১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

৭০ পেরিয়ে মোহন রায়হান: ‘কিছুই করতে পারিনি, আমি ব্যর্থ ও পরাজিত মানুষ’

“ক্ষমতার অনেক সুযোগ আমার কাছে ছিল; এখনো আছে, কিন্তু আমি তা বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছি।”

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 22 Aug 2026, 09:06 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:53 PM

সংগীত, আবৃত্তি, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন, গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন ও কাব্য নৃত্যনাট্যের মধ্য দিয়ে উদযাপন হল কবি মোহন রায়হানের ৭০তম জন্মবার্ষিকী।

শনিবার বিকালে ঢাকার শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠান করে ‘মোহন রায়হান ৭০ বছর উদযাপন পরিষদ’।

একদল সংগীতশিল্পীর যৌথ উদ্বোধনী পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। এরপর দেখানো হয় মোহন রায়হানের জীবন ও কর্মের ওপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র 'অগ্নিপথের কবি'।

মাসুদ করিমের নির্মাণে এই তথ্যচিত্রে কবির জন্ম, শৈশব, বেড়ে ওঠা, সাহিত্যজীবনের বিকাশ, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি তার অবদানের নানা দিক তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানের মূল পর্বে কবিকে নিয়ে রচিত 'রাজপথের কবি' সংবর্ধনা গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। মোহন রায়হানের নির্বাচিত ১০০ কবিতা গ্রন্থেরও মোড়কও উন্মোচন হয় অনুষ্ঠানে।

অতিথি হয়ে এসেছিলেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান, কবি মতিন বৈরাগী ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক।

সভাপতিত্ব করেন 'মোহন রায়হান ৭০ বছর উদযাপন পরিষদের' আহ্বায়ক লেখক ও গবেষক সলিমুল্লাহ খান।

কবি মতিন বৈরাগী বলেন, " মোহন রায়হান কখনোই ক্ষমতালোভী ছিলেন না। চাইলেই তিনি ক্ষমতার কাছাকাছি যেতে পারতেন, কিন্তু তা না করে মানুষের চেতনার বিকাশে কাজ করে যাওয়ার পথই তিনি বেছে নিয়েছেন।"

আলোচনা পর্ব শেষে কবি মোহন রায়হানকে শুভেচ্ছা জানায় জাতীয় কবিতা পরিষদ, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, কবিতা পরিষদ মানিকগঞ্জ, বাংলাদেশ সাম্যবাদী আন্দোলন, আগামী প্রকাশনী, অন্যপ্রকাশ, অন্যধারা এবং সিরাজগঞ্জের সংস্কৃতিজন ফোরাম।

অনুষ্ঠানে মোহন রায়হানের কবিতা আবৃত্তি করেন অনন্যা লাবণী পুতুল, মনিরুজ্জামান রোহান, শিমুল পারভীন, মেহেদী হাসান ও মাহমুদুল হাসান।

অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে কবি মোহন রায়হান বলেন, "স্বাধীনতা, আমার প্রিয়তম স্বাধীনতা। তোমার জন্য যত রক্তপাত, নিবেদিত শব্দাবলী। আসলে আমার কিছুই বলার নেই, আমি মুগ্ধ ও বিমোহিত। আপনারা যারা এখানে উপস্থিত হয়েছেন, তারা হয়তো আমাকে ভালোবাসেন, নয়তো পছন্দ করেন। না হলে এত দূর-দূরান্ত থেকে নিজেদের মূল্যবান সময় ব্যয় করে এখানে উপস্থিত হতেন না।

“আমি জীবনে কিছুই হতে চাইনি, কোনো কিছু পেতে চাইনি; শুধু মানুষকে ভালোবাসতে চেয়েছি। শৈশবেই এ দেশকে ভালোবাসতে শিখেছিলাম উত্তরাধিকার ও পারিবারিক সূত্রে। আমার বাবা আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতাজি সুভাষের সঙ্গে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। তার কাছ থেকেই দেশপ্রেম ও মানুষকে ভালোবাসতে শিখেছি।”

কবি বলেন, “জীবনে কিছুই করতে পারিনি, আমি একজন ব্যর্থ ও পরাজিত মানুষ। তবুও আপনারা আমার এই জন্মদিন উদযাপন করছেন ও ভালোবাসা জানাচ্ছেন, সেজন্য আমি চিরকৃতজ্ঞ।"

তিনি আরও বলেন, "অনেকে প্রত্যাশা করেছেন আমি আমার কবিতায় বা বক্তৃতায় যা বলেছি, যেন আমার সেই নীতি-আদর্শে একনিষ্ঠ ও অবিচল থাকতে পারি। আমি কথা দিচ্ছি, আপনাদের প্রত্যাশার সঙ্গে বা এ দেশের জনগণের সঙ্গে কখনো বেইমানি করব না।

"রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, 'আমার মাথা নত করে দাও হে প্রভু তোমার চরণধূলার তলে।' আমি তার প্রত্যুত্তরে ছাত্রজীবনে কবিতা লিখেছিলাম, 'আমার মাথা নত হয় না, নত হয় না।'

“ক্ষমতার অনেক সুযোগ আমার কাছে ছিল, এখনো আছে; কিন্তু আমি তা বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছি। ভবিষ্যতেও কোনো ক্ষমতা, পদ-পদবি বা অর্থ-বিত্তের কাছে মোহন রায়হান বিক্রি হবে না।"

এরপর দেখানো হয় মোহন রায়হানের কবিতা অবলম্বনে কাব্য নৃত্যনাট্য 'মোহন বাঁশি'।