Published : 26 Aug 2026, 10:24 PM
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের একটি হাসপাতালের মাতৃসদনে বুধবার ভোরের আলো ফুটার পরই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে ১৪ জন নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় এক মা জানিয়েছেন সেখানকার দরজা তালাবদ্ধ ছিল।
নবজাতকদের বাবা-মায়েদের অভিযোগ, উদ্ধারের জন্য তাদেরকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে।
হিবসা ওয়ালিদ নামের এক নারী পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস (পিআইএমস) হাসপাতালের ওই কক্ষের কাছেই ছিলেন। তার ভাবি কয়েক দিন আগেই সেখানে সন্তান জন্ম দেন।
হিবসা প্রথমে কারও চিৎকার শুনে ভেবেছিলেন কোনও রোগীর হয়তো মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু একটু পরই তিনি ধোঁয়া দেখতে পান।
এরপর দুজন মিলে নবজাতককে নিয়ে দ্রুত সেখান থেকে বের হয়ে যান।
হিবসা বলেন, “আমরা আমাদের জিনিসপত্রের কথাও ভাবিনি। শুধু শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়েই দৌড়ে নিচে নেমে যাই। কিছু রোগী ওই রাতেই সন্তানজন্ম দিয়েছিলেন। আমরা কীভাবে নিচে নেমে নামতে পেরেছিলাম, তা নিজেও জানি না। সবকিছু ঘোরের মতো লাগছিল।”
পিআইএমস হাসপাতালটি ইসলামাবাদের অন্যতম প্রধান সরকারি হাসপাতাল। সেটির মাতৃসদন ইউনিটের তৃতীয় তলার শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। ওই কক্ষে ১৫ জন নবজাতক ছিল। তাদের মধ্যে মাত্র একজনকে বাঁচানো গেছে।
৪০ বছর বয়সী খুররম মেহমুদ বার্তা গণমাধ্যমকে বলেন, উদ্ধারকর্মীদের জন্য তাদেরকে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “আমি মেয়েকে হারিয়েছি। তার বয়স ছিল মাত্র তিনদিন।”
নিহত আরেক নবজাতকের মা জাওয়েরিয়া জানান, মাতৃসদনের দরজা তালাবন্ধ করা ছিল। তিনি বলেন, “আমি দুই ঘণ্টা ধরে শুধু কাঁদছিলাম আর আর্তনাদ করছিলাম। পুলিশ চার ঘণ্টা পর এসে বলে, তারা তদন্ত করতে এসেছে।”
এই মায়ের প্রশ্ন, “চিকিৎসকেরা কেন শিশুদেরকে সেখানে ফেলে রেখে গেলেন? উদ্ধারকারী দল, পুলিশ নিপাত যাক! শিশুরা সেখানে পুড়ে মারা গেল, কিন্তু কেউ তাদের বাঁচাতে পারল না।”
হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক রানা ইমরান সিকান্দার অবশ্য বিবিসি-কে বলেছেন, ওয়ার্ডের দরজা তালা মারা ছিল না, তবে সেখানে কর্মী পাহারা ছিল। সরকারি হাসপাতালগুলোতে এর আগে শিশু চুরির ঘটনা ঘটেছে। শিশু চুরি ঠেকাতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
হিবসা ওয়ালিদ অভিযোগ করে বলেন, বড় হাসপাতাল হওয়ার পরও পিআইএমএস- এ পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল না। তিনি বলেন, “সেখানে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ও নির্দিষ্ট নিরাপত্তাবিধি থাকার কথা ছিল। কিন্তু কেউ কিছু করছিল না। সবাই কেবল প্রাণভয়ে ছুটছিল।”
নবজাতক হারানো আরেক বাবা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, তিনি আট দিন ধরে ওই ওয়ার্ডে যাতায়াত করছিলেন। ভবনটিতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বা বের হওয়ার সঠিক কোনও পথ ছিল না।
তিনি বলেন, “সব দরজা বন্ধ থাকত। শিশুদের দেখার জন্য কেবল একটি দরজাই খোলা ছিল। আমরা বারবার শিশুদের দেখতে আসব সেই ভয়ে তারা অন্য দরজাগুলোতে তালা দিয়ে রাখত।”
বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় সেখানকার দায়িত্বে কোনও কর্মী ছিলেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, সাধারণ মানুষকে দরজা ভাঙতে হয়েছিল। আর উদ্ধারকর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে জানালা ভাঙতে বাধ্য হয়েছিল।
আবদুল গফুর নামের আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তিনি ভবনে ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মাতৃসদন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি। তিনি বলেন, “ভেতরে কেবল ঘন কালো ধোঁয়া ছিল আর রোগীরা আটকা পড়েছিলেন। উদ্ধারকারী দল প্রায় দুই ঘণ্টা পর সেখানে পৌঁছায়।”
সম্প্রতি কয়েক বছরে পাকিস্তানে বেশ কয়েকটি বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের ঘটনায় প্রাণহানির জন্য দুর্বল অগ্নিনিরাপত্তা আইন, ত্রুটিপূর্ণ ভবন নির্মাণবিধি এবং আইনের প্রয়োগ না থাকাকেই দায়ী করা হয়।