২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩

সামরিক চৌকির বেড়াজাল পেরিয়ে ফিলিস্তিনি শিশুদের ক্যানভাসে মুক্তির স্বপ্ন

অধিকৃত পশ্চিম তীরে এক শিল্পকলা কেন্দ্রে রঙতুলিতে স্বপ্ন বুনছে স্থানীয় শিশুরা। ইসরায়েলের সামরিক চৌকির বাধা পেছনে ফেলে তাদের আঁকা ছবিতে ডানা মেলছে এক মুক্ত, স্বাধীন আগামীর আশা।

সামরিক চৌকির বেড়াজাল পেরিয়ে ফিলিস্তিনি শিশুদের ক্যানভাসে মুক্তির স্বপ্ন

পশ্চিম তীরে হেবরনের রোমানা স্টুডিওতে ছবি আঁকছে শিশুরা। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 25 Sep 2026, 06:52 PM

Updated : 25 Sep 2026, 07:16 PM

অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরন শহরের উপকণ্ঠে একটি শিল্পকলা কেন্দ্রে ক্যানভাস ও তুলি হাতে জড়ো হয় একদল ফিলিস্তিনি শিশু।

ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক অভিযান আর ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের নজিরবিহীন সহিংসতার মানসিক ট্রমা কাটাতে সেখানে তাদের মূল হাতিয়ার রকমারি রং আর ছবি আঁকা।

চিত্রশিল্পী সারাহ আবু মাদি ২০২০ সালে নিজের বসতভিটাতেই গড়ে তোলেন এই আর্ট সেন্টার। স্থানীয় আরবি ভাষায় যার নাম দেওয়া হয় ‘রোমানা’ -যার অর্থ ডালিম বা আনার।

শিশুদের মনের ভেতর জমে থাকা ভয়, ক্ষোভ আর ট্রমা প্রকাশ করার একটি মুক্ত পরিবেশ দিতেই কেন্দ্রটি চালু করেছিলেন।

সম্প্রতি পশ্চিম তীরে অবৈধ ইহুদি বসতি দ্রুত সম্প্রসারণের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের ওপর চরমপন্থি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় এই কেন্দ্রের কার্যক্রম আরও জরুরি হয়ে পড়েছে।

সারা আবু মাদি বলেন, “কোনও বসতি স্থাপনকারী বা সেনাসদস্য কিছু করলে আমরা শিশুদের কাছে জানতে চাই, ঘটনাটি তোমার কেমন লেগেছে? এতে তোমার মনে কী ভাবনা এসেছে? কীভাবে এটি তোমাকে প্রভাবিত করছে?

“আর কারও ঘরে সেনা অভিযান চালানো হলে আমরা জিজ্ঞেস করি, তখন তোমার কেমন অনুভূতি হয়েছিল? তুমি কী ভাবছিলে? কীভাবে এটি তোমাকে প্রভাবিত করল? আর তোমার নিজের চাওয়া বা ইচ্ছাটাই বা কী?”

চলতি সপ্তাহে শিশুদের পছন্দের বিষয় আঁকতে বলা হলে ১০ বছর বয়সী তালিয়া সাবাহ খাঁচা ছেড়ে আকাশে ডানা মেলা এক পাখির ছবি আঁকে।

নিজের আঁকা ছবি দেখিয়ে সে বলে, “আমি মনে করি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ‘মুক্তি’। আমি চাই আমাদের জীবন থেকে ইসরায়েলি সেনারা চিরতরে চলে যাক, আমরা যেন স্বাধীনভাবে যা খুশি তা করার অধিকার পাই।”

রয়টার্স লিখেছে, ১৯৬৭ সাল থেকেই পশ্চিম তীর ইসরায়েলি সামরিক দখলদারির অধীনে রয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের আমলে সেখানে অবৈধ বসতি স্থাপন নজিরবিহীন গতি পেয়েছে।

জাতিসংঘসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, এই বসতিগুলোকে সম্পূর্ণ অবৈধ হিসেবে গণ্য করলেও ইসরায়েল বরাবরই তা অস্বীকার করে আসছে।

হেবরনের ওয়াদি আল-সামেন মহল্লায় অবস্থিত রোমানা স্টুডিওটি মূল শহর থেকে বেশ বিচ্ছিন্ন। অন্তত ছয়টি সামরিক চৌকি পেরিয়ে সেখানে ঢুকতে হয়।

ছোট বয়স থেকেই যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখা ১১ বছর বয়সী কারাম সাবাহ জানায়, “আমার নানার পাহাড়ে জমি ছিল। কিন্তু ইহুদিরা সেখানে অবৈধ বসতি বানিয়ে তা দখল করে নিয়েছে। এখন আমাদের কেউ পাহাড়ের দিকে গেলেই গ্রেপ্তার করা হয়।”

রোমানা শিল্পচর্চা কেন্দ্রটি শুরুতে একটি পুরানো গুদামঘরের মেঝেতে কার্পেট বিছিয়ে শুরু হলেও আজ সেখানকার দেয়ালগুলো রঙিন ম্যুরালে সজ্জিত।

ফিলিস্তিনি শিশুদের তৈরি শিল্পকর্ম ইতোমধ্যে পশ্চিম তীরের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ভূখণ্ডেও পৌঁছাতে শুরু করেছে। কানাডায় একটি সফল প্রদর্শনী শেষ হওয়ার পর এখন মেক্সিকোতে নতুন প্রদর্শনী আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন চিত্রশিল্পী সারাহ আবু মাদি।

বর্তমানে প্রায় ৬০০ শিশু এই কেন্দ্রে ছবি আঁকা শিখছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। আবু মাদির লক্ষ্য পুরো মহল্লার প্রায় ৩ হাজার শিশুর সবার কাছে এই শিল্পচর্চা পৌঁছে দেওয়া।

শিশুদের আঁকা একটি ছবিতে দেখা যায়, তিন শিশু ডানাওয়ালা ঘোড়ার পিঠে চড়ে সামরিক চৌকির (চেকপয়েন্ট) উঁচু দেয়াল ডিঙিয়ে উড়ে যাচ্ছে।

সারাহ আবু মাদি বলেন, “শিল্পচর্চা শিশুদের স্বপ্ন দেখতে শেখায়। এটি তাদের কল্পনা করতে শেখায়। সেই কল্পনাশক্তি দিয়েই তারা বর্তমানে যে কঠিন পরিবেশে বাস করছে, তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও সুন্দর একটি জগত নিজের জন্য গড়ে তুলতে পারে।”