ইউক্রেইনে রাশিয়ার বর্বরতার শিকার একদল শ্রীলঙ্কান

রাশিয়ার দখল থেকে ইউক্রেইনের ইজিয়ুম শহর মুক্ত হওয়ার পর একে একে বেরিয়ে আসছে সেখানকার ভয়াবহতা; রুশ বাহিনীর নির্যাতন ও বর্বরতার নানা অভিযোগও উঠছে।

রয়টার্স
Published : 20 Sept 2022, 03:45 PM
Updated : 20 Sept 2022, 03:45 PM

রাশিয়ার দখল থেকে ইউক্রেইনের ইজিয়ুম শহর মুক্ত হওয়ার পর একে একে বেরিয়ে আসছে সেখানকার ভয়াবহতা। এরই মধ্যে সেখানে পাওয়া গেছে গণকবর। ইজিয়ুমে রুশ বাহিনীর নির্যাতন এবং বর্বরতার নানা অভিযোগও উঠছে। 

এর মধ্যেই বেরিয়ে এসেছে ওই শহরে কয়েকজন শ্রীলঙ্কানের ওপর রুশ বাহিনীর বর্বরতার কাহিনী। সাতজন শ্রীলঙ্কানের এ দলটি কয়েকমাস বন্দি ছিল। 

ইউক্রেইনের সেনারা ইজিয়ুম আবার নিজেদের দখলে নেওয়ার পর তারা বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়েছেন। বিবিসি- কে তারা শুনিয়েছেন তাদের সেই অন্ধকার দিনগুলোর কাহিনী। 

“আমরা ভেবেছিলাম আর কখনও বেঁচে ফিরতে পারব না,” বলেন দিলুজান পাথিনাজাকন। 

দিলুজান ওই সাত লঙ্কানের একজন। গত মে মাসে রুশ বাহিনীর হাতে তিনিসহ বাকিরাও বন্দি হন। 

সাত লঙ্কানের এই দলটি উত্তর-পূর্ব ইউক্রেইনের কুপিয়ানস্কে তাদের বাড়ি থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে খারকিভের তুলনামূলক নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার জন্য হেঁটে রওনা দিয়েছিল।

কিন্তু প্রথম চেকপয়েন্টেই তারা রুশ সেনাদের হাতে বন্দি হয়। তাদের চোখ, হাত বেঁধে রুশ সীমান্তের কাছে ভোবচানস্ক শহরের একটি কারখানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

 চার মাসের দু’স্বপ্নের সেটাই ছিল শুরু। এই দীর্ঘ সময়ে বন্দি থাকার পাশাপাশি জবরদস্তি শ্রম এমনকী নির্যাতনও চলেছে তাদের ওপর। এই শ্রীলঙ্কানরা ইউক্রেইনে গিয়েছিলেন কাজের সন্ধানে কিংবা পড়তে। 

কিন্তু তাদেরকে হতে হয়েছে বন্দি, বেঁচে থাকতে হয়েছে যৎসামান্য খাবার খেয়ে, স্নান এবং টয়লেটে যাওয়ার ওপরও ছিল কড়াকড়ি। স্নানের সুযোগ মিলত মাঝে মাঝে, তাও আবার দু’মিনিটের জন্য। টয়লেটে যেতে দেওয়া হত দিনে একবার তাও দুই মিনিটের জন্য।

সাত শ্রীলঙ্কানের এই দলে একজন মাত্র নারী। মেরি এদিত উথাজকুমার নামের এই নারীর বয়স ৫০ বছর। তাকে রাখা হয়েছিল আলাদা জায়গায়। আর বাকি পুরষদের সবাইকে একটি কক্ষে রাখা হয়। তাদের বয়স মূলত ২০ থেকে ৩০ এর কোঠায়।

“তারা আমাকে একটি কক্ষে বন্ধ করে রেখেছিল। আমরা গোসল করতে গেলে তারা আমাদেরকে পেটাত, এমনকী অন্যদের সঙ্গে আমাকে দেখাও করতে দেওয়া হত না। ওই কক্ষে আমি আটকা পড়ে ছিলাম,” বলেন মেরি। 

শ্রীলঙ্কায় গাড়িবোমার ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন মেরি। মুখে তার ঝলসে যাওয়া দাগ। তার হৃদরোগও আছে। কিন্তু এর জন্য কোনও ওষুধ তিনি পাননি। উপরন্তু বন্দিদশায় একা তিনি প্রচণ্ড উদ্বেগে থাকতেন। 

বাকিদের নির্যাতনের শিকার হওয়ার কাহিনী আরও মর্মান্তিক। তাদের মধ্যে কারও কারও পায়ের নখ সাঁড়াশি দিয়ে তুলে ফেলা হয়েছে। সেই নির্যাতনের চিহ্ন পায়ের জুতো খুলে দেখিয়েছেন একজন। আরও একজন এমন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। 

এই লঙ্কানরা আরও বলেছেন, রুশ সেনাদের অনেকে অনেক সময় মাতাল হয়ে তাদের ওপর চড়াও হত। কোনও কারণ ছাড়াই মারধর করত তারা।

“তারা বন্দুক দিয়ে আমার শরীরে বহুবার আঘাত করেছে। তাদের একজন আমার পেটে ঘুষি মেরেছে। আমি দুইদিন ব্যথা ভোগ করেছি,” বলেন থিনেশ গগেনথিরান। 

“আমরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ আর মনমরা ছিলাম। প্রতিদিন কাঁদতাম। পরিবারের স্মৃতি আঁকড়ে আর প্রার্থনা করে আমাদের দিন কাটছিল,” বলেন দিলুকশান রবার্টক্লাইভ নামের আরেকজন শ্রীলঙ্কান। 

এ মাসের শুরুর দিকে ইউক্রেইনের সেনাবাহিনী পূর্ব ইউক্রেইনের ভোবচানস্ক-সহ রুশ বাহিনীর কব্জায় থাকা এলাকাগুলো একে একে নিয়ন্ত্রণে নিতে শুরু করলে এই লঙ্কানরা মুক্তি পেয়ে আবার খারকিভে তাদের গন্তব্যের পথে হাঁটা শুরু করেন। 

তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কাছে না ছিল কোনও ফোন, না ছিল পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের কোনও উপায়। কিন্তু ভাগ্যজোরে সে ব্যবস্থাও হয়ে যায়। পথে একজন তাদেরকে দেখতে পেয়ে পুলিশ ডাকেন। পুলিশ পরে তাদেরকে সহায়তা করেছে। 

শ্রীলঙ্কানদের এই দলটিকে খারকিভে নেওয়া হয়েছে। সেখানে তাদেরকে চিকিৎসাসহ সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তারা এখন আনন্দিত। একগাল হাসি দিয়ে দিলুকশান বলেন, “এখন আমি খুব, খুবই খুশি,”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক