১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০১ কার্তিক ১৪৩৩

জাপানে যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমার জান্তা প্রতিনিধিদের মধ্যে আরও গোপন বৈঠক

মিয়ানমারে ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর যে জেনারেলদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল, তাদের সঙ্গেই আবার যোগাযোগ বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন

জাপানে যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমার জান্তা প্রতিনিধিদের মধ্যে আরও গোপন বৈঠক

মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লায়িং। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 16 Oct 2026, 07:54 PM

Updated : 16 Oct 2026, 07:57 PM

জাপানের রাজধানী টোকিওতে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা। বিষয়টি সম্পর্কে জানেন এমন কর্মকর্তারা এ খবর জানিয়েছেন। এটি ছিল গত এক মাসের মধ্যে দু’পক্ষের দ্বিতীয় বৈঠক।

মিয়ানমারে ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর যে জেনারেলদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল, তাদের সঙ্গেই আবার যোগাযোগ বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন।

জাপানে এই বৈঠকের আগে গত সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে দুই পক্ষের মধ্যে বৈঠক হয়েছিল। সেই আলোচনায় মূলত এক মার্কিন ব্যবসায়ীর মুক্তি নিশ্চিত করা এবং মার্কিনিদের লক্ষ্য করে গড়ে ওঠা প্রতারণামূলক কেন্দ্রগুলো বন্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

তবে এই আলোচনা মিয়ানমারের বিরল খনিজ সম্পদের মতো আরও বিস্তৃত বিষয়ের আলোচনার পথ প্রশস্ত করে থাকতে পারে।

দুই পক্ষের আলোচনার বিষয়ে অবগত তিনজন বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, গত সপ্তাহের বৈঠকে ঠিক কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়। বৈঠকের সংবেদনশীলতার কারণে সংশ্লিষ্টরা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে একজন মার্কিন কর্মকর্তাও রয়েছেন।

একজনের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, টোকিওতে অনুষ্ঠিত আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের গোয়েন্দা ও গবেষণা বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল ভ্যান্স। যুক্তরাষ্ট্রের এক ডজনেরও বেশি কর্মকর্তা এই বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন। তবে মিয়ানমারের পক্ষে কে প্রতিনিধিত্ব করেছেন তা রয়টার্স নিশ্চিত হতে পারেনি।

সর্বসাম্প্রতিক এই আলোচনার বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় কোনও সাড়া দেয়নি। তবে তারা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে তারা মিয়ানমারের সব পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রক্ষা করে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের একজন মুখপাত্রও মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি।

আলোচনা আয়োজনে জাপানের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় ইমেইলে জানায়, তারা উভয় পক্ষের সঙ্গেই ‘প্রয়োজনীয় যোগাযোগ’ চালু রেখেছে। তবে সুনির্দিষ্ট কোনও কূটনৈতিক আলোচনা বা আদান-প্রদান নিয়ে তারা কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

আগের আলোচনার বিষয়ে অবগতরা রয়টার্সকে এর আগে জানিয়েছিলেন, গত মাসে নেপিদোতে মাইকেল ভ্যান্স এবং মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের মধ্যকার বৈঠকটি আরও বিস্তৃত আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছিল।

এরপর টোকিওতে তাদের দ্রুত পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফিরে আসা থেকে এটিই বোঝা যাচ্ছে যে, উভয় পক্ষই সংলাপ চালিয়ে যেতে আগ্রহী।

সংশ্লিষ্টদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই চেষ্টার একটি বড় লক্ষ্য হল, মিয়ানমারে গড়ে ওঠা প্রতারণামূলক কেন্দ্রগুলো বন্ধ করতে সহায়তা নেওয়া। এসব কেন্দ্র থেকে রোমান্স এর প্রতারণাসহ বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতি করা হয়, যার মাধ্যমে মার্কিনিদের কাছ থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

গবেষকদের মতে, প্রতারণাগুলো এমন এলাকায় করা হয় য়েখানে সেনাবাহিনী-সমর্থিত মিলিশিয়াদের নিয়ন্ত্রণ আছে। মিয়ানমারের সামরিক-সমর্থিত সরকার জানিয়েছে, তারা প্রতারণামূলক কেন্দ্রগুলো দমন করতে একটি বহুজাতিক প্রচেষ্টায় অংশ নিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা মিয়ানমারের ভারি রেয়ার আর্থ বা বিরল মৃত্তিকার বিশাল মজুত ব্যবহার বিষয়েও আলোচনা করেছেন, যা বৈদ্যুতিক যানবাহন থেকে শুরু করে বায়ু চালিত টারবাইন পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্যে ব্যবহার হয়।

তবে মার্কিন কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, এ ক্ষেত্রে বাধা রয়েছে। এই খনিজ মজুতগুলো এমন সব অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

তাছাড়া, মিয়ানমারের বিরল মৃত্তিকা উপাদানের প্রধান ক্রেতা চীন। তারাও হয়ত মিয়ানমারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনও ভূমিকা ভালোভাবে নেবে না।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের এক ব্যবসায়ীর মেয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। ওই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে দেশটির সামরিক বাহিনীকে সহায়তা করার অভিযোগ আছে। মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, মিয়ানমার নিয়ে তাদের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে বলেছে, এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হল, মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে জড়িত সব পক্ষের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাওয়া। তাছাড়া, দেশটিতে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে যেসব উপায় কাজে লাগিয়ে এসেছে, সেগুলোকে নতুন করে খতিয়ে দেখার বিষয়টিও এখানে রয়েছে।