Published : 06 Aug 2026, 11:28 AM
কবিতা, ছড়া, গান, চিঠি, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ-সাহিত্যের নানা শাখায় রয়েছে বর্ষার বন্দনা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিন্তা-মননে বর্ষার সঘন, উজ্জ্বল, বর্ণিল উপস্থিতি আমরা লক্ষ্য করি। বাংলাদেশের ষড়ঋতুর মধ্যে বর্ষাই বোধকরি রবীন্দ্র রচনাবলিতে সবচেয়ে বেশি জায়গা অধিকার করে আছে। গীতবিতানের প্রকৃতি পর্যায়ের গানে আমরা পাই ‘নিবিড় মেঘের ছায়া' ভরা বর্ষার তরঙ্গকলকল্লোল, শ্রাবণে শ্রাবণে বিস্মৃতি স্রোতের প্লাবন, ছলোছল শ্যামল বনান্তভূমি। হৃদয়ের ভেতরমহলে সুরেলা টংকার তোলে রবীন্দ্রসঙ্গীতের পেলবমধুর মোহিনী মূর্ছনা। কত গান, কত না অনুষঙ্গ, সুগভীর বোধের আশ্চর্য নিপুণ প্রকাশ। অদ্ভুত রহস্যাভাসে, নান্দনিক কারুকাজ, শৈল্পিক কুশলতায়, মানবমনের গহনগোপন প্রদেশের বোধ ও সংবেদন পরম যত্নে সুরের ইন্দ্রজালে রচনা করে গেছেন কবি। বাংলার প্রকৃতির শ্যামল সজল বিশ্বস্ত ছবি এমন করে আর কোনো কবি কিংবা গীতিকার আঁকতে পেরেছেন?
অজস্র গান বেঁধেছেন রবীন্দ্রনাথ, তাঁর অত্যন্ত প্রিয় ঋতু বর্ষাকে নিয়ে। যেমন- ‘বজ্রমানিক দিয়ে গাঁথা, আষাঢ় তোমার মালা’, ‘কদম্বেরই কানন ঘেরি আষাঢ়মেঘের ছায়া খেলে’, ‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদলদিনে', ‘সঘন গহন রাত্রি, ঝরিছে শ্রাবণধারা’, ‘বাদল দিনের প্রথম কদমফুল করেছ দান’, ‘বহু যুগের ওপার হতে আষাঢ় এল’, ‘আজি বর্ষারাতের শেষে/সজল মেঘের সঙ্গী', 'হৃদয়ে অরুণ আলো মেশে', ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী’, ‘হৃদয়ে মন্দ্রিল ডমরু গুরু গুরু,/ঘন 'নীল নবঘনে মেঘের ভুরু কুটিল কুঞ্চিত, /হল রোমাঞ্চিত বন বনান্তর', নীল নব ঘন আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে' ইত্যাদি ।
ছিন্নপত্রাবলিতে রয়েছে বর্ষার বহুমাত্রিক বর্ণনা। বাংলাদেশের শাহজাদপুর, শিলাইদহ এবং পতিসরে জমিদারির কাজে দীর্ঘকাল অবস্থান করতে হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। শ্যামল বাংলার উদার অবারিত প্রকৃতি, এখানকার জনপদ, মানুষ তাঁর সাহিত্যে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে।
বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে যখন ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তখন এক চিঠিতে তিনি লিখছেন,
“... দোতলার জানালায় দাঁড়িয়ে সেদিন দেখছিলুম, সামনের আকাশে জলভারানত মেঘ, নিচে ছেলেদের মধ্যে দিয়ে প্রাণের তরঙ্গিত কল্লোল। আমার মন সহসা আপন খোলা দুয়ার দিয়ে বেরিয়ে গেল বাইরে সুদূরে। অত্যন্ত নিবিড়ভাবে আমার অন্তরে একটা অনুভূতি এল, সামনে দেখতে পেলুম, নিত্যকালব্যাপী একটি সর্বানুভূতির অনবচ্ছিন্ন ধারা, নানা বিচিত্র লীলাকে মিলিয়ে নিয়ে একটি অখণ্ড লীলা, নিজের জীবনে যা বোধ করছি, যা ভোগ করছি, চারদিকে ঘরে ঘরে, জনে জনে, মুহূর্তে মুহূর্তে যা কিছু উপলব্ধি চলেছে, সমস্ত এক হয়েছে একটি বিরাট অভিজ্ঞতার মধ্যে। অভিনয় চলছে নানা নাটক নিয়ে, সুখ-দুঃখের নানা খণ্ড প্রকাশ চলছে তাদের প্রত্যেকের জীবনযাত্রায় ।...”
বর্ষা নিয়ে কত কবিতা যে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, তার হিসাব করা মুশকিল। ‘শেষ সপ্তক' কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতার আংশিক এখানে তুলে ধরছি। ওই কবিতায় তিনি লিখছেন,
... বর্ষা নেমেছে প্রান্তরে অনিমন্ত্রণে;
ঘনিয়েছে সার-বাঁধা তালের চূড়ায়
রোমাঞ্চ দিয়েছে বাঁধের কালো জলে।
বর্ষা নামে হৃদয়ের দিগন্তে
যখন পারি তাকে আহ্বান করতে।
কিছুকাল ছিলেম বিদেশে।
সেখানকার শ্রাবণের ভাষা
আমার প্রাণের ভাষার সঙ্গে মেলেনি।
তার অভিষেক হল না
আমার অন্তরপ্রাঙ্গণে।
কবিতা, গানই শুধু নয়, রবীন্দ্রনাথের অজস্র গদ্যরচনায় সগর্ব উপস্থিতি রয়েছে বর্ষার। মহাপরাক্রমশালী এই ঋতু ছেলেবেলা থেকেই আচ্ছন্ন আবিষ্ট করে রেখেছে কবির মানসলোক। ক্রমেই এই প্রিয়তা প্রসারিত, ব্যাপ্ত ও নানা মাত্রিকতায় ঔজ্জ্বল্যে উদ্ভাসিত হয়েছে। ‘জীবনস্মৃতি' গ্রন্থে দূরের শৈশবে মনোলোভা স্মৃতির সমুদ্রে ডুব দিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন,
“...বাল্যকালের দিকে যখন তাকাইয়া দেখি তখন সকলের চেয়ে স্পষ্ট করিয়া মনে পড়ে তখনকার বর্ষার দিনগুলি। বাতাসের বেগে জলের ছাঁটে বারান্দা একেবারে ভাসিয়া যাইতেছে, সারি সারি ঘরের সমস্ত দরজা বন্ধ হইয়াছে, প্যারিবুড়ি কক্ষে একটা বড়ো ঝুড়িতে তরিতরকারি বাজার করিয়া ভিজিতে ভিজিতে জলকাদা ভাঙিয়া আসিতেছে, আমি বিনা কারণে দীর্ঘ বারান্দায় প্রবল আনন্দে ছুটিয়া বেড়াইতেছি। আর মনে পড়ে, ইস্কুলে গিয়াছি; দরমায়-ঘেরা দালানে আমাদের ক্লাস বসিয়াছে; অপরাহ্নে ঘনঘোর মেঘের স্তূপে স্তূপে আকাশ ছাইয়া গিয়াছে; দেখিতে দেখিতে নিবিড় ধারায় বৃষ্টি নামিয়া আসিল; থাকিয়া থাকিয়া দীর্ঘ একটানা মেঘ-ডাকার শব্দ; আকাশটাকে যেন বিদ্যুতের নখ দিয়া এক প্রান্ত হইতে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত কোন্ পাগলী ছিঁড়িয়া ফাড়িয়া ফেলিতেছে; বাতাসের দমকায় দরমার বেড়া ভাঙিয়া পড়িতে চায়; অন্ধকারে ভালো করিয়া বইয়ের অক্ষর দেখা যায় না- পণ্ডিতমশায় পড়া বন্ধ করিয়া দিয়াছেন; বাহিরের ঝড়-বাদলটার উপরেই ছুটাছুটি-মাতামাতির বরাত দিয়া বদ্ধ ছুটিতে বেঞ্চির উপরে বসিয়া পা দুলাইতে দুলাইতে মনটাকে তেপান্তরের মাঠ পার করিয়া দৌড় করাইতেছি। আরো মনে পড়ে শ্রাবণের গভীর রাত্রি, ঘুমের ফাঁকের মধ্য দিয়া ঘনবৃষ্টির ঝমঝম্ শব্দ মনের ভেতরে সুপ্তির চেয়েও নিবিড়তর একটা পুলক জমাইয়া তুলিতেছে; একটু যেই ঘুম ভাঙিতেছে মনে মনে প্রার্থনা করিতেছি, সকালেও যেন এই বৃষ্টির বিরাম না হয় এবং বাহিরে গিয়া যেন দেখিতে পাই, আমাদের গলিতে জল দাঁড়াইয়াছে এবং পুকুরের ঘাটের একটি ধাপও আর জাগিয়া নাই ।... ”
ফরিদপুরের বাসিন্দা রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী ১৯৩৯-'৪১ সালে শান্তিনিকেতনের শিক্ষা ভবনের ছাত্র ছিলেন। বর্তমান কালের উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্র ছিলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন বেঁচে। বেশিরভাগ সময় তখন তিনি থাকেন তাঁর প্রিয় জায়গা শান্তিনিকেতনেই। বছর দেড়েক ওখানে অবস্থানকালে রথীন্দ্রবাবু রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য হওয়ার দুর্লভ সুযোগ পান। রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরীর স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘রবীন্দ্র তরুমূলে' প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর (১৯৮৮) পর । বইটিতে তিনি শান্তিনিকেতনে জমকালো বর্ষা উৎসবের সরস বর্ণনা দিয়েছেন। রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী লিখেছেন, “১৩৪৬ সালের বর্ষামঙ্গলে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নতুন গান লিখতে পারেননি। মহড়া চলছিল নাট্যঘরে পুরনো বর্ষাসঙ্গীত দিয়ে শৈলজারঞ্জন মজুমদারের পরিচালনায়। হঠাৎ কবির মনে গানের প্লাবন এলো- একে একে রচনা করলেন ষোলটি নতুন বর্ষাসঙ্গীত। ছাত্রছাত্রীদের শেখানো শুরু করলেন তিনি নিজেই। মহড়া চলতে লাগল উত্তরায়ণের পুনশ্চ গৃহে। আমরা যেতাম কবির গান শেখানো দেখতে।
একদিনের কথা মনে পড়ছে। কবি সেদিন শেখাচ্ছিলেন বাউল সুরের নতুন গান, ‘পাগলা হাওয়ার বাদল-দিনে/পাগল আমার মন জেগে ওঠে।' গানটি লিখিয়ে দেয়া হয়েছিল ছাত্রছাত্রীদের। গান শেখানো শুরু করার আগে সঙ্গীত ভবনের একটি ছেলে প্রশ্ন করে বসল গুরুদেবকে, ‘গানটিতে আছে বৃষ্টি-নেশা-ভরা সন্ধ্যাবেলা, কোন বলরামের আমি চেলা- এখানে বলরাম কেন এলো ঠিক বুঝতে পারলাম না।' রাগ করলেন না গুরুদেব। বললেন, ‘পরের লাইনটা দ্যাখো, তাহলেই বুঝবে’, ওই যে ‘আমার স্বপ্ন ঘিরে নাচে পাগল জুটে।' তবু ঠিক বুঝতে পারছিল না সে। বলবার জন্য উসখুস করছিলাম আমি। হঠাৎ বেরিয়ে গেল মুখ দিয়ে, ‘বলরাম নেশা করতেন তো, তাই কবি বলরামকে এনেছেন বৃষ্টির নেশা ভালোভাবে ফোটাবার জন্যে।' বলে ফেলে ভয়ে সঙ্কুচিত হয়ে পড়লাম আমি- কে জানে গুরুদেব কী বলেন। তাঁর কানে গিয়েছিল আমার কথা কটি। আমায় ধমক দেয়া দূরে থাক, খুশি হয়ে বললেন, ‘এই তো- ঠিক বুঝতে পেরেছে ও।' জিজ্ঞেস করলেন ছেলেটিকে, ‘এবার বুঝতে পেরেছ তো?' মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো সে। কবি পুরো গানটি গেয়ে শোনালেন একবার, তারপর নিজেই শিখিয়ে দিলেন তার সুর ।
গানের অর্থ আগে ভালোভাবে বুঝিয়ে তারপর গান শেখানোর নির্দেশ ছিল তাঁর। সেদিন তাঁকেই পালন করতে দেখেছিলাম নিজের নির্দেশ।
১০ ভাদ্র সন্ধ্যার পরে বর্ষামঙ্গল উৎসব লাইব্রেরির বারান্দায়। শ্রাবণ বিদায় নিয়েছিল বর্ষার পালা শেষ করে সেবারের মতো। মেঘের চিহ্ন নেই একটুও। আকাশ ভাসিয়ে দিয়ে নেমেছে জ্যোৎস্নার প্লাবন মাথার ওপর আকাশ-ভরা তারা জ্বলছে জ্বলজ্বল করে। আশপাশের গ্রাম থেকেও এসেছিল অনেক লোক বর্ষামঙ্গল দেখতে। অসহ্য গরম অস্থির করে তুলেছিল সবাইকে।
রবীন্দ্রনাথ এলেন অনুষ্ঠানে। বসলেন বারান্দার পুবপাশে বেতের কেদারায়- যেমন বসেন আর সব অনুষ্ঠানে এলে। প্রথমেই আবৃত্তি করলেন ‘নববর্ষা' কবিতাটি; ‘হৃদয়ে আমার নাচে রে আজিকে, ময়ূরের মতো নাচে রে।' তাঁর আবেগবিহ্বল কণ্ঠস্বর ফুটফুটে জ্যোৎস্না রাতেও সৃষ্টি করল বর্ষার মেঘাচ্ছন্ন পরিবেশ সবার মনের জগতে। এরপর চলতে লাগল গানের একটানা প্রবাহ...।”