Published : 09 Sep 2026, 06:47 PM
যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পূর্তির ঠিক আগে দিয়ে নিউ ইয়র্ক শহরের কিছু গোপন সরকারি নথি প্রকাশ্যে এসেছে।
এসব নথি থেকে জানা যায় যে, হামলার পর সেখানকার বাতাস কতটা ক্ষতিকর ও বিষাক্ত ছিল এবং এই বিপজ্জনক বায়ুর গুণমান সম্পর্কে সরকার সাধারণ মানুষের কাছে সত্য গোপন করেছিল বা তাদেরকে ভুল বুঝিয়ে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিল।
মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার ধসে পড়ার পর তৈরি হওয়া তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কিত প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার পৃষ্ঠার অপ্রকাশিত এসব নথি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করেন।
নথি প্রকাশের সময় মামদানি বলেন, দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে নিউ ইয়র্কবাসী তৎকালীন নগর প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া নিয়ে যেসব প্রশ্নের উত্তর পাননি, এই উদ্যোগের মাধ্যমে সেই ঐতিহাসিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
আমেরিকার তৎকালীন নগর ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দিকে সরাসরি আঙুল তুলে মামদানি বলেন, “সরকার যদি ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়িয়ে শুরু থেকেই প্রয়োজনীয় সব সহযোগিতা দিত, তবে অন্য কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা এর থেকে বহু দূরে।”
মেয়র আরও বলেন, “মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, কারণ তারা যাদের বিশ্বাস করত, সেই নেতারাই মিথ্যা বলেছিলেন যে, এই বিষাক্ত বাতাসে নিশ্বাস নেওয়া সম্পূর্ণ নিরাপদ।”
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চারটি বিমান ছিনতাই করে নজিরবিহীন সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে দুটি বিমান দিয়ে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের জোড়া টাওয়ার গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, যেখানে ঘটনাস্থলেই ২,৭৫৩ জন মারা যান।
অন্য দুটি বিমানের একটি পেন্টাগনে এবং অপরটি পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে বিধ্বস্ত হলে সব মিলিয়ে প্রায় তিন হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।ম্যানহাটনে ভবন ধসে পড়ার পর বিষাক্ত ধূলিমেঘ ছড়িয়ে পড়ে এবং ধ্বংসস্তূপে মাসের পর মাস আগুন জ্বলতে থাকে।
হাজার হাজার পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকারী উপযুক্ত সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়াই দিনরাত সেখানে কাজ করেন। এমনকি হামলার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ‘ওয়ান লিবার্টি প্লাজা’সহ ক্ষতিগ্রস্ত আশেপাশের ভবনে স্থানীয় বাসিন্দা ও কর্মীদের ফিরে আসার অনুমতি দেওয়া হয়।
পরবর্তী বছরগুলোতে ‘গ্রাউন্ড জিরো’ এলাকায় অবস্থানকারী ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়ে। অনেকের তৎক্ষণাৎ শ্বাসকষ্ট ও পরিপাকতন্ত্রের রোগ দেখা দেয়, আবার অনেকের ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী ব্যাধি ধরা পড়ে।
প্রকাশিত নথির মধ্যে রয়েছে ২০০১ সালের অক্টোবরে তৎকালীন ডেপুটি মেয়র রবার্ট হার্ডিংকে পাঠানো একটি গোপনীয় স্মারকপত্র, যা ‘হার্ডিং মেমো’ নামে পরিচিত।
হার্ডিং মেমোতে দেখা যায়, বাতাস বিষাক্ত হওয়া ও সুরক্ষা সরঞ্জাম ত্রুটিপূর্ণ থাকায় শহরের বিরুদ্ধে অন্তত ১০ হাজার আইনি মামলা হতে পারে বলে আগেই আশঙ্কা করেছিলেন নগর কর্মকর্তারা।
মামলা ও আর্থিক দায়বদ্ধতা এড়াতে তারা মার্কিন কংগ্রেসের তহবিল ও সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণের আবেদনের পরিকল্পনাও করেন।
২০০২ সালের ফেব্রুয়ারির আরেকটি মেমোতে দেখা যায়, প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য জেরি ন্যাডলার ম্যানহাটনের বাতাসে বিপজ্জনক মাত্রায় ‘অ্যাসবেস্টস’ উপস্থিতির যে অভিযোগ তুলেছিলেন, তা প্রকাশ পেলে ব্যাপক জনরোষ সৃষ্টি হতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন কর্মকর্তারা।
তৎকালীন মেয়র রুডি জুলিয়ানির বিশেষ উপদেষ্টা এস্টার ফুক্স নথিতে স্বীকার করেন যে, ধূলিকণায় অ্যাসবেস্টসের উপস্থিতি ছিল। অ্যাসবেস্টস ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি এবং ‘মেসোথেলিয়োমা’ নামক বিরল ক্যানসারের জন্য দায়ী।
বাসিন্দাদের শুধু ভেজা নেকড়া দিয়ে ঘর পরিষ্কার করার যে পরামর্শ শহর আগে দিয়েছিল, তা অবিলম্বে বন্ধের সুপারিশ করে ফুক্স লিখেছিলেন, “অন্তত মানুষকে ভেজা নেকড়া দিয়ে ঘর মুছতে বলার উপদেশ দেওয়া বন্ধ করা উচিত।”
দীর্ঘ দুই দশক ধরে ‘৯/১১ হেলথ ওয়াচ’-সহ বিভিন্ন অধিকার রক্ষা গোষ্ঠীর আইনি লড়াইয়ের মুখে শেষ পর্যন্ত এসব নথি প্রকাশ করতে বাধ্য হলো সিটি প্রশাসন।
বিগত চারটি নগর প্রশাসনকে আমলাতন্ত্র ও আইনি জটিলতায় সত্য চেপে রাখার জন্য দায়ী করে নিউ ইয়র্কের মেয়র মামদানি জানান, আগামী এক বছরে আরও লাখ লাখ পৃষ্ঠা তথ্য প্রকাশ্যে আনা হবে।
মামদানি বলেন, “প্রতিটি নিউ ইয়র্কবাসীর প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে, যাতে ‘কখনও ভুলব না’ কথাটি যেন কেবল মুখের ফাঁকা বুলি হয়ে না থাকে, তা বাস্তবে প্রমাণ করা।”
'৯/১১ হেলথ ওয়াচ'-এর নির্বাহী পরিচালক বেনিয়ামিন শেভাত এই নথি প্রকাশকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে চারটি ভিন্ন নগর প্রশাসন সাধারণ জনগণ, মার্কিন কংগ্রেস এবং সিটি কাউন্সিলের কাছ থেকে লোয়ার ম্যানহাটন ও পশ্চিম ব্রুকলিনের বিষাক্ত কেমিক্যালের প্রকৃত বিপদের তথ্য লুকিয়ে রেখেছিল। তারা বিপজ্জনক তথ্য জানার পরও জনগণকে বায়ু ‘নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য’ বলে বার্তা দিয়ে গেছে।”
সংবাদ সম্মেলনে মামদানির পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন বিখ্যাত কৌতুক অভিনেতা ও ভুক্তভোগী অধিকারকর্মী জন স্টুয়ার্ট। তিনি কঠিন অসুস্থতার মধ্যেও তথ্যের জন্য লড়াই করে যাওয়া বাসিন্দাদের শ্রদ্ধা জানান।
স্টুয়ার্ট বলেন, “তথ্যগুলো হয়ত পরিবারগুলোর ক্ষতি রুখতে পারত না। তবে ম্যানহাটনে বসবাসকারী আমরা সবাই যে জানতাম মাটিতে ও বাতাসে বিষ ছিল—তা সরকারকে দিয়ে স্বীকার করাতে এই চরম ভোগান্তি পোহাতে হত না।”
তিনি আরও বলেন, “সামনে এখনও অনেক কাজ বাকি রয়েছে।”
যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন’ (সিডিসি)-এর হিসাবে, ওই হামলায় অন্তত ৪ লাখ মানুষ বিষাক্ত ধূলিকণা ও কেমিক্যালের সংস্পর্শে এসেছিলেন।
‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার হেলথ প্রোগ্রাম- এর তথ্য অনুযায়ী, ১১ সেপ্টেম্বরের মূল ঘটনার পর বিগত ২৫ বছরে বিষাক্ত বাতাস ও পরিবেশগত কারণে তৈরি হওয়া মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৪,৩৪৩ জন মারা গেছেন।