চরু হকের একগুচ্ছ কবিতা
পুবাকাশে বড় একটা চাঁদ উঠেছে/ চাঁদের মুকুরে তোমার ছায়া দেখা যাচ্ছে / এর চেয়েও স্পষ্ট করে যদি দেখতে চাও তোমার মুখ, ও মুসাফির/ তাহলে ভাঙ্গতে হবে তোমার পুরোনো আয়নাখানি।
ভোর
পাথরখন্ড যেমন ছুটে যায় কেবলমাত্র হ্রদের তলদেশে
তেমনি আমি ছুটে যেতে চাই তোমার দিকে।
চাতক যেমন নিদারুণ তৃষ্ণা নিয়েও দৃষ্টি মেলে রাখে
আকাশের দিকে
মৃত্যুসম তৃষ্ণা নিয়েও
কেবলমাত্র শ্রাবণের জলধারার অপেক্ষায় -
তেমনি আমি অপেক্ষা করি তোমার,
কেবল তোমার অমৃতধারার জন্য।
রাত গভীর অন্ধকার, আমি পথ হাঁটতে ভয় পাই
তবু জানি ভোর আসবে
সকালের পাখিরা কলস্বরে গাইবে
দরাজ দিনের গান
পদ্মপুকুরে পদ্মরা মাথা উঁচু করে তাকাবে
আর সূর্যের স্বর্ণকরোজ্বল মহিমা
মেখে নেবে গায়ে।
এবং তখন-
ঢাকার রাস্তায় দিকে দিকে মঞ্জরিত হবে
সেই পদধ্বনি
যার জন্য প্রস্তুতিযজ্ঞ চলছিল
কয়েক সহস্র বছরের।
যখন আমি ধরবো তোমার হাত, আর তুমি পাশের জনের, তার থেকে আরেকজন, আরও একজন এবং তার থেকে আরও একজন
তখন আমাদেরকে ঘিরে নির্মিত হবে এমন এক অমোঘ অভেদ্য ব্যূহের
যা ভেদ করে কোনো শত্রুই আর আঘাত করার দুঃসাহস পাবে না
বীরপুত্র অভিমন্যুকে।
মহিষাসুরবধিনী, জাগো, এসে দাঁড়াও সামনে
উৎপাটিত বিষবৃক্ষরা ভূলুণ্ঠিত হোক
আর তুমি তোমার রক্তচক্ষু দিয়ে ঢেকে দাও
যা কিছু ভেঙে পড়ার জন্য প্রস্তুত
গোপনে।
বিরহী
পাখির ডিমের মতো স্বচ্ছ নীল জল শুয়ে আছে
জলের আয়নায় ভাসে ঈশ্বরের মুখ
অচিন বাতাস এসে এইখানে থেমে যায় ধীরে
জলের আঁচল জুড়ে কার যেনো লেগে থাকে বিরহের দাগ।
এমন নিদাঘদিনে
মাইলস্টোন স্কুল ভবনের কার্নিশে দাঁড়িয়ে থাকা যে ছেলেটিকে আপনি দেখছেন, তার নাম সূর্য।
ঝুলছে, দেখুন, কী দীপ্ত দুঃসাহসে।
হ্যাঁ সূর্যই বটে
আপন দেহে ধারণ করেছো সর্বগ্রাসী আগুনের হলকা
আর কার্নিশে দাঁড়িয়ে দু'হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে
অর্ধমৃত বন্ধুর দিকে।
একের পর এক বাড়িয়ে দিচ্ছ হাত
ওরে অবুঝ মাণিক হাত পুড়ে যায় তোর
বুক পুড়ে যায়, নিদারুণ আর্তনাদে, বোবা কান্নায়।
এ দৃশ্য আমি আঁকতে চাইনি
তবু কোন অভিশাপে হাতে নিতে হলো রংপেন্সিল
আঁকতে আজ পোড়া ফুলের গন্ধ।
টিফিনবক্স থেকে টিফিন ছিটকে পড়ে
ছিটকে পড়ে বাহুতে বেঁধে দেওয়া মায়ের রক্ষাকবচ।
ঝলসে যায় সাদা ইউনিফর্ম, ইশকুল ব্যাগ, পেলব মুখে আঁকা নরম আলো
এ কেমন শ্রাবণদিন, এ কেমন বাদলধারা
প্রবল বর্ষায়ও পুড়ে খাক হয়ে যায় নিষ্পাপ ফুল
গলে পড়া কালো রঙ ছিটকে পড়ে বিভৎস আর্তনাদে।
সূর্য আমি তোকে পেটে ধরিনি, তা সত্যি
কিন্তু এই নিদাঘ বেলায় চারদিকে যখন কেবল আগুন, ধোঁয়া, উন্মাদপ্রায় ভয়ার্ত মানুষের দিগভ্রান্ত ছোটাছুটি, আর
পুড়ে যাওয়া শরীর নিয়ে, হা ঈশ্বর, আমার সন্তানগণ ছুটে যাচ্ছে বেঁচে থাকার সুতীব্র আর্তনাদে
ঠিক তখনই অস্ফুট ভ্রুণের মতো আমার
সমস্ত অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দিয়ে
তুই প্রবেশ করলি
আমার জরায়ুতে,
কলিযুগের কৃষ্ণ যেন।
নতুন যুগে, এই নতুন আগত ভোরে যদি বেঁচে থাকি
তবে জন্ম দেবো তোর মতো আরেকটি সূর্য
আর যদি চলে যাই সব ছেড়ে দুর্ভাগ্যের ফেরে,
তবে আমি হবো তোর আরেক মা, মমতার উষ্ণধারা
মেহরীন যার নাম।
আমার উত্তরসূরী কেউ তবে থাকুক এখানে।
একজন কালো মেয়ে
বুকের ক্ষত ঢাকতে পারে কী আছে এমন?
কেবল তুমি যদি আসো প্রলেপ হয়ে
আমি হতাম উর্বশী।
কালো চামড়ার নীচে
আমারও আছে সাদা একটা মন
মুক্তার মতো ঝকঝকে, সূচিস্নিগ্ধ, কোমল
কী দেখাবো তোমাকে আজ
কী দিয়ে বাঁধবো তোমাকে
আমি কালো মেয়ে, উর্বশীর রূপ নেই আমার অঙ্গে
নেই মরালের মতো শ্বেতশুভ্র গ্রীবা, পীনোন্নত বক্ষ
আর নদীর বাঁকের মতো ক্ষীণকায় কটি।
নেই চোখ ঝলসে দেয়া রূপের বন্যা আর উন্মাতাল যৌবন।
তবে হ্যাঁ, লোকে আমায় ডাকতো বটে মায়াহরিণ
কালো চোখের তারায় তারায় মায়া ছিল, ঘন মেঘের মায়া মেঘলা আকাশ খেলা করতো খোলা চুলে, নরম মুখে
এখন আমি কেবল নারী ঘরকন্না, রান্নাবান্না
এখন আমি কালো মেয়ে, কিন্নরীদের নাচমহলে ভীষণ রকম বেমানান আজ
তবু তুমি যদি বাসতে ভালো আমি হতাম রাধা
মেনকার ঐশ্বর্য আমার দেহে পড়তো বাধা
অশ্রুচিহ্ন মুছতে পারে কী আছে এমন?
কেবল তুমি যদি ডাকতে একটিবার
বেজে উঠতো বাঁশি।
নির্জনতা
নির্জনতা পান করি
নিরিবিলি নিজেকেই পাঠ করি বারবার
তবু পাঠ না ফুরায়, না ফুরায়
আর।
চাতক
পুবাকাশে বড় একটা চাঁদ উঠেছে
চাঁদের মুকুরে তোমার ছায়া দেখা যাচ্ছে
এর চেয়েও স্পষ্ট করে যদি দেখতে চাও তোমার মুখ, ও মুসাফির
তাহলে ভাঙ্গতে হবে তোমার পুরোনো আয়নাখানি।
