Published : 07 Aug 2026, 08:55 PM
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান রাজ্যের ডেট্রয়েট শহরে গত বুধবার মার্কিন সেনেটের ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী বাছাইয়ের প্রাথমিক নির্বাচনে (দলীয় প্রাইমারি) প্রগতিশীল প্রার্থী আব্দুল আল-সাইয়েদের সমর্থকদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ হঠাৎ থমথমে হয়ে পড়েছিল।
নির্বাচনে আল-সাইয়েদের এগিয়ে থাকা ব্যবধান দ্রুত কমিয়ে আনছিলেন চার মেয়াদের কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্স। সাইয়েদের উপস্থিত সমর্থকদের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।
এমন অনিশ্চয়তার মধ্যেই মধ্যরাতের পর মঞ্চে ওঠেন জনস্বাস্থ্য অধিকারকর্মী আল-সাইয়েদ। কৌতুক করে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “আমি ইচ্ছা করেই এখন বিজয়ের ঘোষণা করতে পারছি না। দেখা যাচ্ছে মিশিগানে ভোট গুনতে বেশ দীর্ঘ সময় লাগে। এটি সত্যিই অনেক বড় একটি রাজ্য।”
এরপর তিনি সমর্থকদের মনে করিয়ে দেন যে, তার প্রচার শিবিরকে শক্তিশালী ইসরায়েলপন্থি লবি ‘আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি’ (আইপ্যাক) সহ বিভিন্ন বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠীর কয়েক কোটি ডলারের নির্বাচনী প্রচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
সাইয়েদ বলেন, “আমরা যদি এখান থেকে জিতে বের হয়ে আসি এবং ইনশাআল্লাহ্ যখন বের হয়ে আসব, তখন আমি চাই আপনারা তাদের মনে করিয়ে দিন যে, আমরা মুখে ৭ কোটি ডলারের ঘুষি সহ্য করে লড়াই চালিয়ে গেছি এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই করেই জিতেছি।”
ভোট গণনা যত এগোতে থাকে, স্টিভেন্স তার ব্যবধান কমিয়ে ১ শতাংশেরও নিচে নিয়ে আসেন। কিন্তু বুধবার সকালে সূর্য ওঠার বেশ খানিক্ষণ পর যখন চূড়ান্ত ফল আসে, তখন দেখা যায় খুবই কম ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেছেন আল-সাইয়েদ।
তিনি কেবল স্টিভেন্সকেই পরাজিত করেননি; একইসঙ্গে ইসরায়েলপন্থি গোষ্ঠীগুলোসহ মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রভাবশালী নীতিনির্ধারকদের বিরোধিতাও মোকাবেলা করেছেন। পার্টির শীর্ষ কর্মকর্তারা, এমনকি রাজ্যের ডেমোক্র্যাট গভর্নর গ্রেচেন হুইটমারের মতো কর্মকর্তাও প্রকাশ্যে আল-সাইয়েদের প্রতিপক্ষের সমর্থনে প্রচারণায় নেমেছিলেন।
তবে নির্বাচনের ফল গোটা মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেই স্তম্ভিত করেছে এবং ইসরায়েলপন্থি ডেমোক্র্যাটদের বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও এই ফলে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আল-সাইয়েদকে “কমিউনিস্ট ব্যর্থ লোক, যিনি ইহুদি ও ইসরায়েলকে ঘৃণা করেন” বলে কটূক্তি করেছেন।
তবে এই নির্বাচনী ফল থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট: কেবল বিপুল পরিমাণ নির্বাচনী অর্থ আর প্রভাবশালী দলীয় নেতাদের সমর্থনই যে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরে জয় নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়, তা প্রমাণিত হয়েছে।
‘আগের চেনা পরিস্থিতি আর নেই’
আল-সাইয়েদের সমর্থকরা বলছেন, দেরিতে আসা জয়ের উৎসব আর অল্প ব্যবধানের জয় এই নির্বাচনের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে কোনোভাবেই কমাতে পারে না।
ডেমোক্র্যাট রাজ্য বিধায়ক আলাবাস ফারহাত আল জাজিরাকে বলেন, আল-সাইয়েদের জয় এই বার্তাই দেয় যে, প্রার্থীরা যদি যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়ে আইপ্যাকের মতো স্বার্থগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দেখায়, তবে সাধারণ মানুষ তাদেরই ভোট দেবে।
ফারহাত বলেন, “রাজনীতিতে এখন আর আগের মতো চেনা পরিস্থিতি নেই। যেসব প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদ নির্বাচনী বৈতরণী অনায়াসে পার হতে অভ্যস্ত ছিলেন তাদের দিন ফুরিয়ে আসছে। এখন ভোটাররা তাদেরকেই চায় যারা এসে পুরোনো ব্যবস্থা ভেঙে দেবে এবং মিশিগান ও যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমজীবী পরিবারগুলোর জন্য বড় ও সাহসী পরিবর্তন নিয়ে আসবে।”
স্টিভেন্সের পেছনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির শক্তিশালী সমর্থন ছিল। তাকে সমর্থন দিয়েছিলেন গভর্নর হুইটমার, সাবেক সেনেটর ডেবি স্ট্যাবেনো, সেনেট ডেমোক্র্যাটিক লিডার চাক শুমার এবং বিদায়ী সেনেটর গ্যারি পিটার্স, যার ছেড়ে দেওয়া আসনেই স্টিভেন্স প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন।
স্টিভেন্সকে হারানোর ফলে আগামী নভেম্বরের মূল নির্বাচনে আল-সাইয়েদ লড়াই করবেন ট্রাম্প সমর্থিত সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সের বিরুদ্ধে, যিনি শক্তিশালী ইসরায়েলপন্থি লবিগুলোর সমর্থন পাবেন।
মিশরীয় বংশোদ্ভূত আব্দুল আল-সাইয়েদ নভেম্বরের নির্বাচনে জয়ী হলে তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রথম মুসলিম সেনেটর।
আইপ্যাক ইতোমধ্যে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে জানিয়েছে যে, নভেম্বরের মূল নির্বাচনে সাইয়েদকে হারাতে তারা তাদের বিপুল অর্থায়ন অব্যাহত রাখবে। এক বিবৃতিতে লবি গ্রুপটি বলেছে, “আমাদের সদস্যরা সংকল্পবদ্ধ যাতে আগামী নভেম্বরে ভোটাররা সাইয়েদ এবং তার চরমপন্থি ইসরায়েলবিরোধী এজেন্ডাকে প্রত্যাখ্যান করে।”
তবে নিজেদের এই পরাজয়কে খাটো করে দেখাতে আইপ্যাক অন্যান্য প্রগতিশীল প্রার্থীদের পরাজয়ের চিত্র তুলে ধরেছে। যেমন মিজৌরিতে আইপ্যাক সমর্থিত প্রার্থী ওয়েসলি বেল অনায়াসে প্রগতিশীল সাবেক কংগ্রেস সদস্য কোরি বুশকে হারিয়েছেন।
আইপ্যাক বলেছে, “আমাদের সমর্থিত কিছু প্রার্থী জয়ী না হওয়ায় আমরা হতাশ হলেও, আমাদের সম্প্রদায় সেই ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের পাশে দাঁড়াতে পেরে গর্বিত যারা শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অংশীদারিত্বকে সমর্থন করে।”
এমনকি জনমত জরিপগুলো যখন দেখা যাচ্চে যে, নভেম্বরের মূল নির্বাচন অত্যন্ত কঠিন হবে, তখনও মূলধারার বিশ্লেষকরা অল-সাইয়েদের প্রাইমারি জয়ের ঐতিহাসিক দিক তুলে ধরছেন।
বামপন্থি সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স আল-সাইয়েদের জয়কে আধুনিক মার্কিন রাজনীতির “সবচেয়ে অসাধারণ বিজয়” বলে বর্ণনা করেছেন।
পডকাস্ট ‘পড সেভ আমেরিকা’-তে স্যান্ডার্স বলেন, “আপনি কি কখনও শুনেছেন যে কোনও বড় নির্বাচনে প্রতিপক্ষের চেয়ে ৯ গুণ কম বাজেট নিয়ে একজন প্রার্থী সম্পূর্ণ দলীয় এস্টাবলিশমেন্টকে হারিয়ে জয়ী হয়েছেন? আমার স্মৃতিতে অন্তত এমন ঘটনার নজির নেই।”
প্রগতিশীলদের রাজ্যজুড়ে ও দেশব্যাপী উত্থান
মিশিগানের এই প্রাইমারিতে আল-সাইয়েদ কেবল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রগতিশীল অংশের হয়ে জয় ছিনিয়ে নেননি। বরং তার জয় পুরো রাজ্যে বামপন্থি প্রার্থীদের জন্য এক বড় মাইলফলক।
মঙ্গলবারের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে প্রগতিশীল রাজ্য প্রতিনিধি ডোনাভান ম্যাককিনি ইসরায়েলপন্থি শ্রী থানেদারকে পরাজিত করেছেন। এছাড়া, ডেট্রয়েটের উত্তরের একটি জেলায় বামপন্থি জলবায়ু সংগঠক উইলিয়াম লরেন্স ১৫ পয়েন্টের বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন।
ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, পেনসিলভেইনিয়া, নিউ জার্সি থেকে শুরু করে নিউ ইয়র্ক পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক স্থানে প্রগতিশীলরা একইভাবে বেশ কয়েকজন ক্ষমতাসীন সদস্যকে পরাজিত করে নিরাপদ ডেমোক্র্যাটিক আসনগুলোতে জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন।
আল-সাইয়েদের জয়ের বিশেষত্ব কেবল বিপুল অর্থ ও হেভিওয়েট প্রতিপক্ষকে হারানোই নয়; তিনি ১০ মিলিয়ন জনসংখ্যা অধ্যুষিত এমন একটি দোদুল্যমান রাজ্যে জয় পেয়েছেন, যা দুই বছর আগেও ডনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিল।
পেনসিলভেইনিয়ার প্রগতিশীল রাজ্য প্রতিনিধি ক্রিস র্যাব বলেন, প্রগতিশীল প্রার্থীরা ভোটারদের সঙ্গে সহানুভূতিশীল ও বাস্তবিক উপায়ে সম্পৃক্ত হতে পারছেন বলেই জয়ী হচ্ছেন।
তিনি বলেন, “ডেমোক্র্যাটিক এস্টাবলিশমেন্টকে এখন তাদের নির্বাচনী অংক নতুন করে মেলাতে হবে। পুরোনো যে কৌশলগুলো ছিল সেগুলো এখন অকার্যকর। আল-সাইয়েদ এমন ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে আসছেন, যারা দীর্ঘদিন ভোট দেননি কিংবা জীবনে প্রথমবার ভোট দিতে এসেছেন।”
তিনি আরও বলেন, “ডেমোক্র্যাটিক দলের ভিত্তি বা সমর্থন বাড়াতে আল-সাইয়েদের যে দক্ষতা রয়েছে, তা তার জন্য নভেম্বরে রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য রজার্সকে পরাজিত করতে সহায়ক হবে।”
‘আমরা স্বাস্থ্যসেবায় অর্থ দিতে চাই, যুদ্ধে নয়’
আল-সাইয়েদের নির্বাচনী প্রচারণার মূল স্লোগান ছিল: “রাজনীতি থেকে অর্থের প্রভাব হটাও। পকেটে অর্থ আন। সবার জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত কর।”
তার মূল নজর ছিল জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর। কিন্তু আইপ্যাকের বিপুল অর্থায়ন এবং ইসরায়েল কেন্দ্রিক মেরুকরণের কারণে পশ্চিম এশিয়া নীতি ও বিশেষ করে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ এই নির্বাচনের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত হয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশ্লেষক রাসেল এলিস আল জাজিরাকে বলেন, পুরো যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ভোটাররা এখন ইসরায়েল ও আইপ্যাকের ওপর চরম ক্ষুব্ধ।
তিনি বলেন, “করদাতাদের টাকায় হত্যাযজ্ঞ চালাতে বোমাবর্ষণ বন্ধের পক্ষে যেসব আমেরিকান ‘সীমারেখা’ টেনেছেন, তাদের সংখ্যা মানুষ যা ভাবছে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি। এটি বিশাল। অধিকাংশ মার্কিনিই একমত যে, মার্কিন করদাতাদের টাকায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের বোমা ব্যবহার করে গাজা, সুদান বা কঙ্গোয় গণহত্যা চালানো কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
ইসরায়েলের নীতিগুলোর সমালোচনা করলেও আল-সাইয়েদ সবসময় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুকে মিশিগানের মানুষের কাছে ফিরিয়ে এনেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র যেখানে পশ্চিম এশিয়ার মিত্র ইসরায়েলকে কোটি কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দিচ্ছে এবং ইরান যুদ্ধে অর্থ উড়াচ্ছে, যে যুদ্ধ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বহু দশক ধরে চেয়ে আসছিলেন, সেখানে আল-সাইয়েদের স্পষ্ট বার্তা ছিল, যুদ্ধের এই অর্থ মিশিগান ও যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের উন্নয়নে খরচ করা উচিত।
‘ইউএস ক্যাম্পেইন ফর প্যালেস্টাইন রাইটস অ্যাকশন’- এর রাজনৈতিক পরিচালক ইমান আবিদ বলেন, “মিশিগানে সাইয়েদের ঐতিহাসিক জয় প্রমাণ করে যে ব্যালট বাক্সে ফিলিস্তিনের নীতিই বারবার জয়ী হবে। আইপ্যাক কোটি কোটি ডলার ঢেলে অপপ্রচার চালাতে পারে, কিন্তু আমেরিকান ভোটাররা আমাদের করের টাকায় বিদেশে পরিবারগুলোর ওপর বোমা ফেলা সমর্থন করে না। আমরা স্বাস্থ্যসেবায় অর্থ দিতে চাই, যুদ্ধে নয়।”
ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান-ডিয়ারবর্নের অধ্যাপক স্যালি হাওয়েল, যিনি আরব-আমেরিকান ও মুসলিম-আমেরিকান সম্প্রদায় নিয়ে গবেষণার পথিকৃৎ, তিনি আল জাজিরাকে বলেন, সাইয়েদের জয় মিশিগানের রাজনীতিতে এক প্রকৃত পরিবর্তনের সূচনা করেছে।
হাওয়েল বলেন, “এটি আমাদের বলে দেয় যে, সাধারণ ভোটাররা ওয়াশিংটন এবং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদদের ওপর চরম হতাশ। তারা একই পুরোনো ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি চায় না, তারা এমন নেতৃত্ব চায় যারা প্রকৃত পরিবর্তন আনতে পারবে।”