Published : 24 Feb 2026, 01:22 AM
২০২২ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি ভোরে কিইভের এক হোটেলের হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় জমে যাওয়া ছাদে দাঁড়িয়ে তখনও সীমান্ত জুড়ে সেনা সমাবেশের পরও রাশিয়ার আগ্রাসনকে প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছিল।
ক্রেমলিনের দাপুটে নেতা ভ্লাদিমির পুতিন চেচনিয়া, জর্জিয়া, সিরিয়া, ক্রাইমিয়া এবং পূর্ব ইউক্রেইনেও সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে তুলনামূলক কম ক্ষয়ক্ষতিতে সাফল্য পেয়েছিলেন।
কিন্তু ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ ইউক্রেইনে আক্রমণ করা যে বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তা স্পষ্টতই পুতিনের মতো একজন ঠান্ডা মাথার কৌশলীকেও ভাবিয়ে তোলার কথা ছিল।
দৃশ্যত তা হয়নি। কিইভের ওপর বৃষ্টির মতো ক্ষেপণাস্ত্র ঝরেছে। গত চার বছরের এই সংঘাত কেবল রাশিয়ার ভুল ধারণাকেই সামনে আনেনি, বরং এটি কিইভের মিত্রদের সেই বিশ্বাসকেও পাল্টে দিয়েছে যে,ইউক্রেইন এই আক্রমণ ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট সংগঠিত নয়।
একইসঙ্গে অপরাজেয় হিসেবে পরিচিত রাশিয়ার বিশাল সামরিক বাহিনীর সম্মানেও বড় ধরনের চিড় ধরেছে।
থিঙ্কট্যাঙ্ক 'রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট'-এর গবেষণা বলছে, রাশিয়া যখন তাদের ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ শুরু করে, তখন তারা আশা করেছিল মাত্র ১০ দিনের মধ্যে ইউক্রেইনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে।
কিন্তু ১ হাজার ৪৫০ দিন পেরিয়ে এসে সেই সময়সীমা আজ নৈরাশ্যজনকভাবে অপরিণামদর্শী এবং ভুল হিসাব-নিকাশ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, যার ফলে ধ্বংসলীলা চলছে ও রক্তবন্যা বইছে।
হতাহতের ভয়াবহ পরিসংখ্যান:
রাশিয়া তাদের পক্ষে হতাহতের প্রকৃত তথ্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গোপন রাখলেও আন্তর্জাতিক সূত্রগুলো চোখ কপালে ওঠার মতো পরিসংখ্যান দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক 'সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ' (সিএসআইএস)-এর সর্বশেষ গবেষণা অনুযায়ী, ইউক্রেইনে রাশিয়ার পূর্ণ মাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১২ লাখ রুশ সেনা নিহত বা আহত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোনও বড় শক্তির দেশের কোনও যুদ্ধে এত বেশি মানুষ হতাহত হয়নি। রাশিয়ার এই হতাহতের পরিসংখ্যানে ইউক্রেইনের হতাহতের সংখ্যা ধরা হয়নি, যা ৫ থেকে ৬ লাখের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়।
রাশিয়ার হতাহতের ওই পরিসংখ্যানের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার রুশ সেনা গত চার বছরে প্রাণ হারিয়েছে, যা ১৯৪৫ সালের পর থেকে কোরিয়া, ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত নিহতের সংখ্যার চেয়েও তিন গুণ বেশি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রায়ই ইউক্রেইন যুদ্ধে এই রক্তক্ষয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। যুদ্ধ পঞ্চম বছরে প্রবেশ করলেও পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। হতাহতের সংখ্যা কমার বদলে প্রতিটি মাসে ক্রমেই বাড়ছে।
রাশিয়া নিশ্চিত করে নিহতের সংখ্যা না জানালেও ইউক্রেইনের কর্মকর্তারা সম্প্রতি দাবি করেছেন, কেবল গতবছর ডিসেম্বরেই ৩৫ হাজার রুশ সেনা নিহত হয়েছে।
অর্থনীতি:
মস্কোর ঝলমলে রাজধানী দেখলে যুদ্ধের বীভৎসতাকে অনেক দূরের বিষয় মনে হতে পারে। দোকান, ক্যাফে, যানজট সবই সেখানে স্বাভাবিক।
২০২২ সালে ইউক্রেইনে রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে দেশটির ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আরোপ হওয়ার কারণে অর্থনীতি কিছুটা ধাক্কা খেয়েছিল।
কিন্তু এরপর রাশিয়ার অর্থনীতি আবার চাঙা হয় জ্বালানি তেল ও গ্যাস রপ্তানিকে কেন্দ্র করে। রাশিয়ার সামরিক ব্যয়ও তখন বাড়ে। নিষেধাজ্ঞার ফলে রাশিয়ার অর্থনীতি ধসে যাবে, পশ্চিমাদের এমন ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়।
২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবমতে, রাশিয়া বিশ্বের নবম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে, যা যুদ্ধের আগের ১১তম অবস্থানের চেয়ে উপরে। তবে যুদ্ধকালীন অর্থনীতির ভারসাম্যহীনতার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিতে শ্লথগতির লক্ষণ বাড়ছে।
সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়াতে বড় অঙ্কের বোনাস ও নিহতদের পরিবারকে আরও বেশি ক্ষতিপূরণ দিতে হচ্ছে। সামরিক শিল্পে অগ্রাধিকার দেওয়াযর কারণে অন্যান্য খাতে শ্রমিকসংকট দেখা দিয়েছে।
ক্রেমলিনপন্থি 'নেজাভিসিমা গাজেতা' পত্রিকা তীব্র শ্রমিকসংকটের কথা উল্লেখ করে প্রায় ৮ লাখ দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজনের কথা বলেছে।
সাধারণ মানুষের পকেটেও টান পড়ছে খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যপণ্যের চড়া মূল্যের কারণে। গত ডিসেম্বরের পর থেকে শসার দাম দ্বিগুণ হয়েছে।
অনলাইনে এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, “এক সময় বলা হতো ডিম হলো 'গোল্ডেন', এখন শসার দামও আকাশচুম্বী।” মুদ্রাস্ফীতি এবং কর বৃদ্ধির ফলে রুশরা এখন ঘরে বসেই যুদ্ধের চড়া মূল্য দিচ্ছে।
নেটো বিস্তার ও আন্তর্জাতিক অবস্থান:
পশ্চিমা সামরিক জোট নেটোর সম্প্রসারণ ঠেকানো ছিল ইউক্রেইনে রাশিয়ার যুদ্ধ শুরুর ঘোষিত কারণগুলোর একটি।
কিন্তু সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর পর নেটোতে যোগ দিয়েছে সুইডেন ও ফিনল্যান্ড। বিশেষ করে ফিনল্যান্ডের যোগদানে রাশিয়া ও নেটোর দেশগুলোর মধ্যকার সীমান্ত এখন আগের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি দীর্ঘ।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার কারণে রাশিয়া এখন চীনের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া এখন বেইজিংয়ের ‘জুনিয়র পার্টনারে’ পরিণত হয়েছে।
২০২৪ সালে বিদ্রোহীদের ঝটিকা অভিযানে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হলে রাশিয়া তাকে আশ্রয় দেয়।
মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার আরেক মিত্র ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সময়ও মস্কো নিষ্ক্রিয় ছিল।
ভেনেজুয়েলা থেকে মার্কিন বাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার হন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। তিনি ক্রেমলিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। তাকেও রাশিয়া রক্ষা করতে পারেনি। চার বছরের যুদ্ধে দেশের ভেতরে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চেও রাশিয়ার অবস্থান দুর্বল হয়েছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনেকেই ভাবেননি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেইনে সর্বাত্মক আগ্রাসনের নির্দেশ দেবেন।
কিন্তু তার সিদ্ধান্তের ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে যে আশঙ্কা ছিল, চার বছর পর তা ইউক্রেইন এবং রাশিয়ার জন্যও দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্য প্রমাণিত হয়েছে।
সূত্র: সিএনএন।