০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

গোলাম মুরশিদের ধারাবাহিক রচনা: কবিগান

গোলাম মুরশিদ

Published : 18 Sep 2020, 02:17 PM

Updated : 23 Jun 2022, 03:58 PM


পাঁচালি গানকে আরও আকর্ষণীয় করতে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছিলো কবিগান। তবে, ঠিক কবে—তা জানা যায় না। মনে হয়, ১৭০০ সালের প্রথম দিকে। তখন গোঁজলা গুঁই নামে একজন গায়ক ছিলেন। তিনি খুব সম্ভব পাঁচালি গান গাইতেন। সেই গান গাইতে গাইতে তাঁর মাথায় একটা ধারণা এলো—পাঁচালি গানের মধ্যে যদি একটা প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা যায়, অর্থাৎ একটা দল না-গেয়ে যদি দু দলে বিভক্ত হয়ে পাঁচালি গান পরিবেশন করে, তা হলে শ্রোতারা বাড়তি মজা পাবে। বাড়তি উত্তেজনা সৃষ্টি হবে।

গোঁজলা গুঁইয়ের দুতিন জন শিষ্য ছিলেন। তিনি যত্ন করে তাঁদের শিখিয়ে দিলেন কী করে এই প্রতিযোগিতা করা যায়। সেই থেকে শুরু হয়ে গেলো কবির লড়াই। এই গানে এক পক্ষ তার গান পরিবেশন করার পর দ্বিতীয় পক্ষ তার গান পরিবেশন করে। প্রথম দিকে কবিগান পরিবেশনের পদ্ধতি এ রকম সরল সহজ ছিলো বলে ধরে নেওয়া যায়। তারপর তিন শো বছর ধরে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কবিগান এখনকার চেহারা পেয়েছে।

এই তিন শো বছরে এর বিষয়বস্তুতে পরিবর্তন এসেছে; পরিবেশন-পদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে; রুচিতে পরিবর্তন এসেছে, কখনো এ গান অশ্লীলতায় মলিন হয়েছে, কখনো আবার অশ্লীলতা থেকে কমবেশি মুক্ত হয়েছে। বৈচিত্র্য আনার জন্যে এর আঙ্গিকে নতুন নতুন নাম যুক্ত হয়েছে, কখনো নাম বাদও পড়েছে। যেমন, ১৮৫০-এর দশকের প্রথম দিকে সম্বাদ প্রভাকর পত্রিকায় কবিগান নিয়ে একটি ধারাবাহিক রচনা প্রকাশিত হয়। এই লেখায় সম্পাদক ঈশ্বর গুপ্ত কবিগানের তিনটি মাত্র স্তবক খুঁজে পেয়েছিলেন—মহড়া, চিতেন আর অন্তরা। কিন্তু স্বরোচিষ সরকার কবিগান সম্পর্কিত তাঁর সাম্প্রতিক গ্রন্থে এতোগুলো তুকের কথা লিখেছেন যে, তাঁকে সেগুলো তালিকা করে দেখাতে হয়েছে—মহড়া, ডাক, চিতান, পাড়ন, প্রথম ফুকার, মিশ, মুখ, অন্তরা, প্যাঁচ, খোচ, দ্বিতীয় ফুকার, পরচিতান ইত্যাদি।

প্রথম যখন কবিগান আসরে নেমেছিলো, তখন এর বিষয়বস্তু ছিলো সেই পুরোনো রাধাকৃষ্ণের প্রেমের কাহিনী। ফলে 'কানু ছাড়া গীত নাই' কথাটা আরও একবার প্রমাণিত হয়েছিলো। কিন্তু আঠারো শতকে যখন শাক্তধর্মের উত্থান ঘটলো, তখন সখীসংবাদের সঙ্গে যুক্ত হলো ভবানী-বন্দনা। তাতে কেবল কালী থাকলেন না, দুর্গাও থাকলেন। থাকলেন বললে যথেষ্ট বলা হয় না, থাকলেন দাপটের সঙ্গে, মঞ্চের অনেকটা জুড়ে। তারপর থাকলো রাধাকৃষ্ণের মিলন-বিরহ, মান-অভিমান, প্রতীক্ষা-বিচ্ছেদের কাহিনী। সেই সঙ্গে উনিশ শতকে কবিগানে যুক্ত হলো খেউড় এবং হাফ-খেউড় গান। রাধাকৃষ্ণের কাহিনী এবং খেউড় গানের উদ্দেশ্য ছিলো স্থূল রসিকতার মাধ্যমে শ্রোতাদের যৌনতার খানিকটা স্বাদ দেওয়া। সুশীলকুমার দের মতে ১৭৬০ থেকে ১৮৩০ পর্যন্ত ছিলো কবিগানের রবরবা সময়। কিন্তু তখন দেবদেবী ছাড়া কবিগানে অন্য কারও কল্কে জুটতো না। এই সময়ে যাঁরা কবিগানের আসর আলোকিত করেছিলেন, আড়াই শো বছর পরে তাঁদের অনেকের নাম আজও টিকে আছে।

কবিগান এক সময়ে দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিলো। এমন যে, একমাত্র বর্ধমান জেলাতেই নাকি শ তিনেক কবিয়াল ছিলেন। কিন্তু সব কবিয়ালই সত্যিকার কবি ছিলেন না। ফলে বহু যুগের ওপার হতে সময়ের ধারা বেয়ে যাঁদের নাম এখনো বহমান, তাঁদের মধ্যে আছেন হরুঠাকুর, ভোলা ময়রা, অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, রঘুনাথ দাস, লক্ষ্মীকান্ত বিশ্বাস, রাসু-নৃসিংহ, নীলুঠাকুর, রাম বসু, নিত্যানন্দ ওরফে নিতাই বৈরাগী, ভবানী বণিক ওরফে ভবানে বেনে প্রমুখ।

এঁদের অনেকেরই জন্মমৃত্যুর তারিখ সঠিকভাবে জানা যায় না। যেমন, ভবানী বণিকের জন্ম-সাল কেউ দাবি করেছেন ১৭৩৮, কেউ বলেছেন ১৭৪৯। নানাজনের রচনা থেকে তাঁর মৃত্যু-সাল জানা যাচ্ছে চারটা—১৮১৩, ১৮১৪, ১৮২৪ ও ১৮৩৭। সবই শোনা কথা, সবই আনুমানিক। তার চেয়ে বরং পরম্পরা দিয়ে এঁদের জীবৎকালের চৌহদ্দিটা মোটামুটি বোঝা যায়। যেমন, গোঁজলা গুঁইয়ের জন্ম ১৭০০ সালের দিকে। তাঁর শিষ্য ছিলেন রঘুনাথ দাস। রঘুনাথ দাসের শিষ্য হরুঠাকুর। হরুঠাকুরের শিষ্য ছিলেন ভবানে বেনে, নীলু ঠাকুর এবং ভোলা ময়রা। এঁরা তিনজন হরুঠাকুরের দোহারও ছিলেন এক সময়ে। ভবানে বেনে, নীলু ঠাকুর এবং ভোলা ময়রা যখন নিজের নিজের দল গঠন করলেন, হরুঠাকুর তখন আবার তাঁদের গান লিখে দিতেন, সুরও দিতেন তাঁদের গানে। কখনো তিনি (হরুঠাকুর) প্রতিপক্ষ হয়ে তাঁদের সঙ্গে কবির লড়াইও করতেন। তিনি জীবনের শেষ ভাগে শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণ দেবের সভাসদ হয়েছিলেন।

ঈশ্বর গুপ্ত এঁদের কবি বলেননি, বলেছেন কবিওয়ালা। কবি অথবা কবিওয়ালা—যা-ই তিনি বলে থাকুন, এঁদের কারও কারও যে কবিত্ব-প্রতিভা ছিলো, সে সম্পর্কে তাঁর সন্দেহ ছিলো না। তিনি তাঁদের রচনা সংগ্রহ করে পত্রিকায় প্রকাশ করেছিলেন। তার মধ্য থেকে হরুঠাকুরের লেখা গানের একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক
চিতেন
হায়, কি পুরুষ নারী, করে ঠারাঠারি, যখন তারা দেখে আমায়।
ভাবি কোথা যাব, লাজে মরে যাই, বিদরে ধরণী যাই তায়।
অন্তরা
হায় হৃদয় মাঝারে লুকায়ে, সদা রাখি প্রেম রতনে।
কি জানি কেমনে সখা তথাপি লোকে জানে।
চিতেন
হায় পীরিতের কিবা সৌরভ আছে, সে সৌরভে মম অঙ্গে বয়।
কলঙ্ক পবনে লইয়ে সে বাসে, ব্যাপিলো জগতোময়।

ঈশ্বর গুপ্ত আলাদা করে এই গানটির প্রশংসা করেছেন। তাৎক্ষণিকভাবে কবিতা অথবা ছড়া রচনা করে প্রতিপক্ষের যুক্তি খণ্ডন করা সহজ কাজ নয়। কবিয়ালরা কেবল কবিতার ভাষায় প্রতিপক্ষের জবাব দিতেন না, সেই কবিতায় তাঁরা আবার সঙ্গে সঙ্গে সুর দিতেন। বস্তুত, কবিওয়ালাকে একই সঙ্গে হতে হতো কবি এবং সুরকার/গায়ক।
ঈশ্বর গুপ্ত মাত্র কয়েকজন কবিওয়ালার রচনা প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু তাঁদের বাইরে নাম-করা কবিওয়ালা ছিলেন অনেকে—বিশেষ করে ভোলা ময়রা আর অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির কথা প্রায় কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছে। অ্যান্টনি ফিরিঙ্গিকে নিয়ে দু দুটো জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তৈরি হওয়ায় তাঁর কথা প্রায় সবারই জানা। তাঁর নাম টিকে থাকার একটা কারণ তিনি বাঙালি ছিলেন না, ছিলেন পর্তুগীজ। তা সত্ত্বেও তিনি বাঙালির কবিগান গেয়ে সফল হয়েছিলেন। এই জন্যে তাঁর খ্যাতি। ভোলা ময়রাকে নিয়েও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিলো। তবে দুটি নয়, একটি।

ভোলা ময়রার আসল নাম ছিলো ভোলানাথ মোদক। তাঁর সত্যি সত্যি মিষ্টির দোকান ছিলো, পিতারও মিষ্টির দোকান ছিলো। এমন কি, তাঁর জামাইয়েরও ছিলো। এই জামাই নাকি রসগোল্লা আবিষ্কার করেছিলেন। ভোলানাথের লেখাপড়া ছিলো সামান্যই। প্রাথমিক স্কুলে গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিভা ছিলো বলে খানিকটা সংস্কৃত, ফারসি এবং ইংরেজি শিখেছিলেন। আর শিখেছিলেন পুরাণ অর্থাৎ রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদির কাহিনী। তা ছাড়া, উপস্থিত বুদ্ধি এবং রসিকতা করার ক্ষমতার জন্যে তিনি পরিচিত ছিলেন।

শুধু ভোলা ময়রা নন, আমরা যে-কবিয়ালদের কথা বলছি, তাঁদের সবারই আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছিলো সামান্যই। নিত্যানন্দ বৈরাগী (১৭৫১-১৮২১) প্রথম জীবনে ভিক্ষা করে জীবিকা উপার্জন করতেন। পরে কবিয়াল হয়ে তিনি ধনী হন। চন্দননগরে তিনি একটি মন্দির নির্মাণ করে দিয়েছিলেন।

সত্যিকার অর্থে কবি না-বলে এঁদের বলা যেতে পারে লোক-কবি। এঁরা জন্মেছিলেন সমাজের নীচের তলায়। এবং তাঁদের কবিতা, গান ও ছড়া দিয়ে তাঁরা প্রধানত সেই তলার লোকেদেরই আনন্দ দিতেন। সে সমাজও তাঁদের দু হাত বাড়িয়ে গ্রহণ করতো। কিন্তু বেশির ভাগ পেশার লোকেদের বেলায় এ কথা প্রযোজ্য নয়। বৃহত্তর সমাজের চোখে তাঁরা ছিলেন অছ্যুৎ। তবে জাতিভেদের দেয়াল পেরিয়ে কবিয়ালের পেশায় ঢোকা যেতো। রবীন্দ্রনাথও তাঁদের গ্রহণ করতে পারেননি। তবে অন্য কারণে। গানের মানের জন্যে তিনি কবিগানের প্রশংসা করতে পারেননি।


বিশ শতকের নাম-করা কবিয়াল রমেশ শীলও লেখাপড়া করার তেমন সুযোগ পাননি। প্রাইমারিতে পড়ার সময়ে তিনি পিতাকে হারান। তার ফলে সমস্ত সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর ওপর। অতঃপর তাঁকে নাপিতের কাজ করে সংসার চালাতে হতো। কিন্তু নিজের অবস্থার উন্নতি করার জন্যে তিনি উদ্যোগী ছিলেন। এমন কি, এর জন্যে তিনি মিয়ানমারে গিয়ে প্রায় পাঁচ বছর সেখানে দোকানে কাজ করেছিলেন। তাঁর বয়স যখন বছর বিশেক, তখন তিনি কবিগানের এক আসরে গিয়ে দৈবক্রমে সারা জীবনের জন্যে কবিগানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। কবিগানের সেই আসরে এক পক্ষের কবিয়াল অসুস্থ হয়ে পড়লে সবাই মিলে তাঁকে মঞ্চে তুলে দেন। সেই থেকে তাঁর ভাগ্য জড়িয়ে যায় কবিয়ালের সঙ্গে।
আগেই বলেছি, গোড়াতে কবিগানের বিষয়বস্তু ছিলো দেবদেবীদের কাহিনী। কিন্তু উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে দেবদেবীদের আশেপাশে দু-একজন রক্তমাংসের মানুষও দেখা দেয়। রামকৃষ্ণ পরমহংস আর বিবেকানন্দ তো এলেনই, বিধর্মী বুদ্ধদেবও এলেন, এমন কি, কোথা থেকে এসে দেখা দিলেন খ্রিস্টান মাইকেল মধুসূদন। আর এলো সমসাময়িক ঘটনাবলী, বিশেষ করে সমাজ-সংস্কার সম্পর্কিত বিষয়—সতীদাহ, বিধবাবিবাহের পক্ষ-বিপক্ষ, বহুবিবাহের ভালোমন্দ, স্ত্রীশিক্ষার দোষগুণ ইত্যাদি। এমন কি, নীলকর-বিরোধী আন্দোলনও। এখানেই শেষ হলো না। বিংশ শতাব্দীতে আরও নতুন নতুন বিষয় জায়গা করে নিলো কবিগানে, বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ।

রমেশ শীল এ ব্যাপারে একটা বড়ো ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি নিজে ছিলেন রাজনীতি দিয়ে প্রবলভাবে প্রভাবিত। সেও সাধারণ রাজনীতি নয়, বামপন্থী রাজনীতি দিয়ে। যখন কমিউনিস্ট হওয়াকে লোকে অপরাধ বলে গণ্য করতো—সেই আমলে—১৯৪৪ সালে তিনি কমিউনিস্ট দলের সদস্য পদ লাভ করেন। প্রগতিশীল মানুষ হিসেবে তিনি অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম হয়েছিলেন।

দেশবিভাগের পর তিনি ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তারপর ১৯৫৪ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভা ভেঙে দিলে তিনি জেলে আটক থাকেন। তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ, ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী আন্দোলন, দেশবিভাগ, উদ্বাস্তু সমস্যা, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি নিয়েও তিনি গান এবং কবিতা রচনা করেছিলেন। ইসলামী সুফি-ভাবাপন্ন চিন্তা দিয়ে তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং মাইজভাণ্ডারী মতে বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। এই মতাদর্শ সম্পর্কে তিনি বেশ কয়েকটি পুস্তিকা রচনা করেন। মোট কথা, তিনি অনেকগুলো বই লিখেছিলেন। তাঁর আগে কোনো কবিয়াল বই লিখেছিলেন কিনা, সন্দেহ করি—এতোগুলো বই লেখা তে দূরের কথা। রমেশ শীল কবিয়াল ছিলেন বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে তাঁর আর-এক পরিচয়—তিনি ছিলেন সংগ্রামী মানুষ। তাঁদের অধিকার রক্ষার উদ্দেশে তিনি কবিয়ালদের নিয়ে একটি সমিতিও গঠন করেছিলেন। বস্তুত, মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী।

বিশ শতকে রমেশ শীল কবিগানের নতুন দিগন্ত দেখিয়েছিলেন। কিন্তু উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে কবিগান তার বিচরণ-ভূমি কলকাতা এবং তার আশেপাশের এলাকা থেকে বিদায় নিয়েছিলো। তারপর এ গান টিকে থাকে পূর্ববঙ্গে, বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের মফস্বলে। আসলে কবিগানের সময় চলে গিয়েছিলো।