Published : 20 Jan 2022, 12:23 PM
বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের
এক দুর্দান্ত দুঃসাহসী স্পাই
গোপন মিশন নিয়ে ঘুরে বেড়ায় দেশ-দেশান্তরে।
বিচিত্র তার জীবন। অদ্ভুত রহস্যময় তার গতিবিধি।
কোমলে কঠোরে মেশানো নিষ্ঠুর সুন্দর এক অন্তর।
একা।
টানে সবাইকে, কিন্তু বাঁধনে জড়ায় না।
কোথাও অন্যায় অবিচার অত্যাচার দেখলে
রুখে দাঁড়ায়।
পদে পদে তার বিপদ শিহরণ ভয়
আর মৃত্যুর হাতছানি।
আসুন, এই দুর্ধর্ষ চিরনবীন যুবকটির সঙ্গে
পরিচিত হই।
সীমিত গণ্ডিবদ্ধ জীবনের একঘেয়েমি থেকে
একটানে তুলে নিয়ে যাবে ও আমাদের
স্বপ্নের এক আশ্চর্য মায়াবী জগতে।
আপনি আমন্তিত।
ধন্যবাদ।
মাসুদ রানার যত বই পড়তে হাতে নিতাম প্রতিবার একবার করে মাসুদ রানার এই অতুলনীয় পরিচিতি পড়ে নিতাম। পড়তে পড়তে মুখস্তই হয়ে গিয়েছিল। তাও কেন বারবার পড়তাম জানি না। বিশেষ করে ওই বাক্যটা ভিতরে একটা ছমছমে অনুভূতি জাগিয়ে তুলতো, টানে সবাইকে, কিন্তু বাঁধনে জড়ায় না। প্রথমে ব্যাক কাভারে গল্পের সারসংক্ষেপ পড়ে নিয়ে বই পড়তে শুরু করার আগে এ-ছিল নিয়মিত অভ্যাস। আরেকটা কাজ করতাম প্রায়ই, মাসুদ রানা সিরিজের যত বইয়ের তালিকা দেয়া থাকতো সেগুলো একবার চোখ বুলিয়ে দেখতাম। কোনটা কোনটা পড়িনি সেগুলো দেখে হাহুতাশ করতাম। আর যেগুলো পড়েছি সেগুলোতে গোল দাগ দিয়ে রাখতাম, অথবা খাতায় লিখে রাখতাম। বন্ধুদের মধ্যে যারা মাসুদ রানা পড়তো তাদের সাথে ভাববিনিময় করতাম, রতœদ্বীপ পড়েছিস? সতর্ক শয়তান? অগ্নিপুরুষ? যাত্রা অশুভ? পড়িসনি? পড়িস। ভয়ঙ্কর।
আমাদের পরিবারে ছেলেমেয়েদের বই কিনে দেয়ার রেওয়াজ ছিল না। খাওয়া-পরার চিন্তাটাই প্রধান যে-সব পরিবারে সেরকম এক পরিবারের ছেলে আমি। আমি বই ধার করতাম বন্ধুদের কাছ থেকে। বিশেষ করে আজাদ ভাইয়ের কাছ থেকে। আমার বই পড়ার পেছনে প্রেম জাগিয়ে তোলার ব্যাপারে আজাদ ভাইয়ের অবদান অপরিসীম।
তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। একদিন শরীর ভালো ছিল না। খেলতে গিয়েও আমি মাঠের পাশে বসেছিলাম। আজাদ ভাই খেলতে নামার আগে একটা বই আমার হাতে দিয়ে বললেন, একটু রাখ। আমি মাঠের পাশে বসে সেই বই পড়তে শুরু করলাম। মুহূর্তে বাস্তবপৃথিবী আমার চোখের সামনে থেকে উধাও হয়ে গেল। মাঠে যে আমার বন্ধুরা খেলছে, চিৎকার-চেঁচামেচি কিছুই আমার কানে ঢুকছে না। আমি হারিয়ে গেছি অন্য এক ভূবনে। সন্ধ্যাবেলা আজাদ ভাই খেলা শেষ করে এসে বললেন, বইটা দে। আমি বললাম, আমি তো পড়তে শুরু করে দিছি। আমি নিয়ে যাই, পড়ে ফেরত দেব। উনি বললেন, ঠিক আছে।
শীতের রাতে লেপের তলায় শুয়ে প্রথম পড়লাম সেবা প্রকাশনীর তিন গোয়েন্দা সিরিজের বই নিশাচর। পরদিন আজাদ ভাইকে গিয়ে বই ফেরত দিয়ে বললাম, দারুণ বই, পড়ে খুব মজা পাইছি। উনি উৎসাহের সাথে তিন গোয়েন্দার পরিচয় দিলেন। বললেন, তিন গোয়েন্দার আরো বই আছে। ব্যস, তারপর দুএকদিন বাদে বাদে ওনার কাছ থেকে একটা একটা বই আনি। অল্প কদিনেই ওনার সংগ্রহের তিন গোয়েন্দা সিরিজের সব বই আমার পড়া হয়ে গেল। একদিন বই আনতে গেলে বললেন, আর নাই, সব তোর পড়া হয়ে গেছে। আমি মন খারাপ করলাম। উনি বললেন, মাসুদ রানা পড়বি? আমি বললাম, এইটা আবার কী? উনি বললেন, মাসুদ রানাও একজন গোয়েন্দা। তবে তিন গোয়েন্দাদের মতো কিশোর নয়, বড়। আমি বললাম, দেন একটা, পইড়া দেখি।
আজাদ ভাইরা অনেকগুলো ভাইবোন। ওনার বড় চারভাই এক বোন আর ছোট আরেক ভাই ছিল। ভাইবোনরা সবাই পড়াশোনা করে, ঘরভর্তি গল্পের বই। উনি আমাকে মাসুদ রানার একটা বই দিলেন। আমি নিতান্তই অবহেলার সাথে সেই বই পড়তে শুরু করলাম। রবিন, মুসা, কিশোর পাশার প্রতি মায়া কাটেনি। কীভাবে এই অপরিচিত গোয়েন্দাকে গ্রহণ করব? সেও কি কিশোর পাশার মতো বুদ্ধিমান? মুসার মতো দুঃসাহসী? রবিনের মতো জ্ঞানী?
মনে নেই মাসুদ রানার কোন বইটি প্রথম পড়েছিলাম। তবে, পড়ে মজা পেয়েছিলাম। পর পর অনেক দিন মাসুদ রানা পড়েই কাটিয়ে দিলাম। মজা পাওয়ার কারণ মাসুদ রানা অনেক বেশি রোমাঞ্চকর। মারমুখী। প্রেমিক। মাসুদ রানা পড়তে পড়তে মনে হলো নিজেও যেন অনেকখানি বড় হয়ে গেছি। সে-বয়সে যৌন-উত্তেজক কিছু পড়লেই গা শিরশির করত। মাসুদ রানাকে প্রায়ই দেখি বিভিন্ন নারীর সাথে শুয়ে পড়তে। সোহানা তার প্রেমিকা। কী মিষ্টি-মধুর সম্পর্ক। কী একটা বইয়ে পড়েছিলাম মাসুদ রানা আর সোহানা গেছে শত্রুর ঘাঁটিতে অপারেশনে। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় সোহানাকে পেছনে রেখে মাসুদ রানা আগে আগে নামছে। সোহানা বুঝল হঠাৎ যদি সামনে থেকে কেউ গুলি ছোড়ে তাই মাসুদ রানা তাকে আড়াল করে রাখছে। মুহূর্তে ভালোবাসায় সোহানার চোখে পানি এসে পড়ল। নিষ্ঠুর এই যুবকের প্রতি ভালোবাসায় আমার চোখেও পানি এসে পড়ল।
নারীর অবমাননা রানা কখনো সইতে পারে না। কোনো নারী বিপদে পড়লে সে এগিয়ে যায় মৃত্যুর ভয় না করেই। নারীদের প্রতি তার ভীষণ টান। ফলে শত্রুরাও সুন্দরী নারী দিয়েই টুপ ফেলে তার জন্য। আর দেশের প্রশ্নে রানা সর্বদা আপোষহীন। দেশ বাঁচাতে সে জীবন বাজি রাখে। দেশের প্রশ্নে তাকে কেউ পিছু হটাতে পারে না। ভারতনাট্যম নামে একটি বই পড়ে প্রথম জেনেছিলাম রানা কতখানি দেশপ্রেমিক। ভারতনাট্যম গল্পের প্লট ভারতীয় এক চক্রের হাত থেকে দেশ বাঁচানোর মিশন। মিত্রা সেন নামের এক নৃত্যশিল্পীর প্রাণ বাঁচানোর সংগ্রাম। প্রেম ও লড়াই মিলে কী দারুণ রোমাঞ্চকর অনুভূতি সৃষ্টি করেছিল আমার ছেলেবেলার মনে তা আর বলার না। এক বসায় পড়েছিলাম সেই বই। দম বন্ধ করার মতো অনুভূতি। বইটি রচিত হয়েছিল স্বাধীনতার আগেই। বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের নাম ছিল তখন পাকিস্তান কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স। মেজর জেনারেল রাহাত খান এর প্রধান। অক্লান্ত পরিশ্রমে নিজের হাতে এ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন রাহাত খান। কয়েক বছরের মধ্যে এত সুনাম অর্জন করেছেন যে আমেরিকা, ব্রিটেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের গুপ্তচর বিভাগ বিসিআইকে নিজেদের সমকক্ষ বলে স্বীকার করে নিতে গর্ববোধ করে। রানা রাহাত খানের ডান হাত। তার একটি আদেশে রানা নির্ভয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে মৃত্যুর মুখে। উপরে উপরে রাহাত খানের ওপর রানা বিরক্ত। একটি কাজ শেষ না হতেই বুড়ো তাকে আরেকটি কাজের নির্দেশ দেন। অথচ ভিতরে ভিতরে এই পাগলাটে বুড়োকে কী গভীর ভালোই না বাসে রানা। রাহাত খানকে যেমন ভক্তিশ্রদ্ধা করে রানা তেমনি ভয়ও পায়। 'আর শুধু বিপদ নয়, মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থেকো', এসব সতর্কবানী রানাকে ঠান্ডা মাথাতেই দেন রাহাত খান। মতিঝিল কমার্শিয়াল এরিয়ায় একটা বিল্ডিংয়ের সাততলায় তার অফিস। নানা বর্ণনায় অনুমান করা যায় অফিসটা দৈনিক বাংলার মোড়ে। সেখান থেকে স্টেডিয়াম দেখা যায়, বায়তুল মোকারম মসজিদ দেখা যায়। রানাও থাকে পুরানা পল্টন একটি বাড়ি ভাড়া করে। রানার বাবা-মা বেঁজে নেই, বাড়িতে গৃহকর্মী আছে রাঙার মা। রানার বয়স কখনো ২৬, কখনো ২৭, শেষ পর্যন্ত বোধহয় ২৮ পর্যন্ত উঠেছিল গত পঞ্চাশ বছরে। সে দেখতে শ্যামলা, উচ্চত পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চি। গায়ে কাটা দাগ আছে, ফলে তাকে নিষ্ঠুর খুনির মতো দেখায়।
মাসুদ রানার যে-কোনো মিশনই দম বন্ধ করা অনুভূতি নিয়ে এগিয়ে যায়। ঠিক যেন বইয়ের পাতায় জেমস বন্ডের কোনো মুভির গল্প পড়ছি। এত দ্রুত সব ঘটনা ঘটতে থাকে, চোখের পলকে ঘটনার পটপরিবর্তন, এই শত্রুর হাতে রিভলবার, রিভলবার তাক করা রানার বুক বরাবর, কোত্থেকে কী হয়ে গেল, রিভবলবার রানার হাতে!
মাসুদ রানার জাত শত্রু কবীর চৌধুরী। ভয়ঙ্কর লোক সে। পৃথিবী ধ্বংস করার পরিকল্পনা নিয়েই যেন ঘুরে সব সময়। ঠান্ডা মাথার খুনি। কবীর চৌধুরী আবার বিরাট বৈজ্ঞানিক, গবেষক। হলে হবে কী? নিজের লাভের জন্য মানুষ মারতে পারে পোকামাকড়ের মতো। আর রানার পেছনে লেগেই আছে। রানাকে ধ্বংস করার আগ পর্যন্ত যেন তার শান্তি নেই। কারণ তার সমস্ত পরিকল্পনা একমাত্র রানা এসেই বানচাল করে দেয়। আর রানা, কবীর চৌধুরী যদি চলে ডালে ডালে রানা চলে পাতায় পাতায়। কোনো বইতে কবীর চৌধুরীর উপস্থিতি থাকা মানে সেই বইয়ের উত্তেজান দ্বিগুণ বেড়ে যাওয়া। ধ্বংসপাহাড় বইয়ে কবীর চৌধুরীর প্রথম আবির্ভাব। কাপ্তাই বাঁধ ভেঙে দেয়ার গোপন পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে কবীর চৌধুরী। সাথে আছে ভারতের একটি দল। মাসুদ রানা ঢাকা থেকে যায় সেই পরিকল্পনা ঠেকাতে। তারপর এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান।
মাসুদ রানা পড়তে শুরু করার পর কিশোর থ্রিলার আর ভালো লাগেনি। কিশোর থ্রিলারে মাসুদ রানার এ্যাকশন নেই। কিন্তু অচিরেই আজাদ ভাইয়ের সংগ্রহ শেষ হয়ে গেল। আমরা দুজন তখন অন্য এক এলাকায় এক পাঠাগারের খোঁজে যেতাম। যখনই যেতাম তখনই দেখতাম পাঠাগারটা বন্ধ।
আমাদের এলাকায় প্রথম পাঠাগার স্থাপিত হলো ১৯৯৪ সালে। সুলতানা কামাল স্মৃতি পাঠাগার। সুলতানা কামাল আমাদের এলাকারই মেয়ে। পাঠাগারের সাথে একটি সংগঠন– প্রতিবাদী তরুণ সমাজ। পাঠাগারটি স্থাপিত হওয়ামাত্রই আমি আর আজাদ ভাই সদস্য হলাম। আমাদের সে কী আনন্দ! পাঠাগারে ঢুকে প্রথমে আমি খুঁজতে লাগলাম মাসুদ রানা সিরিজের বই-ই। দেখলাম দুটো তাক ভর্তি সেবা প্রকাশনীর বই। অনেকগুলো রহস্য পত্রিকা। অনেক পরে জেনেছিলাম এগুলো দিয়েছিলেন মাহিন ভাই।
সেবা প্রকাশনীর প্রজাপতিমার্কা লগো দেখলেই তখন চোখ ঝলঝল করে উঠতো। মাসুদ রানার কোনো বইয়ের সাথে এনেছিলাম রহস্য পত্রিকার কোনো একটা সংখ্যা। একটা পত্রিকায় কত বিষয়! পাঠ্যপুস্তকের বাইরে বিচিত্র বিষয় জানার আগ্রহ হুড়মুর করে বেড়ে উঠল। বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল সম্পর্কে জেনেছিলাম তখনই। ভীষণ অবাক হয়েছিলাম, সমুদ্রের গভীরে জাহাজ অদৃশ্য হয়ে যায়, তার আর কোনো খোঁজই পাওয়া যায় না! দেশ-বিদেশের কত কথা জানতে পেরেছিলাম! কিশোরমনের চাহিদাপূরণের যথাযথ আয়োজন ছিল রহস্যপত্রিকা।
পাঠাগার থেকে নাম লিখিয়ে বই আনা যেত একবারে একটা। কিন্তু আমার তখন একদিনে একটা বইয়ে চলছিল না। বিকেলে একটা বই আনলে রাতেই অর্ধেকটা শেষ হয়ে যেত। পরদিন তাহলে স্কুলে গিয়ে পড়ব কী! আমি তখন একটা রহস্যপত্রিকা চুরি করে আনতাম। আমি ছাড়া সেগুলো কেউ ধরতোও না। আজাদ ভাইয়ের তখন এসএসসি পরীক্ষা সন্নিকটে। তিনি গল্পের বই পড়া ছেড়ে দিয়েছিলেন। অল্পকদিনের মধ্যেই দেখলাম ওই পাঠাগারে প্রতিদিনের নিয়মিত পাঠক হিসেবে আমি একজনই। বই এন্ট্রি করতে গিয়ে দেখতাম আর কারো নাম নেই। বড়ভাইদের মধ্যে একজন কেউ থাকতেন বই এন্ট্রি করানোর কাজে। স্কুল থেকে ফিরে সারা বিকেল আমি অপেক্ষায় থাকতাম দায়িত্বপ্রাপ্ত বড়ভাই কি এসেছেন! প্রতিদিন যাওয়া-আসাতে পরিচিত হয়ে যাওয়াতে বড় ভাই আমাকে পাঠাগারে ঢুকিয়ে দিয়েই আড্ডা দেবার জন্য বেরিয়ে যেতেন। বই বাছাইয়ের ছলে একটা রহস্য পত্রিকা আলগোছে আমি জামার ভিতর ঢুকিয়ে ফেলতাম।
এ-সময়ই ওয়েস্টার্ন সিরিজের বই পড়া শুরু। হয়তো মাসুদ রানা সিরিজ শেষ হওয়াতেই ধরেছিলাম ওয়েস্টার্ন সিরিজ। কুয়াশা সিরিজ আমার বেশি পড়া হয়নি। এর সঙ্গে পড়েছিলাম কিশোর ক্লাসিকের কিছু বই। রবিন হুড, হাকলবেরি ফিন, রবিনসন ক্রুসো, গালিভার ট্রাভেলস, টারজান। কী অদ্ভ'ত শিহরণ ছিল একেকটা বইয়ে। এর মধ্যে নাইনে উঠেছি। এর মধ্যে ক্লাশরুমে লুকিয়ে বই পড়ার জন্য স্যারের মার খেয়েছি। এর মধ্যে বাড়িতেও জানাজানি হয়ে গেছে আমি পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে লুকিয়ে বই পড়ি।
আমরা ভাড়া থাকতাম রুবেল ভাইদের বাড়ি। রুবেল ভাই খুব ভালো ছাত্র ছিলেন। তিনি আমার পাঁচ ক্লাশ উপরে পরতেন। তার কাছেই আমি প্রাইভেট পড়তাম। ফলে আমার ওপর তার একটা দায়িত্ব ছিল। স্কুল থেকে যখন আমার নামে নালিশ এলো আমি ক্লাশের পড়া বাদ দিয়ে গল্পের বই পড়ি তখন তিনি আমার ওপর চড়াও হলেন। আমাদের ঘরে এসে যতগুলো বই পেলেন নিয়ে গেলেন। আমার মাকে খুব করে বলে গেলেন আমি কখন কী পড়ি তা যেন খেয়াল রাখেন। রাতে আমি পড়তে বসলে মা এসে প্রায়ই বই উল্টেপাল্টে দেখতেন ভিতরে কোনো গল্পের বই আছে কিনা।
স্কুলে আমার নাম হয়ে গিয়েছিল ব্লাক ড্রাগন। ক্লাশে ব্লাক ড্রাগন নামে একটা বই পড়ার সময় জামাল স্যারের কাছে ধরা খেয়েছিলাম। জামাল স্যার আমাকে সেদিন কী মারটাই না মারলেন। স্যার না মারলেও পারতেন। আমাকে ভালো করে বুঝিয়ে দিলেই হতো। স্কুল ফাঁকি দিয়ে আমি তখন বই পড়তে লাগলাম চিটাগাং হাইওয়ের পাশে বসে। কত জায়গায় বসেই না তখন বই পড়তাম– গাছের ডালে বসে, কবরস্থানে বসে, মসজিদের ছাদে বসে।
সেবা প্রকাশনীর বইয়ের একটা সুবিধা ছিল সেগুলো বহন করা সহজ। ছোট্ট পেপারব্যাক বই। অনায়াসে পেটের ভিতর ঢুকিয়ে রাখা যেত। আশ্চর্য হলেও সত্য প্রায়ই তখন আমার পেটের ভিতর লুকিয়ে থাকতো একটা বই। অনেক সময় খেলতে গেলেও থাকতো। ফলে বল উড়ে এসে পেটে লাগলে কোনো অসুবিধা হতো না। আমার তখন অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল সব সময় সাথে একটা বই রাখা। বই সাথে না থাকলে নিঃসঙ্গবোধের শুরু তখন থেকেই আমার।
তখন শুধু সেবা প্রকাশনীর বই-ই পড়ি। এইট-নাইন-টেন জুড়ে। মুখস্ত হয়ে গেছে কয়েকটা নামÑ কাজী আনোয়ার হোসেন, রকিব হাসান, রওশন জামিল, শেখ আব্দুল হাকিম, নিয়াজ মোর্শেদ, খসরু চৌধুরী। কাজি আনোয়ার হোসেনই যে সবার গুরু সেটা জানা হয়ে গেছে। ঠিক কবে জেনেছি তিনি সেবা প্রকাশনীর প্রকাশকও সেটা খেয়াল নেই। কবে যেন জেনেছিলাম তিনি বিখ্যাত সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেনের ছেলে, এবং সন্জীদা খাতুনের ভাই তাও মনে নেই।
আমার বড়খালা থাকতেন চিটাগাং। বড়খালার তিন ছেলে। রেজাউল ভাই, নাজমুল ভাই আমার চার-পাঁচবছরের বড়। তাদেরও ছিল গল্পের বই পড়ার অভ্যাস। বছরে একবার কুমিল্লা এলে তাদের সঙ্গে আমার দেখা হতো। আসার সময় তারা সব সময়ই সাথে করে কয়েকটি গল্পের বই নিয়ে আসতেন। সব সময়ই থাকতো সেবা প্রকাশনীর বই। তখন মাসুদ রানার বই-ই বেশি আনতেন। আমরা একসাথে শুয়ে-বসে বই পড়তাম। আগে কে কোনটা পড়েছি বলতাম। আমার কোনো বই না পড়া থাকলে তারা গল্প করে শুনাতেন। আমি শুনাতাম তাদের না পড়া বইয়ের গল্প। সে কী দারুণ গল্পের দিন আমাদের। সেবা প্রকাশনীর বই যে আমাদের মধ্যে কী গভীর বন্ধনের সেতু তৈরি করেছিল বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা তা কল্পনাও করতে পারবে না।
২০০৪ সালের একদিন আমি আর রাহাদ দাঁড়িয়ে ছিলাম প্রেসক্লাবের সামনে। রাহাদ আর আমি তখন গল্প লিখি। জনকণ্ঠে, সংবাদে, ভোরের কাগজে আমাদের দুচারটি গল্প ছাপা হয়েছে। সেদিন আমি আর রাহাদ খুব চোটপাট করছিলাম সেবা প্রকাশনীর বইগুলোকে কেন সাহিত্যমর্যাদা দেয়া হয় না? এ-নিয়ে আরো অনেকেই আলাপ করেন, করেছেন তাও আমরা জানি না। আমরা দুজনেই এর একটা মীমাংসায় পৌঁছুলাম যে, কিশোর থ্রিলার, মাসুদ রানা, ওয়েস্টার্ন সিরিজকেও সাহিত্যমর্যাদা দেয়া উচিত। আমরা এ-সিদ্ধান্তেও পৌঁছুলাম যে, এ-দেশে পাঠক সৃষ্টিতে সেবা প্রকাশনী অদ্বিতীয় ভূমিকা পালন করেছে। এবং আমরা এও স্বীকার করলাম যে, এই যে আমরা দুজন আজ লিখতে চাচ্ছি তারও বেশির ভাগ অবদান সেবা প্রকাশনীরই। সুতরাং আর দেরি কেন, এক্ষুণি চল একবার সেবা প্রকাশনীর অফিসে গিয়ে ঘুরে আসি। এই তো কাছেই সেগুন বাগিচা। সেবা প্রকাশনীর নামটাই নেয়া হয়েছে সেগুনবাগিচা থেকে। সেগুনের স আর বাগিচার বা। সেবা।
অনেক খুঁজে আমরা সেবা প্রকাশনীর অফিস বের করলাম। কাজী আনোয়ার হোসেন সেদিন ছিলেন না। শুধু সেবার নেমপ্লেটটার দিকেই আমরা কিছুক্ষণ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলাম। এখান থেকে একদিন আমাদের স্বপ্ন উৎপাদিত হতো! কাজী আনোয়ার হোসেন কি সত্যিই এখানে আসেন!
তখন আমরা বেশ বড়ই হয়ে গেছি। তাও যেন কৈশোরের গন্ধ যায়নি গা থেকে। কাজী আনোয়ার হোসেনকে কি সত্যিই আমরা বাস্তবপৃথিবীর মানুষ বলে ভাবতাম! মনে হতো তিনি যেন থাকেন কোনো দূর দেশে! তা না-হলে এতকিছু জানেন কীভাবে তিনি! কতো দেশ ঘুরছেন, ইউরোপ-আমেরিকা-আফ্রিকা-রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য তো তার হাতের মুঠোয়! মাসুদ রানা পারতো না আর জানতো না এমন কিছু কি আছে! আর মাসুদ রানাকে তো আমরা ভাবতাম কাজী আনোয়ার হোসেন বলেই।
অনেক পরে জেনেছিলাম মাসুদ রানার বেশির ভাগ বই বিদেশী গল্পের রূপান্তর। আরো অনেক পরে জেনেছিলাম মাসুদ রানা সিরিজের সব বই-ই তিনি লিখেননি। কিছু বই লিখেছেন শেখ আব্দুল হাকিম। এ-নিয়ে এই কিছুদিন আগে কত আইন-আদালত হয়ে গেল। তাতে কাজী আনোয়ার হোসেনের মর্যাদা আমাদের কাছে একটুও কমেনি। তিনি মাসুদ রানার স্রষ্টা, কত সিরিজের স্রষ্টা, কত লেখকের স্রষ্টা, কত পাঠকের স্রষ্টা।
তার নাম যেমন বিখ্যাত তার সম্পর্কে জানা গেছে খুব অল্পই। খুব অল্প কিছু সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি। এই কয়েক বছর আগে তার প্রথম ছবি দেখেছিলাম। কী ধারালো চেহারা! কী সুপুরুষ! প্রথম আলোতে পড়া এক সাক্ষাৎকার পড়ে জেনেছিলাম তিনি এক সময় গানও গাইতেন। সুভাষ দত্তের সুতরাং ছবিতে 'এই যে আকাশ এই যে বাতাস' গানটি গেয়েছিলেন তিনি।
সেবাপ্রকাশনীর বই যে সাহিত্যমর্যাদা পাচ্ছে না এ নিয়ে তারও আক্ষেপ ছিল। তিনি বলতেন, সুসাহিত্যিকরা যদি থ্রিলার লেখাকে ছোট নজরে না দেখতেন তাহলে আরো অনেক কাজী আনোয়ার হোসেনের জন্ম হতো। তার আরেকটি দুঃখ ছিল বাংলাদেশে থ্রিলার সাহিত্যের ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখে। শুধু থ্রিলার সাহিত্য নয়, তিনি বলেছিলেন, এ-দেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা, নাচ-গান-বাজনা-সিনেমা-ছবি-ভাস্কর্য, অর্থাৎ যা কিছু সুন্দর, সব ধরণের শিল্পসৃষ্টির ধারা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছে ক্রমে।
ফেসবুকের এ-জমানায় আমরা ক্রমশ বইবিমুখ হয়ে পড়ছি। কিশোর-কিশোরী-তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বাড়ছে বিষণ্ণতা ও বিচ্ছিন্নতা। বাড়ছে কিশোর অপরাধ। আমাদের ছেলেবেলায় এসব ছিল বহুদূরের ব্যাপার। কাজী আনোয়ার হোসেন কী করেছেন তা জানি শুধু আমরা। তিনি শুধু লেখক নন, একটি প্রতিষ্ঠান। পুরো তিনপ্রজন্মের ছেলেমেয়েদের তিনি মাতিয়ে রেখেছেন জাদুময় এক ভূবনের ছোঁয়ায়। ফেসবুকে অনেকে লিখছেন এতই যদি পড়ুয়াপ্রজন্ম গড়ে তুলেছেন তিনি সেই প্রজন্মটা কোথায়? এখন কেন তারা বই পড়েন না? কিংবা তাদের পরবর্তী প্রজন্ম? সেই পড়ুয়াপ্রজন্ম কী দায়িত্বকর্তব্য পালন করেছে সমাজের জন্য?
কথা ঠিকই। এ-নিয়ে বহু তর্কবিতর্ক হতে পারে। গবেষণাও হতে পারে যে আশি, নব্বইয়ের বইপড়ুয়াপ্রজন্ম আজ কোথায়? কিংবা তাদের পরবর্তী প্রজন্মকেই তারা কীভাবে গড়ে তুলেছেন? এর মধ্যে বহু ঘটনা ঘটে গেছে বাংলাদেশে। নতুন নতুন প্রযুক্তি এসেছে, ঘরে ঘরে টেলিভিশন এসেছে, হাতে হাতে মোবাইল এসেছে, ইন্টারনেট এসেছে, যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হয়ে গেছে, অসংখ্য তথ্য ও বিনোদনের উপায় এসে মস্তিষ্ককে ভারী করে তুলেছে। বই পড়ার অভ্যস মানুষের অনেক কমে গেছে। এসব সবই সত্য, যুগের চাহিদা, সময়ের দাবি। কিন্তু এ-কথাও সত্য কাজী আনোয়ার হোসেনের গড়ে তোলা প্রজন্মটা এখনো আছে। তার প্রতি ফেসবুকে অসংখ্য মানুষের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন তারই প্রমাণ। তবে, এটা শুধু শ্রদ্ধাপ্রদর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। আমাদের আজ নতুন করে ভাবতে হবে পরবর্তী প্রজন্মকে আমরা কী দিয়ে যাব? সে-ক্ষেত্রে সেবা প্রকাশনীর বইয়ের চেয়ে সুন্দর উপহার আর কিছু হতে পারে না।
বিচিত্রা পত্রিকায় দেয়া এক কাজী আনোয়ার হোসেন বলেছিলেন, তিনি যা পারেন নি, তাই মাসুদ রানা। এ-কথা সত্য আমাদের সবার ক্ষেত্রেই। মাসুদ রানা আমাদের কল্পনার নায়ক। আর কাজী আনোয়ার হোসেনই আমাদের মাসুদ রানা। তিনিই আমাদের ছেলেবেলার নায়ক।