গর্বিত গোঁফধারী কেরালার শায়জা

কেন গোঁফ রেখেছেন- এ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় বার বার।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 24 July 2022, 06:55 PM
Updated : 24 July 2022, 06:55 PM

বেশ কায়দা করে গোঁফ রেখেছেন ভারতের কেরালার নারী শায়জা; সোশাল মিডিয়ায় তাকে নিয়ে উপহাস করছেন অনেকে, কেউ কেউ আবার বাহবা দিচ্ছেন।

তবে ৩৫ বছর বয়সী শায়জার দাবি, গোঁফ নিয়ে আনন্দ-বেদনার সব ধাপই তিনি পেরিয়ে এসেছেন। হোয়াটসঅ্যাপে নিজের ছবি দিয়ে লিখেছেন, “আমি আমার গোঁফকে ভালোবাসি।”

বিবিসি লিখেছে, মুখের লোম নিয়ে মানুষের যে প্রতিক্রিয়া, তাতে এখন আর বিচলিত নন শায়জা। ফেইসবুকে যারা তার ছবি দেখেন, অথবা যাদের সাথে তার দেখা সাক্ষাৎ হয়, তাদের অনেকেই প্রশ্ন করেন- কেন তিনি গোঁফ রেখেছেন।

জবাবে শায়জা বলেন, “আমি শুধু বলতে পারি যে, আমি গোঁফ পছন্দ করি; ভীষণ পছন্দ করি।”

ভারতের কেরালা রাজ্যের দক্ষিণের জেলা কন্নরের এই নারীর একটিই নাম, শায়জা। অনেক নারীর মত তার ঠোঁটের উপরও হালকা রোম ছিল বহু আগে থেকে। চোখের ভ্রু সুন্দর করে ছেঁটে রাখলেও ঠোঁটের উপরের রোমগুলোর ক্ষেত্রে তার প্রয়োজন কখনও অনুভব করেননি বলে তার ভাষ্য।

বছর পাঁচেক আগে সেই পাতলা রোমগুলো ঘন হতে শুরু করে এবং এক পর্যায়ে দৃশ্যমান গোঁফের চেহারা পায়। ‘আনন্দিত’ শায়জা কামিয়ে না ফেলে সেই গোঁফ রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

“আমি গোঁফ ছাড়া থাকার কথা এখন চিন্তাও করতে পারি না। যখন কোভিড মহামারী শুরু হল, মাস্ক পরতে আমার ভালো লাগত না, কারণ তাতে আমার গোঁফ ঢাকা পড়ে যেত।”

বিবিসি লিখেছে, শায়জাকে যারা দেখেছেন, তাদের অনেকেই তাকে গোঁফ ফেলে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে তাদের কথায় কান দেননি তিনি।

মোটামুটি সব সমাজেই নারীদের বোঝানো হয় যে তাদের মুখে যদি লোম থাকে, সেটা হবে অনাকাঙ্ক্ষিত। সেগুলো তাদের তুলে ফেলতে হবে, আর সেজন্য আছে ক্রিম, ওয়াস্ক স্ট্রিপ, রেজর আর এপিলেটরের মত পণ্য, যার ওপর ভিত্তি করে বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেছে।

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারীদের কেউ কেউ সমাজের ওই নিয়ম মানতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। মুখের লোম না ফেলে না দিয়ে সেগুলোকে যত্ন করে রাখছেন, এমনকি গর্বও বোধ করছেন।

‘বডি পজিটিভিটি’ বা সব আকৃতির শরীরকে ইতিবাচকভাবে দেখার আন্দোলনে যুক্ত হারনাম কাউর মুখে সম্পূর্ণ দাড়ি রাখা বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ নারী হিসেবে ২০১৬ সালে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়েন।

বুলিংয়ের শিকার হয়ে নিজেকে ভালোবাসতে শেখার পর্যায়ে মুখের ওই ‘অবাঞ্ছিত’ লোমই কীভাবে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, সে কথা প্রায়ই সাক্ষাৎকারে বলেন কাউর।

শাইজার কাছে গোঁফ রাখার মানে কোনো বার্তা দেওয়া নয়; এটা যেন এখন তার পরিচয়েরই অংশ।

“আমি যা পছন্দ করি, তাই করি। আমার যদি দুটি জীবন থাকত, তাহলে হয়ত আমি একইভাবে বাঁচতাম।”

ভারতীয় এই নারীর এমন মনোভাব তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে বহু বছর ধরে তার কিছু স্বাস্থ্য জটিলতার সঙ্গে লড়াই করার একটি যোগ রয়েছে।

গত এক দশকে ছয় দফা অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে শায়জাকে। এর মধ্যে স্তন থেকে একটি লাম্প অপসারণ করতে হয়েছে, আরেকটি অস্ত্রোপচারে ডিম্বাশয়ের সিস্ট অপসারণ করতে হয়েছে। পাঁচ বছর আগে তার শেষ অস্ত্রোপচার ছিল জরায়ু অপসারণের জন্য।

শায়জা বলেন, “যতবার আমি অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে এসেছি, আমি আশা করেছি, আমাকে হয়ত আর কখনও অস্ত্রোপচার করাতে হবে না।”

কিন্তু জটিলতা এসেছে বার বার। এর এত ধকল সামলে উঠতে গিয়ে শায়জার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে, এমনভাবে জীবন কাটানো উচিত, যা তাকে সুখী করবে।

তিনি বলেন, শৈশবে বেড়ে ওঠার সময় তিনি ছিলেন লাজুক প্রকৃতির। তার গ্রামের নারীদের সন্ধ্যার পর খুব কমই বাড়ির বাইরে দেখা যেত।

ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে উন্নয়নের সূচকে কেরালা এগিয়ে থাকলেও বেশির এলাকায় পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব এবং নারীদের ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করার প্রবণতা এখনও বিদ্যমান।

বিয়ের পর শায়জা চলে যান তামিলনাড়ুতে। সেখানে খুঁজে পান নতুন স্বাধীনতা।

বিবিসিকে তিনি বলেন, “আমার স্বামী কাজের জন্য বাইরে যেত, ওপর ফিরত দেরি হত। সে কারণে সন্ধ্যার সময় আমি বাড়ির বাইরে বসে থাকতাম।

“কোনো কিছুর দরকার পড়লে মাঝে মাঝে রাতে একাই হেঁটে দোকানে যেতাম। কাউকে পাত্তা দিতাম না। নিজে নিজে কিছু করতে শিখে আমার আত্মবিশ্বাসও বেড়ে যায়।”

নিজের মেয়েকেও সেভাবেই গড়ে তুলছেন জানিয়ে শায়জা বলেন, বন্ধু ও পরিবারের সদস্যরা গোঁফের ব্যাপারে তাকে সমর্থনই দিচ্ছেন।তার মেয়েও মাঝে মাঝে বলে, গোঁফে তাকে সুন্দর দেখায়।

কিন্তু মায়ের গোঁফের জন্য মেয়েকে রাস্তায় লোকের বাজে মন্তব্যও শুনতে হয়।

“লোকজন আমাকে নিয়ে উপহাস করে, বলে- গোঁফ থাকা মানে হল পুরুষ মানুষ, মেয়েদের কেন গোঁফ থাকবে?”

গত কয়েক বছরে স্থানীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরের শিরোনাম হয়েছেন শায়জা। সম্প্রতি সেরকম একটি প্রতিবেদন ফেইসবুকে শেয়ার করার পর সেখানেও তাকে উপহাসের শিকার হতে হয়েছে।

একজন লিখেছেন- শায়জা যেহেতু ভ্রু থ্রেড করেন, গোঁফে কেন তিনি ব্লেড চালাচ্ছেন না?

শায়জার বন্ধুদের অনেকে রেগেমেগে ফেইসবুকে এসব মন্তব্যের জবাব দেন; তবে তিনি নিজে এসব কথায় আর বিরক্ত হন না। বরং, মাঝে মাঝে পাবলিকের উৎসাহ দেখে তার হাসি পায়।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক