‘অসতী’ পেনেলোপির সতীত্বের বয়ান ও পুরুষতন্ত্র
দীর্ঘ কুড়ি বছরের একাকিত্বে, যেখানে স্বামীর ফিরে আসবার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা ছিল না এবং চারপাশের সবাই ইউলিসিসকে মৃত বলে ধরে নিয়েছিল, সেখানে পেনেলোপির সঙ্গে এদের মানবিক, রাজনৈতিক ও মানসিক আদান-প্রদান গড়ে ওঠাই ছিল স্বাভাবিক। সমাজ যাকে সতীত্বের আদর্শ বলে চাপিয়ে দিতে চায়, তার আড়ালে থাকে রক্তমাংসের মানুষের শরীর ও মনের চাহিদা।
পেনেলোপি, গ্রিক পুরাণের একটি চরিত্র। আমি এই লেখার শিরোনাম রেখেছি ‘অসতী পেনেলোপি’। কেন? হোমারসহ আরও কতিপয় বর্ণনায় ‘পেনেলোপি’ চরিত্রটি হাজার বছর ধরে পতিব্রতা, সতী ও ধৈর্যের প্রতীক হিসেবে খ্যাতি পেয়ে আসছে। তার ওপর একপ্রকার দেবীত্ব আরোপ করা হয়েছে। ‘অসতী’ শব্দটি মূলত ট্যাবু। আমি সেই ট্যাবু ভাঙবার জন্যই এইখানে পেনেলোপিকে অসতী বলছি, তাকে রক্তমাংসের মানবিক রূপে ডিসকোর্স করে। কেননা ‘সতী-অসতী’ যথা অর্থে কোনো বাইনারিই নয়, দিন-রাত্রি, বা ভালো-মন্দের মতো। এটি মূলতই ধর্ম ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজ দ্বারা আরোপিত ভুল বাইনারি।
হোমারের ‘ওডিসি’তে তাঁকে যেভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তা মূলত প্রাচীন ইথাকার রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলে বন্দি এক বিরহী রানির গল্প, যিনি কুড়ি বছর ধরে তাঁর স্বামীর প্রত্যাবর্তনের আশায় অশ্রুপাত করেছেন। কিন্তু মহাকাব্যের এই সাজানো ও নৈতিক রূপরেখার গভীরে লুকিয়ে আছে অন্য এক সত্য, যা রাষ্ট্র, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও পরবর্তী যুগের সাহিত্যিক সংস্কারের চাপে ঢাকা পড়ে গেছে। হোমারের বহু আগে থেকেই এজিয়ান সাগরের আশপাশের দ্বীপগুলিতে, স্পার্টা ও আর্কাডিয়ার পাহাড়ি লোকালয়ে পেনেলোপিকে নিয়ে প্রচলিত ছিল বহু কথা। সেই প্রাক-হোমারীয় আখ্যানগুলিতে পেনেলোপি কেবল দেবীতুল্য বা সতী ছিলেন না, তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধূর্ত এক কূটনীতিক, জীবনের জটিল সমীকরণে বেঁচে থাকবার লড়াই চালানো এক বাস্তব মানুষ এবং নিজের মন ও শরীরের চাহিদা প্রকাশে সক্ষম এক স্বাধীন সত্তা।
ইউলিসিস যখন ট্রয় যুদ্ধের উদ্দেশ্যে নিজ রাজ্য ইথাকা ত্যাগ করেন, তখন পেনেলোপির কাছে ছিল শিশু তেলেমাখোস। ইউলিসিস মানে গ্রিক ওদিউসসেউস। লাতিন ভাষায় যাকে ইউলিসিস বলে। যেহেতু খুবই ছোটোবেলায় ইউলিসিসের ভ্রমণকাহিনি নামে প্রথম হোমার পড়ি, তাই আমার ইউলিসিস বলতেই ভালো লাগে। পরে সঙ্গে যুক্ত হয়ে একই নামে দেখা বেশ কয়েকটা সিনেমা আর জেমস জয়েসের উপন্যাস। সে যাইহোক, মূল আলোচনায় আসি।
যুদ্ধের দশ বছর এবং যুদ্ধশেষে পথিমধ্যে ইউলিসিসের নিখোঁজ থাকবার আরও দশ বছর, এই সুদীর্ঘ কুড়ি বছর ইথাকার রাজনীতি ও সামাজিক অবস্থা প্রচণ্ড অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছিল। একজন শাসকের অনুপস্থিতিতে রাজ্যের সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখা এবং একই সঙ্গে নিজের শিশুপুত্রকে রক্ষা করা পেনেলোপির জন্য ছিল এক জীবনমরণ সংগ্রাম। ইউলিসিস বাড়ি ছাড়ার এক দশক পর তাঁর মা আন্তিক্লেয়া পুত্রের বিচ্ছেদশোকে মারা যান, আর বাবা লায়েরতেস মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়ে প্রাসাদ ছেড়ে গ্রামের খামারে একপ্রকার নির্বাসিত জীবন বেছে নেন। তখন ইথাকার রাজপ্রাসাদে পেনেলোপি ও তার শিশু পুত্র তেলেমাখোস ছাড়া আর রক্ত বা আত্মার সম্পর্কের কেউ নেই। দাসী বা কর্মচারীরা তো ওই অর্থে কেউ নয়। এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে ইথাকা ও পার্শ্ববর্তী সামে, দুলিকিয়াম ও জাকিন্থস দ্বীপ থেকে প্রায় ১০৮ জন রাজবংশীয় তরুণ পাণিপ্রার্থী ইথাকার প্রাসাদে ঢুকে পড়ে, এবং থাকতে শুরু করে। তারা কেবল পেনেলোপিকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, উপরন্তু প্রতিদিন প্রাসাদের সম্পদ ধ্বংস করে উৎসব করত, গৃহপালিত পশুপাখি জবাই করে খেত এবং রাজ্য দখলের পাঁয়তারা চালাচ্ছিল।
হাজার বছর ধরে পেনেলোপির আত্মরক্ষার প্রধান মাধ্যম হিসেবে একটি বিখ্যাত কৌশলের কথা বলা হয়। তা হলো, বৃদ্ধ শ্বশুরের জন্য কাফন বুনবার নাটক। পেনেলোপি পাণিপ্রার্থীদের বলেছিলেন, এই কাফন বোনা শেষ হলেই তিনি তাদের মধ্য থেকে কাউকে বিবাহ করবেন। দিনে তিনি রাজপ্রাসাদের সবার সামনে সেই কাফন বুনতেন এবং রাতে গোপনে তা খুলে ফেলতেন। লোকচক্ষুর সামনে এই কাহিনি সতীত্ব ও বুদ্ধিমত্তার এক অভূতপূর্ব নিদর্শন হিসেবে দেখানো হলেও, এটাকে আমার কাছে নাটকের ভেতর আরেক নাটকই মনে হয়।
প্রাচীন ইথাকার সেই ষড়যন্ত্রময় রাজপ্রাসাদে ১০৮ জন উচ্চবিলাসী কূটকৌশলী পুরুষ বছরের পর বছর একটি সুতার কাপড়ের ওপর ভরসা করে বসে থাকবে এবং তারা এক রানির দিনে বোনা ও রাতে খোলা কাপড়ের সাধারণ চালাকি ধরতে পারবে না, এমন তো দাবি মানুষের বাস্তব বুদ্ধি ও বস্তুগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে চরম সাংঘর্ষিক!
এই কাফন বুনবার গল্প ছিল আদতে তেলেমাখোস শিশু থাকা অবস্থায় কালক্ষেপণের এক সাময়িক প্রতিরোধ কৌশল। প্রাসাদে অবস্থানরত ১০৮ জন পাণিপ্রার্থীর সঙ্গে পেনেলোপির সম্পর্কের স্বরূপ কেবল একতরফা প্রতিরোধ বা ঘৃণার ছিল না। দীর্ঘ কুড়ি বছরের একাকিত্বে, যেখানে স্বামীর ফিরে আসবার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা ছিল না এবং চারপাশের সবাই ইউলিসিসকে মৃত বলে ধরে নিয়েছিল, সেখানে পেনেলোপির সঙ্গে এদের মানবিক, রাজনৈতিক ও মানসিক আদান-প্রদান গড়ে ওঠাই ছিল স্বাভাবিক। সমাজ যাকে সতীত্বের আদর্শ বলে চাপিয়ে দিতে চায়, তার আড়ালে থাকে রক্তমাংসের মানুষের শরীর ও মনের চাহিদা। কুড়ি বছর ধরে কোনো মানুষ পাথরের মূর্তির মতো নিষ্কাম ও নিঃসঙ্গ অবস্থায় টিকে থাকতে পারে না, যদি চারপাশে সুযোগ হাঁ করে থাকে। প্রকৃতি কখনো কোনো শূন্যস্থান পছন্দ করে না, জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহে দৈহিক ও মানসিকভাবে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করা মানুষের আদিম ও সার্বজনীন প্রবৃত্তি।
শোপেনহাওয়ার যেমন বলেছিলেন, মানুষের মগজ এক পঙ্গু লোকের মতো, যে চড়ে বসে আছে এক অন্ধ কিন্তু শক্তিক্ষম দানবের কাঁধে। এখানে অন্ধ দানব হল মানুষের শরীর, তার আদিম প্রবৃত্তি, বেঁচে থাকবার তাগিদ ও প্রজনন ও দৈহিক বাসনার অন্ধ শক্তি। আর কাঁধে বসে থাকা পঙ্গু লোকটিকে আমরা বিবেচনা করতে পারি মানুষের বুদ্ধি বা নৈতিক যুক্তি হিসেবে। অন্ধ দানব তার প্রবৃত্তি অনুযায়ী যেদিকে পা বাড়ায়, কাঁধে বসা পঙ্গু লোকটি কেবল নানাবিধ যুক্তি ও নীতি সাজিয়ে প্রমাণ করতে চায় যে, সেই পথটিই ছিল তার অত্যন্ত স্বাধীন ও সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত। পেনেলোপিকে যদি এই যুক্তি দিয়ে বিচার করা যায়, তবে দেখা যাবে যে, সতীত্ব ও কাফন বুনবার গল্প ছিল মূলত কাঁধে বসে থাকা পঙ্গু লোকটির সাজানো যুক্তি। এর গভীরে কাজ করছিল অন্ধ দানবের মতো বেঁচে থাকবার আদিম প্ররোচনা, জীবনতৃষ্ণা ও টিকে থাকবার নির্মম বাস্তব লড়াই।
আর্কাডীয় লোককথা ও প্রাচীন অলিম্পাস-পূর্ব পুরাণে দেখা যায়, পেনেলোপি নামের উৎস লুকিয়ে আছে ‘পেনেলোপ্স’ শব্দটির মধ্যে, যার অর্থ এক প্রকার জলচর পাখি। প্রাচীন গ্রিসে এই পাখি ছিল উর্বরতা, জলাভূমি ও প্রকৃতির অবাধ স্বাধীন শক্তির প্রতীক। পুরুষতান্ত্রিক অলিম্পীয় দেবমণ্ডল সংগঠিত হবার আগে, এজিয়ান অঞ্চলজুড়ে যে মাতৃপ্রধান ও স্বাধীন প্রাক-অলিম্পীয় ধর্মবিশ্বাস প্রচলিত ছিল, পেনেলোপি ছিলেন তারই এক গুরুত্বপূর্ণ দেবী। সেই লোকশ্রুতি থেকে জানা যায়, ইউলিসিসের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে পেনেলোপি প্রাসাদে আসা পাণিপ্রার্থীদের সঙ্গে কোনো নিষ্কাম দূরত্ব বজায় রাখেননি, তিনি তাদের সঙ্গে মুক্ত ও স্বাভাবিক দৈহিক ঘনিষ্ঠতায় লিপ্ত হয়েছিলেন। এই যৌথ মিলনের ফলেই জন্ম হয়েছিল প্রাক-অলিম্পীয় উর্বরতা, অরণ্য ও বন্য প্রকৃতির ছাগলমাথা দেবতা প্যানের।
যখন গ্রিসে ব্যক্তিমালিকানা ও পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা সুদৃঢ় হতে শুরু করল, তখন সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনে নারীর শরীরের ওপর পুরুষের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার তাগিদ দেখা দিল। ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তির প্রধান শর্তই উত্তরাধিকার সুনির্দিষ্ট করা, একজন পুরুষকে নিশ্চিত হতে হবে যে, তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মালিক হতে যাওয়া সন্তানটি একান্তই তার নিজস্ব রক্তের। এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক তাগিদ থেকেই তৈরি হল সতীত্ব ও পতিব্রতীর নৈতিক শেকল। ফলে প্রাক-অলিম্পীয় যুগের সেই স্বাধীন, বহুভোজী ও বহুগামী দেবী পেনেলোপিকে ছেঁটে কেটে হোমারের মহাকাব্যে রূপ দেওয়া হল এক মমতাময়ী, কান্নারত ও পতিব্রত অনুগত রানির চরিত্রে। কাফন বুনবার নাটক ছিল সেই চাপিয়ে দেওয়া নৈতিক রূপান্তরের ওপর লাগানো এক চটকদার সামাজিক আভরণ মাত্র।
ইউলিসিস ও পেনেলোপির এই আখ্যানে পুরুষতান্ত্রিক দ্বিচারিতার নীতি যেভাবে ফুটে উঠেছে, তা বিস্ময়কর। ইউলিসিস ট্রয় যুদ্ধের সুদীর্ঘ ১০ বছর পর আরও ১০ বছর সমুদ্রপথে পরিভ্রমণ করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে ইউলিসিস নিজে কোনো প্রকার সংযম পালন করেননি। হোমারের বর্ণনাতেই আছে, ইউলিসিস জাদুকরী সার্সের দ্বীপে এক বছর রাজকীয় ভোগবিলাসে এবং কামুক জলপরী ক্যালিপ্সোর দ্বীপে দীর্ঘ সাত বছর ধরে শারীরিক ও মানসিকভাবে যুক্ত ছিলেন। সমুদ্রযাত্রার প্রতিটি পদক্ষেপে ইউলিসিস স্বাধীনভাবে নিজের কামক্ষুধা চরিতার্থ করে গেছেন, অথচ ঘরে ফিরে তিনি আশা করেছেন যে তাঁর স্ত্রী পেনেলোপি কুড়ি বছর ধরে কোনো পুরুষকে স্পর্শ করবেন না এবং এক পাথরের দেবীর মতো তাঁর জন্য অপেক্ষা করবেন। পুরুষের জন্য অবাধ যৌন স্বাধীনতা আর নারীর জন্য আজীবন সতীত্বের এই দাবি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা পুরুষতান্ত্রিক শাসনের এক নগ্ন ও বৈষম্যমূলক চিত্র।
কুড়ি বছর পর ইউলিসিস যখন ইথাকায় ফিরলেন, তখন তিনি এক প্রেমিক বা অনুশোচনাগ্রস্ত স্বামীর মতো সোজা স্ত্রীর সামনে গিয়ে দাঁড়াননি। তিনি বেছে নিয়েছিলেন এক নিখুঁত মনস্তাত্ত্বিক গোয়েন্দাগিরি ও ছদ্মবেশের পথ। এক জীর্ণ ভিক্ষুকের রূপ ধারণ করে তিনি রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করেন। এই ছদ্মবেশ ধারণ করবার মূল মনস্তাত্ত্বিক কারণ ছিল চরম অবিশ্বাস ও নিজের মালিকানাধীন সম্পত্তির নিরাপত্তা যাচাই করা। ইউলিসিস দেখতে চেয়েছিলেন, তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর রাজ্য, তাঁর ধনসম্পদ ও সর্বোপরি তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত স্ত্রী পেনেলোপির শরীরের যৌনমন্দির পবিত্র ও অক্ষত আছে কি না। তিনি অন্দরমহলের গোপন খবর সংগ্রহ করতে থাকেন এবং প্রাসাদের বিশ্বস্ততা পরীক্ষা করেন। একজন প্রকৃত প্রেমিক দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর যে মানবিক আবেগ প্রকাশ করে, ইউলিসিসের আচরণে তার থেকে বেশি প্রকট হয়েছিল একজন সন্দেহপ্রবণ মালিকের তাঁর সম্পত্তি তদারকি করবার আদিম আকুলতা।
এরপর প্রাসাদে ঘটে যায় এক মর্মান্তিক ও রক্তক্ষয়ী তাণ্ডব। ইউলিসিস ১০৮ জন পাণিপ্রার্থীকে কোনো প্রকার আলোচনা, বিচার বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে একে একে নির্মমভাবে হত্যা করেন। প্রচলিত গাথায় এই হত্যাকাণ্ডকে ন্যায়বিচার বা পাপের শাস্তি হিসেবে দেখানো হলেও, বস্তুগত বিচারে এটি ছিল ইউলিসিসের ক্ষুব্ধ পুরুষোচিত অহং ও রক্তপিপাসু রাজনৈতিক দখলদারিত্বের চরম বহিঃপ্রকাশ। এই পাণিপ্রার্থীরা কোনো ডাকাত বা বহিরাগত আক্রমণকারী ছিল না, তারা তৎকালীন গ্রিক সমাজের প্রচলিত আইনি ও সামাজিক রীতি মেনেই পেনেলোপিকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিল। সুদীর্ঘ কুড়ি বছর ধরে যে রাজার কোনো খোঁজ নেই, তাঁকে সমাজ মৃত বলেই ঘোষণা করেছিল। ইউলিসিস তাদের হত্যা করেছিলেন মূলত নিজের সামাজিক কর্তৃত্ব পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে এবং তাঁর সম্পত্তিতে অন্য পুরুষদের স্পর্শের শোধ তুলতে।
এই রক্তক্ষয়ী ঘটনার সব থেকে করুণ ও সত্য উন্মোচনকারী অধ্যায় ছিল প্রাসাদের ১২ জন তরুণ দাসীর নির্মম সংহার। যে ১২ জন দাসী পাণিপ্রার্থীদের সঙ্গে মেলামেশা করত, ইউলিসিস পাণিপ্রার্থীদের হত্যার পরপরই সেই তরুণী দাসীদের ধরে ধরে হত্যা করেন। হোমারে এই দাসীদের কুলটা, বিশ্বাসঘাতী বা চরিত্রহীন আখ্যা দিয়ে তাদের হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেবার একটি অপচেষ্টা দেখা যায়। কিন্তু এ ছিল অত্যন্ত ধূর্ত ও নৃশংস এক রাজনৈতিক গণহত্যা এবং প্রমাণ নষ্ট করা। অন্দরমহলে কী ঘটেছিল, পেনেলোপির সঙ্গে পাণিপ্রার্থীদের প্রকৃত সম্পর্কের গভীরতা কেমন ছিল এবং সামাজিক ও দৈহিক ঘনিষ্ঠতার মূল সত্য কী ছিল, তার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী ছিল এই ১২ জন। যদি এরা বেঁচে থাকত, তবে সমাজ ও ভবিষ্যতের ইতিহাসের কাছে পেনেলোপির মেকি সতীত্বের গল্প এবং ইউলিসিসের রাজকীয় ভাবমূর্তি চিরকালের জন্য উন্মোচিত হয়ে যেত। অন্দরমহলের গোপন সত্য, নারীর জৈবিক বাস্তবতার ইতিহাস যাতে কোনোদিন প্রাসাদের দেওয়াল ডিঙিয়ে বাইরে আসতে না পারে, সেজন্যই ইউলিসিস অত্যন্ত ঠান্ডামাথায় সেই সাক্ষী দাসীদের হত্যা করেছিলেন। তাদের মুখ চিরতরে বন্ধ করে দেবার মাধ্যমে ইউলিসিস নিজের বানিয়ে তোলা পতিপ্রাণ সতী স্ত্রীর আখ্যানকে সমাজ ও ইতিহাসে একমাত্র গ্রহণযোগ্য সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। এ ছিল নিজের নড়বড়ে ক্ষমতা, ভণ্ড সামাজিক সম্মান এবং পতিব্রতা প্রথার মেকি দেওয়ালকে টিকিয়ে রাখার এক ভয়াল নকশা।
জেমস জয়েস যখন তাঁর ‘ইউলিসিস’ উপন্যাস লেখেন, তখন তিনি হোমারের বলা এই পৌরাণিক কাহিনিকে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক পরিসরে অবিনির্মাণ করেছিলেন। জয়েস খুব ভালোভাবেই জানতেন যে, পেনেলোপি আসলে রক্তমাংসের কোনো নিষ্কাম দেবী নন। জয়েসের উপন্যাসে পেনেলোপির আধুনিক রূপান্তর ঘটে মলি চরিত্রের মধ্য দিয়ে। জয়েসের গল্পটি ছিল মাত্র একদিনের, আর হোমারের গল্পটি ছিল সুদীর্ঘ কুড়ি বছরের। মলির সেই স্ট্রিম অব কনসাসনেসে যে ইন্টেরিয়র মনোলগ ব্যক্ত হয় তা মূলত নারীর দেহ, যৌনতা, একাকিত্ব ও বেঁচে থাকবার অপ্রতিরোধ্য ও খোলামেলা স্বীকারোক্তি। মলির অবদমনহীন ও স্বতঃস্ফূর্ত শারীরিক কামনার মধ্য দিয়েই যেন হোমারের পেনেলোপি হাজার বছরের সামাজিক শৃঙ্খল ভেঙে নিজের প্রকৃত রক্তমাংসের অস্তিত্বকে জানান দেয়।
‘তেলেগোনি’ নামের প্রাচীন গ্রিক এক মহাকাব্যে দেখা যায়, ১০৮ জন পাণিপ্রার্থীকে হত্যার পর রক্তে ভেসে যাওয়া ইথাকায় ইউলিসিস শান্তি পাননি। সমুদ্রের দেবতা পোসাইডনের অভিশাপ থেকে মুক্তির জন্য তাঁকে আবার কাঁধে একটি দাঁড় নিয়ে অজানা দেশের উদ্দেশে যাত্রা করতে হয়। এই সময়ে জাদুকরী সার্সের গর্ভে জন্ম নেওয়া ইউলিসিসের অপর পুত্র তেলেগোনুস পিতার সন্ধানে ইথাকা দ্বীপে এসে উপস্থিত হয়। অচেনা দ্বীপে খাদ্য সংগ্রহের জন্য এসে সে প্রাসাদের রক্ষীদের মুখোমুখি হয় এবং যুদ্ধ শুরু হয়। ইউলিসিস নিজের পরিচয় না জেনে যুদ্ধক্ষেত্রে নামেন। বিষাক্ত সামুদ্রিক মাছের কাঁটা দিয়ে তৈরি বর্শা দিয়ে তেলেগোনুস ইউলিসিসকে আঘাত করে এবং ইউলিসিস নিজের পুত্রের হাতেই মৃত্যুবরণ করেন। পিতার মৃত্যুর পর তেলেগোনুস যখন তাঁর প্রকৃত পরিচয় জানতে পারে, তখন সে গভীর অনুশোচনায় ভেঙে পড়ে। সে ইউলিসিসের মৃতদেহের সঙ্গে পেনেলোপি ও তেলেমাখোসকে সঙ্গে নিয়ে সার্সের দ্বীপে পাড়ি জমায়। সেখানে পেনেলোপি বিবাহ করেন তাঁরই স্বামী ইউলিসিসের হত্যাকারী ও সৎপুত্র তেলেগোনুসকে, আর ইউলিসিসের পুত্র তেলেমাখোস বিবাহ করেন সৎমা সার্সকে। যে নারী কুড়ি বছর ধরে স্বামীর অপেক্ষায় দিন গুনেছেন বলে প্রচার করা হয়, তিনি কীভাবে নিজের স্বামীর হত্যাকারী এবং স্বামীরই অন্য স্ত্রীর সন্তানকে স্বেচ্ছায় বিবাহ করতে পারেন? এই ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে, পেনেলোপির দীর্ঘ রূপক অপেক্ষা কোনো অন্ধ ভালোবাসার ফল ছিল না, তা ছিল পরিস্থিতির চাপে টিকে থাকবার লড়াই এবং রাজপ্রাসাদের জটিল রাজনৈতিক সমীকরণের এক সাময়িক রূপ মাত্র।
আরেক আঞ্চলিক লোককথায় দেখা যায়, ১০৮ জন পাণিপ্রার্থীকে হত্যার পর ইউলিসিস যখন অন্দরমহলের গোপন তথ্য এবং দাসীদের মাধ্যমে পেনেলোপির অনৈতিক ও ব্যভিচারের সত্যতা জানতে পারেন, তখন তিনি পেনেলোপিকে চরম অপমান করে ইথাকা থেকে নির্বাসিত করেন, রাম যেমন সীতাকে পরিত্যাগ করেছিলেন ভারতবর্ষীয় পৌরাণিক মহাকাব্য ‘রামায়ণ’-এ। তবে পরিত্যক্ত ও অপমানিত পেনেলোপি কিন্তু নিজের জীবন বিসর্জন দেননি বা ইউলিসিসের পায়ে ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করেননি। তিনি মাথা উঁচু করে সোজা নিজের পিতৃভূমি স্পার্টায় ফিরে যান এবং পরবর্তীতে আর্কাডিয়ার নির্জন পাহাড়ি অঞ্চলে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন শুরু করেন। সেখানে একাকীত্ব ও উপেক্ষার ভেতর দিয়েই তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলি অতিবাহিত হয়। এই প্রথাগত বহির্ভূত গল্পগুলি প্রমাণ করে যে, তৎকালীন সমাজেও পেনেলোপির একনিষ্ঠ সতীত্বের গল্পটিকে একটি সামাজিক মিথ্যা বা রাজনৈতিক প্রচার হিসেবে দেখা হত।
ইউলিসিস যখন ১০৮ জন মানুষকে হত্যা করে রক্তমাখা হাতে স্ত্রীর সামনে এসে দাঁড়ান এবং নিজেকে ইথাকার রাজা ও তাঁর দীর্ঘদিনের হারিয়ে যাওয়া স্বামী হিসেবে দাবি করেন, পেনেলোপি কিন্তু আবেগাপ্লুত হয়ে সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে জড়িয়ে ধরেননি বা মেনে নেননি। কুড়ি বছর পর আসা একজন রক্ত তৃষ্ণার্ত পুরুষকে তিনি সন্দেহের চোখে দেখেছিলেন। তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে ইউলিসিসকে এক মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করান। পেনেলোপি রাজপ্রাসাদের বিশ্বস্ত দাসীকে নির্দেশ দেন তাঁদের শোবার ঘরের খাটটি বাইরে বের করে আনতে, যাতে আগন্তুক সেখানে বিশ্রাম নিতে পারেন। এই কথা শুনে ইউলিসিস প্রচণ্ড রেগে যান এবং বলেন যে, এই খাট কোনো মানুষের পক্ষে সরানো অসম্ভব। কারণ, ইউলিসিস নিজে একদা রাজপ্রাসাদ নির্মাণের সময় একটি বিশাল ও সতেজ জলপাই গাছের কাণ্ড কেটে প্রাসাদের ভিত্তির সঙ্গে গেঁথে সেই খাট তৈরি করেছিলেন, তার সঙ্গে প্রাসাদের মূল দেওয়াল ও মেঝে যুক্ত ছিল। ইউলিসিস ছাড়া এই গোপন সত্য আর কারও জানার কথা ছিল না। ইউলিসিস যখন এই গোপন নির্মাণকৌশলের কথা হুবহু বলে দিলেন, কেবল তখনই পেনেলোপি নিশ্চিত হলেন যে এই লোকই তাঁর স্বামী।
আপাতচোখে এই ঘটনাকে স্বামী-স্ত্রীর এক মধুর চেনার উপায় মনে হলেও, এ ছিল পেনেলোপির বুদ্ধিবৃত্তিক জয়। ইউলিসিস ভেবেছিলেন তিনি শক্তি প্রদর্শন করে, ধনুকে ছিলা চড়িয়ে এবং রক্ত গঙ্গা ভাসিয়ে ইথাকার ওপর নিজের কর্তৃত্ব স্থাপন করেছেন। পেনেলোপি প্রমাণ করে দিলেন যে, শারীরিক শক্তির চেয়ে অন্দরমহলের গোপন সত্য এবং বুদ্ধিবৃত্তিক নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি শক্তিক্ষম। তিনি রক্তমাখা বিজয়ী পুরুষটিকে নিজের খাটের গোপন পরীক্ষা দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করেছিলেন। তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, রাজপ্রাসাদের ওপর ইউলিসিসের রাজকীয় অধিকার থাকতে পারে, কিন্তু প্রাসাদের অন্দরমহল ও তার গোপন সত্যের ওপর একমাত্র সার্বভৌম ক্ষমতা ছিল পেনেলোপিরই।
যে স্বামী কুড়ি বছর ধরে অনুপস্থিত, সেই স্বামী একজন সাধারণ রক্তমাংসের নারীর কাছে দিনশেষে একটি কাল্পনিক ও অবাস্তব ছায়ামূর্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রতিদিনের ক্ষুধা, তৃষ্ণা, সামাজিক অনিরাপত্তা, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং শারীরিক নিঃসঙ্গতার বিপরীতে এক দূরবর্তী স্মৃতির ওপর ভরসা করে জীবন পার করা প্রাকৃতিকভাবে অসম্ভব। নারীর কাছে চরম সত্য হয়ে ওঠে তাঁর বর্তমানের একাকিত্ব, তাঁর নিজস্ব শারীরবৃত্তীয় প্রয়োজন এবং একটি নিরাপদ সাময়িক আশ্রয়। ইথাকার রাজপ্রাসাদে যে ১০৮ জন পাণিপ্রার্থী অবস্থান করছিলেন, তারা কেবল ভীতিপ্রদ শত্রু ছিলেন না, তারা ছিলেন প্রত্যক্ষ মানুষ, যাদের উপস্থিতি প্রাসাদের শূন্যতাকে পূর্ণ করে রাখত। তাদের সঙ্গে পেনেলোপির স্বাভাবিক মানবিক ও সামাজিক সম্মিলন গড়ে ওঠা ছিল কোনো সামাজিক অপরাধ নয়, এ ছিল বছরের পর বছর মানসিক পক্ষাঘাত থেকে বেঁচে থাকবার এক স্বাভাবিক উপায়।
সমাজ শতাব্দী ধরে নারীর জৈবিক সত্তাকে দমন করবার জন্য বিভিন্ন কাল্পনিক মহাকাব্যিক রূপকের জন্ম দিয়েছে। পেনেলোপি চরিত্রটি ছিল পুরুষতান্ত্রিক সমাজের তৈরি সেই প্রথাগত ছাঁচ, যা দিয়ে সাধারণ নারীদের শেখানো হত যে, স্বামী বছরের পর বছর অনুপস্থিত থাকলেও, এমনকি অত্যাচারী বা অবিশ্বস্ত হলেও, নারীকে নিঃশব্দে মোমের মতো গলে গলে অপেক্ষা করে যেতে হবে। পুরুষ নিজে পৃথিবীর যেখানে খুশি যেতে পারে, অন্য নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে, কিন্তু ঘরের নারীকে থাকতে হবে সম্পূর্ণ নিষ্কাম ও পবিত্র। হোমারের ‘ওডিসি’ ছিল সেই পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সাহিত্যের মোড়কে অমরত্ব দেবার এক মহামাধ্যম।
পেনেলোপির প্রকৃত সত্য লুকিয়ে আছে সেই প্রাচীন লোককথাগুলির মধ্যে, যেখানে তিনি কেবল সতীত্বের প্রতিমূর্তি নন, তিনি একাধারে অরণ্য ও উর্বরতার স্বাধীন দেবী, রাজপ্রাসাদের ধূর্ত রাজনীতিক, সন্তানকে রক্ষাকারী এক সচেতন মা এবং নিজের শরীর ও মনের চাহিদা সম্পর্কে সচেতন রক্তমাংসের এক প্রাণশক্তিতে ভরপুর নারী। ১০৮ জন পাণিপ্রার্থীকে হত্যা করে এবং ১২ জন দাসীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ইউলিসিস যে সত্যকে চিরতরে মুছে ফেলতে চেয়েছিলেন, তা ইতিহাসের পাতায় এবং আঞ্চলিক লোকগাথায় আজও জীবন্ত হয়ে আছে।
ইথাকা ছিল ছোটো একটি পাহাড়ি দ্বীপ, যার প্রধান সম্পদ ছিল গৃহপালিত পশু, জলপাই বাগান এবং দ্রাক্ষাক্ষেত্র। ইউলিসিসের অনুপস্থিতিতে এই বিপুল সম্পদের কোনো একক পুরুষ অভিভাবক ছিল না। পাণিপ্রার্থীরা যখন ইথাকার প্রাসাদে এসে আস্তানা গেড়েছিল, তাদের উদ্দেশ্য কেবল একজন নারীকে লাভ করা ছিল না, তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ইথাকার এই বিপুল সম্পদ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। পেনেলোপি খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, তিনি যদি যেকোনো একজনকে সরাসরি বেছে নেন বা সবাইকে একবারে প্রত্যাখ্যান করেন, তবে রাজ্যজুড়ে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে এবং তাঁর শিশুপুত্র তেলেমাখোসকে হত্যা করা হবে।
এই জিও-পলিটিকাল সংকট মোকাবেলা করবার জন্যই পেনেলোপি কাফন বোনার মতো এক সূক্ষ্ম রাজনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন। এ কোনো অলৌকিক পতিব্রতা ধর্মের প্রকাশ ছিল না, এ ছিল অত্যন্ত ঠান্ডা মাথার এক রাজনৈতিক দাবা খেলা। পাণিপ্রার্থীদের আপসের টেবিলে ঝুলিয়ে রেখে তিনি একদিকে যেমন সময় সংগ্রহ করছিলেন, অন্যদিকে তেমনি পুত্র তেলেমাখোসকে বয়সে বড়ো হবার সুযোগ করে দিচ্ছিলেন। এই রাজনৈতিক দাবার চালের আড়ালে রাজপ্রাসাদের প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবন কিন্তু থেমে ছিল না। ১০৮ জন তরুণ ও পরাক্রমশালী পুরুষের সঙ্গে এক প্রাসাদে দুই দশক ধরে বসবাস করবার ফলে যে সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তা মহাকাব্যিক নৈতিকতার থেকে অনেক বেশি জটিল ও মানবিক ছিল।
১২ জন দাসী অন্দরমহলের গোপন দৈনন্দিন জীবনের সাক্ষী ছিল। তারা জানত পেনেলোপি পাণিপ্রার্থীদের সঙ্গে কীভাবে সময় কাটাতেন, কোন পাণিপ্রার্থীর সঙ্গে তাঁর কতটা মনস্তাত্ত্বিক ও দৈহিক ঘনিষ্ঠতা ছিল এবং সতীত্বের মেকি নাটকের পেছনে আসল সত্য কী ছিল। ইউলিসিস জানতেন যে, এই দাসীদের বাঁচিয়ে রাখলে ইথাকার লোকালয়ে এবং সাধারণ মানুষের মুখে মুখে সত্য ছড়িয়ে পড়বে। তাই নিজের কথিত সতী স্ত্রীর পবিত্র গাথাকে রক্ষা করতে এবং নিজের পুরুষতান্ত্রিক অহংকারকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত রাখতে তিনি সেই নিরপরাধ দাসীদের নৃশংসভাবে হত্যা করেন। হোমারের ওডিসিতে এই ১২ জন দাসীর আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি। তাদের কেবল পাপী ও অপবিত্র হিসেবে চিহ্নিত করে এক ঘণ্টার মধ্যে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। প্রাচীন পুরুষতান্ত্রিক সাহিত্য কীভাবে দুর্বল ও সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির মুখ বন্ধ করে বিজয়ী পুরুষের কাহিনিকে মহিমান্বিত করে, এই দাসী হত্যা তার এক চরম প্রমাণ। দাসীদের রক্তে ভেজা রাজপ্রাসাদের মেঝে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করবার পরেই কেবল ইউলিসিস ও পেনেলোপির কথিত পবিত্র মিলন ঘটেছিল। এই মিলন তাই প্রেমের কোনো ডিভাইন নিদর্শন নয়, এ ছিল রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা রাজনৈতিক সমঝোতা ও মেকি সামাজিক ভাবমূর্তি রক্ষার এক মর্মান্তিক প্রকাশ।
ইউলিসিস নিজে যখন সমুদ্রের দ্বীপে জাদুকরী ও জলপরীদের সঙ্গে শারীরিক আনন্দে মেতে ছিলেন, তখন তিনি তাঁর অস্তিত্বকে প্রসারিত করছিলেন। ঠিক একইভাবে, পেনেলোপিও ইথাকার প্রাসাদে নিজের নিঃসঙ্গতা ও নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়ে বেঁচে থাকবার জন্য যা করবার প্রয়োজন ছিল, তা-ই করেছিলেন। মহাকাব্যিক বর্ণনায় পেনেলোপির এই মানবীয় রূপকে ছেঁটে ফেলে তাঁকে এক নিষ্প্রাণ পাথরের দেবীতে রূপান্তর করবার চেষ্টা হয়েছিল, যাতে ভবিষ্যতের নারীদের এক অবাস্তব ও অমূল্যায়নযোগ্য আদর্শের শৃঙ্খলে বন্দি রাখা যায়। স্বামীর ঘাতককে পেনেলোপির বিবাহ এই চাপিয়ে দেওয়া আদর্শের মুখোশ খুলে দেয়। এটি প্রমাণ করে যে পেনেলোপির জীবন ইউলিসিসকেন্দ্রিক কোনো অন্ধ ভক্তিমার্গের গল্প ছিল না। ইউলিসিস ছিলেন তাঁর জীবনের এক দীর্ঘ অধ্যায় মাত্র, শেষ অধ্যায় নন। ইউলিসিসের মৃত্যুর পর তিনি আবার নতুন করে নিজের জীবন বেছে নিয়েছিলেন। পুরুষতান্ত্রিক মহাকাব্য যে নারীকে এক স্বামীর স্মৃতিতেই লীন হয়ে যাবার শিক্ষা দিতে চেয়েছিল, পুরাণ নিজেই সেই নারীর জন্য তৈরি করে রেখেছিল বহুবিবাহ ও স্বাধীনতার ভিন্ন এক দিগন্ত।
গ্রিকের আঞ্চলিক লোককথায় আছে, ইউলিসিস যখন তাঁকে সন্দেহের বশে তাড়িয়ে দেন, তখন পেনেলোপি রাজপ্রাসাদের অধিকারের জন্য কাকুতি-মিনতি করেননি। তিনি ফিরে গিয়েছিলেন নিজের শিকড়ে, স্পার্টায়, যেখানে নারীদের স্বাধীনতা ও সামাজিক অবস্থান ছিল গ্রিসের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি সুদৃঢ়। পরবর্তীতে আর্কাডিয়ার পাহাড়ি প্রাকৃতিক পরিবেশে তাঁর জীবনাবসান ঘটার গল্পটি যেন প্রাক-অলিম্পীয় সেই জলচর পাখির নিজের ঘরে ফিরে যাবারই নামান্তর। কৃত্রিম রাষ্ট্র, পুরুষতান্ত্রিক আইন ও মেকি সতীত্বের বন্ধন কেটে পেনেলোপি শেষ পর্যন্ত ফিরে গিয়েছিলেন প্রকৃতির সেই স্বাধীন ও মুক্ত ধারায়, যেখান থেকে তাঁর অস্তিত্বের সূচনা হয়েছিল।
ইউলিসিসের কুড়ি বছরের অনুপস্থিতি, ছদ্মবেশে প্রবেশ, স্ত্রীকে পরীক্ষা করবার গোয়েন্দাগিরি, পাণিপ্রার্থী ও দাসীদের হত্যা, এসবের পেছনে লুকিয়ে ছিল এক চরম পুরুষালি নিরাপত্তাহীনতা। ইউলিসিস ভয় পেতেন যে, তাঁর অনুপস্থিতিতে কোনো নারী স্বাধীনভাবে নিজের জীবন পরিচালনা করতে পারে এবং তাঁর সম্পত্তির স্বাধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে। এই ভয় থেকেই তিনি সৃষ্টি করেছিলেন রক্তের হোলিখেলা এবং প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সতীত্বের এক অনমনীয় শৃঙ্খল।
স্বীকার:
1. Homer, The Odyssey, Translated by Robert Fagles, 1996, Penguin Books.
2. Eugammon of Cyrene, Telegony (in Greek Epic Fragments), Edited and translated by M. L. West, 2003, Harvard University Press.
3. Apollodorus, The Library of Greek Mythology, Translated by Robin Hard, 1997, Oxford University Press.
4. Pausanias, Description of Greece, Translated by W. H. S. Jones, 1935, Harvard University Press.
5. Robert Graves, The Greek Myths, 1955, Penguin Books.
6. Arthur Schopenhauer, The World as Will and Representation, Volume 2, Translated by E. F. J. Payne, 1966, Dover Publications.
7. James Joyce, Ulysses, 1922, Shakespeare and Company.
8. Margaret Atwood, The Penelopiad, 2005, Canongate Books.
9. Friedrich Engels, The Origin of the Family, Private Property and the State, Introduction by Michèle Barrett, 1986, Penguin Books.
