Published : 01 Sep 2026, 10:25 PM
প্রলয়ঙ্করী বন্যা ও ধসে প্রায় ৯০০ মানুষের মৃত্যুর পর নেপাল জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণে শীর্ষ দেশগুলোকে দায়ী করে তাদের কাছ থেকে ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেছেন, বিশ্বের শীর্ষ গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণকারী দেশ—চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের ঐতিহাসিক দায়িত্ব রয়েছে নেপালের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার।
নেপালের অর্থ মন্ত্রণালয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে এই দেশগুলোর কাছে জলবায়ু ক্ষতিপূরণের আনুষ্ঠানিক দাবি জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে।
একইসঙ্গে জলবায়ুজনিত বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলানোর জন্য জাতিসংঘের বিশেষ তহবিল ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ বা ক্ষতিপূরণ তহবিল থেকেও জরুরি আর্থিক সহায়তার অনুরোধ জানিয়েছে কাঠমান্ডু।
গত ২৬ অগাস্ট নেপালের তিব্বত সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলে ওই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়। এখনও নিখোঁজ বহু মানুষ। যত সময় এগোচ্ছে, তাদেরকে জীবিত উদ্ধারের আশা তত ক্ষীণ হচ্ছে।
কান্তিপুর টিভি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেন, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরনে নেপালের ভূমিকা একেবারেই নগণ্য, অথচ অন্য দেশগুলোর তৈরি করা জলবায়ু সংকটের চরম মূল্য দিতে হচ্ছে নেপালকে।
তিনি বলেন, "হিমবাহের দ্রুত গলন এবং এই প্রলয়ঙ্করী পাহাড়ি সুনামি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনেরই প্রত্যক্ষ ফল।” খানাল জোর দিয়ে বলেন, দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তা কোনও করুণা বা দান নয়, বরং এটি একটি নৈতিক দায়বদ্ধতা।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, "আমরা আমাদের কূটনৈতিক অবস্থানকে ‘সহায়তা’ থেকে ‘ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ’এর দাবিতে রূপান্তর করছি।
এটি কোনও দান-খয়রাত নয়; এটি আইনি ও নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়।" আসন্ন সব আন্তর্জাতিক ফোরামে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বিষয়টি তুলে ধরা হবে বলে জানান তিনি।
দক্ষিণ এশিয়ার সভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, "যদি আমাদের হিমালয়ের হিমবাহগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়, তবে গঙ্গা ও ত্রিশূলির মতো নদীগুলোর ওপর নির্ভরশীল দক্ষিণ এশিয়ার ২০০ কোটিরও বেশি মানুষের পানি নিরাপত্তা স্থায়ীভাবে হুমকির মুখে পড়বে। আমরা কেবল নেপালের জন্য নয়, পুরো দক্ষিণ এশীয় সভ্যতার টিকে থাকার লড়াই করছি।"
খানাল জানান, নেপালে ঘটে যাওয়া দুর্যোগ কোনও সাধারণ বন্যা ছিল না। এর ভয়াবহতা প্রকাশ করার মতো ভাষাও অপ্রতুল। বন্যার পানির উচ্চতা ২০ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল এবং তা ঘণ্টায় ১৮০ কিলোমিটার বেগে ধেয়ে আসে।
তিনি বলেন, "এটি ছিল টর্নেডোর মতো তীব্র গতির এক বিপর্যয়, যাকে অনেকে যথার্থভাবেই 'হিমালয়ান সুনামি' বলছেন। নেপালের মানুষের স্মৃতিতে এমন দুর্যোগের উদাহরণ আর নেই।"
প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলার ১০টি পৌরসভার ৩০ থেকে ৩২টি ওয়ার্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এছাড়া, নিম্ন অববাহিকার গোর্খা ও চিতওয়ানেও এর আঘাত পড়েছে। এতে কয়েক দশ হাজার বসতবাড়ি, বহু স্কুল এবং শত কোটি রুপির জলবিদ্যুৎ প্রকল্প কাদা ও পাথরের নিচে চাপা পড়েছে।
জলবায়ু বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়ার হারের চেয়ে হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা অনেক দ্রুত বাড়ছে।
কাঠমান্ডুভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট’ (আইসিআইএমওডি) জানায়, হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো আশঙ্কাজনক হারে বরফ হারাচ্ছে।
পাশাপাশি পারমাফ্রস্টের ক্ষয়, পাহাড়ের ভঙ্গুর ঢাল, হিমবাহ হ্রদের বিস্ফোরণ ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এই অঞ্চলে বন্যা ও ধসের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি জলবিদ্যুৎ হওয়ায় নেপালের জন্য এই ঝুঁকি এখন অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
ওদিকে, দুর্যোগের পর ভোটেকোশি-ত্রিশূলি অঞ্চলের জলবিদ্যুৎ সুরঙ্গে আটকা পড়াদের উদ্ধারে সহায়তার হাত বাড়িয়েছে প্রতিবেশী চীন ও ভারত।
ভারত ৫৭.৫ টন ত্রাণসামগ্রী, ১৯ জন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও ১৩ জন সামরিক সদস্য পাঠিয়েছে। অন্যদিকে, চীন পাঠিয়েছে ৪টি বিশেষায়িত সুরঙ্গ উদ্ধারকারী দল।
এছাড়া, দুর্গতদের পুনর্বাসনে যুক্তরাষ্ট্র ৫ লাখ ডলার এবং অস্ট্রেলিয়া ১০ লাখ ডলার আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।