সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে সেনা আহত: উত্তর কোরিয়ার কাছে ক্ষমা দাবি সিউলের
দুই কোরিয়াকে বিভক্তকারী বাফার জোনে এই বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সেনা আহত হন। উত্তর কোরিয়ার পুঁতে রাখা মাইনের কারণেই এমনটি ঘটেছে বলে অভিযোগ দক্ষিণ কোরিয়ার।
দুই কোরিয়ার সীমান্তের অসামরিক অঞ্চলে (ডিএমজেড) চলতি মাসে স্থলমাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরীয় সেনাসদস্যরা আহত হওয়ার ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছে সিউলের সামরিক বাহিনী।
২১ সেপ্টেম্বর দুই কোরিয়াকে বিভক্তকারী এই বাফার জোনে হওয়া বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সেনাসদস্য আহত হন।
মঙ্গলবার সিউল জানায়, ডিএমজেডের দক্ষিণ কোরিয়া অংশের ভেতরে হওয়া ওই বিস্ফোরণ উত্তর কোরিয়ার পুঁতে রাখা মাইনের কারণেই ঘটেছে বলে তারা “নিশ্চিত”। এ ঘটনাকে দশকের পর দশক ধরে চলে আসা যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন উল্লেখ করে এর জবাবে “উপযুক্ত পদক্ষেপ” নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটি।
তবে এই বিস্ফোরণের দায় অস্বীকার করেছে উত্তর কোরিয়া। সিউলের দাবিকে “ভিত্তিহীন” আখ্যা দিয়ে পিয়ংইয়ং বলেছে, উপদ্বীপে উত্তেজনা বাড়াতে এটি তাদের সাজানো “নাটক”।
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং অভিযোগ করে বলেছেন, দক্ষিণ কোরিয়া “রাজনৈতিক ও সামরিক উসকানি” দিতেই এসব কথা বানিয়ে বলছে।
মাইন পুঁতে আসতে উত্তর কোরিয়ার সেনারা সীমান্ত পার হয়েছিল, এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করে কিম ইয়ো জং বলেন, উত্তেজনা বৃদ্ধির দায় উত্তর কোরিয়ার ওপর চাপাতে সিউল “পরিকল্পিতভাবে মনগড়া বক্তব্য প্রচার করছে”।
বুধবার দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি দক্ষিণ কোরিয়াকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “নিজেদের তৈরি নাটকের মাশুল গুনতে তাদের প্রস্তুত থাকা উচিত।”
অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার দাবি, সীমান্ত সুরক্ষিত করার অংশ হিসেবেই পিয়ংইয়ং এসব মাইন পুঁতেছিল। বুধবার এক বিবৃতিতে পিয়ংইয়ংকে ক্ষমা চাইতে হবে বলার পাশাপাশি সীমান্তে এমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার কাজ অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে সিউল।
এর আগে মঙ্গলবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাং শিন-চুল বলেন, এই বিস্ফোরণ ১৯৫৩ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির “স্পষ্ট” লঙ্ঘন, যা কোরীয় যুদ্ধের সক্রিয় সংঘাত বন্ধ করেছিল।
ওই চুক্তির অধীনে দুই দেশের মূল সীমান্ত রেখাকে (সামরিক ডিমার্কেশন লাইন) ঘিরে ৪ কিলোমিটার প্রশস্ত অসামরিকীকৃত অঞ্চল বা ডিএমজেড গঠিত হয়। তবে পরবর্তী দশকগুলোতে এই অঞ্চলে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ ও মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে আসছে।
এর আগে ২০১৫ সালে ডিএমজেডে টহল দেওয়ার সময় স্থলমাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার দুই সেনা পঙ্গু হন। সিউলের অভিযোগ ছিল, তাদের একটি গার্ড পোস্টের কাছে উত্তর কোরিয়ার সেনারা গোপনে মাইন পুঁতে রেখেছিল। পিয়ংইয়ং সেবারও অভিযোগ অস্বীকার করেছিল।
বুধবারের বিবৃতিতে সেই ২০১৫ সালের ঘটনার কথা উল্লেখ করে কিম ইয়ো জং দাবি করেন, সেবারেও উত্তেজনা বাড়াতে দক্ষিণ কোরিয়া ওই ঘটনাকে “উসিলা” হিসেবে ব্যবহার করেছিল এবং এবারও তারা একই কাজ করছে।
২০১৫ সালের পর পিয়ংইয়োং ও সিউলের সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটেছে, যা যেকোনও ছোটখাটো ঘটনাতেই বড় সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ক্রাইসিস গ্রুপ’-এর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ক্রিস্টোফার গ্রিন বিবিসি-কে বলেন, “উত্তর কোরিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে সীমান্ত আরও দুর্ভেদ্য করে তুলছে এবং আন্তঃকোরীয় সম্পর্ক কার্যত মুছে ফেলার চেষ্টা করছে।”
তিনি আরও বলেন, “এর ফলে ২০১৫ সালে দুই কোরিয়ার মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ের যোগাযোগের যে সুযোগ ছিল, তা এখন আর নেই। কোরীয় উপদ্বীপে আকস্মিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়াটা মাত্র কয়েক ধাপের বিষয়, আর ২০১৫ সালের তুলনায় সেই ধাপে পৌঁছানোর দূরত্ব এখন আরও কমে এসেছে।”
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর ‘জাতিসংঘ কমান্ড’ (ইউএনসি) জানিয়েছে, ১৯৫৩ সালের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের এই বিষয়টি বিদ্যমান কাঠামোর মাধ্যমেই সমাধান করা হবে।
এক বিবৃতিতে জাতিসংঘ কমান্ড জানায়, “ইউএনসি যুদ্ধবিরতি চুক্তি বজায় রাখা ও প্রয়োগে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে কোরীয় উপদ্বীপে স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং উত্তেজনা বৃদ্ধি রোধে নিজেদের দায়িত্ব পালনে আমরা বদ্ধপরিকর।”
