০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলা’: শাশ্বত বাংলার স্বপ্নরূপ

syedaireen_zaman

Published : 19 Feb 2014, 12:15 AM

Updated : 23 Jun 2022, 04:06 PM

জীবনানন্দের বাংলা- রূপসী বাংলা, শাশ্বত বাংলার স্বপ্নরূপ। জীবনানন্দ ত্রিকালদর্শী কবি। তিনি মনে মনে তার প্রিয় ভূমিকে অখণ্ড ভারতবর্ষ থেকে আলাদা করে নিয়ে 'রূপসী বাংলা' নামকরণ করেছেন এবং রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করেছেন আবহমান বাংলা ও বাঙালিকে। রূপসী বাংলা গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫৭ সালের আগস্ট মাসে সিগনেট প্রেস থেকে, যদিও রূপসী বাংলার কবিতাসমূহ রচিত হয়েছিল বনলতা সেন কাব্যগন্থের কবিতাগুলি রচনার পূর্বে। এতে সর্বমোট ৬১ টি সনেট স্থান পেয়েছিল। কাব্যগন্থটি প্রকাশকালে কবিভ্রাতা অশোকনন্দ দাশ লিখেছেন, 'পঁচিশ বছর আগে খুব পাশাপাশি সময়ের মধ্যে একটি বিশেষ ভাবাবেগে আক্রান্ত হয়ে কবিতাগুলি রচিত হয়েছিল। মাইকেল মধুসূদন দত্ত যেমন ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে তার জীবনের পীড়িত দিনগুলিতে চতুর্দশপদী কবিতাবলী লিখেছিলেন, জীবনানন্দ তার জীবনের বিবাহ-পরবর্তি বেকার সময়ে রূপসী বাংলার কবিতাগুচ্ছ রচনা করেছিলেন।

নিসর্গের রূপকার জীবনানন্দ রূপসী বাংলার রূপে বিমোহিত, যেমনি করে একজন শুদ্ধ প্রেমিক তাঁর অনন্যসাধারণ প্রেমিকার অপার সৌন্দর্য ঐশ্বর্যে সর্বদাই মুগ্ধ থাকেন। এই মুগ্ধতার সূত্র ধরে তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে এই বাংলায় থাকবার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন:
তোমরা যেখানে সাধ চ'লে যাও- আমি এই বাংলার পারে র'য়ে যাব;
দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে;
দেখিব খয়েরী ডানা শালিকের সন্ধ্যায় হিম হ'য়ে আসে
ধবল রোমের নিচে তাহার হলুদ ঠ্যাং ঘাসে অন্ধকারে

জীবনানন্দ রূপসী বাংলার সৌন্দর্যের বিমুগ্ধ রূপকার। পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে তিনি মোটেই আগ্রহী নন। বাংলার প্রতি অগাধ ভালবাসার সূত্র ধরে তিনি অনায়াসেই বলতে পারেন:

বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ
খুঁজিতে যাই না আরঃ অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে
চেয়ে দেখি ছাতার মতন বড়ো পাতাটির নিচে ব'সে আছে
ভোরের দোয়েল পাখি– চারিদিকে চেয়ে দেখি পল্লবের স্তুপ
জাম-বট-কাঁঠালের-হিজলের-অশ্বত্থেরা ক'রে আছে চুপ;
ফণীমনসার ঝোপে শটিবনে তাহাদের ছায়া পড়িয়াছে;
মধুকর ডিঙা থেকে না জানি সে কবে চাঁদ চম্পার কাছে
এমনই হিজল-বট-তমালের নীল ছায়া বাংলার অপরূপ রূপ দেখেছিলো;

এখানে কবি খণ্ডের ভেতর অখণ্ডের অস্তিত্ব অনুভব করেছেন, এরপর কবি তাঁর স্বদেশভূমির অস্তিত্ব দেখতে চেয়েছেন পৃথিবীর মানচিত্রে। অনাগত স্বদেশভূমির উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন:
তুমি কেন দূরে-বহু দূরে- ঢের দূরে- আরো দূরে নক্ষত্রের অস্পষ্ট আকাশ
তুমি কেন কোনোদিন পৃথিবীর ভিড়ে এসে বলনাকো একটি ও কথা


রূপসী বাংলা কাব্যগন্থের কবিতাসমূহ সম্পর্কে ইরাবান বসুরায় 'রূপসী বাংলার জীবনানন্দ' প্রবন্ধে(কোরক, সাহিত্য পত্রিকা, জীবনানন্দ সংখ্যা, শারদ ১৯৯৪) উল্লেখ করেছেন:
'এই কবিতাগুলির সারা শরীরে ছড়িয়ে আছে এক প্রগাঢ় ভালোবাসা, কিন্তু সে ভালোবাসা কোনো নির্বস্তুক বায়বীয় কল্পনাবিলাস নয়। যে বাংলাদেশকে ভালোবেসেছেন কবি, সে বাংলাদেশ শরীরি হয়ে ওঠে শুধু প্রকৃতিতে নয়, ইতিহাসেও। এ কথা ঠিক যে, সেই ইতিহাসের গায়ে আছে উপকথার আবরণ, কখনো বা অতিকথাও, কিন্তু সেই উপকথা, রূপকথা, আর অতিকথার মানুষজন নিয়েই জেগে ওঠে এক বাংলাদেশ, সে বাংলাদেশে নেই কোনো নাগরিক আকাশরেখা, তা শুধু ভরে থাকে আম কাঁঠালের গন্ধে, হিজলের ছায়ায়, সেখানে আজও যেন সপ্তডিঙা মধুকরের যাওয়া আসা।'

রূপসী বাংলার কবিতার আবহের মধ্যে ঘুরে ফিরেই ইতিহাস লুকোচুরি খেলেছে:
এশিরিয়া ধুলো আজ-বেবিলন ছাই হয়ে আছে।

ইতিহাসের ঐতিহাসিক চরিত্রকে তিনি তাঁর কবিতার পংক্তিতে পংক্তিতে পুনরুজ্জীবিত করেছেন। তিনি বল্লান সেন, রায়গুণাকর, দেশবন্ধু, চন্দ্রশেখর, রামনাথ ইত্যাদি ঐতিহাসিক চরিত্রের উল্লেখ করেছেন:

মধুকুপী ঘাস-ছাওয়া ধলেশ্বরীটির পাড়ে গৌরী বাংলার
এবার বল্লাল সেন আসিবে না জানি আমি- রায়গুণাকর
আসিবে না- দেশবন্ধু আসিয়াছে খরধার পদ্মায় এবার,
কালীদহে ক্লান্ত গাংশালিখের ভিড়ে যেন আসিয়াছে ঝড়,
আসিয়াছে চণ্ডীদাস-রামপ্রাসাদের শ্যাম সাথে সাথে তার:
শঙ্কমালা, চন্দ্রমালা: মৃত শত কিশোরীর কঙ্কনের স্বর।

বাংলার পথে তিনি আজও বল্লাল সেনের ঘোড়ার কেশর ঘেরা ঘুঙুরের শব্দ শোনেন:
বল্লাল সেনের ঘোড়া-ঘোড়ার কেশব ঘেরা ঘুঙুর জিনের শব্দ হ'তো এই পথে-,

বুদ্ধের স্বপ্ন দেখার কথাও তিনি ইতিহাস থেকে জেনেছেন। জেনেছেন রোম, এশিরিয়া, উজ্জয়িনী, গৌড়-বাংলা, দিল্লী, বেবিলনের স্বপ্নের কথা:

স্বপ্ন কি দেখেনি বুদ্ধ- নিউসিডিয়ায় ব'সে দেখেনি মণিকা?
স্বপ্ন কি দেখেনি রোম, এশিরিয়া, উজ্জয়িনী, গৌড়-বাংলা, দিল্লী, বেবিলন?

রূপসী বাংলার সনেটগুচ্ছের প্রতিটি পংক্তিতে আবহমান বাংলার রূপ-বৈভবের প্রতিভাস উৎকীর্ণ। জীবনানন্দ এই কাব্যগ্রন্থে বৃক্ষরাজি, ঘাস, নদী, পাখি ইত্যাদির রূপ-সৌন্দর্য নিখুঁতভাবে অংকন করেছেন। রূপসী বাংলার রূপের মধ্যে তিনি খুঁজেছেন লোকজ পুরাণকে, ইতিহাসের প্রবাহমানতাকেও তিনি এড়িয়ে যান নি। অতিলৌকিক আবহ ঘুরে ফিরেই তাঁকে আচ্ছন্ন করেছে। পাতা ঝরে পড়ার বিষণ্নতা থেকেও তিনি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নন। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে মানুষের প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াকে তিনি স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেও দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন:
আমি চ'লে যাব বলে
চালতাফুল কি আর ভিজিয়ে না শিশিরের জলে