১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ভারতীয় তরুণদের নিয়ে যেভাবে অনলাইন ‘সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক’ গড়লেন পাকিস্তানের শাহজাদ ভাট্টি

সোশ্যাল মিডিয়ায় 'রবিনহুড' সেজে ভারতীয় তরুণদের অপরাধ জগতে টানার অভিযোগ। পাকিস্তানের এই গ্যাংস্টারের নেটওয়ার্ক ভেঙে ভারতের ১৪ রাজ্য থেকে ২৫০ জনের বেশি গ্রেপ্তার।

ভারতীয় তরুণদের নিয়ে যেভাবে অনলাইন ‘সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক’ গড়লেন পাকিস্তানের শাহজাদ ভাট্টি
শাহজাদ ভাট্টি। ছবি: এনডিটিভি

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 20 Aug 2026, 11:05 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:52 PM

শাহজাদ ভাট্টি একদিকে পাকিস্তানের গ্যাংস্টার, অন্যদিকে সোশাল মিডিয়ায় তিনি ‘ভাই’, ‘রবিনহুড’ কিংবা দরিদ্রদের ত্রাতা। চকচকে গাড়ি, জনপ্রিয় পাঞ্জাবি গান, বলিউড সিনেমার ডায়লগ, বিদেশের বিলাসবহুল জীবন—সব মিলিয়ে তিনি তৈরি করেছেন এক অভিনব অনলাইন পরিচয়।

এই পরিচয়ের আড়ালেই ভাট্টি ভারতীয় তরুণদের একাংশকে অপরাধ এবং সন্ত্রাসের দিকে টানার চেষ্টা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে।

গত ১২ অগাস্ট একদিনেই ভারতের ১৪টি রাজ্য থেকে ভাট্টির সঙ্গে যোগ থাকার অভিযোগে ২৫০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।

তিনি জানান, ভারতে স্বাধীনতা দিবসের সময় দেশজুড়ে বড় সন্ত্রাসী হামলার ছক ছিল। কিন্তু সময়মতো ভাট্টি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে এই নাশকতা এড়ানো গেছে।

গত কয়েক বছর ধরে ভারতে সন্ত্রাস ও নাশকতার ছক বদলেছে পাকিস্তানের বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন। আর এই আবহেই সামনে এসেছে শাহজাদ ভাট্টির নাম।

ভারতীয় পত্রিকা এনডিটিভি-র তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ বিভাগ (এনডিটিভি ডেটাফাই) সোশাল মিডিয়ায় সক্রিয় গ্যাংস্টার শাহজাদ ভাট্টির অনলাইন জগৎ ('ভাট্টি-ভার্স') গভীরভাবে খতিয়ে দেখেছে।

এর মাধ্যমে তারা বের করার চেষ্টা করেছে, ভাট্টি কীভাবে তার বিশাল অনলাইন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন এবং কোন কৌশলে তরুণ ভারতীয়দেরকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে প্ররোচিত করেছেন।

কে এই ভাট্টি? তার নেটওয়ার্কই বা কী ভাবে কাজ করে?

গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নজরদারিতে থাকা আন্তঃসীমান্ত অপরাধজগতের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে উঠে এসেছে ভাট্টির নাম। আগে গ্যাংস্টার হিসাবে পরিচিতি ছিল তার। পরে নাম জড়ায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে। তার মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে ভারত।

ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, হোয়াটসঅ্যাপ এবং ইউটিউব মিলিয়ে তার নামে দু’ডজনেরও বেশি অ্যাকাউন্ট ও পেজ সক্রিয় রয়েছে।

সব মিলিয়ে সেগুলির ফলোয়ার সংখ্যা এক কোটিরও বেশি। এর বাইরে ‘৩৩৩’ এবং ‘সফটঅয়্যার আপডেট’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করা আরও বহু অ্যাকাউন্ট রয়েছে।

তার অনলাইন নেটওয়ার্ক খুব বেশি পেশাদারও নয়, বরং তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর এর বড় অংশ নির্ভরশীল বলে এনডিটিভি-র বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভাট্টির নেটওয়ার্কের লক্ষ্য হচ্ছে এমন ভারতীয় তরুণরা, যারা দরিদ্র এবং একই সঙ্গে দ্রুত অর্থ ও পরিচিতি পাওয়ার আশায় অপরাধজগতে প্রবেশ করতে দ্বিধা করে না।

ভাট্টির নেটওয়ার্কের বড় অংশ পরিচালনা করে পাকিস্তানে থাকা তরুণ ভিডিও এডিটররা। তার অনলাইন উপস্থিতি বাইরে থেকে দেখলে পাকিস্তানি গ্যাংস্টার বা সন্ত্রাসী হ্যান্ডলারের প্রচারণা বলে সহজে বোঝা যায় না।

ভাট্টির পুরনো ভিডিও নতুন করে সম্পাদনা করে জনপ্রিয় গান, ওয়েব সিরিজের ডায়লগ এবং ভারতীয় প্রসঙ্গ জুড়ে তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। সরকারি নিষেধাজ্ঞায় কোনও অ্যাকাউন্ট বন্ধ হলে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে ফের প্রচার শুরু করারও অভিযোগ রয়েছে।

ভাট্টির ভিডিওগুলোতে কখনও দেখা যায় বাঘ-সিংহের সঙ্গে তার ছবি, কখনও দামি গাড়ির কনভয়, অস্ত্র প্রদর্শন কিংবা বিদেশের অভিজাত রেস্তোরাঁ। এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় দরিদ্রদের সাহায্য করার ছবি বা ভিডিও। অর্থাৎ, তৈরি করা হয় গ্ল্যামারাস ইমেজ।

অনুসারীরা ভাট্টিকে দরিদ্রদের সাহায্যকারী একজন দয়ালু ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরেন। একটি ভিডিওতে তাকে এক ব্যক্তিকে তার মেয়ের বিয়ের জন্য আরও অর্থ পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিতে দেখা গেছে।

ভারতীয় মুসলিম যুবকদের কাছে পৌঁছতে ভাট্টি দেশটির নানা ঘটনা নিয়ে কনটেন্ট তৈরি করেন। ধর্মীয় আবেগ উসকে দিতে পারে, এমন বিষয় নিয়েও তিনি ভিডিও পোস্ট করেন। একইসঙ্গে তার পোস্টের ক্যাপশনে ভারত-সম্পর্কিত হ্যাশট্যাগ চোখে পড়ে।

ভারতের সুবিধাবঞ্চিত ও অপরাধপ্রবণতার ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের লক্ষ্য করে এই অনলাইন নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছে এবং পাকিস্তান ও উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এই নেটওয়ার্ক চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে।

ভারতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানো এবং দলে নতুন সদস্য সংগ্রহের কাজ করে তার নেটওয়ার্ক। আর এজন্য হাতিয়ার করা হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ‘এনক্রিপ্টেড’ যোগাযোগ মাধ্যমকে।

বিদেশে থেকেও ভাট্টি ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাপ্রবাহের ওপর নজর রাখেন। সুযোগ পেলেই বিভাজনমূলক বক্তব্য ছড়ানোর চেষ্টা করেন। চলতি মাসের শুরুতে পাঞ্জাবের গুরদাসপুরে রণজিৎ সিং নামের এক তরুণ নিহত হওয়ার ঘটনায় ভিডিও পোস্ট করেন ভাট্টি।

তিনি ঘটনাটিকে ‘ভুয়া এনকাউন্টার’ বলে দাবি করেন এবং ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ওই তরুণকে নিশানা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন।তাছাড়া, ভারতীয় মুসলিম তরুণদের আকৃষ্ট করতে ভাট্টি প্রায়ই ইসলামবিরোধী কথা বলা বা মুসলিমদের ক্ষতি করতে চায় এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন।

গত ১২ অগাস্ট ভারতজুড়ে গ্রেপ্তার অভিযানের পর ভাট্টি নতুন একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট খোলেন। সেখানে তিনি ভারতে থাকা অনুসারীদের অ্যাকাউন্টটি অনুসরণ, পোস্টে লাইক বা মন্তব্য না করার পরামর্শ দেন, যাতে ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তাদের শনাক্ত করতে না পারে। যোগাযোগের জন্য সরাসরি বার্তা পাঠানোর কথা বলেন তিনি।

ফাঁদে পা তরুণদের

ভাট্টির প্রচারে আকৃষ্ট হয়ে ভারতের কিছু তরুণ তার প্রতি প্রকাশ্যে আনুগত্য প্রকাশ করছে। এমনকি কেউ কেউ তার নির্দেশে অপরাধে জড়ানোর আগ্রহও প্রকাশ করেছে।

এক তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাট্টিকে লিখেছে, তার কোন ‘শত্রুর’ বাড়িতে বোমা হামলা চালাতে হবে তার নাম তাকে পাঠাতে। পাঞ্জাবের আরেক তরুণও ভাট্টির সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

পাঞ্জাবের আরেক যুবক আরমান দীপ অমৃতসরের একটি নিরাপত্তা সংস্থার ইউনিফর্ম পরা নিজের ছবি পোস্ট করেন এবং ভাট্টির একটি ভিডিওতে মন্তব্য করে তার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছাও প্রকাশ করেন।

 শাহজাদ ভাট্টির বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকারও অভিযোগ আছে।

তিনি মহারাষ্ট্রের রাজনীতিবিদ বাবা সিদ্দিকি হত্যাকাণ্ডের এক অভিযুক্তকে ভারত থেকে পালাতে সহায়তা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া, গত বছর পাঞ্জাবের গুরুদাসপুরে একটি থানায় গ্রেনেড হামলার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে।

ভাট্টির নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি প্রায় ৭ বছর আগে বিদেশে চলে গেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন ভিডিও থেকে ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমানে তিনি দুবাই থেকে তার অনলাইন নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন।