হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানের সাতদিনের পরিকল্পনায় যা আছে
ইরান এখনও গত জুনে হওয়া সমঝোতা চুক্তির কাঠামো অনুযায়ী এগোতে চায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করাকে যে কোনো আলোচনার মূল বিষয়বস্তু মানছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে কাতারের মধ্যস্থতায় বার্তার মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আগামী সাত দিনের মধ্যে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার একটি পরিকল্পনা দিয়েছে।
জাতিসংঘ অধিবেশনের এক ফাঁকে বৃহস্পতিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, ওয়াশিংটন তাদের এই প্রস্তাব গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে সাত দিনের এই সময়সীমা গণনা শুরু হতে পারে। তবে শর্ত হল, ওয়াশিংটনকে তেহরানের তেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে এবং আরও কিছু নির্দিষ্ট দাবি পূরণ করতে হবে।
ইরানের গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ায় দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি বন্ধ করে দেয়। মাঝে সাময়িকভাবে হরমুজ প্রণালি খোলা হলেও যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় আবার তা বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমানে উচ্চ যুদ্ধঝুঁকির বীমা খরচ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রণালিটি বর্তমানে বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য কার্যত বন্ধ আছে।
ফলে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে নতুন করে ইরানের পরিকল্পনা জমা দেওয়ার খবরে আবার এ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ওমান উপসাগর ও পারস্য উপসাগরের মাঝের এই জলপথ আবার উন্মুক্ত করতে বৃহস্পতিবার তেহরানের সাতদিনের পরিকল্পনায় কি আছে তা বিস্তারিত ব্যাখা করেছে আল জাজিরা।
শুক্রবার আল জাজিরা এক্সপ্লেইনারে বলা হয়, নিউ ইয়র্কে কাতারের মধ্যস্থতায় হওয়া এই পরোক্ষ যোগাযোগকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেছে। কিন্তু যুদ্ধ সাত মাসে পা দিলেও তা বন্ধে দুই দেশের মধ্যে কোনো বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকরা আল জাজিরাকে বলেছেন, অবিলম্বে কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ ইরান এখনও গত জুনে হওয়া একটি চুক্তির কাঠামো অনুযায়ী এগোতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুরনো ওই চুক্তিতে হরমুজ প্রণালি পরিচালনায় ইরান এবং ওমানকে প্রধান ভূমিকা পালনের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
যদিও দুই দেশের মধ্যে আবার সংঘাত শুরু হওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই হরমুজ খুলতে ওই সমঝোতা চুক্তি ভেস্তে যায়।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে’ আছে দাবি করা যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি অবিলম্বে বন্ধ করাকে যে কোনো আলোচনার মূল বিষয়বস্তু বানাতে চায়।
যদিও ইরান আগেই স্পষ্ট করেছিল, হরমুজ প্রণালি ও তার আশপাশের বন্দরে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা বাতিল এবং মার্কিন হামলার সমাপ্তির নিশ্চয়তাসহ অন্যান্য শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা পারমাণবিক কর্মসূচির মত বৃহত্তর কোনো শান্তি আলোচনায় অংশ নেবে না।
কি আছে ইরানের প্রস্তাবে
আব্বাস আরাঘচি নিউ ইয়র্কে সাংবাদিকদের বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাদের পরিকল্পনা জমা দিয়েছে। যদি কিছু নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করা হয়, তাহলে সপ্তমদিনের শেষে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া হবে এবং শান্তি আলোচনা ফের শুরু হবে।
তাদের পরিকল্পনার বিশদ বিবরণ না দিলেও আরাঘচি বলছেন, এই প্রস্তাবের পরিকল্পনার সঙ্গে গত ১৭ জুন হওয়া সমঝোতা স্মারকের সঙ্গে মিল আছে। তারা এই পরিকল্পনা গ্রহণ করার পরদিন থেকেই এই সময়সূচি শুরু হতে পারে, এবং সাত দিন পর প্রণালীটি উন্মুক্ত হয়ে যাবে।
ফলে গত জুনে হওয়া সমঝোতা চুক্তিতে থাকা পরিকল্পনাগুলো আবার আলোচনায় এসেছে। ওই চুক্তিতে ছিল, ইরান পরবর্তী ৬০ দিনের জন্য কোনো টোল বা মাশুল ছাড়াই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেবে; যা ছিল মূলত শান্তি আলোচনার জন্য বরাদ্দ করা সময়। তবে সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর কী হবে, তা ওই চুক্তিতে অস্পষ্ট রাখা হয়েছিল।
আরাঘচি স্পষ্ট করেননি যে নতুন প্রস্তাবেও একই ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে কি না। এমনকি সাত দিনের সময়সূচি শুরু হওয়ার আগে ওয়াশিংটনকে কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে, উভয় পক্ষ কীভাবে সেই পদক্ষেপগুলো যাচাই করবে, কিংবা হরমুজ প্রণালি খোলার পর জাহাজ চলাচলের জন্য কী ধরনের নিয়ম কার্যকর হবে, সে সম্পর্কেও তিনি কোনো তথ্য দেননি।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, যে পরিকল্পনাই দেওয়া হোক, ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে, এমন সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। যুক্তরাজ্যের অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক আরবান কানিংহাম বলেন, “ইরান আগে যে ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিল তা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে যুদ্ধপরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য তারা হরমুজ প্রণালিকেই তাদের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছে।
“হরমুজ প্রণালি হল ইরানের চূড়ান্ত রেড লাইন বা অতিক্রমণীয় সীমানা। ইরানিরা যুদ্ধের জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ পাবে না, তাই প্রণালির নিয়ন্ত্রণই তাদের অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর একমাত্র উপায়। আমি মনে করি না তারা এ অবস্থান থেকে পিছিয়ে আসবে।”
জুন মাসের চুক্তিটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধের কথা বলা হয়েছিল। কারণ ইসরায়েল হামলা চালিয়ে লেবাননের কিছু অংশ দখল করে রেখেছে। পাশাপাশি একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির জন্য ৬০ দিনের আলোচনার পথ উন্মুক্ত হয়েছিল। এতে ইরানি তেল রপ্তানির ওপর মার্কিন ছাড় এবং হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে যোগাযোগ আবার শুরুর বিধান অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে চুক্তিতে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও মজুতসহ অন্যান্য জটিল বিষয়গুলোকে বৃহত্তর শান্তি আলোচনার জন্য স্থগিত রাখা হয়েছিল। আরবান কানিংহাম বলেন, “ইরানের সাম্প্রতিক প্রস্তাবটি তাদের আগের মডেলটিকেই অনুসরণ করছে। এর মাঝে সাত দিনের মধ্যে প্রণালি খুলে দেওয়া এবং পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা শুরু করা অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
“তবে যুক্তরাষ্ট্র এসব ইস্যুকে আলাদা আলাদাভাবে না দেখে, সবকিছুকে একটি একক প্যাকেজ হিসেবে ধরে আলোচনা করতে চায়।”
ইরানের নতুন প্রস্তাব কি যুক্তরাস্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে
মার্কিন নাগরিকরা যখন জ্বালানি তেলের উচ্চ মূল্যের সঙ্গে লড়াই করছে, তখন জাতিসংঘের মত বৈশ্বিক মঞ্চে ইরানের এই প্রস্তাব দেওয়াকে একটি ‘কৌশলগত রাজনৈতিক চাল’ মনে করছেন কানিংহাম। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধ বন্ধে ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে এটিই হয়ত শেষ সুযোগ বলে বর্ণনা করছে তেহরান। এভাবে ইরান মূলত তেল ও গ্যাসের দাম এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বাড়তি চাপ তৈরির একটি পদ্ধতি।
কানিংহাম বলছেন, ইরান ও ওমানের মধ্য দিয়ে যাওয়া হরমুজ প্রণালিটি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল ও গ্যাস রপ্তানির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট। জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় জ্বালানির দাম এই অঞ্চলের বাইরেও বহুগুণ বেড়েছে, যা দ্বিমত থাকা সত্ত্বেও একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য তেহরান ও ওয়াশিংটনকে অর্থনৈতিক তাগিদ দিচ্ছে।
এক্সপ্লেইনারে বলা হয়, সামনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি আবার খোলার চুক্তি ট্রাম্পকে ভোটারদের কাছে যাওয়ার আগে জ্বালানির দাম কমানোর একটি সুযোগ দিতে পারে; যা নির্বাচনের আগে তার দল রিপাবলিকান পার্টিকে একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সুবিধা দিতে পারে।
যদিও ট্রাম্প এই নির্বাচনি হিসাবটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন। মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে তিনি অভিযোগ করেন, ইরান মূলত নভেম্বরে তার রিপাবলিকান পার্টি নির্বাচনে কেমন ফল করে তা দেখার জন্য অপেক্ষা করছে। ট্রাম্প ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, ভোটের পরেই চুক্তি হবে। না হলে ইরানকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকিও দেন তিনি।
ফলে এই প্রশ্নটি থেকেই যায় যে, কম জ্বালানি মূল্যের সম্ভাবনা কি ট্রাম্প প্রশাসনকে ইরানের প্রস্তাবিত আলোচনার শর্তাবলী মেনে নিতে রাজি করানোর জন্য যথেষ্ট কিনা?
কানিংহাম সন্দেহ প্রকাশ করেন, ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত পরিস্থিতি এভাবে চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। তবে মূল সমস্যাটি আগের মতোই রয়ে গেছে, কারণ ইরানের প্রস্তাবটি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দেয় না।
