ধর্ষণের শিকার মায়ের হয়ে বিচার পেতে ছেলের লড়াই

প্রায় তিন দশক আগে ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃস্বত্তা হওয়া ভারতীয় এক নারীর সন্তানই আজ মায়ের হয়ে ধর্ষণের বিচার পেতে লড়ছেন।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 11 August 2022, 05:52 PM
Updated : 11 August 2022, 05:52 PM

প্রায় তিন দশক আগে ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃস্বত্তা হন ভারতীয় এক নারী, জন্ম দেন সন্তানের। সেই সন্তানই আজ মায়ের হয়ে ধর্ষণের বিচার পেতে লড়াই করছেন।

ভারতের উত্তর প্রদেশের বাসিন্দা ওই নারী ধর্ষণের শিকার হওয়ার সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। সে সময় দুই ব্যক্তি ছয় মাসের বেশি সময় ধরে তাকে ধর্ষণ করেন।

ফলে কিশোরী থাকতেই অন্তঃস্বত্তা হয়ে পড়েন সেই নারী। জন্মদেন এক ছেলের। ছেলেকে ওই সময় দত্তকের জন্য দিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ১৩ বছর পর ওই ছেলে মায়ের কাছে ফিরে আসে এবং ধর্ষকদের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য মা কে উৎসাহ দেয়।

বিবিসি জানায়, পুলিশ ১০ দিন আগে অভিযুক্ত এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। আর গত বুধবার গ্রেপ্তার করা হয় দ্বিতীয় ব্যক্তিকে।

ওই নারী বিবিসি-কে বলেন, ‘‘ঘটনার পর অনেক বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু আমার হৃদয়ে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে তা এখনও সারেনি। ওই ঘটনা আমার জীবন স্থবির করে দিয়েছে। বার বারই আমার ওই কথা মনে পড়ে।”

ভারতে প্রতি বছর হাজার হাজার শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মামলা হয়। অনেক ঘটনা আড়ালেই থেকে যায়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে ভারতে শিশু যৌন নিপীড়নের প্রায় ৪৭ হাজার মামলা হয়েছে।

সমাজকর্মীরা বলেন, অনেক ক্ষেত্রে শিশুর বয়স অনেক কম হওয়ায় তাদের সঙ্গে কী ঘটছে তারা সেটা বুঝতেও পারে না বা অতিরিক্ত আতঙ্কে তারা সে কথা প্রকাশ করে না। ফলে শিশু ধর্ষণের অনেক ঘটনা আড়ালেই থেকে যায়।

‘তারা আমার হৃদয়ের ভেতর আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে’

ভারতীয় ওই নারী জানান, ১৯৯৪ সালে শাহজাহানপুর নগরীতে তিনি ধর্ষণের শিকার হন।

যাদের বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগ তুলেছেন তারা দুই ভাই। নাম মোহাম্মদ রাজি ও নাকি হাসান। দুইজনই তার প্রতিবেশী ছিলেন এবং যখনই তিনি বাড়িতে একা থাকতেন তারা প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে বাড়িতে ঢুকে তাকে ধর্ষণ করত বলে অভিযোগ করেন ওই নারী।

তিনি বলেন, ‘‘আস্তে আস্তে আমার শরীর খারাপ হতে থাকে; তখন বুঝতে পারি আমি অন্তঃস্বত্তা। আমার বোন আমাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যায়।”

অল্প বয়স এবং দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে চিকিৎসক গর্ভপাত সম্ভব না বলে জানিয়ে দেন। সন্তান জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই তাকে দত্তক দিয়ে দেওয়া হয়।

“শিশুর জন্ম দিতে আমাকে অনেক ভুগতে হয়েছিল। কিন্তু আমাকে এমনকী তার মুখটা পর্যন্ত দেখতে দেওয়া হয়নি। আমি শিশুটির বিষয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি আমাকে বলেন, ‘তুমি এখন জীবনে বেঁচে থাকার দ্বিতীয় সুযোগ পেয়েছো।”

দুই ধর্ষকের ভয়ে ওই সময় ওই নারী ও তার পরিবার থানায় এ বিষয়ে কোনও অভিযোগ করেনি। তিনি বলেন, ‘‘যদি আমি ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ করি তবে তারা আমার পরিবারকে হত্যা করা এবং বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল।

“বড় হয়ে আমি পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু দুই ধর্ষকের কারণে আমার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। আমি স্কুলে যেতে পারিনি, লেখাপড়া করতে পারিনি।”

ভয়ঙ্কর ওই স্মৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে ওই নারী ও তার পরিবার এলাকা ছেড়ে রামপুর জেলায় পালিয়ে গিয়েছিল।

২০০০ সালে তার বিয়ে হয় এবং তিনি আরেক সন্তানের জন্ম দেন। তিনি আশা করেছিলেন জীবনের নতুন অধ্যায় তাকে ভয়ঙ্কর অতীত ভুলতে সাহায্য করবে। কিন্তু তেমনটা হয়নি। বিয়ের ছয় বছরের মাথায় তার স্বামী ধর্ষণের ঘটনা জানতে পারেন এবং এজন্য তাকেই দায়ী করেন বলেও জানান তিনি।

‘‘ছেলেসহ আমার স্বামী আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। পরে আমি আমার বোনের এবং আমার পরিবারের সঙ্গে বসবাস শুরু করি,” বলেন ভুক্তভোগী ওই নারী।

এক ছেলের সত্যের খোঁজ পাওয়ার লড়াই:

ধর্ষণের শিকার হয়ে সন্তানের জন্ম দেওয়া শিশুটিকে দত্তক দিয়ে দেওয়ার কারণে সেই শিশুকেও নিজের পরিচয় নিয়ে নানা বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে।

ধর্ষণের শিকার ওই নারী বলেন, সে (ছেলেটি) তার প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সব সময় শুনেছে যে, সে যাদের বাবা-মা বলে জানে, তারা তার আসল পিতা-মাতা নন। তারপর সে জানতে পারে তাকে দত্তক নেওয়া হয়েছে।

ছেলেটির বয়স যখন ১৩ বছর তখন তার দত্তক পিতা-মাতা তাকে তার আসল মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেয়।

ছেলেটি জানতে চায়, কে তার বাবা। কারণ, তার নামের শেষে কোনো পদবী নেই। ভারতে সন্তানরা বাবার পদবি ব্যবহার করে। বাবার পরিচয় না জানায় ছেলেটিকে স্কুলে অন্য শিশুদের কাছ থেকে বুলিংয়ের শিকারও হতে হচ্ছিল।

যে কারণে সে তার মায়ের কাছে ক্রমাগত তার বাবার নাম জানতে চাইত এবং উত্তর না পেয়ে খুবই হতাশ হয়ে পড়ত।

“এমনকী আমার ছেলে আমাকে বলেছিল সে এই পরিচয়হীন জীবন আর টানতে পারছে না। তাই যদি তাকে তার বাবার নাম না বলি তবে সে আত্মহত্যা করবে।” বাবার পরিচয় জানতে চাওয়ায় ওই নারী শুরুতে তার ছেলেকে তিরস্কার করতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি তাকে সত্যটা জানান।

তিনি বলেন, ‘‘সত্য জানার পর সে ভেঙে না পড়ে বরং আমার সবথেকে বড় সমর্থক হয়ে ওঠে। বলে, আমাকে অবশ্যই এই লড়াই লড়তে হবে এবং অভিযুক্তদের শিক্ষা দিতে হবে।

“আপনার সঙ্গে ঠিক কতটা অন্যায় হয়েছে, যদি আপনি সেটা বলতে পারেন তবে হয়ত বেশিরভাগ মানুষ সেটাই (সমর্থন) করবে। এটাই আমাদের সাহস বাড়িয়ে দেয় এবং অভিযুক্তরা শাস্তি পায়। এর মাধ্যমে সমাজকে একটি বার্তা দেওয়া যায়। সেটি হলো, অপরাধ করে কেউ পার পাবে না।”

বিচারের জন্য লড়াই:

ছেলের উৎসাহে ২০২০ সালে ওই নারী পুনরায় শাহজাহানপুর যান। কিন্তু অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এতদিন পর মামলা করতে গিয়ে তাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে।

থানায় অভিযোগ করতে গেলে পুলিশ এত পুরাতন ঘটনায় মামলা নিতে রাজি হয়নি। পরে তিনি একজন আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করেন। তিনিও বলেন, প্রায় তিন দশক আগে ঘটা একটি ঘটনা নিয়ে মামলা লড়া কঠিন হবে।

তিনি ছোটবেলায় যে এলাকায় বসবাস করতে সেটি এতটাই পরিবর্তন হয়ে গেছে যে, তার চিনতে কষ্ট হয়েছে। তিনি এমনকী তার পুরাতন বাড়িটি খুঁজে বের করতে পারেননি। অভিযুক্তদেরও খুঁজে পাননি।

তার আইনজীবী তাকে প্রশ্ন করেছিল, ‘‘তিন দশক আগে কোথায় বাস করতেন এবং কীভাবে সেখানে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন সেটা আপনি কীভাবে প্রমাণ করবেন?”

জবাবে ওই নারী বলেছিলেন, ‘‘আমরা আপনাকে প্রমাণ যোগাড় করে দেব। আপনি মামলাটি গ্রহণ করুন।”

তার আইনজীবী আদালতে একটি মামলা করেন। তাদের আবেদন শুনে শাহজাহানপুরের প্রধান বিচারিক হাকিম পুলিশকে মামলা নিতে নির্দেশ দেন এবং ২০২১ সালের মার্চে দুইজনকে আসামি করে একটি ধর্ষণের মামলা হয়।

কিন্তু পুলিশ ওই নারীকেই অভিযুক্তদের খুঁজে বের করতে বলেন।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমিই তাদের খুঁজে বের করি এবং ফোনে তাদের সঙ্গে কথা বলি। তারা আমাকে চিনতে পারে এবং বলে কেন আমি এখনও মরে যাইনি। আমি বলি, এবার তোমাদের মরার পালা।”

প্রমাণ এবং গ্রেপ্তার:

অভিযুক্তদের খুঁজে বের করা সম্ভব হলেও অপরাধ প্রমাণে তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত পুলিশ প্রমাণের জন্য ডিএনএ পরীক্ষা করার উদ্যোগ নেয় এবং গত ফেব্রুয়ারিতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়।

শাহজাহানপুরের জ্যেষ্ঠ পুলিশ সুপার এস আনন্দ বিবিসি-কে বলেন, ‘‘এ মামলা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। যখন ওই নারী সামনে এগিয়ে আসেন এবং মামলা করেন, আমরা খুবই অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু আমরা একটি সুযোগ নেই এবং তার ছেলের ডিএনএ পরীক্ষা করাই।”

ইন্সপেক্টর ধর্মেন্দ্র কুমার গুপ্তা গত বছর থেকে এই মামলাটি দেখছেন। তিনি বলেন, ‘‘আমরা দুই অভিযুক্তের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করি এবং সেগুলো পরীক্ষা করাই। তাদের একজনের সঙ্গে ছেলেটির ডিএনএ মিলে গেছে।”

যার ভিত্তিতে গত ৩১ জুলাই একজনকে এবং গত বুধবার অন্যজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা এখনও দোষ স্বীকার করেনি।

ওই নারী চান তার ঘটনা সবাই জানুক এবং সমাজে অন্যদেরও তাদের বিরুদ্ধে ঘটা অপরাধের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা ও সামনে এগিয়ে আসতে অনুপ্রেরণা যোগাক।

তিনি বলেন, ‘‘লোকজন মুখ বন্ধ করে রাখে। আমিও মুখ বন্ধ রেখেছিলাম এবং ভেবে নিয়েছিলাম, আমার ভাগ্যে যা লেখা আছে তাই ঘটেছে। কিন্তু বিষয়টা তেমন না। আমাদের পুলিশের কাছে যাওয়া উচিত। যাতে আমাদের সঙ্গে যা ঘটেছে সেটা অন্য কারও সঙ্গে না ঘটে।”

তার ছেলে বলেন, অপরাধীরা ধরা পড়েছে এজন্য সে খুব খুশি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক