০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

তিন বছরের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে অচেনা গাজা: বিলীন বসতি, বিপর্যস্ত জনজীবন

ইসরায়েলের হামলায় গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বিলীন হয়ে গেছে ঘরবাড়ি, পাড়া-মহল্লা। মারাত্মভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অবকাঠামো ও জরুরি সেবা। থমকে গেছে ফিলিস্তিনিদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।

তিন বছরের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে অচেনা গাজা: বিলীন বসতি, বিপর্যস্ত জনজীবন

যুদ্ধে ধ্বংস হওয়া গাজা। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 07 Oct 2026, 07:44 PM

Updated : 07 Oct 2026, 07:44 PM

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে ইসরায়েলে ঢুকে হামাসের হামলাকে কেন্দ্র করে গাজা ভূখন্ডে ইসরায়েলের শুরু করা সামরিক অভিযানে তিন বছরের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর অবরুদ্ধ এই ফিলিস্তিনি জনপদটির চেহারা এমনভাবে বদলে গেছে যে, তা এখন আর চেনার উপায় নেই।

ইসরায়েলের বিমান ও স্থল হামলায় গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বিলীন হয়েছে ঘরবাড়ি, পাড়া-মহল্লা, মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রয়োজনীয় সব অবকাঠামো ও জরুরি সেবা। থমকে গেছে ফিলিস্তিনিদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তিন বছরের যুদ্ধে গাজার প্রায় ২০ লাখ মানুষের জীবন ছারখার হয়ে গেছে। বারবার এলাকা খালি করার নির্দেশে গৃহহীন হয়েছেন অগণিত ফিলিস্তিনি, আর প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৭৪,২৪৫ জন।

২০২৫ সালের অক্টোবরে একটি তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণা করা হলেও তা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে পারেনি। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় আরও ১,৪৬২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

দীর্ঘদিনের এই যুদ্ধ গাজার শিক্ষা, চিকিৎসা ও অর্থনীতিকে একেবারে ধসিয়ে দিয়েছে। বেঁচে থাকার জন্য পানি, খাবার, আশ্রয় ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদার সুযোগ মেলাতে প্রতিদিন নতুন করে সংগ্রাম করতে হচ্ছে সেখানকার বাসিন্দাদের।

টিকে থাকার দৈনন্দিন সংগ্রাম

গাজাবাসীর জন্য কেবল বাসস্থানই বদলায়নি, প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবনযাপনের ধরনও পুরোপুরি পাল্টে গেছে। বাড়িঘর, সুপেয় পানি, বিদ্যুৎ ও যাতায়াতের যানবাহন, দৈনন্দিন জীবনের এসব মৌলিক উপাদান এখন সিংহভাগ মানুষের জন্যই অতীত।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গাজার ৯৪ শতাংশ মানুষের জরুরি আশ্রয় ও গৃহস্থালি সহায়তার প্রয়োজন ছিল। বাড়িঘর হারিয়ে বা জোরপূর্বক উচ্ছেদের শিকার হয়ে ৬৫ শতাংশ মানুষ এখন তাঁবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছেন।

এছাড়া অধিকাংশ পরিবারের কাছেই পর্যাপ্ত বিছানা, আলো, রান্নার সরঞ্জাম এবং স্যানিটেশন বা শৌচাগার সুবিধা নেই।

সুপেয় পানির সংকটও চরম রূপ নিয়েছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, অগাস্টের শুরুতে ৯১ শতাংশ পরিবার মাঝারি থেকে তীব্র পানির নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে, যা জুনে ছিল ৮৪ শতাংশ।

বিদ্যুৎ সরবরাহের কেন্দ্রীয় গ্রিড বলতে এখন আর কিছু অবশিষ্ট নেই। ফলে হাসপাতালসহ জরুরি সেবা ক্ষেত্র ও বাসা-বাড়িগুলোকে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, কিন্তু সেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও খুচরা যন্ত্রাংশের তীব্র সংকট রয়েছে।

রাস্তাঘাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় যাতায়াত, ফোন ও ইন্টারনেট সেবা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ফলে পানি সংগ্রহ, মোবাইল চার্জ দেওয়া বা রান্নার মতো প্রতিদিনের স্বাভাবিক কাজগুলোও এখন একেকটি জটিল শারীরিক ও মানসিক সংগ্রামের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ধসে পড়া অর্থনীতি ও কাগুজে টাকার সংকট

ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় শিল্প কারখানা ধ্বংস হওয়ায় গাজার অর্থনীতি পুরোপুরি ধসে পড়েছে। উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা (আঙ্কটাড)-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে গাজার ৯২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে এবং বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ৭৮ শতাংশে।

২০২৫ সালে গাজায় মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) নেমে এসেছে মাত্র ২১২ ডলারে, যা ২০২২ সালের মাত্র ১৭ শতাংশ। এছাড়া, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন ছিল ২০২২ সালের মাত্র ৬ শতাংশ এবং নির্মাণ খাত নেমে এসেছে ১ শতাংশে।

সীমান্ত পারাপারে ইসরায়েলি কড়াকড়ির কারণে জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। সেপ্টেম্বরে গাজায় নিত্যপণ্যের দাম ২০২৩ সালের অক্টোবর পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় গড়ে ২০০ শতাংশ বেশি ছিল।

অর্থনৈতিক গবেষক রামী আল-জাইগ আল জাজিরাকে বলেন, “এই যুদ্ধ গাজার সমাজকে কয়েক দশক পিছিয়ে দিয়েছে। বাধ্য হয়ে মানুষ আবার মৌলিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে আদিম পদ্ধতির কাজের দিকে ঝুঁকছে।”

আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অধিকাংশ পরিবার এখন মানবিক ত্রাণ সাহায্য ও ধারের ওপর নির্ভর করছে। বাজারে কাগুজে টাকার তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়ে ডিজিটাল পেমেন্ট ও ই-ওয়ালেট ব্যবহার করছে।

শিক্ষা ব্যবস্থা ধসে পড়া ও শিশু সংকট

তিন বছরের যুদ্ধের কারণে গাজার শিক্ষা ব্যবস্থা চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। কয়েক লাখ শিশু টানা তিন বছর ধরে নিয়মিত স্কুলে যেতে পারছে না।

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্যমতে, গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। যে কটি ভবন টিকে আছে, সেগুলো মূলত বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়শিবির হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ৭ লাখ শিশু টানা ৩ বছর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিল।

শ্রেণিকক্ষে ফেরার বদলে অনেক শিশু এখন তাঁবু ও অস্থায়ী শিখন কেন্দ্রে ক্লাস করছে। অন্যদিকে, প্রায় ২ লাখ শিশুর কোনো ধরনের শিক্ষায় প্রবেশাধিকারই নেই। ফিলিস্তিনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, দীর্ঘমেয়াদে পুরো একটি প্রজন্ম শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে।

চিকিৎসা ব্যবস্থার পঙ্গুত্ব

গাজার স্বাস্থ্য খাত ধ্বংসের শেষপ্রান্তে পৌঁছেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) তথ্যানুযায়ী, গাজার ৩৬টি হাসপাতালের সবকটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বর্তমানে কেবল ১৯টি আংশিক চালু রয়েছে। তবে কোনোটিই পূর্ণ সক্ষমতায় সেবা দিতে পারছে না।

সচল কেন্দ্রগুলোতেও জরুরি ওষুধ, ডায়াগনস্টিক সামগ্রী ও জ্বালানির তীব্র ঘাটতি থাকায় ক্যান্সার ও ডায়ালাইসিসের মতো জরুরি চিকিৎসা সেবা মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে।

গাজার বাইরে নিয়ে চিকিৎসার সুযোগও সীমিত। অক্টোবর ২০২৩ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১২,৪০০ রোগীকে বাইরে পাঠানো হলেও ডাব্লিউএইচও জানিয়েছে, বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজনে এখনও হাজার হাজার রোগী অপেক্ষায় আছেন। এর সঙ্গে উপচে পড়া ভিড় ও সুপেয় পানির অভাবে ছড়িয়ে পড়ছে মহামারী।

সংকুচিত ভূখণ্ড ও ‘ইয়েলো লাইন’

ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে গাজার মানচিত্রই বদলে গেছে। ফিলিস্তিনিদের দিন দিন ছোট এলাকায় ঠেলে দিয়ে নিজেদের বসতি, কৃষিজমি ও মূল স্থাপনা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হচ্ছে।

২০২৫ সালের তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতির’ পর ইসরায়েল ‘ইয়েলো লাইন’ বা সামরিক সীমান্ত চিহ্নিত করে নিজেদের অবস্থান ফিলিস্তিনি লোকালয়ের আরও গভীরে নিয়ে গেছে।

ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটর জানায়, সেপ্টেম্বরের মধ্যে গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের সামরিক নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে, যার ফলে ২০ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি গাজার মাত্র ৩০ শতাংশেরও কম জায়গায় গাদাগাদি করে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।

যেমন মিসর সীমান্তবর্তী রাফাহ শহরে যুদ্ধের সময় ১০ লাখের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন। তবে ২০২৪ সালের মে মাসে ইসরায়েলি অভিযানে ৮ লাখের বেশি মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুত হন। বর্তমানে মওয়াসি রাফাহ ছাড়া পুরো শহরের নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের হাতে থাকায় বাস্তুচ্যুতরা আর ঘরে ফিরতে পারছেন না।

২৯ সেপ্টেম্বর ইউরো-মেড এক সতর্কবার্তায় জানায়, ইসরায়েলের এই এলাকা সম্প্রসারণ ফিলিস্তিনিদের স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত করছে এবং তাদের নিজস্ব জমি ও ভিটেমাটিতে ফেরার অধিকার কেড়ে নিচ্ছে।

শাসনব্যবস্থা ও নিরাপত্তায় শূন্যতা

২০০৭ সাল থেকে গাজা পরিচালনা করে আসা ফিলিস্তি মুক্তিকামী গোষ্ঠী হামাসের বেসামরিক প্রশাসন ও নিরাপত্তা অবকাঠামো যুদ্ধের কারণে অনেকাংশে অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

জুলাইয়ে হামাস গাজার প্রশাসনিক ক্ষমতা কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত এক কমিটির (এনসিএজি) কাছে হস্তান্তরের ঘোষণা দিলেও সেই পরিবর্তন এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।

এছাড়া, পুলিশ বাহিনীর ওপর নিয়মিত ইসরায়েলি হামলার ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে পুলিশ বাহিনীর ওপর অন্তত ১২টি হামলায় ৩৫ জন পুলিশ কর্মকর্তাসহ ৫৩ জন নিহত হন।

এর ফলে গাজায় চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে, যা অপহরণ, সম্পত্তি দখল ও ত্রাণসামগ্রী লুটপাটের মতো অরাজকতা বাড়িয়ে তুলছে। তিন বছরের যুদ্ধের পর গাজার ফিলিস্তিনিদের সামনে এখন শুধুই অনিশ্চয়তা, যেখানে ঘুরে দাঁড়ানোর কোনও স্পষ্ট আলো দৃশ্যমান নয়।