০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়ন ও গণগ্রেপ্তারের পর উত্তাল ফ্রান্স

গত এক সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার ও অন্তত ১৯০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।

শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়ন ও গণগ্রেপ্তারের পর উত্তাল ফ্রান্স

ফ্রান্সের লিওঁ শহরে হাই স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলাকালে রাস্তায় আগুন জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 06 Oct 2026, 04:48 PM

Updated : 06 Oct 2026, 04:48 PM

শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও নানা সংকট সমাধানের দাবিতে ফ্রান্সজুড়ে চলমান ছাত্র আন্দোলনে চরম অস্থিরতার মধ্যে মঙ্গলবার দেশব্যাপী বড় ধরনের প্রতিবাদ শুরু হয়েছে।

ছাত্র সংগঠনগুলোর আন্দোলনের ডাকে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলো ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ করছে। দেশটির অন্যতম প্রধান ও বৃহত্তম বামপন্থি ছাত্র সংগঠন লুনিউঁ এতুদিয়ঁতের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ফ্রান্সের ৩০টিরও বেশি স্থানে প্রতিবাদ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

মার্সেই, নিস, নান্তেস, লিওন ও প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরের মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে, এসব শহরে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ পদযাত্রায় অংশ নেবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মঙ্গলবারের প্রতিবাদের অন্যতম সংগঠক ফ্রান্সের হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের প্রধান ছাত্র সংগঠন উঁনিয়ঁ সাঁদিকাল লিসিয়েন (ইউএসএল) এর দাবি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বর্তমানে ১৮০০ স্কুল অবরুদ্ধ অথবা বন্ধ করে রেখেছে। তারা আরও জানায়, ৯০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এক্স এ এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, আন্দোলনের জনগণের অংশগ্রহণ ‘এক নতুন উচ্চতায়’ পৌঁছেছে।

বিবিসি জানিয়েছে, গত এক সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ও অন্তত ১৯০ জন শিক্ষার্থী আহত হওয়ার পর ছাত্র সংগঠনগুলো এই সর্বাত্মক আন্দোলনের ডাক দেয়।

সংঘর্ষ চলাকালে উত্তরের শহর লেন্সে ১৫ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

এছাড়া গত সপ্তাহে সেন্ট-উঁয়া-লোমোনে টিয়ার গ্যাসের শেলের আঘাতে মারাত্মক আহত হয় ১৪ বছর বয়সী আরেক শিক্ষার্থী ইডেন। ইডেনের উভয় চোয়াল ভেঙে যাওয়ায় তার বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে।

Image

প্যারিসে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। ছবি: রয়টার্স

সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ইডেনের মা বলেন, “এটি লজ্জাজনক, অপমানে ভরা, নৃশংস ও ভয়াবহ। পড়ালেখার ভালো পরিবেশ দাবি করা শিশুদের ওপর এভাবে চড়াও হওয়া উচিত নয়।”

পরিস্থিতি সামাল দিতে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন ল্যকরনু শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে বিদ্যালয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তবে একই সঙ্গে কড়া বার্তা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সহিংসতার বিষয়ে আমরা কোনো আপস করব না। আমরা আহত শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের পাশে আছি।”

তবে প্রধান ছাত্র সংগঠন ইউএসএল প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, সরকার বাস্তবে কোনো স্পষ্ট সমাধান দেয়নি।

সরকারের অবহেলা এবং আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের ‘নজিরবিহীন দমন-পীড়নের’ প্রতিবাদে মঙ্গলবার দেশজুড়ে সর্বাত্মক কর্মসূচির আহ্বান জানিয়েছিল ইউএসএল।

তাদের এই আহ্বানে সমর্থন দিয়ে ফ্রান্সের প্রধান শিক্ষক সমিতি ‘এসএনইএস-এফএসইউ’ তাদের সদস্যদেরও মঙ্গলবার রাজপথে নামার অনুরোধ জানিয়েছে।

ফ্রান্সের কট্টর বামপন্থি দল ‘লা ফ্রঁস আঁসুমিজ’ (এলএফআই)-এর নেতা জ্যাঁ-লুক মেলাঁশোঁ এই বিক্ষোভকে ১৯৬৮ সালের ঐতিহাসিক আন্দোলনের পর দেশটির ‘সবচেয়ে শক্তিশালী স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন’ বলে বর্ণনা করেছেন।

গত সেপ্টেম্বরে প্যারিসে প্রথম এই বিক্ষোভ শুরু হয় এবং পরবর্তীতে তা দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

শ্রেণিকক্ষে ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, জরাজীর্ণ ভবন এবং শিক্ষকসংকটের প্রতিবাদে প্রথমে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামলেও পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও তাদের সঙ্গে যোগ দেন।

Image

ফ্রান্সের নঁত শহরে এক বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন সেখানকার হাই স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ছবি: রয়টার্স

উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা শত শত স্কুল অবরুদ্ধ করে রাখে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ২৪টি স্কুলে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।

ফ্রান্সের বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৫০৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের ৮৭ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক।

ছাত্র সংগঠনগুলো পুলিশের বিরুদ্ধে মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুললেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনিয়াস দাবি করেছেন, পুলিশ অত্যন্ত সংযমের সঙ্গে পরিস্থিতি বজায় রাখছে।

আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে।

কট্টর ডানপন্থি নেত্রী মারিন ল্য পেন বলেন, “এটি এখন আর শিক্ষার্থীদের সাধারণ আন্দোলন নেই, এটি পেশাদারদের দাঙ্গা, যা লা ফ্রঁস আঁসুমিজের আইনপ্রণেতারা উসকে দিচ্ছেন।”

অন্যদিকে, মার্সেইয়ের মেয়র বেনোয়া পায়াঁ সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন, আর বামপন্থি নেতা মেলাঁশোঁ আন্দোলনরত তরুণদের সুরক্ষায় দেশবাসীকে রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়েছেন।