Published : 30 Jan 2026, 11:54 PM
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের দিন যতই এগিয়ে আসছে ভোটারদের মনোভাব ততই স্পষ্ট হচ্ছে, যেখানে তারা বিএনপিকে এগিয়ে রাখছে বলে ইনোভিশন কনসাল্টিং নামের একটি বেসরকারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জরিপে বলা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ‘জনগণের নির্বাচনি ভাবনা’ শীর্ষক জরিপের তৃতীয় রাউন্ডের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বিএনপিকে পরবর্তী সরকার গঠনের জন্য উপযুক্ত দল মনে করেন ৫২ শতাংশ উত্তরদাতা।
আর জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ মনে করেন তারেক রহমান পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন।
শুক্রবার ঢাকার কাওরান বাজারের বিডিবিএল ভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে জরিপের ফলাফল প্রকাশ করেন ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবাইয়াৎ সারওয়ার।
বিআরএআইএন ও ভয়েস ফর রিফর্ম নামের দুটি নাগরিক প্ল্যাটফর্মের সহযোগিতায় ৫১৪৭ জন অংশগ্রহণকারীর টেলিফোন সাক্ষাতকারের ভিত্তিতে জরিপটি করা হয়েছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে ইনোভিশন কনসাল্টিং এর ‘পিপলস ইলেকশন পালস সার্ভের’ বা ‘জনগণের নির্বাচনি ভাবনা’ শীর্ষক এই জরিপের তৃতীয় রাউন্ড পরিচালিত হয় ১৬ থেকে ২৭ জানুয়ারির মধ্যে।
তৃতীয় রাউন্ডের জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা এর আগে প্রথম ও দ্বিতীয় রাউন্ডেও অংশ নিয়েছিলেন।
জরিপে অংশ নেওয়া উত্তরদাতাদের ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ মনে করে বিএনপি ও তাদের জোট সরকার গঠনের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা পছন্দ করেছেন জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটকে।
আর উত্তরদাতাদের ২২ দশমিক ৫ শতাংশ জামায়াতের শফিকুর রহমানকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখছেন। এনসিপির নাহিদ ইসলামকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পছন্দ করেছেন উত্তরদাতাদের ২ দশমিক ৭ শতাংশ।
জরিপে মন্তব্য করা হয়েছে, “জামায়াতের ভোটারদের মধ্যে অস্থিরতা তুলনামূলকভাবে বেশি, যা দলের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। বিপরীতে, বিএনপির ভোটাররা তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল। জামায়াত থেকে বিএনপির দিকে উল্লেখযোগ্য সমর্থন স্থানান্তর লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে, নির্বাচনের সময় এই প্রবণতায় আবারও পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
“জামায়াতে ইসলামী সরাসরি ২২৪টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। জরিপের ফলাফল থেকে দেখা যায়, ভোটাররা বিএনপি প্রার্থীদের তুলনায় জামায়াত প্রার্থীদের সম্পর্কে কম সচেতন। এটি সম্ভবত বিএনপির তুলনায় জামায়াতের প্রার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ার প্রতিফলন।”
৩০ শতাংশ ‘ভাসমান’ ভোটারের ওপর পরবর্তী নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করছে তুলে ধরে জরিপে বলা হয়েছে, “মোট নমুনার প্রায় ৩০ শতাংশ কোনো রাউন্ডেই ভোটের পছন্দ প্রকাশ করেনি। এই ৩০ শতাংশ ভোটার কাকে ভোট দেবেন তার উপর চূড়ান্ত ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে।”

জরিপে বলা হয়েছে, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রভাব জরিপে তুলনামূলকভাবে কম প্রতিফলিত হয়েছে, কারণ শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিভিন্ন আসনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন।
গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দ্বিতীয় রাউন্ডের জরিপ চালানো হয়, তাতে অংশ নেন ১০ হাজার ৪১৩ জন ভোটার। দেশের ৬৪ জেলার ৫২১টি ওয়ার্ডে এ জরিপ পরিচালনা করে ইনোভিশন কনসাল্টিং।
তখন ইনোভিশন কনসাল্টিং এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবাইয়াৎ সাওয়ার বলেছিলেন, মোট ১০ হাজার ৪১৩ জন ভোটার সেপ্টেম্বরের 'জনগণের নির্বাচন ভাবনা' জরিপে অংশগ্রহণ করলেও তাদের মধ্যে ৫ হাজার ৬৭৩ জন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে কাকে ভোট দেবেন সে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং তা জরিপের মধ্যে প্রকাশ করেছেন।
দ্বিতীয় রাউন্ডের জরিপে সমর্থনে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বিএনপি, সেপ্টেম্বরের জরিপে ৪১ দশমিক ৩০ শতাংশ উত্তরদাতা বিএনপিকে ভোট দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। গত বছরের মার্চে প্রথম রাউন্ডের জরিপে এই হার ছিল একটু বেশি, ৪১ দশমিক ৭০ শতাংশ।
জামায়তে ইসলামীর ক্ষেত্রে এই হার মার্চের ৩১ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে কমে ৩০ দশমিক ৩০ শতাংশ হয়েছিল সেপ্টেম্বরের জরিপে।
আর এনসিপির ক্ষেত্রে ৫ দশমিক ১০ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ১০ শতাংশ; জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রে ১ শতাংশ থেকে দশমিক ৯০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
ব্যতিক্রম শুধু ইসলামী আন্দোলন। তাদের ভোট দিতে আগ্রহীর সংখ্যা মার্চের ২ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ১০ শতাংশ হয়েছে।
আগামী সরকার গঠনে সবচেয়ে যোগ্য দল কোনটি এমন প্রশ্নে ৩৯ দশমিক ১ শতাংশ উত্তরদাতা রায় দিয়েছেন বিএনপির পক্ষে উত্তর দিয়েছে।
গতবছরের দুই রাউন্ডের জরিপে আওয়ামী লীগের বিষয়ে জনগণের ভাবনা যাচাই করা হয়েছিল। মার্চের চেয়ে সেপ্টেম্বরের জরিপে আওয়ামী লীগের পক্ষে সমর্থন বাড়ার বিষয়ে দেখতে পাওয়ার কথা বলেছিল ইনোভিশন কনসাল্টিং।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আট মাস পর গত বছরের মে মাসে দলটির কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সরকার। নির্বাচন কমিশন তাদের নিবন্ধন স্থগিত করায় এবারের নির্বাচনে ব্যালট পেপারে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক থাকছে না।

সরকারের ওপর আস্থার প্রকাশ
জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ৭২ দশমিক ৩ শতাংশ বলেছেন, তারা মনে করেন অন্তর্বর্তী সরকার একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে পারবে। দ্বিতীয় রাউন্ডের জরিপে সরকারের ওপর এই আস্থা রাখার হার ছিল ৬৯ দশমিক ৪ শতাংশ।
পুলিশ ও প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবে এমন আস্থাও বেড়েছে তৃতীয় রাউন্ডে এসে। ৭৪ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করছেন পুলিশ ও প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
ভোটাররা নিরাপদে ভোট দিতে পারবেন, এমন বিশ্বাস বেড়েছে বলে তৃতীয় রাউন্ডের জরিপে দেখা যাচ্ছে। এই রাউন্ডে ৮২ দশমিক ৩০ শতাংশ উত্তরদাতা বিশ্বাস করেন যে তারা নিরাপদে ভোট দিতে পারবেন। আগের রাউন্ডে এই হার ছিল ৭৮ শতাংশ।
জরিপের ফলাফলে বলা হচ্ছে, গণভোটে ‘হ্যা’তে ভোট দেবেন বলেছেন ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা। ‘না’ ভোটের পক্ষে ছিলেন মোটে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। ২২ শতাংশ ভোটার বলেছেন তারা গণভোট সম্পর্কে জানেন না। আর ১১ দশমিক ৭ শতাংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় থাকার কথা জানিয়েছেন।
উত্তরদাতাদের ৯৩ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট দিতে যাবেন বলেছেন।
বয়সভিত্তিক অন্যান্য গোষ্ঠীর তুলনায় জেন-জি দের মধ্যে ভোট দেওয়ার আগ্রহ কম থাকার কথা বলা হয়েছে জরিপের ফলাফলে। জেন-জিদের ৯১ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট দিতে যাওয়ার কথা বলেছেন।
আগের খবর: