Published : 08 Aug 2026, 05:57 PM
সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের এক পরিত্যক্ত অভিজাত ফ্ল্যাট। ঘরের ছাদে ঝুলছে ঝকমকে ঝাড়বাতি, আর মেঝোজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে নামীদামি ব্র্যান্ডের পোশাক ও বিভিন্ন নথিপত্র।
ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য ছবির মধ্যে একটি ছবি বারবার চোখে পড়ে - ছিপছিপে গড়নের হাসিমুখের এক ব্যক্তি ক্ষমতাচ্যুত একনায়ক বাশার আল-আসাদের সঙ্গে উষ্ণ অভ্যর্থনায় হাত মেলাচ্ছেন। কাছেই স্তূপ করে রাখা সোনার পদক আর সনদে খোদাই করা একটি নাম - হুসাম লুকা।
সিরিয়ার সাধারণ মানুষের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘দ্য স্পাইডার’ বা ‘মাকড়সা’ নামে। আসাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও নির্দয় এই সহযোগী ছিলেন দেশটিতে নির্মম গণহত্যা ও পদ্ধতিগত নির্যাতনের প্রধান কারিগর। যে কারণে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল।
সিরিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘জেনারেল সিকিউরিটি ডিরেক্টরেট’ (জিএসডি) এর প্রধান হিসেবে তিনি ছিলেন দেশের সবচেয়ে আতঙ্কের নাম। তবে তার কাজ ছিল পর্দার আড়াল থেকে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যখন আসাদ সরকারের পতন ঘটে, তখন অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতো লুকাও এক রাতেই যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যান। তবে পেছনে ফেলে যান অসংখ্য প্রশ্ন আর স্বজনহারাদের বিচারের দাবি।
আসাদ পতনের পর সেই পরিত্যক্ত ফ্ল্যাটে যখন বিদ্রোহীরা লুকার খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছিল, তখন ঘরের এক কোণে রাখা একটি সাধারণ নোটবুক চোখে পড়ে। নীল কালিতে লেখা সেই ডায়েরিতে ছিল দোকানদার, ডাক্তার, সামরিক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে লুকা পরিবারের অনেকের নাম ও ফোন নম্বর।
এই ডায়েরি কি আসাদের এই গোয়েন্দাপ্রধানের কোনো সন্ধান দিতে পারবে?
একসময় সিরিয়ায় হুসাম লুকার ফোন নম্বর জানা খুব কঠিন কিছু ছিল না। ২০১১ সালে আসাদ সরকার যখন নির্মমভাবে গণতন্ত্রকামী গণঅভ্যুত্থান দমন শুরু করে, তখন যে গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত হয়, তাতে কয়েক লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সেই অভ্যুত্থান দমনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল পলিটিক্যাল সিকিউরিটি ডিরেক্টরেটের হোমসের স্থানীয় প্রধান লুকাকে।
বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো আসাদ বাহিনী অবরুদ্ধ করে রাখায় খাবারের অভাবে মানুষ ইঁদুর পর্যন্ত খেতে বাধ্য হয়েছিল। তৎকালীন বিদ্রোহী যোদ্ধা মোতাজ আল-জায়দি জানান, তাদের এলাকার দেয়ালে দেয়ালে লুকার নাম ও ফোন নম্বর লিখে রাখা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, যারা লড়াই ছেড়ে পালাতে চায়, তারা যেন এই নম্বরে কল দেয়।
কেউ কেউ নিরাপদ পথ পেলেও, এই নম্বরে কল দেওয়া বহু মানুষকে আর কোনো দিন খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিদ্রোহী ও সাধারণ মানুষের ওপর নজরদারির জন্য তৈরি করা তথ্যদাতাদের বিশাল এক জালের কারণে সবাই তাকে ডাকত ‘দ্য স্পাইডার’ বা ‘মাকড়সা’। মোতাজ আল-জায়দি তাকে ‘প্রতিভাবান শয়তান ও ‘শেয়াল প্রকৃতির মানুষ’বলে বর্ণনা করেন।
তবে হোমসে তার সবচেয়ে বর্বর কাণ্ডটি ঘটেছিল ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ঈদুল আজহার দিনে। বিকেল ৫টা ১০ মিনিটের দিকে আল-ওয়ায়ার এলাকার একটি খেলার মাঠে শিশুরা যখন খেলাধুলা করছিল, ঠিক তখনই বিমান হামলা চালানো হয়।
সাত বছরের শিশু ওয়ায়েলের বাবা মোহাম্মদ তাওয়াকাতলি কেঁদে কেঁদে বলেন, “মাঠটি রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল। ওরা সব পুঁচকে শিশু ছিল।”
সিরিয়ান নেটওয়ার্ক ফর হিউম্যান রাইটস-এর তথ্যমতে, সেই হামলায় ১৭ জন শিশু ও ৪ জন নারীসহ মোট ২৮ জন নিহত হয়। স্থানীয় একটি প্রতিরোধ গোষ্ঠী ও সংবাদমাধ্যম জানায়, সেদিন হামলার লক্ষ্যস্থল ঠিক করার পেছনে ছিলেন এই হুসাম লুকা।
হোমসে এমন নৃশংসতার পর লুকার দ্রুত পদোন্নতি হয় এবং তিনি গোটা জিএসডি-এর প্রধান হন। বিরোধী যোদ্ধা, সাংবাদিক, চিকিৎসক কিংবা মানবাধিকারকর্মী থেকে শুরু করে আসাদবিরোধী যে কাউকে তুলে নিয়ে নির্যাতন চালানো হতো দামেস্কের কুখ্যাত সিদনায়া কারাগারে, যাকে মানুষ বলত ‘মানুষের কসাইখানা’।
সেখানে যাওয়া বহু মানুষ আর ফেরেনি। লুকা নিজে এই বন্দিশালাগুলোর নজরদারি চালাতেন আর সিদনায়া কারাগারের যাবতীয় যোগাযোগের ওপর তাঁর বাহিনীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছিল।
আসাদ পতনের পর সিরিয়ার নতুন সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল হাসান আল-তুর্বা বিবিসিকে জানান, লুকার বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
নিহত শিশু ওয়ায়েলের বাবা মোহাম্মদ বলেন, “ওদের দেখতে মানুষের মতো হলেও ভেতরটা পশুর চেয়েও খারাপ। আমি চাই লুকাকে দেশে ফিরিয়ে এনে ফাঁসি দেওয়া হোক।”
লুকার ফ্ল্যাটে পাওয়া নীল কালির সেই ডায়েরিতে ছিল ১৫৫টি ফোন নম্বর। বিবিসি সাংবাদিকরা লন্ডন থেকে প্রতিটি নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা শুরু করেন।
এর মধ্যে ৫১টি নম্বর সচল পাওয়া যায়। সামরিক কর্মকর্তা ও আত্মীয়দের ফোন করা হলে তারা বিবিসির পরিচয় পাওয়া মাত্রই কল কেটে দেয় বা লুকাকে চেনার কথা অস্বীকার করে।
এরপর বিবিসির এক সাংবাদিক (যার নাম একসময় লুকার হিটলিস্টে ছিল) নিজে সিরিয়ায় যান তদন্তের জন্য। ডায়েরিতে থাকা বেশ কয়েকজন চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেন তিনি।
আলেপ্পোর এক চিকিৎসক প্রথমে লুকার চিকিৎসার কথা স্বীকার করলেও পরে সাংবাদিকদের টাকা ফেরত দিয়ে ক্লিনিক থেকে বের করে দেন।
দামেস্কের অন্য এক চিকিৎসক জানান, তিনি লুকার মায়ের সাথে চিকিৎসা সূত্রে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন, তবে বেশি তথ্য না দিয়ে লুকার মেয়ের ফার্মেসির ঠিকানা দেন। কিন্তু সেই মেয়েও ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে নিখোঁজ।
অবশেষে সাফল্য আসে ওই ফ্ল্যাটের এক সাবেক নিরাপত্তারক্ষীর মাধ্যমে। তিনি লুকার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী ‘মাহমুদ’ (ছদ্মনাম)-এর নম্বর দেন।
অনেক নাটকীয়তার পর মাঝরাতে এক হোটেলে মাহমুদের সাথে দেখা হয়। মাহমুদ জানান, আসাদ পতনের রাতে লুকা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি দামেস্ক ছেড়ে পালাবেন না, কিন্তু শেষ রাতে অফিসের সেফ থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ নিয়ে গোপনে পালিয়ে যান।
মাহমুদ ক্ষুব্ধ হলেও লুকার নম্বর দিতে রাজি হননি, তবে তিনি লুকার গাড়িচালকের নম্বর দেন। সেই চালক অত্যন্ত ভীতকণ্ঠে জানান, তিনি শুধুই একজন চালক ছিলেন এবং পরে আর যোগাযোগ রাখেননি।
লুকার পালানোর সম্ভাব্য পথ হিসেবে প্রতিবেশী লেবাননের দিকে নজর দেয় বিবিসি, কারণ ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে আসাদ সরকারের গভীর সম্পর্ক ছিল।
অনুসন্ধানে লেবাননের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, লুকা ভুয়া নাম ব্যবহার করে ভালো মানের একটি রুশ পাসপোর্ট নিয়ে লেবানন হয়ে রাশিয়ায় পালিয়ে গেছেন। রাশিয়ার সাথেও আসাদ সরকারের গভীর সম্পর্ক ছিল। এমনকি লুকার ফ্ল্যাটেও রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার নানা পুরস্কার ও কার্ড পাওয়া গিয়েছিল।
অবশেষে লেবাননে থাকা আসাদপন্থি এক সাবেক ব্যক্তির সূত্র ধরে লুকার একটি রাশিয়ান ফোন নম্বর (+৭ কোডের) উদ্ধার করা হয়।
নম্বরটি সত্যিই লুকার কি না তা নিশ্চিত করতে একটি কৌশল নেওয়া হয়। সেই ব্যক্তি স্পিকার ফোনে লুকাকে এমন কিছু ব্যক্তিগত প্রশ্ন করেন, যার উত্তর শুধু লুকারই জানা সম্ভব। অপর প্রান্তের ব্যক্তিটি প্রতিটি উত্তর নিখুঁতভাবে দেন।
পরে বিবিসি সাংবাদিক যখন ফোনটি হাতে নিয়ে নিজের পরিচয় দেন এবং গণহত্যা ও নির্যাতনের বিষয়ে প্রশ্ন করতে চান, তখন চরম আতঙ্কিত কণ্ঠে লুকা বলেন, “আমার বর্তমান অবস্থান থেকে ফোনে কোনো কথা বলা সম্ভব নয়। আপনারা বোঝার চেষ্টা করুন।”
রাশিয়ার কারণে কথা বলছেন না কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি কিছু বোঝাতে পারব না। বাইরের দেশে দেখাও করতে পারব না,” এই বলে তিনি ফোন কেটে দেন।
পরবর্তীতে সিরিয়ার অন্য একটি সচল নম্বরের ডিজিটাল লোকেশন ও মেসেজিং অ্যাপ ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর উপকণ্ঠে লুকার সুনির্দিষ্ট দুটি অবস্থানের সন্ধান পায় বিবিসি।
পরে তাকে আবার ফোন দেওয়া হলে বিবিসির নাম শুনেই তিনি সংযোগ কেটে দেন এবং হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো প্রশ্নেরও কোনো উত্তর দেননি।
লুকা এখন রাশিয়ায় অবস্থান করছেন নিশ্চিত হওয়া গেলেও তাকে বিচারের মুখোমুখি করা প্রায় অসম্ভব, কারণ মস্কো আসাদ সরকারের সহযোগীদের অন্য দেশের হাতে তুলে দেবে না। রাশিয়ার সরকারও বিবিসির এ সংক্রান্ত প্রশ্নের কোনো জবাব দেয়নি।
তবে হোমসের মাটিতে দাঁড়িয়ে নিহত শিশু ওয়ায়েলের বাবা মোহাম্মদ এখনও আশা ছাড়েননি। তিনি বলেন, “আমি আজও আশাবাদী যে একদিন না একদিন তারা বিচারের মুখোমুখি হবে। ওয়ায়েল তো মাত্র সাত বছরের একটি শিশু ছিল, খেলাধুলাই ছিল তার একমাত্র কাজ।”