চীন সীমান্তে উত্তর কোরিয়ার গোপন ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, ঝুঁকিতে যুক্তরাষ্ট্র
উত্তর কোরিয়ার সিনপুং-ডং নামের এই ঘাঁটি চীন সীমান্ত থেকে মাত্র ২৭ কিলোমিটার দূরে। ঘাঁটিটি পূর্ব এশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘পারমাণবিক হুমকি’ হয়ে উঠতে পারে।
চীনের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তের কাছে গোপন একটি দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি আছে উত্তর কোরিয়ার। এই ঘাঁটি পূর্ব এশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করেছে। কারণ, ঘাঁটিটি তাদের জন্য হয়ে উঠতে পারে ‘পারমাণবিক হুমকি’।
বুধবার ওয়াশিংটন-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ (সিএসআইএস)-এর প্রকাশিত এক নতুন প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনটি তুলে ধরে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানায়, উত্তর কোরিয়ার ‘সিনপুং-ডং’ নামের এই ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি চীন সীমান্ত থেকে মাত্র ২৭ কিলোমিটার (১৭ মাইল) দূরে অবস্থিত।
এতে ৯টি পারমাণবিক আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) এবং এগুলোর মোবাইল লাঞ্চার মজুত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এই ঘাঁটিটি উত্তর কোরিয়ার ১৫ থেকে ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং ওয়ারহেড মজুত কেন্দ্রগুলোর একটি। উত্তর কোরিয়া কখনওই এই ঘাঁটির কথা প্রকাশ করেনি।
‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ স্যাটেলাইটে তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে, উত্তর কোরিয়ার শরণার্থী ও কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার নিয়ে এবং গোপনীয়তামুক্ত নথি এবং ওপেন-সোর্স ডেটার ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, “ঘাঁটির ক্ষেপণাস্ত্রগুলো পূর্ব এশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের জন্য সম্ভাব্য পারমাণবিক হুমকি হয়ে আছে।”
গত কয়েক বছরে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের শাসনামলে অস্ত্র কর্মসূচি গতি পেয়েছে। তারা দ্রুতই সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক করে তুলছে। নতুন অস্ত্র উন্নয়ন করছে এবং আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করছে।
এইসব ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় যে কোনও জায়গায় আঘাত হানতে সক্ষম। উত্তর কোরিয়ার এই ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার লঙ্ঘন।
কিন্তু উত্তর কোরিয়া, ইউক্রেইনে রাশিয়ার আক্রমণের পর থেকে মস্কোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়িয়েছে। ইউক্রেইন যুদ্ধে রাশিয়ার হয়ে লড়ার জন্য সেনাও পাঠিয়েছে।
সেকারণে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে যে, রাশিয়া এর বিনিময়ে উত্তর কোরিয়াকে প্রযুক্তি ও অন্যান্য সরঞ্জাম সরবরাহ বাড়িয়ে দিতে সহায়তা করতে পারে।
সিএসআইএস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন সীমান্তের কাছেন গোপন ঘাঁটিটি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি জোরদারের চেষ্টারই অংশ। এটি একটি সরু পাহাড়ি উপত্যকায় অবস্থিত।
ঘাঁটিটি প্রায় ২২ বর্গকিলোমিটার (৫ হাজার ৪৩৬ একর) জুড়ে অবস্থিত। এটি আয়তনে নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের চেয়েও বড়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমান্তের কাছে এই ঘাঁটির অবস্থান ভৌগোলিক দিক থেকেও সুবিধাজনক। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো এই ঘাঁটিতে হামলা করার বিষয়ে সতর্ক থাকতে পারে। কারণ, সেখানে কোনও কিছু ঘটলে পার্শ্ববর্তী চীনে তা প্রভাব ফেলতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের ইওহা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লেইফ-এরিক ইজলি বলেছেন, “চীনের এত কাছে ঘাঁটি তৈরি করে, উত্তর কোরিয়া আক্রমণ ঠেকানোর জন্য বেইজিং এর প্রতিক্রিয়ার রাজনৈতিক ঝুঁকি এবং অনিশ্চয়তাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা নিতে পারে।”
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্যাটেলাইটের ছবি অনুযায়ী, ঘাঁটির নির্মাণকাজ ২০০৪ সালে শুরু হয়েছিল। এটি ২০১৪ সাল থেকে কার্যকর রয়েছে। তখন থেকে ঘাঁটিটি ভালভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করে আসা হচ্ছে এবং সক্রিয়ভাবে উন্নত করে গড়ে তোলা হচ্ছে।
ঘাঁটিতে কোন মডেলের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মজুত আছে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে গবেষকদের ধারণা, এই ঘাঁটিতে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক-সক্ষম হাওয়াসং-১৫ বা হাওয়াসং -১৮ আইসিবিএমএস অথবা অন্য কোনও ধরনের আইসিবিএমএস ক্ষেপণাস্ত্র থাকতে পারে, যা এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
ঘাঁটিতে ট্রান্সপোর্টার লাঞ্চার বা মোবাইল লাঞ্চার রয়েছে, যা দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে সক্ষম। তাছাড়া সঙ্কট বা যুদ্ধের সময় এই লাঞ্চার এবং ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ঘাঁটি থেকে দ্রুত সরানোও যাবে- বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
উত্তর কোরিয়ার হাতে ৪০ থেকে ৫০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড আছে বলে ধারণা করা হয়। তাছাড়া, অঞ্চলজুড়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে সেগুলো দিয়ে আঘাত হানার উপায়ও তাদের আছে বলে মনে করা হয়।
