ফ্রান্সজুড়ে ধর্মঘট, রাজপথে পৌনে ৬ লাখ মানুষ
ফ্রান্সে বেতন বৃদ্ধি ও শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে দেশব্যাপী ধর্মঘটে রাজপথে নামে পৌনে ছয় লাখ মানুষ
বেতন বৃদ্ধি ও শিক্ষা খাতের সংস্কারসহ নানা দাবিতে ফ্রান্সজুড়ে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে।
রয়টার্স লিখেছে, বৃহস্পতিবার এই কর্মসূচিতে বিভিন্ন শহরের রাস্তায় নামেন প্রায় ৫ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ।
সেপ্টেম্বর থেকে দেশটিতে অসন্তোষের যে ঢেউ শুরু হয়েছিল, তার মধ্যে একদিনে এটিই ছিল বিক্ষোভকারীদের সবচেয়ে বড় জমায়েত।
গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে ব্যাপক সহিংসতা হয়েছিল। তবে বৃহস্পতিবারের কর্মসূচি মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ ছিল। কেবল কয়েকটি শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
বিক্ষোভের পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের কর্মীরা ধর্মঘটে যান। তাতে বেশ কিছু স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও রেল যোগাযোগে কর্মী সংকট দেখা দেয় এবং স্বাভাবিক কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়। তবে হাসপাতালগুলোতে এর প্রভাব খুব একটা পড়েনি।
শুরুতে শিক্ষাঙ্গনে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছিল।
পরে বড় বড় ট্রেড ইউনিয়ন ও আট বছর আগে আত্মপ্রকাশ করা ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীরাও তাতে যুক্ত হয়। ফলে এটি সর্বাত্মক এক সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয়।
ধর্মঘটের প্রভাব
শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ডাককর্মী, চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট ও পরিবহন শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্বকারী বড় ইউনিয়নগুলো বৃহস্পতিবার এই দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দেয়।
সরকারি হিসাবে, বিক্ষোভের কারণে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর এক-তৃতীয়াংশেই স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
এ ছাড়া স্কুলকর্মীদের প্রায় ১৩ শতাংশ ধর্মঘটে যোগ দেন। তবে ইউনিয়নগুলোর দাবি, কর্মবিরতিতে অংশ নেওয়া কর্মীর সংখ্যা ছিল আরও অনেক বেশি।
রেলকর্মীদের একাংশ ধর্মঘটে থাকায় ট্রেন চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে। তবে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ধর্মঘটের প্রভাব ততটা ছিল না।
ফ্রান্সের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে সিএনএন জানায়, স্বাস্থ্যকর্মীদের মাত্র ৫ শতাংশ ধর্মঘটে অংশ নেয়। ফলে চিকিৎসা সেবায় বড় কোনো বিঘ্ন ঘটেনি।
সংঘর্ষ ও আটক
তিন সপ্তাহ আগের সহিংসতার পর এবারের বিক্ষোভ ঘিরে প্রশাসন ও ব্যবসায়ীরা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। কিছু বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ ছাড়া মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবেই দিনটি পার করেছে ফ্রান্স।
দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, রেন, নান্তেস, লিওঁ ও মার্সেইসহ কয়েকটি শহরে উগ্র বামপন্থি কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। দেশজুড়ে মোট ৪৪৮ জনকে আটক করে পুলিশ।
লিওঁতে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস ছোড়ে ও ধাওয়া দেয়।
অন্যদিকে রেন শহরে একটি হোটেলে ভাঙচুর, পুলিশের দিকে ঢিল নিক্ষেপ ও মিছিলে অংশ নেওয়া ইউনিয়ন কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় কয়েক ডজন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে জানান, তুলুজের কাছে একটি স্কুলে আগুন দেওয়া হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপক ক্ষতি হয়।
এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এদিন দমকল বাহিনী দেশজুড়ে ৮৬টি অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে আগুন নেভাতে গেছে।
আন্দোলনকারীদের একাংশ অভিযোগ তুলেছিল, তাদের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের স্বাধীনতায় পুলিশ বাধা দিচ্ছে। তবে সেই অভিযোগ নাকচ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ বলেন, সহিংসতার মুখেও পুলিশ সাহসিকতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে।
তিনি বলেন, “পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হচ্ছে। অথচ বিক্ষোভ যাতে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ থাকে, আমাদের সদস্যরা মূলত সেটিই নিশ্চিত করেছে।”
বিক্ষোভকারীদের দাবি
আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন গোষ্ঠীর দাবি ভিন্ন ভিন্ন। ধর্মঘটের ডাক দেওয়া ট্রেড ইউনিয়নগুলো মূলত মজুরি ও পেনশন বাড়ানোর দাবি তুলেছে।
সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন সিজিটি অবিলম্বে ন্যূনতম মজুরি ১০ শতাংশ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। আরেক ইউনিয়ন সিএফডিটি ন্যূনতম মাসিক বেতন ১০০ ইউরো বা প্রায় ৭ শতাংশ বৃদ্ধির দাবি করছে।
শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো শিক্ষা বাজেটে এক হাজার কোটি ডলারের বেশি বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে। সেই সঙ্গে স্কুল অবকাঠামোতে ১৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আড়াই লাখ আসন বাড়ানোর দাবি তাদের।
অন্যদিকে কট্টর ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনকারীরা সরাসরি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ ও তার সরকারের পদত্যাগ চেয়েছে। একই সঙ্গে তারা দেশে নতুন এক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরুর দাবি তুলছে।
আন্দোলন কি চলবে?
রয়টার্স লিখেছে, আন্দোলনকারীদের দাবিগুলো সহজে পূরণ করা সম্ভব নয়। ফলে এই বিক্ষোভ সহসাই থামছে না। আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন, বড়দিন, এমনকি আগামী বসন্তের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত তারা বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।
ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীরা শুক্রবার ও শনিবারও নতুন কর্মসূচির ডাক দিয়েছে।
ফ্রান্সের বাইরে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও এই অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ছে। চলতি মাসের শেষ দিকে স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল ও বেলজিয়ামেও বড় ধরনের ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে।
সরকারের অবস্থান
গত ১৭ অক্টোবরের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির পর এবার সরকার ‘চরম সতর্ক’ ছিল বলে বুধবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান সরকারের একজন মুখপাত্র।
সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনী সফল হলেও বিক্ষোভকারীদের দাবির বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁ।
ফরাসি সাংবাদিক ও ইউটিউবার উগো দেক্রিপ্তকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ছুটির পর হাই স্কুলগুলো খোলা থাকা দরকার, কারণ তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে তাদের ক্লাসে ফেরা জরুরি।
মাক্রোঁ দাবি করেন, তরুণদের কথা সরকার শুনেছে। আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অধিকার থাকলেও তিনি সবাইকে ক্লাসে ফেরার ও পরিস্থিতি শান্ত রাখার আহ্বান জানান।
