০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

অনুবাদক মধুসূদন

মাইকেল মধুসূদন দত্তের একমাত্র গ‍দ‍্যগ্রন্থ ‘হেক্‌টর-বধ’। এটি হোমারের ‘ইলিয়ড’ কাব‍্যের অনুবাদ।

খসরু পারভেজ খসরু পারভেজ

Published : 25 Jan 2025, 01:32 AM

Updated : 26 Aug 2026, 11:39 AM

বাংলা সাহিত‍্যের ইতিহাস মূলত অনুবাদের ইতিহাস। ইংরেজদের দ্বারা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার যুগে ভাষিক প্রয়োজনে প্রাতিষ্ঠানিক অনুবাদকর্মের সূচনা ঘটলেও মূলত মধ‍্যযুগে শুরু হয় সাহিত‍্যের অনুবাদের কর্মপ্রক্রিয়া। ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষে তুর্কি শাসনের সূত্রপাত ঘটে। তখন থেকেই শুরু হয় ভারতীয় সাহিত‍্য-সংস্কৃতির সাথে সংশ্লিষ্ট গ্রন্থ অনুবাদের কাজ। এ সময়ে অনূদিত হয় প্রায় চারশত খ্রিস্টপূর্বাব্দে রচিত সংস্কৃত মহাকাব‍্য ব‍্যাসদেব (কৃষ্ণদৈপায়ান বেদব‍্যাস) এর ‘মহাভারত’। বাংলায় এটি অনুবাদ করেন কবীন্দ্র পরমেশ্বর। পরে অনেকেই এটি অনুবাদ করেন। তন্মধ্যে ষোড়শ শতকে কাশীরাম দাসের অনুবাদটি সমধিক প্রচলিত ও জনপ্রিয়। আর একটি সংস্কৃত মহাকাব‍্য বাল্মীকি রচিত ‘রামায়ণ’। এটিও খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে রচিত। এই মহাকাব‍্যের বঙ্গানুবাদ করেন কৃত্তিবাস ওঝা। পরে এটি অনেকে অনুবাদ করলেও কৃত্তিবাসী রামায়ণই অধিক জনপ্রিয়। মধ‍্যযুগে মুসলমান কবিরা হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির সমন্বয়ে রচনা করেন চৌতিশা, জ‍্যোতিষ ও সঙ্গীত শাস্ত্রীয় কাব‍্য। এগুলো একপ্রকার অনুবাদকর্ম। চৌদ্দ শতকে শাহ্ মুহম্মদ সগীর ফরাসি থেকে অনুবাদ করেন প্রণয়কাব‍্য ‘ইউসুফ-জোলেখা’। পনের শতকে গৌড়ের সুলতান শামসুদ্দিন ইউসুফ শাহের সভাকবি জৈনুদ্দীন রচনা করেন ‘রসুল বিজয়’ কাব‍্য। এটির অংশবিশেষ ফরাসি ভাষার গল্প থেকে নেওয়া। আনুমানিক ১৫৬০-৭৫ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি কবি জামী-এর ‘লাইলী-মজনু’ কাব‍্যের ভাবানুবাদ করেন দৌলত উজীর বহরাম খাঁ। ষোল শতকে আলওয়াল হিন্দি ভাষা থেকে অনুবাদ করেন ‘পদ্মাবতী’ কাব‍্য। এ সময়ে অনেক কাব‍্য বিভিন্ন ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় রূপান্তর লাভ করে। ব্রিটিশ জাতি ভারতে প্রভূত্বকালে প্রতিষ্ঠা করে ফোর্ড উইলিয়াম কলেজ। মূলত উইলিয়াম কেরির নেতৃত্বে শুরু হয় বিভিন্ন ভাষা থেকে অনুবাদের কাজ। এসময় নির্দিষ্ট অনুবাদক কর্তৃক অসংখ্য বই সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, বাংলা, হিন্দি ও উর্দু থেকে ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়। বিভিন্ন ভাষা থেকে বাংলা ভাষাতেও কিছু অনুবাদের কাজ হয়। এই প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন‍্য যাঁরা অনুবাদকর্মে নিবেদিত ছিলেন তাঁদের মধ‍্যে রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ‍্যাসাগরের নাম উল্লেখযোগ্য। ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দে রামমোহন বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন আদিশঙ্কর রচিত ভাষ‍্য অবলম্বনে কনোপনিষদের ‘তলবকার উপনিষৎ’। এরপর এক এক করে তিনি অনুবাদ করেন ঈশোপনিষৎ, কঠোপনিষৎ, মাণ্ডুক‍্যোপনিষৎ, মুণ্ডুকোপনিষৎ। আর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ‍্যসাগরের রচনার সিংহভাগই অনুবাদকর্ম। তিনি সংস্কৃত থেকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন— শকুন্তলা, সীতার বনবাস, মহাভারতের উপক্রমণিকা, বামনাখ‍্যানম্ (মধুসূদন তর্কালঙ্কার রচিত ১১৭টি শ্লোকের অনুবাদ)। হিন্দি থেকে— বেতাল পঞ্চবিংশতি। ইংরেজি থেকে— বাঙ্গালার ইতিহাস (মার্শম‍্যানকৃত হিষ্ট্রি অফ বেঙ্গল), জীবনচরিত (চেম্বার্সের বায়োগ্রাফিজ), নীতিবোধ (রবার্ট ও উইলিয়াম চেম্বার্সের ‘মরাল ক্লাস’ অবলম্বনে প্রথম সাতটি প্রস্তাব), বোধোদয় (চেম্বার্সের রুডিমেন্টস অফ নলেজ অবলম্বনে), কথামালা (ঈশপস ফেবলস অবলম্বনে), চরিতাবলী (বিভিন্ন গ্রন্থ, পত্র-পত্রিকা অবলম্বনে), ভ্রান্তিবিলাস (শেক্সপিয়রের কমেডি অফ এররস)। বাংলা সাহিত‍্যের বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মাইকেল মধুসূদন দত্তও একজন সফল অনুবাদক। তাঁর নাট‍্য ও কাব‍্য প্রতিভার আড়ালে অনুবাদক পরিচয় চাপা পড়ে আছে। আমার আলোচনায় সেই অনুবাদক মধুসূদনকে তুলে ধরার চেষ্টা করব।

১.

মধুসূদন শৈশবে ফারসি শিখেছিলেন। তখনকার সাগরদাঁড়ী, আজকের শেখপুরা গ্রামের মৌলভি সাহেবের কাছে ফারসি শিখে পাঠ করেছেন ফারসি সাহিত‍্য। ছাত্র জীবনে তাই তো তাঁকে আমরা ফারসি সাহিত‍্যের বিশ্বখ‍্যাত কবি শেখ সাদীর কবিতা অনুবাদ করতে দেখি। ফারসি কবির একটি ‘ODE’ সরাসরি ফারসি থেকে তিনি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে। তখন তিনি হিন্দু কলেজের ছাত্র। এটিই তাঁর প্রথম অনুবাদ। কবিতাটির কয়েকটি চরণ উল্লেখ করা যেতে পারে। যেমন:

  Oh! Come, gaze on that eye whose beam

      Is softer than ray, so bright,

That Iulls to Love’s ethereal dream

      The maiden in her dewy bow’r,

At midnight’s soft and starry hour,

Shed by the moon, the pensive Queen of Nihgt!

Oh! come, gaze on those ringlets there.

    That around her temples softly play.১

২.

মধুসূদন প্রথমে ইংরেজি ভাষায় সাহিত‍্যচর্চা করতেন। বাংলা ভাষায় সাহিত‍্যচর্চা শুরু হয় একটি আকস্মিক ঘটনার মধ‍্য দিয়ে। হয়ত মনে মনে তাঁর প্রস্তুতিও ছিল। ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি মাদ্রাজ থেকে কলকাতা ফিরে আসেন। পাইকপাড়ার রাজাদের বেলগাছিয়া থিয়েটারে শ্রীহর্ষের ‘রত্নাবলী’ নাটকের রামনারায়ণ তর্করত্নকৃত বাংলা অনুবাদের মহড়া চলছিল। মধুসূদনের বন্ধু গৌরদাস বসাকের যাতায়াত ছিল সেখানে। ‘রত্নাবলী’ মঞ্চস্থ হবে, কিন্তু ইংরেজ সাহেব দর্শকদের জন‍্য নাটকটির ইংরেজি অনুবাদের প্রয়োজন হয়। রাজারা অনুবাদক খুঁজছিলেন। গৌরদাস বসাক মধুসূদনের নাম প্রস্তাব করেন। মধুসূদন রাজি হন। নাটক অনুবাদ করতে এসে তিনি বিস্মিত হন, বাংলা নাটকের দুরবস্থা দেখে। তিনি বাংলা অনুবাদের দিকে না তাকিয়ে রত্নাবলীর মূল সংস্কৃত ও ল‍্যাটিন অনুবাদ অবলম্বন করে অনুবাদকর্ম সমাপ্ত করেন। রত্নাবলী মঞ্চস্থ হয় ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ২১ জুলাই। ধারণা করা সমীচীন যে, অভিনয়ের আগেই এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু এ বছরের ৯ অক্টোবর বেলগাছিয়া রাজাদের ম‍্যানেজারের একটি চিঠি পাওয়া যায়, যেখানে তিনি লেখেন—

“My dear Michael,

    I have much pleasure in sending by the bearer Bank of Bengal Notes for Rupees five hundred which I beg you to accept as a slight recognition on the part of Rajahs of the ability and the masterly skill you have displayed in investing our Rutnavaly with an English garb.

That you mey live long and continue to show the nations of Europe what inestimable gems we have in our ancient language is the heartfelt wish of yours sincerely, S.R. Chatterjea.”২

‘রত্নাবলী’ অনুবাদ করে মধুসূদন পাঁচশত টাকা সম্মানী পেয়েছিলেন। গবেষক ধারণা করেছেন, ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের জুলাইয়ের পর ৯ অক্টোবরের আগে ‘রত্নবলী’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। প্রথম সংস্করণে আখ‍্যাপত্রে লেখা ছিল: RATNAVALI: A Drama in Four Acts Translated from Bengali By Michael M.S.Dutt— Calcutta G.A.SAVIELLE, Calcutta Printing and Publishing Company (Limited) No. 1, Weston’s Lane, Cossitollah— 1858.৩ এটি পাইকপাড়ার প্রতাপচন্দ্র সিংহ এবং ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ রাজ ভ্রাতৃদ্বয়কে উৎসর্গ করা হয়।

৩.

‘রত্নাবলী’ নাটক অনুবাদে সাফল‍্যের পর মধুসূদন বাংলা ভাষায় নাটক রচনায় মনোনিবেশ করেন। তিনি মহাভারতের সুন্দ-উপসুন্দ কাহিনির পটভূমিকায় রচনা করেন ‘শর্ম্মিষ্ঠা নাটক’। পাশ্চাত্য ধারায় বাংলা সাহিত‍্যে প্রথম সার্থক নাটক ‘শর্ম্মিষ্ঠা’। নাটকটি রাজাদের পছন্দ হওয়ায় বেলগাছিয়া থিয়েটারে মঞ্চস্থের আয়োজন হয়। ‘রত্নাবলী’র মতো ইউরোপীয় দর্শকদের বোধগম‍্যের জন‍্য ‘শর্ম্মিষ্ঠা নাটক’-এর ইংরেজি অনুবাদের প্রয়োজন হয়। মধুসূদন এবার নিজের নাটক নিজেই অনুবাদ করলেন। ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দের ১৯ মার্চ তিনি বন্ধু গৌরদাস বসাককে একটি চিঠিতে লেখেন, “শর্ম্মিষ্ঠার অনুবাদ ইতোমধ‍্যে প্রায় শেষ করে ফেলেছি। যাঁরা এটা আপাতত দেখেছেন— তাঁদের মধ‍্যে আছেন রাজারা, ঠাকুরও। তাঁদের কথা বিশ্বাস করলে রত্নাবলী আমাকে যে সামান‍্য পরিচিতি এনে দিয়েছে তার সাথে আরও একটু সুনাম যোগ হল। মূল বাংলা বই সম্পর্কে একমাত্র অভিযোগ, যেসব দর্শকদের কাছ থেকে বর্তমানে নাটকের পৃষ্ঠপোষকতা আশা করা যায়, তাদের কাছে এর ভাষা একটু দুরূহ বোধ হয়েছে। বলা বাহুল‍্য ওটা বিশেষ কিছু নয়। আমাদের দেশের সাহিত‍্যে এ নাটক যদি স্থায়ী আসন পাওয়ার উপযুক্ত হয়, তাহলে সামান‍্য কারণে তাকে বাদ দেয়া যায় না।আজ থেকে বিশ বছরের মধ‍্যে সকলেই বাংলা শিখে যাবে। তোমাকে একটা সহজ কথা বলি, একাধারে এমন একটা কাজ আমি করতে পারব ভাবিনি। এই শর্ম্মিষ্ঠাই আমাকে বাঙালি লেখকদের ভেতরে প্রায় শীর্ষস্থানে বসিয়েছে। এটার কাব‍্যগুণ সম্পর্কে সকলেই উল্লসিত মতামত ব‍্যক্ত করেছে। তুমি নিজে এ ব‍্যাপারে বিচার করে দেখ।”৪

১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ৩ সেপ্টেম্বর ‘শর্ম্মিষ্ঠা নাটক’ বেলগাছিয়া নাট‍্যশালায় মঞ্চস্থ হয়। ঐদিন ইউরোপিয় দর্শকদের মধ‍্যে ‘শর্ম্মিষ্ঠা নাটক’-এর ইংরেজি অনুবাদ-পুস্তিকা বিতরণ করা হয়। এটির আখ‍্যাপত্রে লেখা ছিল: SERMISTA ADrama in five acts Translated from the Bengali By (The Author) Michael M. Dutt. Cin. I’am Cinna— the poet. Cit. Tear him for bad verses Julius Caesar.— Calcutta I.C. Bose & Co., Printers and Publishers, Stanhope Press, 185, Bowbazar Road.1859.৫ এই অনুবাদটিও পাইকপাড়ার রাজভ্রাতৃদ্বয়কে উৎসর্গ করা হয়। কবির জীবৎকালে শর্ম্মিষ্ঠার অনুবাদের একটিই মাত্র সংস্করণ প্রকাশিত হয়।

৪.

কবি ও নাট‍্যকার মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং নাট‍্যকার দীনবন্ধু মিত্রের আবির্ভাব প্রায় একই সময়ে। মধুসূদনের জন্ম ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দ, আর দীনবন্ধুর জন্ম ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে। মধুসূদন ছিলেন দীনবন্ধুর চেয়ে ছয় বছরের বড়। ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে মধুসূদন রচনা করেন দুটি প্রহসন ‘একেই কি বলে সভ‍্যতা’ ও ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’। তৎকালীন সমাজ বাস্তবতার পটভূমিতে রচিত এই প্রহসন দুটি দীনবন্ধু মিত্রকে ‘নীলদর্পণ’ নাটক লেখায় অনুপ্রাণিত করে। ভারতের কৃষকদের জোরপূর্বক ইংরেজ শাসকেরা নীল চাষে বাধ‍্য করত। বিশেষত বঙ্গদেশে নীলচাষকে কেন্দ্র করে কৃষক অসন্তোষ, শাসকদের অমানুষিক নির্যাতনের বাস্তবচিত্র তুলে ধরে এহেন কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে দীনবন্ধু মিত্র রচনা করেন ‘নীলদর্পণ’ নাটক। বাঙালি সমাজে নীলকরদের নির্যাতনের দর্পণ উন্মোচিত হলেও শাসক ও শোষক সমাজের পক্ষে এ নাটকের মর্মোদ্বার করা সহজ ছিল না। তাই এ নাটকটি অনুবাদের প্রয়োজন বোধ করেন নাট‍্যকার। ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে ‘নীলদর্পণ’ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। জানা যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত ছিলেন এটির অনুবাদক। যদিও গ্রন্থে অনুবাদকের নাম ছিল ‘A Native’. গ্রন্থের উপর লেখা ছিল— Nil Durpon or Indigo Planting Mirror, A Drama Translated from Bengali by A Native.Calcutta C.H.Manuel, Calcutta Printing & Publishing Press No. 1০, Weston’s Lane, Cossitollh 1861. কুমুদবিহারী বসু ‘Indigo Planters, and all about them” নামে একটি গ্রন্থ সংকলন করেন। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার এ. এল. আনদিনি এন্ড কোং থেকে এটি প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থের শেষে নীলদর্পণের অনুবাদ সংযোজিত হয়। সেখান থেকে এই আখ‍্যাপত্রটি নেওয়া হয়েছে। ৬ গ্রন্থটির প্রকাশক ছিলেন শাসক সম্প্রদায়েরই একজন পাদ্রী ভারতবন্ধু জেমস লঙ্ (Rev James Long)। অস্বাক্ষরিত ভূমিকায় তিনি লেখেন— “The original Bengali of this Drama— the NIL DURPAN, or INDIGO-PLANTING MIRROR— having excited considerable interest, a wish was expressed by various Europeans to see a translation of it. This has been made by a Native; both the original and translation are bonafide Native productions and depict the Indigo-Planting system as viewed by Natives at large.”৭

‘নীলদর্পণ’-এর অনুবাদ প্রকাশের পর ঝড় ওঠে শাসক সমাজে। তারা বুঝতে পারে এ রচনার মধ‍্য দিয়ে বাংলার নিরীহ, অত‍্যাচারিত কৃষকদেরকে তাদের বিরুদ্ধে উসকে দেওয়া হয়েছে। ইংরেজদের মধ‍্যে অনেকেই নীলচাষীদের প্রতি নির্মম অত‍্যাচার ও শোষণের ভয়াবহতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জানা যায়, লন্ডন নগরের সিমপকিন্ মার্শাল এন্ড কোম্পানি (Simpkin, Marshall & Co) অনূদিত ‘নীলদর্পণ’-নতুন করে প্রকাশ করে। প্রখ‍্যাত ঔপন্যাসিক চার্লস ডিকেন্স তাঁর সম্পাদিত ‘All the year Round’ পত্রিকায় এই গ্রন্থের ভূয়সী প্রশংসা করেন।৮ নীলকর সাহেবরা সিমপকিন্ কোম্পানি ও চার্লস ডিকেন্সকে শান্তি দিতে পারেনি। তবে ভারত-হিতৈষী জেমস লঙ্ সাহেবের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করে। আদালতের পক্ষ থেকে ‘নীলদর্পণ’-এর মতো শাসকবিরোধী রচনা প্রকাশের দায়ে লঙ্ সাহেবকে একমাস কারাদণ্ড প্রদান এবং এক হাজার টাকা জরিমানা প্রদানের আদেশ দেয়া হয়। সাহিত‍্যিক কালীপ্রসন্ন সিংহ জরিমানার এই এক হাজার টাকা পরিশোধে সহায়তা করেন। যে গ্রন্থ নিয়ে এত কিছু হয়ে গেল, সেখানে অনুবাদকের নাম প্রকাশ করা হলো না কেন? প্রশ্ন উঠেছে ‘নীলদর্পণ’-এর অনুবাদক সত‍্যিই মধুসূদন কিনা! ‘A Native’ ছদ্ম নামের আড়ালে প্রকৃত ব‍্যক্তি কে? ‘নীলদর্পণ’ অনুবাদের সার্ধশতবর্ষে এমনও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়, যে অনুবাদটি জেমস লঙ এবং কালীপ্রসন্ন সিংহের মিলিত প্রয়াস কিনা! সুবলচন্দ্র সংকলিত ‘সরল বাংলা অভিধান’-এর ষষ্ট সংস্করণে বলা হয়েছে ‘নীলদর্পণ’-এর অনুবাদক স্বয়ং প্রকাশক জেমস লঙ্। যদিও তিনি কোনো সূত্র উল্লেখ করেননি। প্রশ্ন উঠতে পারে। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কেননা, মধুসূদন তাঁর চিঠিপত্রে অনেক কথাই বলেছেন, কিন্তু এ প্রসঙ্গে তিনি কোথাও কিছু বলেননি। জীবনীকার বলেছেন, “গ্রন্থের নামের পৃষ্ঠায় মধুসূদনের নাম ছিল না। থাকিবার কথাও নয়।... মধুসূদন তখন রাজকার্যে (পুলিশ কোর্টে কেরানী বা দোভাষী) নিযুক্ত। মূল গ্রন্থ প্রকাশকালে যখন গ্রন্থকার দীনবন্ধু মিত্র স্বীয় নাম প্রকাশ করেন নাই, তখন অনুবাদকও রাজ কর্মচারী হইয়া, কি করিয়া আপনার নাম সংযুক্ত করিতে পারেন? ডেপুটি ম‍্যাজিট্রেট তারকনাথ ঘোষের ঝামাপুকুরস্থ বাসভবনে ১৮৬১ খ্রীষ্টাব্দে মধুসূদন এক রাত্রির মধ‍্যে ‘নীলদর্পণে’র অনুবাদকার্য সমাধা করেন। একজন ‘নীলদর্পণ’ পাঠ করিয়া যাইতেছেন, আর মধুসূদন চেয়ারে বসিয়া টেবিলের উপর অবিরত লেখনী-সঞ্চালনে, ইংরাজিতে ভাষান্তরিত করিয়া যাইতেছেন। যে গৃহে ‘নীলদর্পণে’র অনুবাদ লিখিত হয়, সে গৃহ এখনও বিদ‍্যমান।”৯

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘দীনবন্ধু-চরিত’-এ লিখেছেন— “এই গ্রন্থ রচনা করিতে করিতে দীনবন্ধু মেঘনায় নৌকাডুবি হইয়া জলমগ্ন হইতে হইতে বাঁচিয়া গিয়াছেন— লং সাহেব কারারুদ্ধ হইয়াছিলেন। ইহার ইংরাজি অনুবাদ করিয়া মাইকেল মধুসূদন গোপনে তিরস্কৃত হইয়াছিলেন।

সঞ্জীবচন্দ্র স্বহস্তে মধুসূদনের অনুবাদের কথা উক্ত গ্রন্থে লিখিয়া দিয়াছিলেন। ‘বঙ্কিম যুগের কথা’— লেখকও বলেন;— অবিলম্বে ‘নীলদর্পণ’ ইংরাজিতে অনুবাদিত হইল। অনুবাদ করিয়া ছিলেন, মাইকেল মধুসূদন দত্ত; কিন্ত লং সাহেবের নামেই তাহা প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়। এই ‘নীলদর্পণে’র সংস্রবে আসিয়া মাননীয় মিঃ সিটনকারও কিছু কষ্টভোগ করিয়াছিলেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত ‘নীলদর্পণে’র অনুবাদ করিয়া একেবারে পরিত্রাণ লাভ করেন নাই; গোপনে তিনিও তিক্তমধুগোছের কিছু কিছু পাইয়াছিলেন।

নীলকরদিগের ইতিহাস সম্বন্ধে যত গ্রন্থ ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হইয়াছে, তাহার প্রায় সবগুলিতেই লেখকরা মধুসূদনকেই ‘নীলদর্পণে’র প্রকৃত অনুবাদক বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন।”১০ মধুসূদন যে ‘নীলদর্পণ’-এর অনুবাদক— এই তথ‍্য প্রসঙ্গত উল্লেখ করেছেন কুঞ্জবিহারী বসু ‘নীলদর্পণ’-এর দ্বিতীয় মুদ্রণের ভূমিকায় ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে। শিবনাথ শাস্ত্রী ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গ সমাজ’ (১৯০৪)-এর ২২৪ পৃষ্ঠায় লিখেছেন: “যতদূর স্মরণ হয়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত এই গ্রন্থ ইংরেজীতে অনুবাদ করেন।” সতীশচন্দ্র মিত্র ‘যশোর খুলনার ইতিহাস’ (প্রকাশকাল ১৩২৯ বঙ্গাব্দ)-এ লিখেছেন: “যখন এই নাটক পাদরী লঙ সাহেবের তত্ত্বাবধানে কবিবর মাইকেল মধুসূদন দত্তের নিপুন লেখনীর সাহায‍্যে ইংরেজীতে ভাষান্তরিত হইল তখন নীলকরমহলে হুলস্থূল পড়িয়া গেল।” বঙ্কিম-পরবর্তী আরও কোনো কোনো প্রবন্ধে এ প্রসঙ্গে তথ‍্য পাওয়া যায়। এ বিষয়ে বিখ‍্যাত গবেষক ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের মন্তব‍্য— “দীনবন্ধু ও মধুসূদন উভয়ে রাজকার্যে নিযুক্ত ছিলেন। এই কারণে বোধ হয়, মূল নাটকে বা তাহার ইংরেজি অনুবাদে গ্রন্থাকার বা অনুবাদক কেহই নিজ নাম প্রকাশ করেন নাই।” (—দ্রঃ, মধুসূদন দত্ত ॥ সাহিত‍্য সাধক চরিতমালা, ২য় খণ্ড ॥ পৃঃ ৬০)। মধুসূদন যে নীলদর্পণের দেশীয় (Native) ইংরেজি অনুবাদক নন— এই বিষয়ে প্রথম লিখিতভাবে সন্দেহ প্রকাশ করেন বিশিষ্ট পণ্ডিত ও গবেষক মম্মথনাথ ঘোষ তাঁর ‘নীলদর্পণের ইংরেজী অনুবাদক কে?’ শীর্ষক ক্ষুদ্র নিবন্ধটিতে (দ্রষ্টব‍্য: প্রবাসী, মাঘ, ১৩৬৩)। বঙ্কিমের উক্তি সম্পর্কে উক্ত নিবন্ধে তিনি মন্তব‍্য করেন: “মোকদ্দমার সময় যাঁহার নাম প্রকাশ পাইল না,সুপ্রিম কোর্ট কি গোয়েন্দা লাগাইয়া তাঁহাকে খুঁজিয়া বাহির করিলেন এবং বাহির করিয়া প্রকাশ‍্যে নহে, গোপনে তিরস্কার করিলেন? বঙ্কিমচন্দ্রের ন‍্যায় উচ্চপদস্থ কর্মচারীর পক্ষে এরূপ লেখা সম্ভব বলিয়া মনে হয় না। আমরা দীনবন্ধুর পুত্র ললিতচন্দ্র মিত্র মহাশয়ের নিকট এ বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করিলে তিনি বলেন বঙ্কিমচন্দ্রের লেখায় নিম্নরেখ অংশ ছিল না, পরে কোন অজ্ঞাত হস্তে উহা সন্নিবিষ্ট হইয়াছিল। তাঁহার নিকট পাণ্ডুলিপি ছিল, কিন্তু পরে সন্ধান করিলে বর্তমান লেখক উহা দেখিতে পান নাই তাঁহার অনুমান উহা বঙ্কিমাগ্রজ সঞ্জীবচন্দ্রের দ্বারা সন্নিবেশিত।”

‘A native’-ছদ্মনামের আড়ালে প্রছন্ন থেকে যিনি নীলদর্পণের ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন তিনি মাইকেল মধুসূদন দত্ত কিনা—এই প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক কালে তথ‍্য ও যুক্তিপূর্ণ আলোচনা করেছেন ডঃ তপোবিজয় ঘোষ— শিবপ্রসাদ চক্রবর্তী সম্পাদিত এবং বৈশাখ, ১৩৮০-তে প্রকাশিত ‘চতুষ্কোণ’ পত্রিকার ‘নীলদর্পণ-এর ইংরেজী অনুবাদ ও মাইকেল মধুসূদন’ প্রবন্ধটিতে। এ প্রবন্ধটিতে তিনি যুক্তি দেখাবার চেষ্টা করেছেন, বাইরের তথ‍্যাবলী এবং আভান্তরীণ ভাষা-রীতি— উভয় দিক থেকে মধুসূদন যে নীলদর্পণের ইংরেজী অনুবাদক নন— এটা অনুমান করবার যথেষ্ট সঙ্গত কারণ আছে। তাঁর ঐকান্তিক বিশ্বাস, নীলদর্পণের ইংরেজী অনুবাদ সর্বস্তরের বাংলা ভাষার সঙ্গে অপরিচিত এবং অনভিজ্ঞ কোন বিদেশী ইংরেজের,— যেহেতু অনুবাদের অনেক স্থলে মূলের অর্থ বিকৃতি ঘটানো হয়েছে। মধুসূদনের মত আঞ্চলিক ভাষার সঙ্গে পরিচিত এবং শক্তিমান ইংরেজী লেখকের পক্ষে অনুবাদে এত মারাত্মক ভুল করা সম্ভব নয়।”১১

নীলদর্পণের অনুবাদ নিয়ে পরে সন্দেহ থাকলেও অনেক আগেই এই অনুবাদের গুণাবলী প্রশ্নে যে মন্তব‍্য করেছিলেন হাইকোর্টের বিচারপতি, তা মধুসূদনের পক্ষেই যায়। জানা যায়, “এই নাটকের ইংরাজি অনুবাদ পাঠ করিয়া, হাইকোর্টের বিচারপতি স‍্যর মর্ডন্ট ওয়েলস্ (Sir Lawson Wells) ইহা দেশীয় লোকের অনুবাদ বলিয়া ধারণা করিতে পারেন নাই। তাঁহার বিশ্বাস, লং সাহেব এই অনুবাদ না করুন, অপর কোন বাঙ্গালাভাষাভিজ্ঞ কৃত‍বিদ‍্য ইংরাজ কর্তৃক ইহা অনূদিত হইয়া থাকিবে। কিরূপ ভাষায় নীলদর্পণ বিরচিত ও তাহার অনুবাদকার্য কিরূপ কঠিন ও জ্ঞানসাধ‍্য, সে ধারণা স‍্যর মর্ডন্ট ওয়েলসের ছিল না। যাহা হউক, অনুবাদকের পক্ষে ইহা বড় অল্প গৌরবের কথা নহে।”১২ মধুসূদনের ইংরেজি জ্ঞান এত উচ্চমার্গীয় ছিল যে, তা তাঁর সমকালে ছিল বিরল। মধুসূদনের বাংলা ও ইংরেজি জ্ঞান সম্পর্কে ওয়েলসের ধারণা ছিল না। তিনি কথিত যে বাংলাভাষাভিজ্ঞ কৃত‍্যবিদ‍্য কোনো ইংরেজ মধুসূদনের সমকালে ছিল কি? ড. তপোবিজয় ঘোষ অনুবাদের অনেক স্থলে মূল ভাবের বিকৃতির যে কথা তুলেছেন, সেটা মনে হতে পারে; কেননা মধুসূদন কখনও আক্ষরিক অনুবাদে বিশ্বাসী ছিলেন না। ‘রত্নাবলী’ অনুবাদের ক্ষেত্রে তার প্রমাণ আমরা পাই। তিনি বন্ধু গৌরদাস বসাককে বলছেন, “ইংরেজি সাহিত‍্যের নাটক সম্বন্ধে তোমার পড়াশুনার পরিধি কতটুকু আমি জানি না। আমি একটু প্রচার করেই বলতে পারি— তুমি সহজেই বুঝতে পারবে আমি খাঁটি স‍্যাক্সন ইংরেজি ব‍্যবহার করার চেষ্টা করেছি। যা সেরা নাট‍্যকারদের ভাষা। আরও দেখতে পাবে, এ ব‍্যাপারে আমি মৌলিক রচনার নিয়ম-কানুন গ্রহণ করেছি, যে সমস্ত জায়গায় বঙ্গীয় ভাব এবং ভাষান্তর করা অসম্ভব সেখানে একটু অমনোযোগী হয়েছি।”১৩ সাহিত‍্যের অনুবাদের ক্ষেত্রে একটি ভাষা থেকে আরেকটি ভাষায় অনুবাদ কখনও আক্ষরিক হতে পারে না। মূল ‘নীলদর্পণ’ এবং অনুবাদ ‘নীলদর্পণ’ পাশাপাশি রেখে মিলিয়ে পাঠ করলে একটু অসঙ্গতি চোখে পড়তেই পারে। সেরা সকল অনুবাদের ক্ষেত্রে একথা প্রযোজ‍্য।

নীলদর্পণ যে মধুসূদনের অনুবাদ নয়, এটা নিয়ে যতই ভিন্নমত থাকুক না কেন, আঞ্চলিক ভাষা সমৃদ্ধ ‘নীলদর্পণ’ মধুসূদনের মতো ইংরেজি ও বাংলা ভাষাবিদের পক্ষে এবং স্বাধীনচেতা লেখকের পক্ষেই ‘নীলদর্পণ’ অনুবাদ করা সম্ভব; এটি আমার ধারণা।

৫.

মাইকেল মধুসূদন দত্তের একমাত্র গ‍দ‍্যগ্রন্থ ‘হেক্‌টর-বধ’। এটি হোমারের ‘ইলিয়ড’ কাব‍্যের অনুবাদ। বিশ্বখ‍্যাত এই কাব‍্যের বারোটি সর্গ ছয়টি পরিচ্ছদে অনুবাদ করেন তিনি। ‘ইলিয়ড’ এর চব্বিশটি সর্গ। কিন্তু মধুসূদন বাকি বারোটি সর্গ শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে শেষ করতে পারেননি। ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দের ১ সেপ্টেম্বর অসমাপ্ত অবস্থায় ‘হেক্‌টর-বধ’ প্রকাশিত হয়। টানা গদ‍্যে লেখা এই রচনাকে মধুসূদন বলেছেন গদ‍্যকাব‍্য।

আমরা আগেই জেনেছি মধুসূদন আক্ষরিক অনুবাদে বিশ্বাসী ছিলেন না। উৎসর্গপত্রে বন্ধু ভূদেব মুখোপাধ‍্যায়কে তিনি জানান— “কাব‍্যখানি পাঠ করিলে টের পাইবে, যে আমি কবিগুরুর মহাকাব‍্যের অবিকল অনুবাদ করি নাই, তাহা করিতে হইলে অনেক পরিশ্রম করিতে হইত, এবং সে পরিশ্রমও যে সর্ব্বতোভাবে আনন্দোৎপাদন করিত, এ বিষয়ে আমার সংশয় আছে। স্থানে স্থানে অনেকাংশ পরিত‍্যক্ত এবং অনেকাংশ পরিবর্ত্তিত হইয়াছে। বিদেশীয় কাব‍্য দত্তকপুত্ররূপে গ্রহণ করিয়া আপন গোত্রে আনা বড় সহজ ব‍্যাপার নহে, কারণ তাহার মানসিক ও শারীরিক ক্ষেত্র হইতে পর বংশের চিহ্ন ও ভাব সমুদায় দূরীভূত করিতে হয়।”১৪ মধুসূদন বাংলা ভাষায় নতুন গদ‍্যরীতির প্রচলন করেছিলেন ‘হেক্‌টর-বধ’-এর মধ‍্য দিয়ে। সমালোচকগণ খুব গুরুত্ব দিয়ে মধুসূদনের এই রচনাটিকে আলোচনা করেননি। তাঁরা এটি কবির অপ্রধান রচনা বলে অভিহিত করেছেন। সমকালে রামগতি ন‍্যায়রত্ন বলেছিলেন— “মাইকেল নাটক ও পদ‍্য রচনা করিয়া কিছু খ‍্যাতিলাভ করিয়াছিলেন সেই তাঁহার ভাল ছিল। তিনি আবার গদ‍্য রচনায় হস্তক্ষেপ করিতে গেলেন কেন? এই কাব‍্য রচনায় না আছে চাতুর্য, না আছে লালিত‍্য, না আছে পাণ্ডিত্য। এই রচনায় ব‍্যাকরণকে পদদলিত করাই যেন রচয়িতার অভীষ্ট ছিল বোধ হয়। নচেৎ রিপুন্তুদ, সিঞ্চন, বিপদার্ণব, মহা মহ অক্ষৌহিনী, ব‍্যঙ্গতা, ব‍্যক্তার্থে, মনান্তর, তুষ্ণীভাবে, হে দেবকুলেন্দ্রদুহিতে, পতিবিরহকাতরা কলত্রবৃন্দ ইত‍্যাদি ভুরি ভুরি ব‍্যাকরণ-দোষ কি কারণে পদে পদে থাকিবে?”১৫ এই সমালোচনা সমালোচকের নয়; এটা বৈয়াকরণের। লেখক ব‍্যাকরণ সৃষ্টি করেন না। লেখকের রচনা অবলম্বনে ব‍্যকরণের জন্ম হয়। মধুসূদনের নাটকের যে গদ‍্য, হেক্‌টর-বধের তুলনায় তা সরল। যেহেতু তিনি একটি মহাকাব‍্যের অনুবাদ করেছেন, সেহেতু এর ভাষা গুরুগম্ভীর হতে বাধ‍্য। আমরা ‘হেক্‌টর-বধ’ থেকে একটি উদ্ধৃতি তুলে ধরতে পারি— “যেমন সাগরমুখে প্রবল বাত‍্যা বহিতে আরম্ভ করিলে ফেনচূড় তরঙ্গনিকর পর্য‍্যায়ক্রমে গভীর নিনাদে সাগরতীর আক্রমণ করে, সেইরূপ গ্রীকযোধবল হুহুঙ্কার শব্দ করিয়া রণক্ষেত্রে রিপুদলকে আক্রমণ করিল। তুমুল রণ আরম্ভ হইল। ত্রাস, পলায়ন,কলহ, বধিরকর নিনাদ, দৃষ্টিরোধক ধূলারাশি, এই সকল একত্রীভূত হইয়া ভয়ানক হইয়া উঠিল। এক দিকে দেবকুলসেনানী স্কন্দ,অপর দিকে সুনীলকমলাক্ষী দেবী আথেনী বীর্য‍্যশালী রীরদলের সাহায‍্য করিতে লাগিলেন। রবিদেব নগরের উচ্চতম গৃহচূড়ায় দাঁড়াইয়া উৎসাহ প্রদানহেতু উচ্চৈঃস্বরে কহিতে লাগিলেন, হে অশ্বদমী ট্রয়নগরস্থ বীরগ্রাম! তোমরা স্বসাহসে নির্ভর করিয়া যুদ্ধ কর। গ্রীকযোধগণের দেহ কিছু পাষাণনির্ম্মিত নহে। আর ও দলের চূড়ামণি বীরকুলেন্দ্র আকিলীসও এ রণস্থলে উপস্থিত নাই। সে সিন্ধুতীরে শিবিরমধ‍্যে অভিমানে স্থিরভাবে আছে। তোমরা নিঃশঙ্ক চিত্তে রণক্রিয়া সমাধা কর। ট্রয়নগরস্থ বীরদল এইরূপে দেবোৎসাহে উৎসাহাম্বিত হইয়া বৈরিগণের সম্মুখীন হইলে ভীষণ রণ বাজিয়া উঠিল। ফলকে ফলকাঘাত, করবালে করবালাঘাত, হন্তা ও মুমূর্ষু জনের হুহুঙ্কার ও আর্ত্তনাদ, এই প্রকার ও অন‍্যান‍্য প্রকার নিনাদে পরিপূরিত হইল। যেমন বর্ষাকালে বহু উৎসগর্ভ হইতে বহু জলপ্রবাহ একত্রে মিলিত হইয়া গভীর গিরিগহ্বরে প্রবেশপূর্ব্বক মহারবে দেশ পরিপূরণ করে, সেইরূপ ভৈরব রবে চতুর্দ্দিক্ পরিপূর্ণ হইল। ভগবতী বসুমতী রক্তে প্লাবিত হইয়া উঠিলেন।”১৬ মধুসূদন যখন এই গদ‍্য রচনা করেছেন, তার আগে প‍্যারীচাঁদ মিত্র, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ‍্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ বাংলা ভাষায় গদ‍্যের আসর জমিয়ে বসেছেন। তুলনামূলক উদাহরণ দিলে আমরা দেখবো, মধুসূদনের গদ‍্যের ভাষা সবার থেকে আলাদা। ‘হেক্‌টর-বধ’-এর ভাষা সুললিত নয় বটে, তবে তা দুর্বোধ‍্য নয়। কবি অনেক তৎসম শব্দ অবলীলায় ব‍্যবহার করেছেন। সংস্কৃত শব্দের উপর ভিত্তি করে অনেক নতুন শব্দ, শব্দব‍্যুহ সৃষ্টি করেছেন। বিষয়ের কারণে যেটুকু ভাবগাম্ভীর্য, ওজস্বীতা প্রয়োজন; তা প্রয়োগে তিনি কার্পণ্য করেননি। কোথাও ভাষার স্খলন ঘটেনি।

১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে বন্ধু রাজনারায়ণ বসুকে লেখা একটি চিঠিতে জানিয়েছিলেন, “গদ‍্যচর্চায় আমি অগ্নিশিখার মতো জ্বলে উঠতে চাই। ‘ভদ্রলোকদের যে ঘৃণ‍্যজন’ নিজেদের অনেক বড় লেখক বলে প্রকাশ করতে চায়, তাদেরকে আমি ছাই করে দিতে চাই। বড় লেখক!! ওরা বেহালার ছড়। দিন দিনই তা প্রকাশ পাচ্ছে। বন্ধু রাজ! তুমি আমার ওপর ভরসা রাখতে পারো। আমি প্রচণ্ড একটা ধূমকেতুর মতো উদিত হবো এবং এর কোনো অন‍্যথা হবে না।”১৭ ধূমকেতুর মতো ঠিকই উদিত হয়েছিলেন, কিন্তু গদ‍্য রচনায় মনোনিবেশের যথেষ্ট অবসর তিনি পাননি। ‘ভদ্রলোকদের ঘৃণ‍্যজন’ বলতে মধুসূদন কাকে বা কাদেরকে অভিহিত করেছেন, সে অনুসন্ধানে না গিয়ে বলা যায়, তিনি গদ‍্যচর্চায় অগ্নিশিখার মতো যদি জ্বলে ওঠার সময় পেতেন, তাহলে বাংলা কবিতার মতো বাংলা গদ‍্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হত।

৬.

মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম কাব‍্য ‘তিলোত্তমা সম্ভবকাব‍্য’-এর ইংরেজি অনুবাদে হাত দিয়েছিলেন, কিন্তু শেষ করতে পারেননি। তিনি ইংরেজি, বাংলা মিলিয়ে যেটুকু অনুবাদ করেছেন, তা তাঁর উভয় ভাষাজ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। অনুবাদ সাহিত‍্যের ইতিহাসে অনুবাদক মধুসূদনের পরিচয়কে ছোটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই।

তথ্যনির্দেশ:

১.    ক্ষেত্র গুপ্ত (সম্পাদিত), ১৯৮৫। মধুসূদন রচনাবলী, সাহিত্য সংসদ, কলিকাতা, পৃষ্ঠা ৪৬৭

২.    প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৭৫

৩.    তদেব

৪.    খসরু পারভেজ (অনূদিত), ২০১০। মধুসূদনের চিঠি, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা, পৃষ্ঠা ৪৮-৪৯

৫.    ক্ষেত্র গুপ্ত (সম্পাদিত) ১৯৮৫। প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৭৭

৬.    প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৭৮

৭.    প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৭৯-৮০

৮.    নগেন্দ্রনাথ সোম, ১৯৮৯। মধু-স্মৃতি, বিদ্যোদয় লাইব্রেরী, কলিকাতা, পৃষ্ঠা ১৩৫

৯.    প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৩৫-১৩৬

১০.    প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৩৬

১১.    দ্বিজেন্দ্রলাল নাথ (সম্পাদিত) ১৯৮৬। মধুসূদন: সাহিত্য প্রতিভা ও শিল্প ব্যক্তিত্ব, পুথিপত্র, কলকাতা, পৃষ্ঠা ৪৩৩

১২.    নগেন্দ্রনাথ সোম, ১৯৮৯। প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৩৭

১৩.    খসরু পারভেজ (অনূদিত), ২০১০। প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৪৬

১৪.    ক্ষেত্র গুপ্ত (সম্পাদিত) ১৯৮৫। প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৬৫-৬৬

১৫.    দ্বিজেন্দ্রলাল নাথ (সম্পাদিত), ১৯৮৬। প্রাগুক্ত। সজনবিহারী ভট্টাচার্য, ‘বাংলা চলতি গদ্যের প্রথম সতর্ক লেখক মধুসূদন’, পৃষ্ঠা ৯৯-১০০

১৬.    ক্ষেত্র গুপ্ত (সম্পাদিত), ১৯৮৫। প্রাগুক্ত, হেক্‌টর-বধ-এর দ্বিতীয় পরিচ্ছদের শেষাংশ, পৃষ্ঠা ৪১১

১৭.    খসরু পারভেজ (অনূদিত), ২০১০। প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৯০