মিয়ানমারের ১,৪৭৬ আশ্রয়প্রার্থীর প্রত্যাবাসন শুরু করেছে মালয়েশিয়া
প্রথম ধাপে এই আশ্রয়প্রার্থীদের নিয়ে মিয়ানমার নৌবাহিনীর তিনটি জাহাজ মঙ্গলবারেই মালয়েশিয়া ছেড়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।
মিয়ানমারের সামরিক শাসক মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে এক বিতর্কিত চুক্তির অধীনে দেশটির প্রায় পাঁচ হাজার আশ্রয়প্রার্থীকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে মালয়েশিয়া সরকার।
প্রথম ধাপে ১ হাজার ৪৭৬ জন আশ্রয়প্রার্থীকে নিয়ে মিয়ানমার নৌবাহিনীর তিনটি জাহাজ মঙ্গলবারেই মালয়েশিয়া ছেড়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।
বিবিসি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের সতর্ক করে বলেছে, মিয়ানমারে ফিরিয়ে দেওয়া হলে এই আশ্রয়প্রার্থীরা চরম সহিংসতা, নিপীড়ন কিংবা জান্তা বাহিনীতে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবায় ঠেলে দেওয়ার চরম ঝুঁকিতে পড়বেন।
মালয়েশিয়া এই পদক্ষেপকে ‘স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তন’ বলে দাবি করছে। তবে বন্দিশালাগুলোতে রাখা এসব মানুষের অবস্থা সরেজমিনে দেখা কিংবা তথ্য যাচাইয়ের জন্য জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থাকে (ইউএনএইচসিআর) কোনও অনুমতি দেওয়া হয়নি।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানান, ফেরত পাঠানো আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা মুসলিম রয়েছেন। মিয়ানমারে নাগরিকত্ব না থাকা ও চরম নির্যাতনের শিকার এই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী প্রাণ বাঁচাতে বিপুল সংখ্যায় মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নিয়েছিলেন।
চলতি বছর আনোয়ারের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। দেশে রোহিঙ্গাদের নিয়ে স্থানীয়দের বাড়তে থাকা ক্ষোভের কারণে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে তাদেরকে ফেরত পাঠানো নিয়ে আলোচনা ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথ ছিল না বলে দাবি করেছেন তিনি।
তবে এই পদক্ষেপ আনোয়ারের আগের রাজনৈতিক অবস্থানের বড় এক পটপরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
সাবেক রাজনৈতিক বন্দি আনোয়ার আগে নিজেকে মানবাধিকার ও স্বাধীনতার সমর্থক হিসেবে তুলে ধরতেন। এমনকি রোহিঙ্গাদের সহায়তায় আরও উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছিলেন তিনি।
তার নেতৃত্বেই মিন অং হ্লাইংয়ের জান্তা সরকারকে কোনও স্বীকৃতি দেয়নি মালয়েশিয়া। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ অবসানের দাবিতে পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবচেয়ে সোচ্চার ভূমিকাও রেখেছিল দেশটি।
অবস্থান বদলাল কেন?
প্রধানমন্ত্রী আনোয়ারের অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে দুটি বড় কারণ রয়েছে।
প্রথমত, কোভিড মহামারীর পর থেকে কম আয়ের মালয়েশীয়দের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ায় রোহিঙ্গাদের প্রতি স্থানীয়দের একাংশের মধ্যে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে তৈরি হওয়া অস্থিরতা। ওই নির্বাচনে প্রায় ৬০ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা ‘ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্জনকানাইজেশন’ (ইউএমএনও) ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই দেশে একের পর এক নড়বড়ে জোট সরকার গঠিত হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের সমধর্মীদের প্রতি মালয়েশীয়দের গভীর সহানুভূতি ছিল।
২০১৭ সালের অগাস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংস অভিযানের মুখে রাখাইন রাজ্য থেকে সাড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। পরবর্তী বছরগুলোতে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরের চরম কষ্টকর পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন।
মালয়েশিয়ার নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের বহনকারী নৌকাগুলো ভিড়তে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে বিকল্প পথে অনেকেই ঢুকে পড়েন এবং দীর্ঘদিন তাদের সেখানে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। বর্তমানে দেশটির দুই লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছেন, যাদের বেশিরভাগই কায়িক শ্রম দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।
মহামারী চলাকালে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সাধারণ মানুষের মনোভাব বদলাতে শুরু করে। করোনাভাইরাসের ভীতি বাড়ার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ছড়িয়ে পড়ে এবং তাদের বিতাড়নের দাবি ওঠে।
জবাবে তৎকালীন সরকার কড়া অবস্থান নিয়ে আর কোনও শরণার্থী না নেওয়ার ঘোষণা দেয় এবং অবৈধ অভিবাসীদের ধরতে অভিযান চালায়।
চলতি ২০২৬ সালেও ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে।
গত মে মাসে ঈদুল আজহার কোরবানির বর্জ্য ঠিকমতো না ফেলার এক অনলাইন অভিযোগকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয় যে, রোহিঙ্গা নেতারা মালয়েশিয়ায় জমি ও নাগরিকত্ব দাবি করছেন।
এর পরপরই ‘চেঞ্জ ডট অর্গ’-এ রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের দাবিতে ওঠা এক আবেদনে ৪ লাখের বেশি মানুষ সই করেন, যা পরে সরিয়ে নেওয়া হয়।
চাপে নতি স্বীকার
উদারপন্থি হিসেবে পরিচিত আনোয়ারের কাছ থেকে এই বিদ্বেষ ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানের প্রত্যাশা ছিল। তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, “আমরা তাদের গ্রেপ্তার করতে পারি, কিন্তু গায়ে হাত তোলা, ভয় দেখানো বা অপমান করা যাবে না।”
যদিও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর অভিযোগ, অভিবাসন বন্দিশালাগুলোতে ঠিক এই খারাপ আচরণই করছেন মালয়েশিয়ার কর্মকর্তারা। তার পরও আনোয়ার রোহিঙ্গাদের বের করে দেওয়ার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “তারা স্পষ্টতই আমাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে, নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও জনক্ষোভের উৎস হয়ে উঠেছে।”
আনোয়ারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন মালয়েশিয়ার দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক প্রধান লতিফা কোয়া। তিনি এটিকে “লজ্জাজনক, নীতিহীন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারী পদক্ষেপ” বলে মন্তব্য করেন।
রাজনৈতিক দিক থেকে ব্যাপক চাপে আছেন আনোয়ার। ২০২২ সালে একসময়ের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইউএমএনও-র সঙ্গে নড়বড়ে জোট গড়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদে বসেন। তবে এরপর তার জনপ্রিয়তা ধসে পড়ে এবং সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে তার দল হেরে যায়। ২০২৮ সালের শুরুর দিকেই তাকে সাধারণ নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে।
নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয় মালয়েশিয়ার ‘এশিয়ান ইনস্টিটিউট ফর পলিসি অ্যান্ড এনগেজমেন্ট’-এর পরিচালক ট্রিসিয়া ইয়ো বলেন, “রাজনৈতিকভাবে জীবনের সবচেয়ে নাজুক মুহূর্তে এখন কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন আনোয়ার। জোটে টিকতে তাকে ইউএমএনও-র সঙ্গে আপস করতে হচ্ছে; একাধিক দুর্নীতি কেলেঙ্কারি ও নিজের দলের বিভক্তির কারণে ভোটাররা আর তার কথা শুনছেন না।”
এর পরিবর্তে, ভোটারদের অর্ধেকেরও বেশি মালয় জনগোষ্ঠীর মানুষ ইউএমএনও-র সেই পুরনো জাতিগত সুরক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন, যা বহিরাগতদের প্রতি ভয় ও ক্ষোভ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অনিশ্চিত গন্তব্য
এদিকে, নাগরিকত্ব না থাকা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো কতটা সম্ভব, তা নিয়ে চরম ধোঁয়াশা রয়েছে।
মিয়ানমারের ভেতরে রোহিঙ্গাদের মুক্তভাবে চলাচলের অনুমতি নেই, তারা কেবল বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা রাখাইন রাজ্যেই থাকতে পারেন।
অথচ রাখাইনের প্রায় পুরো অংশই এখন সশস্ত্র বিদ্রোহী ‘আরাকান আর্মি’র নিয়ন্ত্রণে এবং সেখানে জান্তা বাহিনী নিয়মিত বিমান হামলা চালাচ্ছে। প্রত্যাবাসনের ঠিক আগের দিন সোমবারও রাখাইনের কিওক্তাও শহরের এক বাজারে জান্তার বোমাবর্ষণে ৪৯ জন নিহত হন।
রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর মতো একমাত্র জায়গা হতে পারত রাজ্য রাজধানী সিতওয়ে; তবে সেটিও অবরুদ্ধ ও বিচ্ছিন্ন, আর এখানকার জরাজীর্ণ শিবিরে খাদ্য ও ওষুধের চরম সংকট রয়েছে। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর আশঙ্কা, ফেরত পাঠানো পুরুষদের জান্তা বাহিনী গৃহযুদ্ধে লড়তে জোর করে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করতে পারে।
এসব চরম বাধা কীভাবে অতিক্রম করা হবে কিংবা এই পরিকল্পনা কীভাবে মানবিক নীতি রক্ষা করবে, তার কোনও স্পষ্ট ব্যাখ্যা মালয়েশিয়া বা মিয়ানমার কোনো পক্ষই দেয়নি।
রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী নূর সাদেক বলেন, “আমরা সবাই একদিন নিজ ভিটায় ফেরার স্বপ্ন দেখি। তবে আমরা ফিরতে চাই নিরাপদে ও নিজেদের ইচ্ছায়, কারো চাপে পড়ে নয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাদের কথা শোনা এবং মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
