০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

এরিক আর্থার ব্লেয়ার ওরফে জর্জ অরওয়েল

তিনি কড়া চা, বিয়ার, ভাজা গো-মাংস, নোনা মাছ এবং কমলালেবুর আচার পছন্দ করতেন।

মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 25 Jun 2024, 04:17 PM

Updated : 26 Aug 2026, 09:51 AM

ব্রিটিশ-শাসিত ভারতের বাংলা প্রদেশের একটি ছায়া সুনিবিড় স্থান মোতিহারি। ১৯০৩ সালের ২৫শে জুন এখানেই জন্মগ্রহণ করেন এরিক আর্থার ব্লেয়ার। গোটা বিশ্ব তাঁকে তাঁর কলম নাম জর্জ অরওয়েল হিশেবে চেনে। ইংল্যান্ডের সাফোক-এর একটি নদীর নামানুসারে এই নামকরণ করা হয়েছিল। তাঁর পিতা রিচার্ড ওয়ালমেসলে ব্লেয়ার ছিলেন একজন ব্রিটিশ সরকারি কর্মচারী। তাঁর মা লন্ডনবাসী ইডা মেবেল লিমুজিন একজন স্কুলশিক্ষিকা হিসেবে ভারতে এসেছিলেন। ১৭ বছর বয়সের পার্থক্য সত্ত্বেও রিচার্ড এবং ইডা ১৮৯৭ সালের ১৫ জুন ভারতের নৈনিতালের পাহাড়ের এক চার্চে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন। অরওয়েলের বড় বোন মার্জোরি ফ্রান্সিস ব্লেয়ার ১৮৯৮ সালে ভারতের বিখ্যাত গয়া শহরে জন্মগ্রহণ করেন। অরওয়েলের জন্মের অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের নিজ জেলায় প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এর ফলে শংকিত ইডা পরিবার সমেত ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রবলভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এভাবেই অরওয়েলের বয়স যখন মাত্র এক বছর তখন তাঁর মা তাঁকে এবং মার্জোরিকে নিয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে যান। ১৯০৪ সালে ইডা ব্লেয়ার তাঁর সন্তানদের সঙ্গে অক্সফোর্ডশায়ারের হেনলি-অন-টেমসে বসবাস শুরু করেন। এখানেই অরওয়েল তাঁর মা এবং বোনদের সঙ্গে বেড়ে ওঠেন। অরওয়েল একটি পূর্ণ জীবন যাপন করেছেন, কখনো সাম্রাজ্যের পুলিশ, কখনো একজন শিক্ষক, কখনো পুরনো বইয়ের দোকানে, কখনো বিবিসির জন্য কাজ করেছেন, আবার একজন পূর্ণ-সময়ের লেখক হিশেবে জীবন যাপন করেছেন। তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তিনি তাঁর লেখাকে রাঙিয়েছেন। তাঁর বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ কিংবদন্তির মর্যাদা অর্জন করেছে এবং কিছু রচনা আজকাল স্কুলেও পাঠ্য হয়েছে। তিনি ভাল, সুনির্দিষ্ট, স্পষ্ট লেখার নিয়ম নির্ধারণ করেছেন। তাঁর লেখার মাধ্যমে তিনি কর্তৃত্বের হুমকির উপরে ব্যক্তির স্বতন্ত্রতার গুরুত্বকে স্থান দিয়েছেন। তিনি যখন যুবক হয়ে উঠছিলেন তখন ফ্যাসিবাদ এবং কমিউনিজম উভয়ই ইউরোপ জুড়ে উদার গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এগিয়ে ছিল। অরওয়েল সাধারণ মানুষের পক্ষে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে ছিলেন। তাঁর বইসমূহের প্রধান চরিত্রগুলো ধারাবাহিকভাবে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের মুখোমুখি হয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছে।

তিনি আজ তাঁর দুটি ব্যঙ্গাত্মক উপন্যাস, অ্যানিমাল ফার্ম (১৯৪৫) এবং নাইনটিন এইটি ফোর (১৯৪৯)-এর জন্য সর্বাধিক পরিচিত হলেও অরওয়েল এই দুটি উপন্যাসের চেয়ে অনেক অনেক বেশি লিখেছেন। এগুলো ছাড়াও তিনি আরও চারটি উপন্যাস, তিনটি নন-ফিকশন গ্রন্থ এবং আক্ষরিক অর্থে কয়েক ডজন প্রবন্ধ এবং প্রচুর সংখ্যক সংবাদপত্রের কলাম লিখেছেন। তাঁর রচনাশৈলী স্বতন্ত্র, তিনি সাধারণ ও দৈনন্দিন ভাষায় বয়ান করে যান, কোন দাম্ভিকতা বা অর্থহীন বাক্য এড়িয়ে চলেছেন। তিনি গভীর অন্তর্দৃষ্টি এবং সততার সাথে বিষয়গুলোকে প্রকাশ করেছেন। দরিদ্রদের জীবন কেমন ছিল তা জানার জন্য অরওয়েল প্রথমে লন্ডনে, তারপর প্যারিসে ভবঘুরের মতো রুক্ষ জীবনযাপন করেছেন। তিনি বর্ণনা করেছেন যে কীভাবে আপনার শার্টের ভিতরে খবরের কাগজ রাখলে শীতের রাতে ঠান্ডা থেকে বাঁচা যায়। যদিও ফেলে দেওয়া সিগারেটের প্রান্তগুলিকে সিগারেটের মধ্যে পুনরায় একত্রিত করা যেতে পারে কিন্তু সেগুলোকে আলোকিত করার দিয়াশলাই বিরল। তিনি বর্ণনা করেছেন রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া একটি মুদ্রা কীভাবে মূল্যবান বস্তুতে পরিণত হয়৷ এইসব বাস্তব অভিজ্ঞতাই তাঁর  প্রথম গ্রন্থ ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিসে এ্যান্ড লন্ডন (১৯৩৩) নির্মাণ করতে সাহায্য করেছে।

তাঁর রোড টু উইগান পিয়ার(১৯৩৭) উপন্যাসের বর্ণনায় উত্তর ইংল্যান্ডে জীবন কেমন ছিল, সেখানের প্রতিদিনের সংগ্রাম, মাঝে মাঝে হতাশার অনুভূতি, জরাজীর্ণ আসবাবপত্র এবং তাদের সামর্থ্য অনুযায়ি সাধারণ খাদ্যের বিবরণ দেয়। পাশাপাশি সেখানকার দরিদ্র সংখ্যাগরিষ্ঠরা আসলে কীভাবে বাস করত, সেই বর্ণনা শিক্ষিত পাঠকদের কাছে উপস্থাপন করেছে। ঠিক সেইভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যেভাবে ১৮২০-এর দশকের গোড়ার দিকে উইলিয়াম কোবেটের "রুরাল রাইডস" বর্ণনা করেছিল। অরওয়েল স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধে অংশগ্রহণ  করেন এবং গুরুতরভাবে আহত হন। তিনি পাউম নামে পরিচিত মার্ক্সবাদী একীকরণের একটি ওয়ার্কার্স পার্টিতে যোগদান করার সিদ্ধান্ত নেন এবং সামরিক একনায়ক ফ্রাঙ্কোর বাহিনীর বিরুদ্ধে বিশৃঙ্খল এবং সরবরাহে ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বর্ণনা দেন। তাঁর গ্রন্থ হোমেজ টু কাতালোনিয়া(১৯৩৮) প্রকাশের পর বামপন্থীদের অস্বস্তিতে ফেলে দেয় কারণ তিনি বর্ণনা করেন কমিউনিস্টরা সম্মিলিত মিলিশিয়া বাহিনি পাউমকে অবশেষে কীভাবে ট্রটস্কিস্ট বলে নিন্দা করেছে এবং তাঁদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।

১৯৩৯ সালে নাৎসি-সোভিয়েত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি অরওয়েলের বিরাগ চরমে পৌঁছে যায়। চুক্তিটি হিটলারের জন্য পশ্চিমে যুদ্ধ করার পথ প্রশস্ত করে। তিনি আর্থার কোয়েস্টলারের ডার্কনেস অ্যাট নুন (১৯৪০) পর্যালোচনা করেন যা স্ট্যালিনের ১৯৩০-এর শো ট্রায়ালগুলোকে প্রকাশ করে। অরওয়েল মন্তব্য করেন, "এই ট্রায়ালগুলোর পরিণতি সম্পর্কে যে ভয় ছিল তার চাইতেও ভয়াবহ মনে হয়েছে অন্য একটি বিষয় - এমনিতে একটি সর্বগ্রাসী সমাজে এই জাতীয় অন্যায্য বিষয়গুলো অনিবার্য হয়ে উঠতেই পারে কিন্তু সেই সব বিষয়কে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের আকুলতা ছিল সত্যিই ভয়ের বিষয়।"

অরওয়েল পুরোদস্তুর ইংরেজ ছিলেন। তিনি অতিশয় ধূমপায়ী ছিলেন, কড়া তামাক দিয়ে নিজের সিগারেট গুটিয়ে বানিয়ে নিতেন। তিনি কড়া চা, বিয়ার, ভাজা গো-মাংস, নোনা মাছ এবং কমলালেবুর আচার পছন্দ করতেন। তিনি পৌরাণিক আদর্শের ইংরেজি পাব "দ্য মুন আন্ডার ওয়াটার" সম্পর্কে লিখেছেন। তিনি একজন নজিরবিহীন  দেশপ্রেমিক এবং ইংরেজ শ্রমিক শ্রেণীর প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, "মানুষকে ভদ্র আচরণ করার জন্য বিশ্বাস করা যেতে পারে যদি আপনি তাদের একা থাকতে দিন।"

৪৬ বছর বয়সে নিভে যাওয়া তাঁর জীবন এবং উজ্জ্বলভাবে জ্বলে ওঠা তাঁর কৃতিত্বের অনুধাবন করলে যেকোনো মানুষই আফসোস না করে পারবে না। তিনি তখনই চলে গেলেন যখন তিনি স্পষ্টতই তাঁর ক্ষমতার উচ্চতায় বিরাজ করছিলেন। আরও অনেক কিছু দেওয়ার বাকি রয়ে গিয়েছিল। তিনি বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই সেই অনবদ্য শৈলীর আরও উপন্যাস, প্রবন্ধ এবং প্রামাণিক গ্রন্থ সৃষ্টি হতো। তবুও তাঁর লেখক জীবনের সংক্ষিপ্ত সময়ের বিচারে তাঁর কৃতিত্বের পরিমাণ এবং বৈচিত্র্য উল্লেখযোগ্য।

উড়োজাহাজ আবিষ্কারের আগে জন্মগ্রহণ করেছেন অরওয়েল, তখন মোটর গাড়িও বিরল ছিল। টেলিভিশন এবং কম্পিউটারের অস্তিত্ব অজানা ছিল এবং বিশ্বযুদ্ধ প্রায় অচিন্তনীয় ছিল। যে সময়ে তিনি প্রিপারেটরি স্কুলে শিক্ষালাভ করেন তা ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন ভয়ঙ্কর হত্যাযজ্ঞ এবং সামাজিক উত্থানের সময়। ১৯৩৩ সালের জানুয়ারিতে তাঁর প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার পর এডলফ হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর হন। ১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৩৬ সালের সময়টিতে তিনি নিজেকে একজন লেখক হিসেবে আবিষ্কার করেন। সেই বছরগুলোতে ব্রিটেনে ব্যাপক সামাজিক পরিবর্তন সাধিত হয়। সময়টি ছিল ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, ব্যাপক দারিদ্র্য এবং ক্রমবর্ধমান সামাজিক অস্থিরতাময়। ১৯৩৬ সালে অরওয়েলের দ্য রোড টু উইগান পিয়ার গ্রন্থটি লেখার বছরে ব্রিটেনে বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় তিন মিলিয়নে। একই বছরে স্পেনের গৃহযুদ্ধও শুরু হয়। এর ফলে ব্রিটেন এবং ইউরোপের উগ্রবাদী মতামতসমূহ সম্পূর্ণভাবে ভিন্ন ভিন্ন শিবিরে অবস্থান নেয়। একই সাথে সংখ্যালঘুদের উপর চরম অত্যাচার, সহিংসতা এবং নিষ্ঠুরতার পাশাপাশি সর্বগ্রাসী শাসনব্যবস্থা সমগ্র ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

তিন বছর পরে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এর ফলে ব্যাপক সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়। এটি ছিল তীব্র মতাদর্শিক উচ্ছ্বাসের যুগ। ১৯৩০ -এর দশকের রাজনৈতিক বিতর্কের প্রগাঢ় অবশ্যম্ভাবিতা পুনরুদ্ধার করা আমাদের পক্ষে আজকের এই সন্দেহ ও অস্পষ্টতার যুগে খুবই কঠিন। দশকটি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদ, ফ্যাসিবাদ, নৈরাজ্যবাদ এবং শান্তিবাদের পক্ষে-বিপক্ষে প্রচণ্ডভাবে বিতর্কিত ছিল। এমন পরিবেশে নিরপেক্ষ থাকা অসম্ভব না হলেও খুব কঠিন ছিল। রাজনৈতিক অবস্থান যাই হোক না কেন, এই মতাদর্শগত বিতর্কে অনেকেই অনিবার্যভাবে আটকা পড়েছেন; অনেকেই আবার পক্ষ নিয়েছেন। জর্জ অরওয়েলও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। সেই সময়ের ‘পোলেমিক’, ‘পার্টিজান রিভিউ’, ‘কন্ট্রোভার্সি’, ‘লেফট ফোরাম’ প্রভৃতি যেসব জার্নালে তিনি লিখতেন সেগুলোর নামগুলোই সেই সময়ের উত্তপ্ত পরিবেশের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

অরওয়েলের লেখার শক্তি, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা, স্পষ্টভাষ্য এবং মানবিক চিন্তা অনুধাবন করে তাঁকে জোনাথন সুইফট, ড্যানিয়েল ডিফো এবং ভলতেয়ারের সাথে তুলনা করা অযৌক্তিক হবে না। তিনি তাঁর শতাব্দীর হাতে গোনা কয়েকজন লেখকের মধ্যে একজন যিনি ভাষার সৌন্দর্য এবং এর অপব্যবহারের কলুষিত প্রভাব সম্পর্কে পাঠকদের সচেতন করেছেন। দারিদ্র্য ও বঞ্চনার কারণে সৃষ্ট দুর্দশার বিরুদ্ধে ভাষার মাধ্যমেই তিনি মানব ভ্রাতৃত্ব ও  দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। মানব সম্পর্কের মধ্যে সহনশীলতা, ন্যায়বিচার এবং শালীনতার উপর জোর দিয়েছেন; নগর সভ্যতার ক্রমবর্ধমান কৃত্রিমতার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। সর্বোপরি তিনি সর্বগ্রাসীতাবাদের একটি ধ্বংসাত্মক সমালোচনা উপস্থাপন করেছেন। বাগ্মীতার সাথে সতর্কতা এবং স্বাধীনতার ক্ষয় সম্পর্কে সতর্ক করেছেন এবং তাঁর পাঠকদেরকে তিনি সব ধরনের নিপীড়নকে চিনতে সাহায্য করেছেন।

তথ্যসূত্র :

Why Orwell Matters. By Christopher Hitchens. Basic Books. 2003.

Orwell: The Authorized Biography. Michael Shelden.  HarperCollins. 1991.

A Study of George Orwell: The Man and His Works. By Christopher Hollis.  Chicago. Henry Regnery Co. 1956.

George Orwell: A Life. By Bernard Crick.  Penguin. 1982.

Orwell: Wintry Conscience of a Generation. By Jeffery Meyers. W.W. Norton. 2000.