০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

মিয়ানমার জান্তার সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরু যুক্তরাষ্ট্রের

ট্রাম্প প্রশাসনের এ উদ্যোগ মিয়ানমারের জেনারেলদের বিচ্ছিন্ন করে রাখার ওয়াশিংটনের আগেকার চেষ্টায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মিয়ানমার জান্তার সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরু যুক্তরাষ্ট্রের

মিন অং হ্লায়িং। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 08 Oct 2026, 09:33 PM

Updated : 08 Oct 2026, 10:11 PM

মিয়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর সামরিক জান্তা সরকারের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার নীতি থেকে সরে এসে সরাসরি আলোচনা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন কর্মকর্তা ও এই আলোচনা সম্পর্কে অবগতদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগ মিয়ানমারের জেনারেলদের বিচ্ছিন্ন করে রাখার ওয়াশিংটনের আগেকার চেষ্টায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আলোচনার উদ্যোগে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রাখছেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের গোয়েন্দা ও গবেষণা বিভাগের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল ভ্যান্স।

সাতজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার পাশাপাশি এই উদ্যোগ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল অন্যন্যরা জানিয়েছেন, আলোচনার লক্ষ্য মার্কিন নাগরিকদের নিশানা করে পরিচালিত অনলাইন প্রতারণাকেন্দ্র বন্ধ করা। তবে এ আলোচনা ভবিষ্যতে মিয়ানমারের বিরল খনিজ সম্পদ নিয়েও দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

গত ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে মাইকেল ভ্যান্স সামরিক অভ্যুত্থানের নেতা এবং বর্তমানে দেশটির প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন।

সংশ্লিষ্ট চারজন বলেছেন, বৈঠকের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মিয়ানমারে আটক মার্কিন ব্যবসায়ী অ্যাডাম কাস্তিয়োকে মুক্ত করার চেষ্টা। তবে বৈঠকটি দুই দেশের মধ্যে আরও বিস্তৃত যোগাযোগের সুযোগও তৈরি করেছে।

গত মাসের বৈঠকটি, যা মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে এ পর্যন্ত হওয়া সর্বোচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ— ট্রাম্প প্রশাসনের বৈদেশিক নীতির এক ব্যাপক পরিবর্তনকেই সামনে নিয়ে এসেছে, যেখানে গণতন্ত্রের প্রসার ঘটানোর চেয়ে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ বা লেনদেন ভিত্তিক সম্পর্ককে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

গত অগাস্টে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে মাইকেল ভ্যান্সের নিয়োগ নিশ্চিত হয়। মিয়ানমার নীতিতে তার এই সক্রিয় ভূমিকার বিষয়টি এর আগে প্রকাশ্যে আসেনি।

ওদিকে, মানবাধিকারের অপব্যবহারের অভিযোগে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের ওপর এখনও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এর মধ্যে ২০১৬-১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো হত্যাজজ্ঞ ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনাও রয়েছে। এসব ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্র গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছে।

মাইকেল ভ্যান্সের মিয়ানমার সফরের দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে রাখাইন রাজ্যের একটি জনাকীর্ণ বাজারে বিমান হামলা চালায় দেশটির সামরিক বাহিনী। জাতিসংঘের মানবাধিকার কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী, সেই হামলায় ৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং আরও অনেকে আহত হন।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের সব পক্ষের সঙ্গেই নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে যোগাযোগ রাখে। একইসঙ্গে সহিংসতা বন্ধ এবং রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথাও তারা জানায়।

এক বিবৃতিতে পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট বলেন, “সমস্যা এড়িয়ে গেলে তার সমাধান হয় না, বরং সমস্যা মোকাবেলা করে সমাধানের পথে এগোতে হয়।” মিয়ানমারের সামরিক সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভ্যুত্থানের পক্ষে যুক্তি হিসেবে নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ তুলে আসছেন মিন অং হ্লাইং। তিনি তার বিরোধীদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়েছেন। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, মাইকেল ভ্যান্স মিয়ানমারের সংঘাতে জড়িত বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ করেছেন। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের মিয়ানমার নীতি নির্ধারণেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন।

গোয়েন্দা প্রধানরা সাধারণত নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নেন না, কারণ এতে তাদের নিরপেক্ষ তথ্য বিশ্লেষণের স্বাধীনতা বা বস্তুনিষ্ঠতা ক্ষুণ্ণ হতে পারে।

মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ও গোয়েন্দা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ রিচার্ড বেটস বলেন, যখন কোনও সরকার বা কর্তৃপক্ষ তাদের আগে থেকে নির্ধারিত নীতি বা রাজনৈতিক কর্মসূচি অনুযায়ী গোয়েন্দা প্রতিবেদন তৈরি করতে চাপ দেয়, তখন সত্য ঢাকা পড়ে যায়।

গোয়েন্দা বা তথ্য অনুসন্ধানকারীরা তখন নিরপেক্ষ সত্য তুলে ধরার চেয়ে কর্তৃপক্ষকে খুশি করার মতো বা তাদের নীতির সঙ্গে মেলে এমন তথ্য দিতে বাধ্য হন। ফলে আসল ও সত্য ঘটনাটি আর জানা যায় না।

তবে মাইকেল ভ্যান্সের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করেননি পররাষ্ট্রদপ্তরের মুখপাত্র পিগট। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে প্রশাসনের সবাই একটি দল হিসেবে কাজ করে।

আটক মার্কিন ব্যবসায়ীকে ঘিরেই নতুন যোগাযোগ

মিয়ানমারে আটক মার্কিন ব্যবসায়ী অ্যাডাম কাস্তিয়োকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে নতুন যোগাযোগের সূচনা হয়। কাস্তিয়ো একসময় মিয়ানমারে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের প্রধান ছিলেন।

গত ১১ জুন ইয়াঙ্গুন বিমানবন্দরে তাকে আটক করেছিল মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ। তার সমর্থকদের অভিযোগ, কাস্তিয়োর বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে কাস্তিয়োকে ভুলক্রমে আটক করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে মার্কিন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও মন্তব্য করেনি।

কাস্তিয়োর মুক্তির জন্য হোয়াইট হাউজ, ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল ও মার্কিন পররাষ্ট্রদপ্তরের কর্মকর্তারা মিয়ানমারের সঙ্গে গোপন আলোচনায় জড়িত ছিলেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কাস্তিয়ো মুক্তির জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কৃতিত্ব দিয়েছেন।

এর আগে জুনে টোকিওতেও যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি বৈঠক হয়েছিল। ওই বৈঠকেও মািইকেল ভ্যান্স অংশ নিয়েছিলেন বলে চারজন জানিয়েছেন।