শ্রীলংকায় বিশাল গণকবরের সন্ধান, পাওয়া গেল ৫৭২ কঙ্কাল
এটি শ্রীলংকায় এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে বড় গণকবর বলে মনে করা হচ্ছে। দেহাবশেষগুলো নিখোঁজ হওয়া মানুষদের বলেই মনে করছে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো।
গত ফেব্রুয়ারিতে শ্রীলংকার উত্তরাঞ্চলে যখন একটি গণকবরের সন্ধান মেলে, সেটি পরিকল্পিতভাবে খুঁড়ে তোলা কোনও কবরস্থান ছিল না।
সে সময় জাফনার চেম্মানি এলাকায় একটি শ্মশানের পরিধি বাড়াতে খননকাজ করছিলেন শ্রমিকরা, আর তখনই তারা সেখানে হঠাৎ মানব দেহাবশেষ খুঁজে পেতে শুরু করেন। এরপর ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়।
অগাস্টের মধ্যে প্রত্নতত্ত্ববিদরা সেখানে খননের তৃতীয় ধাপ শেষ করেন। এ সময় তারা শিশু ও নবজাতকসহ মোট ৫৭২ জন মানুষের হাড়গোড় খুঁজে পান। সেখানে মৃতদের সঙ্গে তাদের নানা ব্যবহার্য জিনিসও পাওয়া যায়; যেমন: চুড়ি, স্কুলব্যাগ, দুধের বোতল।
এটি শ্রীলংকায় এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে বড় গণকবর বলে মনে করা হচ্ছে। এই গণকবরের অস্তিত্ব নিয়ে আগে কিছু গুঞ্জন ছিল।
শ্রীলংকায় কয়েক দশক ধরে চলা গৃহযুদ্ধের সময় একজন তরুণীকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে বিচারের মুখে পড়া এক সেনাসদস্য এমন একটি গণকবরের কথা বলেছিলেন, যেখানে শত শত মরদেহ ছিল।
মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, সেখানকার মরদেহগুলো নিখোঁজ হওয়া বেসামরিক মানুষদের। তবে এতদিন পর্যন্ত এর কোনও প্রমাণ ছিল না।
গণকবরের এই স্ন্ধান বিপর্যয়কর হলেও এটি জেয়ারুবি জেয়াবালানের মতো মানুষের মনে নিখোঁজদের খোঁজ পাওয়ার ব্যাপারে আশার সঞ্চার করেছে। জেয়াবালানের বাবা ছিলেন সেই হাজার হাজার মানুষের একজন, যারা কয়েক দশকব্যাপী গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন।
জেয়াবালান এবং তার মতো স্বজন হারানো পরিবারগুলো আশা করছে, তাদের প্রিয়জনদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল তার জবাব হয়ত এই মৃতদেহগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
বহু তামিলের বিশ্বাস, এই গণকবরে রয়েছে গৃহযুদ্ধ চলাকালীন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার মানুষদের দেহাবশেষ। তারা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করা এবং ন্যায়বিচারের দাবি জানাচ্ছে।
তবে চেম্মানিতে খনন প্রক্রিয়া ধীরগতিতে এগিয়েছে, যেন এই পরিবারগুলোর ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে,যারা নিখোঁজ স্বজনের শেষ পরিণতি কী হয়েছিল তার উত্তর খুঁজে ফিরছেন।
ওদিকে, আগে শনাক্ত করা একটি গণকবরের কাছে শত শত দেহাবশেষের সন্ধান পাওয়ায় তামিলদের মধ্যে ক্ষোভ বেড়েছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাগুলোর পূর্ণ তদন্ত দাবি করে আসছিলেন।
অনেকের আশঙ্কা, সত্য উদঘাটনে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে শেষ পর্যন্ত সন্ধান পাওয়া গণকবরটি জনসাধারণের দৃষ্টির আড়ালে চলে যাবে। ফলে গণকবরটি শ্রীলংকার উত্তরাঞ্চলে নতুন করে প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জবাবের অপেক্ষা
শ্রীলংকায় বিশেষ করে তামিল অধ্যুষিত উত্তর ও পূর্বাঞ্চল কয়েক দশক ধরে সংঘাত জর্জরিত ছিল। ওই অঞ্চলে ১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত চলা গৃহযুদ্ধ দেশটিকে জাতিগত বিভাজনের রেখায় ভাগ করেছে।
তামিল টাইগার বিদ্রোহীরা দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে লড়াই করেছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, বছরের পর বছর ধরে সিংহলী-প্রধান সরকারের পক্ষ থেকে ধারাবাহিকভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে তারা।
২৬ বছর ধরে চলা সংঘাতে আনুমানিক এক লাখ মানুষ নিহত হয়। নিখোঁজ হয় প্রায় ২৩ হাজার মানুষ, যাদের বেশিরভাগই তামিল। নিরাপত্তা বাহিনী এবং তামিল টাইগার দুই পক্ষের বিরুদ্ধেই নৃশংসতা ও অপরাধের অভিযোগ আছে।
১৯৯৫ সালে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর শ্রীলংকার সেনাবাহিনী লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম (এলটিটিই)-এর কাছ থেকে জাফনা উপদ্বীপের নিয়ন্ত্রণ পুনর্দখল করে। আর সেটিই যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ২০০৯ সালে টাইগারদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
৯০ এর দশকের শেষদিকে সেনাবাহিনী নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়ালে পুরো চেম্মানি এলাকাজুড়ে একটি কঠোর নিরাপত্তা অঞ্চল গড়ে ওঠে। সেখানে সেনা শিবির, তল্লাশি চৌকি ও নিরাপত্তা ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়।
চেম্মানিতে কবরস্থানের কাছেও একটি সেনা শিবির ছিল। তখন কেউ কেউ জাফনাকে একটি উন্মুক্ত কারাগার হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। সেইসঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধেও হাজার হাজার বেসামরিক মানুষকে গুম করার অভিযোগ ওঠে, যদিও শ্রীলংকা সরকার সবসময় তা অস্বীকার করে এসেছে।
জাফনার বাসিন্দা জেয়ারুবি জয়পালান বিবিসি-কে বলেন, "১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমি ১২ বছর বয়সী ছিলাম। সে সময় আমার বাবাকে চেম্মানি এলাকার কাছে একটি তল্লাশি চৌকি থেকে শ্রীলংকার সেনাবাহিনী আটক করে নিয়ে যায়। এরপর তার কী হয়েছিল, আমরা আজও জানি না।"
তিনি সেই সময়ের কথা স্মরণ করে বলেন, তার বাবা নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ার পর পরিবার আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল এবং মরিয়া হয়ে তার খোঁজে জাফনার বিভিন্ন সেনা শিবির ও পুলিশ স্টেশনে ঘুরে বেড়িয়েছিল।কিন্তু বাবা আর কখনও ফিরে আসেননি।
জেয়ারুবির বাবা কান্দাইয়া জয়পালান ছিলেন সরকারি কর্মচারী। পাশাপাশি তিনি চেম্মানির কাছেই একটি সড়কের পাশে ক্যাফে চালাতেন।
জেয়ারুবি বলেন, "আমি অনেকের সঙ্গে চেম্মানির গণকবর দেখতে গেছি, এ আশায় যে কোনও উত্তর পাব। কিন্তু আমরা কোনও বস্তুগত প্রমাণ পাইনি। আমরা মানবদেহের অবশিষ্টাংশের বিস্তারিত ফরেনসিক বিশ্লেষণ চাই।"
কান্দাইয়া জয়পালান নিখোঁজ হওয়ার দুই সপ্তাহ আগে একই এলাকায় ১৮ বছর বয়সী তামিল স্কুলছাত্রী কৃষান্তি কুমারস্বামী নিখোঁজ হয়েছিলেন।
১৯৯৮ সালে কলম্বোর এক আদালত কুমারস্বামীকে ধর্ষণ ও হত্যার অপরাধে এবং তার পরিবারের আরও তিন সদস্যকে হত্যার অভিযোগে পাঁচ সেনাসদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
সেসময় ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মনোযোগ কেড়েছিল। পরে তাদের মরদেহ চেম্মানি এলাকায় সমাহিত করা অবস্থায় পাওয়া যায়। বর্তমানে যে গণকবর নিয়ে তদন্ত চলছে তা কুমারস্বামী ও অন্যদের দেহাবশেষ পাওয়া স্থানটির ১০০ মিটারের মধ্যেই অবস্থিত।
আদালতে দেওয়া এক সাক্ষ্যে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এক সেনাসদস্য সোমারাত্নে রাজাপাক্ষে অভিযোগ করেন, ৯০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে নিহত ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষকে চেম্মানিতে কবর দেওয়া হয়েছিল।
তার এই কথার সূত্র ধরেই এক বছর পর চেম্মানিতে প্রথম খননকাজ শুরু হয়। তখন তদন্তকারীরা ১০টিরও বেশি মানব কঙ্কাল উদ্ধার করেন। মানবাধিকারকর্মীদের ধারণা, এসব দেহাবশেষ গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হওয়াদের হতে পারে। তবে বিচারিক ব্যবস্থায় এ ধারণাকে তেমন আমল দেওয়া হয়নি।
অধিকারকর্মীরা বলছেন, তামিল বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধ চলমান থাকায় তৎকালীন সরকার তদন্ত এগিয়ে নেয়নি এবং কেন নেয়নি তাও ব্যাখ্যা করেনি। একই এলাকাতেই আরেকটি গণকবরের সন্ধান পাওয়ায় এখন জবাবদিহিতার দাবি নতুন করে জোরালো হয়েছে।
অতীতের তদন্ত কোনটিই বিচার পর্যন্ত পৌঁছায়নি
সংঘাতের সময় নিখোঁজ হওয়াদের পরিবারগুলো নতুন গণকবরের সন্ধান মেলার পর প্রতিবাদ সমাবেশ ও স্মরণানুষ্ঠান আয়োজন করেছে।
তাদের একজন ৬৫ বছর বয়সী সুসিলা। তিনি তার ছেলে জ্ঞানাসীলান রবির সন্ধান করছেন, যাকে ২০০৭ সালে ২৪ বছর বয়সে শ্রীলংকার সামরিক বাহিনী তুলে নিয়ে গিয়েছিল।
তিনি বিবিসি-কে বলেন, "সে ছিল আমার একমাত্র ছেলে। তার কথা মনে করে আমি রোজ ঘুমের মধ্যে কেঁদে উঠি। তাকে ছাড়া আমার জীবন শূন্য।"
তিনি চেম্মানির কবরস্থল পরিদর্শন করলেও তার ছেলে সেখানে আছে এমন কোনও প্রমাণ, অর্থাৎ পোশাক বা ব্যক্তিগত কোন ব্যবহার্য সামগ্রী, খুঁজে পাননি।
উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষগুলোর ডিএনএ পরীক্ষা এখনও করা হয়নি। চেম্মানি থেকে উদ্ধার হওয়া সব দেহাবশেষ আদালতের হেফাজতে জাফনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক বিভাগে সংরক্ষিত রয়েছে।
গণকবরের প্রধান প্রত্নতত্ত্ববিদ অধ্যাপক রাজ সোমদেব বিবিসি-কে বলেন, "আমরা একটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন তৈরি করছি। সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ সেটি আদালতে জমা দেওয়া হবে।"
সম্প্রতি কয়েক দশকে শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন স্থানে ২০টিরও বেশি গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে জোর করে গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়টির কোনও যোগসূত্র নিশ্চিত হওয়া যায়নি, এবং কোনও ক্ষেত্রেই বিচার হয়নি।
আগের গণকবরগুলোর তদন্তে কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার কারণে নতুন গণকবর নিয়ে তদন্ত কী ফল বয়ে আনবে সে বিষয়ে অনেক তামিলেরই সংশয় আছে।
তারা ২০১৮ সালে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর মান্নারে সন্ধান মেলা আরেক গণকবরের তদন্তের ফলের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে ৩৫০টিরও বেশি কঙ্কালাবশেষ পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু তদন্ত চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারায় বহু পরিবারকে হতাশ হতে হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান
অতীতের অপরাধ তদন্তে শ্রীলংকার সরকারি সংস্থাগুলোর দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে অধিকার গোষ্ঠীগুলো কঠোর সমালোচনা করেছে।
বহু বছরের আন্তর্জাতিক চাপের পর ২০১৮ সালে সরকার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা তদন্তে স্বাধীন সংস্থা অফিস অব দ্য মিসিং পারসন্স (ওএমপি) গঠন করে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্তরা বলছেন, তাদের নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে সংস্থাটি খুব বেশি এগুতে পারেনি।
এ মাসের শুরুতে এক প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, "জোর করে গুম, নির্যাতন ও হত্যার বহু মামলা স্থবির হয়ে আছে। আর ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য ও মানবাধিকারকর্মীরা হুমকি ও ভয়ভীতির মুখোমুখি হচ্ছেন।"
জাতিসংঘ শ্রীলংকাকে আহ্বান জানিয়েছে, ভুক্তভোগীদের পরিচয় শনাক্ত করে তাদের মৃত্যুর কারণ জানতে এবং কারা দায়ী তা নির্ধারণে আন্তর্জাতিক সহায়তা নিতে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রধান রোরি মাঙ্গোভেন বিবিসি-কে বলেন, "পরিস্থিতিটা এমন যেখানে ভুক্তভোগীরা খুবই হতাশ, কয়েক দশক ধরে বেদনা নিয়ে বেঁচে আছেন এবং অতীতের তদন্তের ওপর আস্থা হারিয়েছেন।”
তিনি বলেন, "আমি মনে করি আন্তর্জাতিক সহায়তা যোগ হলে এসব তদন্তে আস্থা জোরদার হবে।"
তবে শ্রীলংকার সব সরকারই যুদ্ধকালে সংঘটিত নৃশংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
