জাহিদ সোহাগের গল্প: ডগ থেরাপি
ছাত্রীরা ফিরে এলো, তাদের মুখে যাত্রার নারীদের চড়া মেকআপ। তারা চেয়ারে বসে ভেজা ন্যাপকিন দিয়ে ঘষে ঘষে মুছে ফেলছে। আমি তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে চিনতে পারি না। তাদের লম্বা মুখ, ধারালো দাঁত দেখে এলসেশিয়ান মনে হচ্ছিল, আমার কাছে এসে বসলে নিশ্চয়ই আমার গায়ে লালা গড়িয়ে পড়বে। কুকুরের লালার স্বাদ কেমন আমার জানা নাই।
কদিন থেকে বৃষ্টি থামতে থামতে রোদ তেতে ওঠে, আবার রোদ দেখে বের হলাম, ঝুপ করে নামলো বৃষ্টি। রাস্তার খনাখন্দ ভরা, ভেক ডাকে কিনা! না ডাকলেও ভেকের ইনভিজিবল অস্তিত্ব নিশ্চয়ই আছে। আমি আমার স্কুটি এমন জায়গায় পার্ক করলাম, চাইলে চোর নিতে পারে, বা লোক সমাগম দেখে নাও নিতে পারে। আরেকটি লক লাগাতে পারতাম, কিন্তু অভ্যাসমতো হেলমেট হাতে নিয়ে তাতানো রোদ পারি দিচ্ছি। এখন ঝপ করে বৃষ্টি নামলে স্কুটির সিটের নিচ থেকে রেইনকোর্ট বের করব না, ভিজব।
শুনেছি, বাংলাদেশ মেডিকেলে পাকিস্তানি ও কাশ্মিরের মেয়েরা পড়ে, বাইচের নৌকার মতো ছিপছিপে লম্বা, খাড়া নাক, চামড়া ইউরোপিয়ানদের মতো চর্মরোগি চেহারার না। নিজেকে প্রশ্ন করলাম, এদের দেখতেই কি এখানে আসি? টিকিট কাটার লম্বা লাইন ও ওয়েটিং থাকা সত্ত্বেও? যেটুকু কম টাকায় ডাক্তার দেখানো যায় তার সঙ্গে ভোগান্তি যোগ করলে খুব লাভ হয় না শিওর। তবু এখানে আসি, দামি হসপিটালের ওয়েটিংয়ে বসেও ভাবি ওখানে গেলে ভালো হতো। ভালো কোথাও হয় না, ভালো হতে পারতো, এই বোধই আশা জাগায়।
ইনফরমেশন ডেস্কে শুধু চোখখোলা এক নারীর দিকে ঝুঁকে বললাম এন্ডোক্রিনোলজিস্ট দেখাতে চাই। তিনি ঝটপট নাম বলে একটা পকেটসাইজ খোলা বইয়ে আবার নজর দিলেন।
আমি ফোনের স্ক্রিন অন করে দেখলাম, অর্থোপেডিক্সে আমার ছেলে ডাক্তার থেকে অন্তত আধঘণ্টা পিছিয়ে আছে, আমি এই সুযোগে এন্ডোক্রিনোলজিস্ট দেখিয়ে আসি। খুঁজে খুঁজে চেম্বারের সামনে গিয়ে দেখি ডাক্তারদের দেখা পেতে বিশ মিনিটের বেশি লেগে যেতে পারে, প্রয়োজনে পাঁচশত টাকার টিকিট জলাঞ্জলি দিয়ে ছেলের কাছে ফিরব।
বারবার ফোন অন করে সময় দেখছিলাম। টাইমলি আমাকে দেখতে না পেলে ছেলে হুইলচেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠবে, তদুপরি ফ্যাচ ফ্যাচ করে কেঁদে গতজন্মের কাশি জাগিয়ে তুলে বমিও করে ফেলতে পারে। ডাক্তারের এটেন্ডেন্টকে পেলে অনুরোধ করতে পারতাম। ভেতরের রোগির বের হওয়ারও লক্ষণ নাই।
এখন মুয়াজ্জিন আজান দিয়ে দিলে ডাক্তার নামাজ ধরতে মসজিদে যেতে পারে, তারপর লাঞ্চ, বা তিনি ওয়ার্ড ভিজিট করতে গেছেন কিনা ভেবে আমি কাচের দরজাটা একটু ঠেলে দেখলাম ডাক্তার আছেন। ডাক্তার আমার দিকে তাকাল না।
কিছুক্ষণ পর আমার নাম ধরে একজন ডাকলেন, আমি তার দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হলাম, ‘আপনি এখানে বসে আছেন?’
তার ইউনিফর্ম পরা উচিত ছিল, বা রোগিদের ওপর একটু খবরদারি করলে বুঝতে পারতাম, সে এখানে বসে আপনমনে পান চিবাচ্ছিলেন আর পিচ পিচ শব্দ করে পিক ফেলছিলেন বাইরে মাথা বের করে দেয়াল ঠেকিয়ে।
আমি নির্ধারিত চেয়ারে বসলাম। আমার পেছনে দুজন ছাত্রী, টেবিলের দুইপাশে দুইজন। পেছনের দুজনের চেহারা না দেখায় তাদের অস্তিত্ব আমার কাছে অস্বস্তিকর হয়ে উঠল। মনে হচ্ছিল তারা যেকোনো সময় আমার কাঁধে মোটা নিডলের ইনজেকশন পুশ করে দিতে পারে।
‘আপনার কি এমন মনে হয় সবকিছু ভেঙেচুরে ফেলতে ইচ্ছে করে? কিন্তু নিজেকে সামলে রাখেন?’ ডাক্তার আরো বললেন, ‘যেমন ধরুন কেউ আপনাকে বুঝতে চায় না, কিন্তু আপনি সঠিক?’
আমি আস্তে করে বললাম, ‘এর সঙ্গে হেয়ার লসের সম্পর্কে কী?’
ডাক্তার মনে হলো কাঙ্ক্ষিত উত্তর পেয়ে গেল, ‘আছে আছে, হেয়ার লসের সম্পর্ক আছে।’
আমি ডান দিকের ছাত্রীর চোখে চোখ রেখে বললাম, ‘আমি কেমন মানুষ শুনুন। সকালে বউ রান্নাঘরে রুটি ভাজছে, আমি থালাবাসন মাজছি। আমি তাকে শুধু ৪টি রুটি ভাজতে বললাম, আর সে ঝামটা দিয়ে মুখ খিচিয়ে বলল, বাকিগুলো কে করবে শুনি? আমি ভাবলাম, এত রেগে আছে কেন! সকাল তো নিরুত্তাপ। আমি প্রায় কোনো কথাই বলিনি। তাহলে কি ফোনে কারো সঙ্গে বাতচিৎ হয়েছে, বা রুমি ভাই বলেছে আজ সামিরা তার ঘাড়ে বাচ্চা ফেলে বাইরে চলে গেছে। রুমি ভাই ওই বজ্জাতকে ঘর থেকে বের করে দিতে পারে না কেন এই প্রশ্ন করেছিল?’
আমি লক্ষ করলাম বাম পাশের ছাত্রীটি আমার কথা দ্রুত নোট করছিল, আমি তার দিকে তাকিয়ে আবার বলতে শুরু করলাম, ‘আমার মনে রাগের পারদ উঠতে শুরু করলে, আমি স্ত্রীকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে…’
লক্ষ করলাম এবার ডানপাশের ছাত্রীটি নোট নিচ্ছে।
আমি ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে গোটা কয়েক চুমু খেলাম। আর স্ত্রী আমার মুখে থুতু ছিটিয়ে তাতে সাড়া দিলো। আমি থুতু মুছে বললাম, তোমার থুতুতে তো অমৃতের স্বাদ আছে।’
ডাক্তার আমাকে উৎসাহ দিয়ে বললেন, ‘বলুন, বলুন, থামবেন না।’
আমি আবার শুরু করলাম, ‘গোসল করার সময় দেখি বাথরুমের ফ্লোর চুলে ভরে যায়। চুলগুলো স্বাস্থ্যহীন। ভাবলাম হরমোনাল ইমব্যালেন্স থেকে হচ্ছে কিনা।’
এর আগে আমি প্রেসক্রিপশনে দেখে নিয়েছি, আমি সাইক্রিয়াটিস্টের চেম্বারে ঢুকে পড়েছি।
ডাক্তার চেয়ার ছেড়ে উঠে আমাকে স্ট্রেচারে শুয়ে পড়তে বলল।
আমি সেখানে বসে বললাম, ‘শুতে হবে কেন?’
ততক্ষণে আমার শরীর অবশ হতে শুরু করল। ছাত্রীরা অ্যাপ্রন খুলে তা দিয়েই আমার হাত-পা বেঁধে ফেলল। আমি চিৎকার করতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু শব্দ কানে এলো না। আমি কেবল বুঝতে পারছি আমার শরীরের ওপর আঙুলের ব্যথাহীন চলাচল করছে।
আমি চিৎকার করে বললাম, ‘আপনারা কি আমাকে কাটছেন?’
কোনো উত্তর নেই এবং তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন, নোটখাতা মিলিয়ে দেখছিলেন।
ডাক্তার আমার কানের কাছে মুখ এনে কিছু বললেন, আমি অনুমান করি সে কথা আমি শুনেছি। তার জবাবে বললাম, ‘বাসনাই দুঃখের কারণ, আর বাসনাহীন থাকা মানেই আনন্দে থাকা। তাই বলতে পারেন, আমি আনন্দে আছি।’
আমার চোখের পাতা আরো ভারি হয়ে উঠল, মনে হচ্ছিল কেউ একজন আমার চোখ দুই আঙুল দিয়ে খুলে তার ভেতরে আলোর তরবারি ঢুকিয়ে দিয়েছে।
আমি টের পাচ্ছি আমার পিঠের নিচে ভেজা, কলার ভেলার শুয়ে যাত্রা করছি স্বর্গলোকে। আমার মাথার পাশে বসে ছাত্রীটি গাইছে:
‘বেহুলা ভাসেরে ভাসেরে অগম দরিয়ায়
অভাগিনী বেহুলার নাইরে গাছের ছায়।
মৃতপতি কোলে বালা ভাসেরে ভাসে
কী করিবে কোথা যাবে বুঝা বড় দায়।’
ডাক্তার ছাত্রীটিকে ধমক দিয়ে বলল, ‘স্বামী নিয়ে স্বর্গে যাত্রা করছ, মুখে হাসি কেন? দেবতারা তোমার স্বামীকে জীবন ফিরিয়ে দেবে?’
ছাত্রীটি তার কোল থেকে আমার মাথা নামিয়ে অদৃশ্য হলে ডাক্তার আকাশী রঙের পর্দার দিকে চেঁচিয়ে বলল, বেহুলা কই? বেহুলা কই? এখনই শুরু করতে হবে।’
কিছুক্ষণ পর আমি ঘুঙুরের শব্দ শুনতে পেলাম, দূর থেকে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে।
২
আমি একটা সিগারেট জ্বালালাম, বা ডাক্তার জ্বালিয়ে দিলেন কিনা, খালি পেটে সিগারেট খেলে আমার মাথা টলে, আর মনে হয় রক্তের ভেতর নিকোটিন দৌড়ায়।
ডাক্তার বললেন, ‘ধোঁয়া গিলবেন না। মাড়িতে যতটুকু ধোঁয়া লাগে তাতেই নেশা হওয়ার কথা।’
আমি সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে ফুসফুসে না নিয়ে নাক দিয়ে মুখ দিয়ে ছেড়ে দিই। ধোঁয়ায় চেম্বার ভরে ওঠে।
আমার বাম পাশের ছাত্রীটি পাঞ্চিং মেশিন দিয়ে প্রায় হাফ দিস্তা কাগজ ফুটো করে একটি ফাইল বানালেন। তাতে ইংরেজিতে লিখলেন, Yahid/0016/ho/SD-009. তারপর আমার নামের ওপর হাইলাইটার ঘসে দিলো।
আমি বললাম, ‘আমি কি এখন যেতে পারি?’
ডাক্তার বলল, ‘আমাকে একটু সময় দেবেন প্লিজ। আরেকটু এক্সামিন করব। আচ্ছা বলুন তো, আপনি রেগে না গিয়ে হাসেন কেন?’
আমি বললাম, ‘হাসি পেলে কী করব?’
‘নিশ্চয়ই হাসবেন। কিন্তু আমাদের মনে যা আসে তা তো প্রকাশ করতেই হবে, নাকি?’ ডাক্তার আরো বললেন, ‘নইলে এসবই বুম করে, যেমনটা আপনার ক্ষেত্রে হয়েছে।’
আমি বললাম, ‘আমার বাড়ি ফিরতে হবে। কুকুরগুলো না খেয়ে আছে।’
ডাক্তার আশ্চর্য হয়ে বলল, ‘আপনি কুকুর পোষেন? কয়টি কুকুর আছে?
: এতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে! তবে কয়টি কুকুর আছে তা গুনে দেখিনি। গুনে দেখলেই বা কী? দুটি থাকা আর পাঁচটি থাকা তো একই কথা। কুকুর আছে এটাই তো কুকুরের এগজিসটেন্স।
ডাক্তার বলল, ‘তা ঠিক, তা ঠিক। তবে কুকুর কি চিন্তা করে যে, কুকুর আছে?’
: মানে বলতে চাচ্ছেন, হিউম যেভাবে নিজের অস্তিত্ব বুঝতে চায়, সেভাবে?
ডাক্তার বলল, আমি হিউম পড়িনি।
: আমিও পড়িনি। তবে মনে হলো হিউম বলে কেউ থাকতে পারে, আর তিনি এভাবে বলতেও পারেন।
আমি আমার সামনে রাখা এক কাপ ব্ল্যাক কফিতে চুমুক দিলাম। ঠান্ডা। তবে কোল্ড কফি নয়।
ছাত্রীরা ফিরে এলো, তাদের মুখে যাত্রার নারীদের চড়া মেকআপ। তারা চেয়ারে বসে ভেজা ন্যাপকিন দিয়ে ঘষে ঘষে মুছে ফেলছে। আমি তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে চিনতে পারি না। তাদের লম্বা মুখ, ধারালো দাঁত দেখে এলসেশিয়ান মনে হচ্ছিল, আমার কাছে এসে বসলে নিশ্চয়ই আমার গায়ে লালা গড়িয়ে পড়বে। কুকুরের লালার স্বাদ কেমন আমার জানা নাই।
ডাক্তার চেয়ার ছেড়ে উঠে বললেন, ‘আপনি থেরাপি নিয়ে বাড়ি যান, কেমন? ওরা খুব ভালো।’
আমি হ্যাঁ-সুচক মাথা নাড়িয়ে একটু হাসার চেষ্টা করলাম।
