Published : 09 Feb 2026, 12:35 AM
নির্বাচনি প্রচারে সব প্রার্থীই কোনো না কোনোভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ- টিআইবি।
দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি বলছে, আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়গুলো দেখলেও ‘সক্ষমতার ঘাটতি থাকায়’ নির্বাচন কমিশন বিষয়গুলো ‘এড়িয়ে যাচ্ছে’।
‘গণভোট ও প্রাক-নির্বাচন পরিস্থিতি: টিআইবির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ‘নির্লিপ্ত ভূমিকা’ নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি নির্বাচনে ‘অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি’ নিয়ে সতর্কবার্তা এসেছে।
টিআইবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটির একাংশ উপস্থাপন করেন সংস্থার সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. মাহ্ফুজুল হক। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সেখানে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, “শুরুতে সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচনি কার্যক্রমের পুরাতন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বজায় রেখেছেন। ফলে নির্বাচনে দল ও জোটের মধ্যে সংঘাত, আন্তঃদলীয় কোন্দল, ক্ষমতার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং সহিংসতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।”
টিআইবির পর্যবেক্ষণ বলছে, “নির্বাচনি সহিংসতার পাশাপাশি পতিত কর্তৃত্ববাদী শক্তির ঘোষিত নির্বাচনবিরোধী তৎপরতার ফলে অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি রয়েছে। আগের মতোই রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা নির্বাচনে অর্থ, ধর্ম ও পেশী, পুরুষতান্ত্রিক ও সংখ্যাগরিষ্ঠতন্ত্র শক্তির ব্যবহার শুধু অব্যাহতই রাখেননি, বরং অর্থ ও ধর্মের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
“নির্বাচনি আচরণবিধি ভেঙে রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচার অব্যাহত ছিলো, যা নির্বাচন কমিশনের কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি তুলে ধরেছে।”
জুলাই সনদে ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের অঙ্গীকারের পরও বাস্তবে দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে নারীদের যে ‘উপেক্ষা’ করা হয়েছে, সে বিষয়টিও প্রতিবেদনে এসেছে।
এছাড়া তফসিল ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থী হত্যার শিকার হওয়া, দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক কর্মী এবং প্রতিপক্ষের উপর হামলা, গুলিবর্ষণ, হত্যাকাণ্ড অব্যাহত থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘নির্লিপ্ততা’ ও তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে বলে টিআইবি মনে করছে।
“তাছাড়া, নির্বাচন কমিশনের অব্যবস্থাপনার কারণে কমিশনের ওয়েবসাইটে নিবন্ধনের জন্য আবেদনকারী ১৪ হাজার গণমাধ্যমকর্মীর ব্যক্তিগত তথ্য কিছু সময়ের জন্য ফাঁস হয়, যার ফলে গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা এবং সুরক্ষার জন্য হুমকি সৃষ্টি হয়েছে।”
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “সকল প্রার্থী কর্তৃক কোনো না কোনো নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া নির্বাচনি প্রচারণাকে কেন্দ্র করে একটি আসনে দুই দলের সংঘর্ষে একজনের প্রাণহানি এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।”
টিআইবির পর্যবেক্ষণ বলছে, সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বরিশাল বিভাগে; সর্বনিম্ন সিলেটে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “অনলাইন ও অফলাইন প্রচরসহ নির্বাচনের প্রায় প্রতিটি স্তরে দল এবং প্রার্থীরা আচরণবিধির ব্যাপক লঙ্ঘনসহ বিবিধ অনিয়ম করলেও নির্বাচন কমিশন সক্ষমতার ঘাটতির কারণে এড়িয়ে যাচ্ছে।
“ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম–যেমন মেটা বা গুগল এর মত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে পর্যাপ্ত সমন্বয় হয়নি। প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রার্থীরা প্রচার চালালেও সেই বিতর্কিত কন্টেন্টগুলো সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে না, কারণ এখানে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত।”
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থান প্রদত্ত ম্যান্ডেট অনুযায়ী জুলাই সনদের ওপর গণভোটে ‘হ্যাঁ’ রায় অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন সরকারের দায়িত্ব। এ ভূমিকা পালনে নির্বাচন কমিশন একমত না হওয়ার কোনো আইনগত বা যৌক্তিক ভিত্তি ছিলো না।
“তবে তফসিল ঘোষণার পর থেকে যেহেতু সরকারি কর্মচারীরা আইনত নির্বাচন কমিশনের কর্তৃত্বাধীন, কর্মচারীদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালানোর নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি যৌক্তিক হওয়া সত্ত্বেও সরকার নির্দেশনা দেওয়ার আগে নির্বাচন কমিশনের সম্মতি না নিয়ে কমিশনের এখতিয়ারে অহেতুক হস্তক্ষেপ করেছে।
“সার্বিকভাবে সরকার ও নির্বাচন কমিশন ঐতিহাসিক গণভোট আয়োজনে নিজেদের প্রত্যাশিত ভূমিকা সুষ্ঠু ও সুচারুভাবে পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।”
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে টিআইবির অবস্থান ঘোষণা করেন।