ফ্রান্সের বিক্ষোভে ভাইরাল স্লোগান ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ এর মানে কী?
বাক্যটির অর্থ আপাতদৃষ্টিতে অস্পষ্ট।তবে গত মাসে ফ্রান্সে তরুণদের প্রতিবাদ শুরু হওয়ার পর থেকে এ বাক্যাংশকে প্রজন্মগত ব্যবধানের প্রতীক হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
ফ্রান্সে চলমান শিক্ষার্থী বিক্ষোভে আন্দোলনকারীরা এক অদ্ভুত স্লোগান নিয়ে রাজপথে নেমেছে। সাম্প্রতিক দিনের প্রতিবাদবিক্ষোভে ধ্বনিত হচ্ছে 'বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র্'। আরবি ও ফরাসি ভাষার মিশ্রণে তৈরি এই বাক্যাংশ যেন আন্দোলনে সবার মুখে মুখে প্রচলিত স্লোগান হয়ে উঠেছে।
‘বিসমিল্লাহ’ আরবি শব্দ, যার অর্থ ‘আল্লাহর নামে’। অন্যদিকে, ফরাসি বাক্যাংশ ‘সে লে তেনেব্র’ আক্ষরিকভাবে ‘এটি অন্ধকার’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যার মানে দাঁড়ায় “আল্লাহর নামে শুরু করছি”, “এ তো অন্ধকার।”
বাক্যটির অর্থ আপাতদৃষ্টিতে অস্পষ্ট।তবে গত মাসে ফ্রান্সে তরুণদের প্রতিবাদ শুরু হওয়ার পর থেকে এ বাক্যাংশকে প্রজন্মগত ব্যবধানের প্রতীক হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বাক্যাংশটি কীভাবে এল?
ধারণা করা হচ্ছে, স্ন্যাপচ্যাটে প্রকাশিত একটি বার্তা থেকে এই স্লোগানের সূত্রপাত। ফ্রান্সের শিক্ষার্থী আন্দোলনের আয়োজকদের একটি ব্যক্তিগত চ্যাট গ্রুপে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন এমন এক ব্যক্তি বার্তাটি পাঠান।
লেখক মামাদৌ ও আবদুল্লাহর মতো নাম এবং আলজেরিয়ার পতাকার ইমোজি ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রোফাইল থেকে কয়েকবার অদ্ভুতভাবে আরবি ও ফরাসি ভাষা মিলিয়ে এই বার্তা পাঠানো হয়েছিল।
এতে লেখা ছিল করে ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’। বাক্যটি শুনতে অদ্ভুত। ফ্রান্সে তরুণদের ব্যবহৃত আরবি ও ফরাসি ভাষার সংমিশ্রণকে অনুকরণ করে বাক্যটি লেখার চেষ্টা করা হয়। এরপর সেই লেখক আরও লেখেন, ‘আমরা সবকিছু ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব’।
বার্তাটিতে যেভাবে অদ্ভুতভাবে ফরাসি তরুণদের ভাষা (জেন-জি স্ল্যাং) আরবি শব্দ এবং জাতীয় পতাকা মেলানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, তা সাধারণ কোনও তরুণের লেখার মতো ছিল না।
শিক্ষার্থীদের তখনই সন্দেহ হয় যে, এটি আসলে কোনও ছদ্মবেশী পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি তরুণ সেজে তাদের গ্রুপে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছেন।
এরপর এই চ্যাটের স্ক্রিনশটটি শিক্ষার্থীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে দেয়। পুলিশের এমন আনাড়ি ও হাস্যকর চেষ্টা নিয়ে টিকটক এবং ইনস্টাগ্রামে হাজার হাজার প্যারোডি ভিডিও ও মিম তৈরি হতে থাকে।
অল্প সময়ের মধ্যেই এই ট্রল অনলাইন থেকে সরাসরি রাস্তায় নেমে আসে। বিক্ষোভকারীরা দ্রুত ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ বাক্যটিকে একটি ব্যঙ্গাত্মক স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। তরুণদের আন্দোলনকে দমন করতে কর্তৃপক্ষ যে চেষ্টা চালাচ্ছে, তাকে উপহাস করা–ই ছিল এই স্লোগানের উদ্দেশ্য।
সুইডিশ জলবায়ু কর্মী গ্রেটা থুনবার্গ যখন ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানান, তিনিও এই স্লোগানটি উচ্চারণ করেন, আর তাতেই এই স্লোগান আন্তর্জাতিকভাবে আরও বেশি ভাইরাল হয়।
বিক্ষোভকারীদের কাছে এই স্লোগান এবং এর অদ্ভুত শব্দচয়নই বুঝিয়ে দেয় যে, তাদের আন্দোলনের সঙ্গে সরকারের একটি বড় প্রজন্মগত ব্যবধান রয়েছে। কারণ, সরকার তাদের দাবিগুলো বরাবরই মেনে নেয়নি।
ফ্রান্সের প্রভাবশালী শিক্ষার্থী ইউনিয়নের মুখপাত্র বলেন, কোনও তরুণ এভাবে কথা বলে না। তরুণেরা এই বাক্যটিকে তাদের নিজস্ব করে নিয়েছে একথা বোঝাতে যে, তাদের আন্দোলনে নজরদারি বা অনুপ্রবেশের চেষ্টা চোখ এড়ায় না।
ফ্রান্সে শিক্ষার্থীরা কেন বিক্ষোভ করছে?
গত মাসে ফ্রান্সের ক্রেতেই-এ শিক্ষার্থী বিক্ষোভ শুরু হয় এবং দ্রুত তা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। শ্রেণীকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষকদের অনুপস্থিতি, স্কুলের দীর্ঘ সময়, পর্যাপ্ত শিক্ষা সরঞ্জামের অভাব এবং স্কুলের জরাজীর্ণ অবকাঠামোর বিরুদ্ধে এই বিক্ষোভ চলে আসছে।
"পুলিশ বলপ্রয়োগ করার কারণে বিক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে।”
শিক্ষার্থী আন্দোলন ধীরে ধীরে জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিরুদ্ধে শ্রমিক ইউনিয়ন এবং অন্যান্য দলগুলোর একটি জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে মিশে গেছে। ১৭ অক্টোবর এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত এমন এক বড় দাঙ্গা আর লুটপাটে রূপ নেয়, যা ফ্রান্স বহু বছরের মধ্যেও দেখেনি।
