পরবর্তীতে, অনেক বছর পরে জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে তার সরাসরি সাক্ষাতও হয়েছিল। ধূসর পাণ্ডুলিপি পাঠের আশ্চর্য অভিজ্ঞতার কথা তিনি কবিকে জানিয়েছিলেন।
Published : 17 Aug 2023, 12:34 PM
কালের ধুলোয় লেখা আসলে একটি শহরের আত্মজীবনী। শহরটির নাম ঢাকা। এবং এই শহরে শামসুর রাহমান কাটিয়েছেন ব্রিটিশ রাজের শেষ ১৮ বছর, পাকিস্তান রাষ্ট্রের ২৩ বছর, এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ৩৫ বছর। ৭৬ বছরের দীর্ঘজীবন তার, যার পুরোটাই কেটেছে এই নগরে। মুক্তিযুদ্ধের সময় কয়েক মাস গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর পাড়াতলীতে গিয়েছিলেন। তার জন্ম পুরনো ঢাকার ৪৬ মাহুতটুলিতে, এবং মৃত্যুর পর এই শহরেরই বনানী কবরস্থানে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।
পঞ্চাশ-ষাট-সত্তর দশকের যত কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী আত্মজীবনী লিখেছেন ঘুরেফিরে বারবার এই ঢাকা শহরের কথা বলেছেন। একে তো এই ঢাকা শহর পূর্ববাংলা, তথা, পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাজধানী, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র, দ্বিতীয়ত, বিশ বছর আগেও এই ঢাকা শহর জাহান্নামের নগরী ছিল না। একদিন এই শহরের রূপ-লাবণ্যের খ্যাতি ছিল, একদিন এই শহরের প্রাণ-স্পন্দন ছিল। জনসংখ্যার চাপে ঢাকা তখনো থেৎলে যায়নি। সে-সময়ের কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীরা তাই ঢাকাকে কোনো স্থান হিসেবে চিত্রিত করেননি, এই নগরকে একটি বিশেষ চরিত্র হিসেবেই উপস্থাপন করেছেন। আর শামসুর রাহমানের জন্ম, বেড়ে-উঠা যেহেতু এই ঢাকা শহরেই, তাই তিনি এই শহরটিকে রূপ দিয়েছেন প্রিয়তমার মতো। শুধু আত্মজীবনীতে নয়, তার অসংখ্য কবিতায় ঢাকার রূপ উঠে এসেছে অপরূপ লালিত্য নিয়ে। আধুনিক সাংস্কৃতিক-রাজধানী ঢাকার জন্ম হয়েছে শামসুর রাহমানের কলমেই। ঢাকাইয়া ভাষায় লেখা তার সেই বিখ্যাত কবিতা কে না পড়েছে।
হালায় আজকা নেশা করছি বহুত। রাইতের
লগে দোস্তি আমার পুরানা, কান্দুপট্টির খানকি
মাগীর চক্ষুর কাজলের টান এই মাতোয়ালা
রাইতের তামাম গতরে। পাও দুইটা কেমুন
আলগা আলগা লাগে, গাঢ়া আবরের সুনসান
আন্দরমহলে হাঁটে। মগর জমিনে বান্ধা পাও...
এই ঢাকার প্রেমে মুগ্ধ ছিলেন বলেই তার প্রথম স্মৃতি কথার নাম স্মৃতির শহর। ঢাকার জন্মকথা, ইতিহাস থেকে শুরু করে নিজের দেখা ঢাকাকে তিনি গভীর মমতা দিয়ে উপস্থাপন করেছেন। স্মৃতির শহর-এ এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘সেই ছেলেবেলা থেকেই পথ হাঁটতে আমার ভালো লাগে। মাহুতটুলির রাস্তা, সাতরওজা আর আরমানিটোলার পথ, নয়াবাজর, বাবুর বাজার, ইসলামপুর, চকবাজার, নবাবপুর, পাটুয়াটুলি, তাঁতিবাজার-- কত্ত পথ, ...কত্ত অলিগলি...’
কালের ধুলোয় লেখাতেও বলেছেন পুরনো ঢাকার অলিগলি আর বাড়িঘরের কথা। বলেছেন আলীজান বেপারীর কথা। কে এই আলীজান বেপারী? দেখতে ছোটখাট মানুষটি ছিলেন বিরাট ব্যবসায়ী। তার নাম স্মরণীয় হয়ে আছে সিতারা মসজিদের নিষ্ঠাবান সংস্কারক হিসাবে। দূর দেশ থেকে দামি পাথর আনিয়ে তিনি মসজিদটির শ্রীবৃদ্ধি করেছিলেন। সৌন্দর্যের দিক থেকে সিতারা মসজিদ ঢাকার মসজিদগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। কেউ যদি সেই মসজিদটি স্বচক্ষে না দেখে থাকেন তাহলে আলীজান বেপারীর কৃতিত্বের কথা কল্পনাও করতে পারবেন না। সেই আলীজান বেপারী যখন রাতে জুতার মচ্মচ্ শব্দ তুলে বাড়ি ফিরতেন কিশোর শামসুর রাহমান কানপেতে তার চলে যাওয়ার শব্দ শুনতেন। আলীজান বেপারীর জুতার মচ্মচ্ শব্দ যে শামসুর রাহমানের অবচেতন মনে প্রথম কবিতার ছন্দের জন্ম দেয়নি তা কে বলবে?
শামসুর রাহমানের আত্মজীবনী তাই এক অর্থে আলীজান বেপারীরও জীবনী। আলীজান বেপারীর মতো এমন অসংখ্য অচেনা নামকে শামসুর রাহমান তার রচনার মধ্য দিয়ে অমর করে দিয়েছেন। ঢাকার অসংখ্য অলিগলির কথা শামসুর রাহমান এমনভাবে লিখেছেন যে মনে হয় পথগুলোও বোধহয় মানুষ। পুরো ঢাকা শহরটাকেই তিনি এমনভাবে জীবন্ত করেছেন যে মনে হয় শামসুর রাহমানের কলম দিয়ে আসলে ঢাকা শহর নিজেই তার জীবনী লিখছে।
আলীজান বেপারীর মতো আরো অসংখ্য সাধারণ মানুষের কথা লিখেছেন শামসুর রাহমান তার আত্মজীবনীতে। লিখেছেন হার্নি সাহেবের কথা, পাঁচকড়ি মিয়ার কথা, অদ্ভুত এক তেলওয়ালী বুড়ির কথা। লিখেছেন ভিস্তিওয়ালার কথা, বাতিওয়ালার কথা। এ-দুটো শব্দ হয়তো এখন অনেকের কাছেই অপরিচিত। কিন্তু, একদিন ঢাকার বাড়িতে বাড়িতে মশকে করে পানি দিয়ে যেতেন যিনি তাকে বলা হতো ভিস্তিওয়ালা। আর সন্ধ্যায় গলির মোড়ে মোড়ে এসে বাতি জ্বেলে দিয়ে যেতেন বাতিওয়ালা। এঁরাই শামসুর রহমানের কিশোর কবিমানস তৈরি করেছেন। এক শিল্পীর কথা লিখেছেন পরম দরদ দিয়ে। “বাবুর বাজারের আরেকটি ছবির দোকানের কথা কোনওদিন ভুলতে পারব না। সে দোকানে প্রথম একজন শিল্পীকে দেখেছিলাম। শিল্পীর নাম নঈম মিঞা, খাস ঢাকার বাসিন্দা। না, তাঁর নাম চিত্রকলার ইতিহাসেও কোনও খাতার ফুটনোটেও পাওয়া যাবে না। তিনি তুলি দিয়ে কাঁচের উপর ছবি আঁকতেন, লিখতেন, ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’, ‘আজ নগদ কাল বাকি’, ‘বাকি চাহিয়া লজ্জা দিবেন না’, জাতীয় কিছু কথা। ’
নঈম মিঞার শিল্পের প্রেমে পড়ে কিশোর শামসুর রাহমান প্রায়ই যেতেন তার দোকানে। বসে বসে দেখতেন শিল্পীর হাতের কাজ। নঈম মিয়া এক সময় তাকে তালিম দিতে শুরু করেন। কিন্তু, একদিন বারণ করে দেন এখানে আসতে। কারণ, নঈম মিঞা চাননি তার মতো করুণ জীবন এই ছেলেটির হোক।
তৎকালীন এমন কোনো কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী নেই যাদের নাম শামসুর রাহমানের কলমে উঠে আসেনি। শুধু নাম নয়, অনেক সময় অনেক বন্ধুর জীবনীই তিনি লিখেছেন পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা জুড়ে। কালের ধুলোয় যখন লিখছেন তখন নাকি অনেকে তাকে জিজ্ঞেস করেছেন, আপনি কি আপনার জীবনী লিখছেন নাকি আপনার বন্ধুদের জীবনী? শামসুর রাহমান নাকি হেসে উত্তর দিতেন, ‘আমার বন্ধুদের জীবনই তো আমার জীবন। তাদের জীবন বাদ দিয়ে আমার জীবনের আর কী থাকে?’
আসলে এ-কারণেই আমার এই লেখাটা লিখতে বসা। উপরের অংশটুকু কেবল ভূমিকা। অনেকে অনেক সময় বলে এ-বইটি অবশ্য-পাঠ্য। শুধু কবি-সাহিত্যিকদের জন্য নয়, আমি মনে করি শামসুর রাহমানের এ-আত্মজীবনী সমস্ত শিক্ষিত মানুষেরই পাঠ্য হওয়া উচিত। কারণ, তার কলমে যে-ইতিহাস উঠে এসেছে সেটি আমাদের আধুনিক মনস্ক সংস্কৃতিবান, শিল্পীমনা জাতি হয়ে ওঠার ইতিহাস।
ধারাবাহিকভাবে বিস্তৃতভাবে লিখতে হলে আমাকে হয়তো কমপক্ষে বিশ পৃষ্ঠা লিখতে হবে। কিন্তু, তা তো আর সম্ভব নয়। যারা বইটি এখনো পড়েননি তাদের আগ্রহ বাড়ানোর জন্য আমি শুধু কিছু চৌম্বক অংশই তুলে ধরছি।
ছেলেবেলার স্কুলজীবনের বন্ধুদের কথা লিখতে গিয়ে শামসুর রাহমান লিখেছেন, ‘স্কুলের মোট আটশ ছাত্রের মধ্যে মুসলমান ছাত্র দশজনের বেশির ছিল না।’ তাদের অনেককে তিনি হারিয়েছেন ছেলেবেলাতেই, বাকিদের দেশভাগের পর। পরবর্তীতে কলেজে উঠে পরিচয় হয় জিল্লুর রহমানের সঙ্গে। যিনি পরে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতা ও রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। তিনি নিজ থেকে এসেই শামসুর রাহমানের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন, এবং আচমকা প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনি কি লিখেন?’ শামসুর রাহমান অবাক হয়ে বললেন, ‘না তো’। জিল্লুর রহমান শামসুর রাহমানের পাশে বসে বললেন, ‘আপনাকে দেখে কিন্তু মনে হয় যে, আপনি লেখালেখি করেন। লিখেন না কেন?’ জিল্লুর রহমান শামসুর রাহমানকে নিজের মেসে নিয়ে গেলেন। তারপর থেকেই লেখালেখির বিষয়টা শামসুর রাহমানের মাথায় ঘুরতে থাকে। এর আগে কখনো তিনি লেখালেখির কথা ভাবেননি।
না লেখার কথা ভাবলেও ছোটবেলা থেকেই তিনি পড়তেন প্রচুর। আর ভালাবাসতেন লেখকদের। ঢাকা কলেজে পড়ার সময় কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন হারামনির সংকলক মুহম্মদ মনসুর উদ্দীনকে। তার স্নেহও পেয়েছেন। পরবর্তীতে শামসুর রাহমানের কবিতা পড়ে মুগ্ধ হয়ে মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন শামসুর রাহমানকে একটি গোলাপ উপহার দিয়ে বলেছিলেন, ‘যদি আমার টাকা থাকত তাহলে তোমাকে অনেক বড় রকমের পুরস্কার দিতাম’। শামসুর রাহমান লিখেছেন, ‘তিনি যখন সস্নেহে একটি রক্ত গোলাপ আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন, তখন আমি কোনও পুরস্কারই পাই নি। পরবর্তী জীবনে আমি বহু পুরস্কার পেয়েছি। সে সব পুরস্কারের সবগুলোর কথা আমার মনেও পড়ে না, অথচ ‘হারামনি’ গ্রন্থের প্রণেতা প্রদত্ত গোলাাপটির কথা কস্মিনকালেও ভুলব না।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠেও শামসুর রাহমান লেখালেখি শুরু করেননি। এর মধ্যে তারা মাহুৎটুলি ছেড়ে সৈয়দ আওলাদ হোসেন লেনে একটি পুরনো বাড়িতে চলে এসেছেন। দিন কেটে যাচ্ছে বন্ধুবান্ধবহীন একা। একদিন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। বিকেলবেলা তিনি বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। সমবয়সী এক তরুণ তার দিকে এগিয়ে এলেন। মাথায় ছোট চুল, মুখে বসন্তের দাগ, চোখ দুটো বুদ্ধিদীপ্ত। ছেলেটি নিজের পরিচয় দিয়ে অনেকটা জোর করে ধরেই শামসুর রাহমানকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেল। এই তরুণের নাম হামিদুর রহমান। পরবর্তীতে যিনি চিত্রশিল্পী হিসেবে বিখ্যাত হয়েছেন এবং শহীদ মিনারের নকশা করেছেন। তার অগ্রজ নাসির আহমেদ, নাজির আহমেদ এবং অনুজ সাঈদ আহমেদ স্বনামে আজ খ্যাত। তাদের ১৭ নম্বর আশেক লেনের বাড়িতে তখন নিয়মিত আড্ডা বসত। এখানে এসেই শামসুর রাহমান দেখা পান অনেক গুণিজনের। তাদের মধ্যে চিত্রকর এসএম সুলতান, সঙ্গীতশিল্পী আবদুল আহাদ, অভিনেতা ফতেহ লোহানী অন্যতম। আরো আসতেন সে-সময়ের উদীয়মান সমস্ত কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীরাই। যেমন, মোশাররফ হোসেন চৌধুরী, হাসান হাফিজুর রহমান, আলউদ্দিন আল আজাদ, চিত্রকর আমিনুল ইসলাম, মর্তুজা বশীর, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর। মোটামুটি শিল্প-সাহিত্যজগতের সোনালী দুয়াল খুলে যায় শামসুর রাহমানের চোখের সামনে। শুধু তাই নয় হামিদুর রহমান সব সময় শামসুর রাহমানকে লিখতে উৎসাহিত করতেন। হামিদুর রহমানের উৎসাহেই ১৯৪৯ সালের ১ জানুয়ারি সে-সময়ের জনপ্রিয় সাহিত্যপত্রিকা ‘সোনার বাংলা’-য় শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। শামসুর রাহমানের লেখালেখির পেছনে হামিদুর রহমানের উৎসাহ-অনুপ্রেরণা তুলনাহীন। অনেক পরে শামসুর রাহমান হামিদুর রহমানকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘সেদিন তুমি আমাকে এভাবে ডেকে নিয়ে এসেছিলে কেন? আমাকে তো চিনতে না তুমি?’ হামিদুর রহমান যে উত্তর দিয়েছিলেন তার সারকথা হলো, শামসুর রাহমানকে দেখেই নাকি তার মনে হয়েছিল তিনি লেখক। মহল্লায় আগন্তুক অন্য ছেলেদের চেয়ে তিনি নাকি আলাদা ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে শামুস রাহমানের পরিচয় হয় কবি জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর সঙ্গে। জিল্লুর রহমানের হাতেই শামসুর রাহমান প্রথম দেখেন জীবনানন্দ দাশের ধূসর পাণ্ডুলিপি বইটি। একরাতের জন্য বইটি ধার চেয়ে এনে সারারাত ধরে পড়ে সারাজীবনের জন্য তিনি জীবনানন্দ দাশের ভক্ত হয়ে গেলেন। পরবর্তীতে, অনেক বছর পরে জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে তার সরাসরি সাক্ষাতও হয়েছিল। ধূসর পাণ্ডুলিপি পাঠের আশ্চর্য অভিজ্ঞতার কথা তিনি কবিকে জানিয়েছিলেন।
অধ্যাপক খান সরওয়ার মুরশিদকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন শামসুর রাহমান। আত্মজীবনীতে দু-পৃষ্ঠা জুড়ে তার কথা লিখেছেন, মুগ্ধচিত্তে স্মরণ করেছেন বাংলাসাহিত্যে তার অবদানের কথা। আর শ্রদ্ধাভরে লিখেছেন অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার কথা। অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে লিখেছেন ফতেহ লোহানীর কথা। এ-প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘আজকের অনেক তরুণ লেখক তাদের নানাবিধ কীর্তির জন্যে গর্ববোধ করেন এবং প্রচারও করেন। এটা অন্যায় কিছু নয়। তবে বিস্মৃত হলে চলবে না যে, আজকের ভিত্তি গড়ে তুলেছেন তাদের অগ্রজ লেখকরা’।
এক সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা ছেড়ে দেন। পড়াশোনা ছেড়ে দিলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাড়তে পারেন না বন্ধুদের কারণে। বন্ধু বদরুউদ্দীন উমরের কথা এমন শ্রদ্ধাভরে লিখেছেন যে পড়ে মনে হয় কোনো তরুণ ভক্ত বোধহয় বয়জেষ্ঠ্য নেতার প্রশংসা করছেন। আসলে শামসুর রাহমান এমনই নিরহঙ্কারী যে বন্ধুর সাফল্যে কখনো ঈর্ষাবোধ করেননি। জীবনসংগ্রামে যখন তিনি একেবারেই বিপর্যস্ত তখন দেখছেন কাছের বন্ধুরা একেকজন সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে উপরে উঠে যাচ্ছে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, কেউ বড় সরকারি চাকরি করছেন, কেউ বড় নেতা হয়ে গেছেন; তা দেখেও তিনি প্রশংসায় পঞ্চমুখ, বন্ধুর সাফল্যে গর্ববোধ করেছেন।
শামসুর রাহমানের জীবনের একটি বাঁকবদল বা স্বপ্নের মতো ঘটনা বুদ্ধদেব বসুর সুদৃষ্টি লাভ। ১৯৫৩ সাল থেকেই বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় নিয়মিত তার কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে।
১৯৫২ সালের রাষ্ট্র-ভাষা আন্দোলনের পর থেকেই পূব-পাকিস্তানের রাজনৈতিক পটভূমি দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে। বছর বছর নতুন নতুন ঘটনার জন্ম হয়। কোনো রাজনৈতিক দলে নাম না লেখালেও শামসুর রাহমান সব সময় প্রগতির পথে, অসাম্প্রদায়িকতার পথে অটল থেকেছেন। ’৫৪ সালের নির্বাচনের কথা লিখেছেন সবিস্তারে। ’৬৯’র গণঅভ্যুত্থানের কথা উঠে এসেছে রক্তের অক্ষরে। ‘আসাদের শার্ট’ কবিতা লেখার যে-মর্মস্পর্শী বর্ণনা দিয়েছেন তাও একটি অনন্য কবিতার মতোই।
লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধের কথা, মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজের অসহায়ত্বের কথা। অদ্ভুত আঁধার এক নামে এক উপন্যাসেও সেই অসহায়বোধের কথা তিনি জানিয়েছেন।
আত্মজীবনীর শেষ দিকে শামসুর রাহমান কিছু রোজনামচা যুক্ত করেছেন। তখন এরশাদ-বিরোধী আন্দোলন চলছে। ১৯৮৭ সালের কথা। আত্মজীবনীটা তিনি কোথায় শেষ করবেন বুঝতে পারছিলেন না। তাই দৈনন্দিন জীবনের টুকিটাকি লিখে রাখছিলেন। তাতেও সমকালীন রাজনীতি, শিল্প-সংস্কৃতি ও শিল্পীদের কথাই আসছিল ঘুরেফিরে। আরো পরে বিরতি দিয়ে দিয়ে ১৯৯৬, ১৯৯৭ এবং ২০০২ সালের কিছু রোজনামচাও যুক্ত করেছেন।
শেষ পর্যন্ত এই খেদ নিয়েই তিনি কালের ধুলোয় লেখা শেষ করেন যে, যা লিখতে চেয়েছিলেন তা লিখতে পারেন নাই।
আমিও এই খেদ নিয়েই লেখাটা এখানেই শেষ করে দিলাম। শুধু শেষ একটা কথা বলে রাখি, শামসুর রাহমানের আত্মজীবনী মূলত বাংলাদেশ হয়ে ওঠার জীবনী!