০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

রাখাইনের রোহিঙ্গা গ্রামগুলো বন্দিশালা ও ব্যারাকে রূপান্তর করছে আরাকান আর্মি: গার্ডিয়ানের অনুসন্ধান

নিপীড়নের মধ্যেও দেশে রয়ে যাওয়া রোহিঙ্গারা আরাকান আর্মি এবং সরকারি বাহিনী উভয় গ্রুপেরই সহিংসতা, বাধ্যতামূলক বাস্তুচ্যুতি এবং নিপীড়নের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 05 Oct 2026, 11:32 PM

Updated : 05 Oct 2026, 11:56 PM

মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন প্রদেশের বিস্তির্ণ অঞ্চল ২০২৪ সালে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর জ্বালিয়ে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোকে বন্দিশালা ও ব্যারাকে রূপান্তর করছে দেশটির স্বশস্ত্র বিদ্রোহী গ্রুপ আরাকান আর্মি।

স্যাটেলাইট চিত্র, জাতিসংঘের গবেষণা এবং বেঁচে যাওয়া ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে গত বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দেখান হয়েছে, কিভাবে বিদ্রোহী বাহিনীর হাতে নিশ্চিহ্ন হতে থাকা রোহিঙ্গা গ্রামগুলোর নতুন মানচিত্র তৈরি হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালে মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশ ছেড়ে পালানো প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বর্তমানে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে বাস করছে। কিন্তু এরমধ্যেও দেশে রয়ে যাওয়া রোহিঙ্গারা রাজ্যের নিয়ন্ত্রণের জন্য পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত বিদ্রোহী আরাকান আর্মি এবং সরকারি বাহিনী উভয় গ্রুপেরই সহিংসতা, বাধ্যতামূলক বাস্তুচ্যুতি এবং নিপীড়নের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন।

Image

স্যাটেলাইট চিত্রে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে রাখাইনের বুথিডং উপজেলার ‘নগেট থায়’ এলাকা। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান।

Image

স্যাটেলাইট চিত্রে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে নগেট থায় এলাকায় গড়ে ওঠা বিশাল বন্দিশালা। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান।

গার্ডিয়ানের প্রাপ্ত সাক্ষ্য এবং সাম্প্রতিক জাতিসংঘের প্রতিবেদনে প্রতিফলিত চিত্র থেকে রোহিঙ্গাদের মুখোমুখি হওয়া ‘বিপর্যয়কর’ পরিস্থিতির একটি স্পষ্ট রূপরেখা পাওয়া যায়, যাকে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ফলকার তুর্ক নির্যাতন, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, নির্বিচার গ্রেপ্তার, জমি দখল, বাস্তুচ্যুতি, বেগার খাটানো এবং বাধ্যতামূলক সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের মত গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

অনুসন্ধানে স্যাটেলাইট চিত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন রাখাইনের বুথিডং উপজেলার ‘নগেট থায়’ এলাকার একটি ধানখেতের চিত্র দেখান হয়েছে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত রোহিঙ্গা কৃষকরা সেখানে চাষাবাদ করতেন; কিন্তু ২০২৬ সালের মধ্যে সেখানে ১২০টি ধূসর রঙের ভবন গড়ে তোলা হয়েছে।

গার্ডিয়ান বলছে, ধান খেতে গড়ে তোলা এসব ভবন আরাকান আর্মি পরিচালিত একটি বন্দিশালা, যেখানে আশপাশের এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা পরিবারগুলোকে আটকে রাখা হয়েছে। আটকে থাকা এই রোহিঙ্গারা অনুমতি ছাড়া সেখান থেকে বের হতে পারেন না। রাখাইনের অধিকাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীটির তৈরি অন্তত ১০টি এ ধরনের শিবিরের মধ্যে এটি একটি।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নগেট থায় এলাকার ওই বন্দিশালায় বুথিডংয়ের ‘হয়ার সিরি গণহত্যার’ পর বেঁচে যাওয়া কিছু মানুষকে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য করেছিল আরাকান আর্মি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্যানুযায়ী, রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সময় ২০২৪ সালের ২ মে হয়ার সিরি গ্রামে আরাকান বাহিনীর হাতে শত শত নিরস্ত্র রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন।

Image

স্যাটেলাইট চিত্রে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মায়ু নদীর তীরবর্তী ইউয়েত নিও তাউং এলাকা। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান।

Image

স্যাটেলাইট চিত্রে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইউয়েত নিও তাউংয়ের পরিস্থিতি। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতিসংঘের এক মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ বলেন, “রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে এটিই যে রোহিঙ্গাদের শেষ, এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ নেই। হয়ত কিছুটা সময় লাগতে পারে, কিন্তু এই সম্প্রদায়ের যেন সেখানে কোনো ভবিষ্যৎ না থাকে তা নিশ্চিত করতে নিঃশব্দে কাজ করে যাচ্ছে আরাকান আর্মি।

“রোহিঙ্গারা যত দিন সহ্য করতে পারে ততদিন এই মারাত্মক পরিস্থিতিতে কারাগারের মত স্থানগুলোতে থাকতে পারবে। কিন্তু তাদের নিজেদের ভিটেমাটিতে আর কখনো ফিরতে দেওয়া হবে না।”

জাতিসংঘের এক অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে গার্ডিয়ান বলছে, ২০২৪ সাল থেকে ২৩টি রোহিঙ্গা গ্রামের অন্তত ৮০০ হেক্টর জমি দখল করে ক্যাম্প, অন্যান্য সম্প্রদায়ের বসতি বা সামরিক অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আরাকান আর্মি কর্তৃক রোহিঙ্গাদের জমি দখল বা রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুত করার অন্তত ২৯টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে জাতিসংঘ। বিশ্ব সংস্থাটির প্রতিবেদনে এই প্রবণতাকে আরাকান আর্মি কর্তৃক তাদের নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ড সুসংহত করার চেষ্টার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

Image

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুহাম্মদ আরেস। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান।

বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয়ে থাকা ওই গ্রামের বাসিন্দা ১৮ বছর বয়সি মুহাম্মদ আরেস বলেন, “আরাকান আর্মি প্রথম যখন আসে, তখন আমাদের এলাকায় প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়। এই সংঘর্ষের সময় বহু বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারায়। আরাকান আর্মি শেষ পর্যন্ত আমাদের পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে ছাই করে দেয়। এরপর তারা ঘরবাড়ি হারানো সব মানুষকে জোর করে একত্র করে ক্যাম্পে নিয়ে যায়।”

আরাকান আর্মি মূলত আমাদের জন্মভূমিকে জোরপূর্বক শ্রমাশ্রম এবং সামরিক ফাঁড়ির এক বিশাল নেটওয়ার্কে পরিণত করেছে বলেও মন্তব্য করেন আরেস।

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা আরেক রোহিঙ্গা ২৬ বছর বয়সি মোহাম্মদ সাদিক বলছেন, ক্যাম্প থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে মায়ু নদীর তীরে সারিবদ্ধ গ্রাম নিয়ে গঠিত ইউয়েত নিও তাউং এলাকায় ২০২৪ সালের এপ্রিলে আগুন দেওয়ার পর রোহিঙ্গা কৃষক ও মাঝিরা তাদের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও ফলের বাগান হারিয়েছে।

“তারা আমাদের বড় বড় গাছ ও ফলের বাগান কেটে জমি পুরোপুরি ফাঁকা করে ফেলে। গ্রামগুলোতে আগে যেমন ঘরবাড়ি বা অবকাঠামো ছিল তা মানচিত্র থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়েছে। তারা আমাদের জায়গায় ওদের ঘরবাড়ি বানিয়েছে।”

Image

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মোহাম্মদ সাদিক। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান।

হয়ার সিরি ‘গণহত্যায়’ বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, তাদের বাধ্য করা হয়েছিল নিজেদের ঘরবাড়ি ভেঙে সেই কাঠ-উপকরণ দিয়ে বিদ্রোহীদের জন্য নতুন স্থাপনা তৈরি করতে। এর মধ্যে ‘ইউয়েত নিও তাউং’-এ অবস্থিত ‘এপি ব্যাটালিয়ন’ নামে পরিচিত সেনাশিবিরও অন্তর্ভুক্ত, যেখানে তরুণ রোহিঙ্গাদের আটকে রেখে জোরপূর্বক প্রশিক্ষণ দেওয়া হত বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাদিক বলেন, “তারা আমাদের জোর করে রাস্তা পরিষ্কার, পরিখা খনন এবং শিবিরের ভেতরে কঠোর পরিশ্রমের কাজে বাধ্য করত। ক্লান্তিতে কেউ ঢলে পড়লে তাকে রোদের মধ্যেই ফেলে রাখা হত।”

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ৩২ বছর বয়সি এক ব্যক্তি বলেন, তাকে জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে ভর্তি করা হয় এবং এক মাসের আটকাবস্থায় বারবার মারধর করা হত। অন্য এক ব্যক্তি বলছেন, তার ২২ বছর বয়সি মেয়েকে তুলে নিয়ে গিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয় এবং সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে বাধ্য করা হয়।

জাতিসংঘের মিয়ানমার বিষয়ক স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থার (আইআইএমএম) প্রধান নিকোলাস কৌমুজিয়ান বলেন, “রোহিঙ্গাদের ওপর হামলার পেছনে যারা চক্রান্ত করেছিলেন তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাস্তব পরিস্থিতি বদলে নতুন বাস্তব তৈরি করা। রোহিঙ্গাদের জমি ধ্বংসের জন্য আরাকান আর্মি দায়ী কি না তা এখনো আইআইএমএম চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হতে পারেনি। তবে মিয়ানমারের ভেতরে এখনও যেসব রোহিঙ্গা রয়েছে, তারা চলমান সংঘাতের সব পক্ষের দ্বারাই লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।”

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক টম ড্যানেনবাউম বলেন, “জবরদস্তি এবং রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুতির এই সমন্বিত প্রচেষ্টা জনসংখ্যা স্থানান্তরের মত যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে।”

মিয়ানমারের বিদ্রোহীদের সমর্থকদের দ্বারা গঠিত জাতীয় ঐক্য সরকারের (এনইউজি) একমাত্র সাবেক রোহিঙ্গা প্রতিনিধি অং কিয়াও মো বলেন, “প্রধান কথা আর এটি নয় যে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে টিকতে পারবে কি না। মূল প্রশ্ন হল, এমন পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে কি না যা তাদের স্থায়ী বাস্তুচ্যুতি এবং তাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক অস্তিত্বকে চিরতরে মুছে দেবে?”

এদিকে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) গত জানুয়ারিতে রোহিঙ্গা গণহত্যার মামলার শুনানি শুরু করেছিল। সেখানে রোহিঙ্গাদের পরিকল্পিত উচ্ছেদ এবং ধ্বংসযজ্ঞকে গণহত্যার উপাদান হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গারা গণহত্যার শিকার হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে আদালত এ মাসেই তার রায় দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।