাসা নেবো, বিছানার চাদরে পড়ে আছে কেবল শরীর বিচূর্ণ ধুলো। অনেকদিন আগে এক প্রিয়তমো সৌরভ হয়ে আমার পাশে হেঁটেছিল, আমি তখন ছাত্র ছিলাম। বই কিনে সারারাত জেগে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা পড়ে অন্যের প্রেমের কৌশল পরিণতি জেনেছিলাম, এসবের কিছুই কাজে লাগেনি আমার। যদি বিক্ষুব্দ বেদনার জামায় শরীর ঢেকে এই রাতে প্রেম খুঁজে পেতে আর ক্ষুদ্রতা ছেড়ে জীবনের বৃহৎ অর্থের দিকে হাঁটা শুরু করি, সব গন্তব্যই দূরে সরে যাবে তার সূচনা থেকে, আমি সাক্ষ্য দেবো প্রার্থনার কাম্যে এইখানে মরে গিয়ে নিদ্রার অজস্রতাকে ভেঙে কেবল হৃদয়ের তাপে জেগে উঠবো। যদি প্রিয়তমোর পেটের মতো দেশ পেতাম, লালসূর্যে দুই একটা বাক্যালাপ করা যেতো, উপগ্রহ হয়ে চারদিকে অভিভূত ময়ূর জন্ম দিতাম। আজ এতো কিছু শিখেও কেবল প্রেম রচনা করতে পারেনি মানুষ, চারদিকে কেবলই সংবাদ, শিরোনাম, প্রিয়তমোর ইচ্ছার আনন্দ কেনো সর্বত্র ছড়িয়ে নেই! যদি প্রিয়তমর ডানাগুলো বাতাসে একটু শব্দ করতো, গ্রাম অতিক্রমের আগেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়তাম অভিবাদনের পালা হাতে, আগে বলতাম- প্রজাপতিগুলো ফুলের উপর বসেছে, নদীর রেখাগুলো পাথর ডিঙিয়ে ছুটেছে, বাতাসে ভাসছে মৌমাছি, হাত বাড়াও আজ সামান্য আগ্রহে আমাকে পাবে তুমি।

পৃথিবীটা বড় বেশি সুন্দর

পৃথিবীটা বড় বেশি সুন্দর আর নিষ্পাপ, একাকী মানুষ আমি সয়ে উঠতে পারি না। সুন্দরই দুঃখ ও ক্লান্তিকর, যেন ক্রুদ্ধ সারস শুনালো তার ডাকে জীবনের ক্ষুদ্রতম ব্যথা। নীরবতা, সূর্যপোড়া পাথরের নিচে মুখ রেখে বুক অব্দি জানালায় কোমরের নিচে অগ্নিময় মাছের ঝাঁকে আলোয় মায়াবী গাভী তুলছে বাহু। হয়তো ছোঁবে সে প্রলম্বিত ইচ্ছায় পৃথিবীর বৃত্ত আঁকা প্রাণে, প্রেমের উজ্জ্বল তালুতে চেপে ধরবে আঘাত। আমার গলায় ছিল চুমুর দাগ, যেখান থেকে ঘষে ঘষে মুছে গেছে প্রেমিকার ঠোঁটের ছায়া। আজ কোথায় সেই ত্রিভুজ, টেনে তুলবে নতুন আলিঙ্গন এক পাখির দেহের ভেতর! তার নীল চোখের রচনায় একাকী মানুষ আমি তাকিয়ে থাকতে পারি না, দীর্ঘ চাঁদ ঊষার উদ্ভাস কিংবা নারীর দিকে। পৃথিবীটা চলমান মুখ থেকে অনেক চোখ অনেক বিমুগ্ধ আকাশ, সবই মুছে যায়। সবই ক্ষয় লয় দারুণ আঘাত।

ভাত খাওয়ার পর পৃথিবীটা কতো সুন্দর লাগে, মনে হয় পেটে একটা গন্ধরাজ ফুল ফুটেছে। মনে হয় সব অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিলাম। লুইস ক্যারলের অ্যালিসের মতো, পা পিছলে খরগোশের গর্তে পড়ে গড়াতে গড়াতে গিয়ে উঠলাম কোনো ফুলক্ষেতে! মানুষেরা কতো ভালো, কতো সুন্দর ওদের কথা, আমরা কেনো আরও ধানচাষ করি না!

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক