২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬ আশ্বিন ১৪৩৩

জলবায়ু পরিবর্তন হিমালয় অঞ্চলে বিপর্যয়কর বন্যার ঝুঁকি বাড়িয়েছে, বলছেন বিশেষজ্ঞরা

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ সপ্তাহে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ঘটা হড়পা বানের মতো বিপর্যয়ের আশঙ্কা আরও বাড়ছে বলে অভিমত বিজ্ঞানীদের।

জলবায়ু পরিবর্তন হিমালয় অঞ্চলে বিপর্যয়কর বন্যার ঝুঁকি বাড়িয়েছে, বলছেন বিশেষজ্ঞরা
চীন-নেপাল সীমান্তের কাছে হিমবাহ ধসের জায়গায় তৈরি হওয়া হ্রদের স্যাটেলাইট ছবি। ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 28 Aug 2026, 12:40 AM

Updated : 16 Sep 2026, 01:01 PM

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উঁচু পর্বতের শিলা ও বরফ দুর্বল হয়ে পড়ায় বাড়ছে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি। 

ফলে এ সপ্তাহে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের হিমালয় অঞ্চলে ঘটা ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার মতো বিপর্যয়ের আশঙ্কা আরও বাড়ছে, যাতে প্রাণহানি হয়েছে ৩৮৯ জনের- বিশেষজ্ঞরা এমনটিই বলছেন।

বৃহস্পতিবার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যায় এক হাজারের বেশি মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্তত ৮০০ জন বিদেশি। 

আগের দিন হিমবাহ ধসে পলিমাটি ও পাথরের বিশাল অংশ হিমালয়ের একটি নদীতে আছড়ে পড়ে। এরপরই প্রলয়ংকরী বন্যায় উপত্যকা ও পাহাড়ি জনপদ ভেসে যায়।

আর্থ সায়েন্সেস নিউজিল্যান্ডের ‘মাউন্টেনস টু সি’ কর্মসূচির প্রধান বিজ্ঞানী সাইমন কক্স বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উঁচু পর্বতের পাথর ও বরফের ভিত নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে হিমবাহ ধস এবং চলতি সপ্তাহে নেপালে ঘটে যাওয়া হড়পা বানের মতো দুর্যোগ ঘন ঘনই ঘটছে।”

দুর্যোগের সঠিক কারণ এখনও খুঁজে দেখা হচ্ছে

বুধবারের ওই বিপর্যয়কর বন্যার মূল কারণ জানতে এখনও বিচার-বিশ্লেষণ চলছে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, নেপালের ‘লাংটাং লিরুং’ চূড়ার উত্তর ঢালে একটি বিশাল হিমশিলা ধসে পড়ে এবং সেই ধস তিব্বত অংশের লেহন্দে খোলা নদীতে আছড়ে পড়লে এই বিপর্যয় ঘটে।

সীমান্তজুড়ে অন্তত ৬টি বড় জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধ্বংস হয়েছে জিরং বন্দরের বাণিজ্যকেন্দ্রের অবকাঠামো। ভারত সীমান্তের কাছাকাছি ভাটির ১০০ কিলোমিটারের বেশি এলাকার নদীর গতিপথও এর প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বুধবারের ওই ধসের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনই একমাত্র ও তাৎক্ষণিক কারণ নয়, বরং বিশ্ব উষ্ণায়ন বেড়ে যাওয়া ও হিমবাহ গলে যাওয়াও হয়ত ভূমিকা রেখেছে।

বিজ্ঞানী সাইমন কক্স বলেন, তাপমাত্রা বাড়লে খাড়া ঢালে বরফের বাঁধন আলগা হয়ে যায় এবং গলিত বরফের পানির প্রবাহ বাড়ে।

তাছাড়া, বরফ জমাট বাঁধা ও গলে যাওয়ার চক্র এবং বৃষ্টির ধরনও পরিবর্তন হয়। এসব কারণে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং কিছু জায়গায় ধসের ঘটনা আরও বেড়ে যায়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন ঘটনা দেখা গেছে

সম্প্রতি কয়েক বছরে এই অঞ্চলে বারবার এমন বিপর্যয় দেখা গেছে, যদিও সেগুলো ছিল তুলনামূলক ছোট মাত্রার। 

এর মধ্যে আছে- তিব্বত-নেপাল সীমান্তের জিরংয়ে ২০২৫ সালের বন্যা, ২০২৪ সালে শেরপাদের থামে গ্রামে হিমবাহের হ্রদ ভাঙা বন্যা এবং এর আগে ২০২৩ সালে ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সিকিমে হওয়া দুর্যোগ।

হিন্দুকুশ পর্বতমালাজুড়ে বন্যা, ভূমিধস, তুষারধস ও খরার প্রকোপ দিন দিন বাড়ছে। নেপালভিত্তিক ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেইন ডেভেলপমেন্ট’জানিয়েছে, পানি, ভূমি ও বাতাসের দ্রুত পরিবর্তন এই অঞ্চলের মানুষকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

কেন্দ্রটির এক বিশেষজ্ঞ ফারুক আজম বলেন, পাহাড়ে তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় পৃথিবীর বরফাবৃত অংশ অতীতের যে কোনও সময়ের তুলনায় অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে। 

তিনি মনে করেন, অতিরিক্ত তুষার গলে যাওয়ার পাশাপাশি ভূকম্পনের কারণে সম্ভবত বরফ ও শিলার প্রাথমিক ধস নেমেছিল। আর তা থেকেই বুধবার নেপালের ভোটে কোশি নদীর ভাটিতে আকস্মিক বন্যা হয়।

দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা উদ্বেগজনক

হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের ২০২৩ সালের তথ্যানুযায়ী, বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে মাত্র ৩০ বছরের ব্যবধানে নেপালের তুষারাবৃত পাহাড়গুলো তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। 

সংস্থাটি তখন আরও জানিয়েছিল, নেপালের হিমবাহগুলো আগের দশকের তুলনায় গত দশকে ৬৫ শতাংশ দ্রুতগতিতে গলেছে।

হংকংয়ের সিটি ইউনিভার্সিটির ‘দ্য স্কুল অব এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’-এর ডিন বেনজামিন হর্টন বলেন, বুধবারে নেপালে ঘটে যাওয়া দুর্যোগ অনেকগুলো ঘটনার প্রভাবে সংঘটিত ঘটনার একটি বড় উদাহরণ হতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমবাহ ক্ষয়, হিমায়িত মাটি গলে যাওয়া এবং পাহাড়ি ঢাল নড়বড়ে হয়ে পড়ার সঙ্গে ভূমিকম্প হলে তখন এমনটি ঘটে। 

এর ফলে একক কোনও কারণে ঘটা ক্ষয়ক্ষতির চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও বিপর্যয়কর ক্ষয়ক্ষতি হয় বলে জানান হর্টন। 

তিনি বলেন, “উচ্চ পাহাড়ি অঞ্চলে দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা বাড়াতে এই পর্যায়ক্রমিক ঝুঁকিগুলো বোঝা অত্যন্ত জরুরি|”

নেপালে ভয়াবহ বন্যায় মৃত্যু বেড়ে ৩৮৯