Published : 03 Sep 2026, 04:22 PM
নেপালের তিব্বত সীমান্তের অদূরে বিশাল হিমবাহ ধসের ৩৮ মিনিট পর রসুয়া জেলার আক্রান্ত এলাকার মানুষের মোবাইলে জরুরি সতর্ক বার্তা পৌঁছায়। কিন্তু বার্তা পাওয়ার আগেই নেমে আসা হড়পা বান ও পাথরের আঘাতে বহু গ্রাম ও ঘরবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশে যায়।
দেশটির গণমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্ট লিখেছে, সেই ভয়ংকর প্রলয়ের মুখে পড়েন রসুয়া জেলার হাকুবেসি গ্রামের বাসিন্দা নিমা দোর্জে তামাং। নিমেষেই মাথার চেয়েও উঁচু পাহাড়ি ঢল এসে আঘাত হানে তার ওপর।
তারমধ্যেই কোনোমতে পাহাড়ের উপরের দিকে উঠে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি, কিন্তু একটি পাথর পড়ে পা ভেঙে যায় তামাংয়ের। এরপর ঢলের তোড়ে ভেসে গেলেও অলৌকিকভাবে একটি গাছ ধরে বেঁচে যান তিনি।
দীর্ঘ ২৪ ঘণ্টা অর্ধচেতন অবস্থায় থাকার পর উদ্ধার পান তিনি, হেলিকপ্টারে করে তাকে কাঠমান্ডুর হাসপাতালে নেওয়া হয়।
তামাং প্রাণে বাঁচলেও হারিয়েছেন তার চাচা, চাচি, বোন ও ভগ্নিপতিকে। ২৬ অগাস্ট সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে তিব্বত সীমান্তবর্তী লেন্দে উপত্যকায় হিমবাহের বিশাল একটি অংশ ধসে পড়ার পর এভাবেই বরফ, পানি ও কাদায় প্লাবিত হয় চারপাশ।
৩৮ মিনিটের বিলম্ব ও কাঠামোগত দুর্বলতা
হিমবাহ ধসের পর রসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও চিতওয়ান অঞ্চলের মানুষের মোবাইলে সতর্কবার্তা পৌঁছাতে সময় লাগে ৩৮ মিনিট। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পাঠানো ক্ষুদে বার্তায় তাৎক্ষণিকভাবে উঁচু নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
কিন্তু ততক্ষণে নদী তীরের অনেক বসতি ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেপালের দুর্যোগ সতর্কীকরণ ব্যবস্থাটি মূলত কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগভিত্তিক, যা ধসের ফলে সৃষ্ট জটিল পাহাড়ি ঢল ও হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া বন্যা মোকাবিলায় যথেষ্ট নয়।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (এনডিআরআরএমএ) সাবেক প্রধান নির্বাহী অনিল পোখরেল বলেন, “নেপালে প্রকৃত অর্থে সমন্বিত কোনো আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নেই। কেবল কিছু সেন্সর বসানোকেই পুরো ব্যবস্থা বলা যায় না।”
তিনি জানান, কেবল নদীর পানি বৃদ্ধি মাপার সেন্সর দিয়ে এ ধরনের অতি তীব্রগতির হিমবাহ ধস বা পাহাড়ি ঢল আগে থেকে শনাক্ত করা সম্ভব নয়। ঘটনার দিন সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে রসুয়ার জলবিজ্ঞান কেন্দ্রের সেন্সরটি পানির তীব্র তোড়ে ভেসে গিয়েছিল।
চীন-নেপাল সীমান্তে সমন্বয়ের অভাব
হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্ট এই দুর্যোগ নেপাল ও চীনের মধ্যে সীমান্ত অঞ্চলের তথ্য আদান-প্রদানের বড় ধরনের ফাঁকফোকর উন্মোচন করেছে। তিব্বত থেকে উৎপন্ন লেন্দে নদীটি নেপালের ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীতে এসে মিশেছে।
২০১৯ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও নেপালের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবী ভাণ্ডারীর মধ্যে পরিবেশ সুরক্ষায় সহযোগিতার সমঝোতা হলেও, সীমান্ত অঞ্চলগুলোর মধ্যে জরুরি বার্তা পাঠানোর কোনো বাধ্যবাধকতামূলক প্রোটোকল আজও তৈরি হয়নি।
এনডিআরআরএমএ-র ভূতত্ত্ববিদ প্রকাশ পোখরেল জানান, অন্য দেশের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত তথ্য আদান-প্রদান করতে হলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এতে জরুরি মুহূর্তে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না।
এছাড়া স্যাটেলাইট ছবির মাধ্যমে বরফের ভেতরের ফাটল বা ধসের ঝুঁকি আগাম টের পাওয়া অত্যন্ত কঠিন বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে আঘাত ও অর্থনৈতিক ক্ষতি
এই ভয়াবহ বন্যায় রসুয়া ও নুয়াকোট জেলার অন্তত ১৩টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে নেপালের জাতীয় গ্রিড থেকে প্রায় ৪৩১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যা নেপালের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ১০ শতাংশ।
ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্পগুলোর মধ্যে 'উজান ত্রিশূলী-১' এবং 'ত্রিশূলী ৩এ' অন্যতম।
এগুলোতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি), আইএফসি এবং চীনের এক্সিম ব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার বিপুল পুঁজি বিনিয়োগ করা রয়েছে।
'সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ড্যামস, রিভার্স অ্যান্ড পিপল'-এর সমন্বয়ক হিমাংশু ঠাক্কর বলেন, স্পর্শকাতর হিমালয় অঞ্চলে অপরিকল্পিত সুরঙ্গ নির্মাণ, বিস্ফোরণ ও নদী ভরাট করে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলায় বিপর্যয়ের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে প্রকল্প অর্থায়নকারী ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতার মারাত্মক অভাব রয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি)-এর তথ্যমতে, হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলে ৫৪ হাজার হিমবাহ এবং ২ হাজারের বেশি হিমবাহ হ্রদ রয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বরফ গলার হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বৈশ্বিক দুর্যোগ মোকাবিলায় কেবল নিজেদের ভেতরের সতর্কীকরণ ব্যবস্থা বাড়ালেই চলবে না। একই সঙ্গে চীন, নেপাল ও ভারতের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার করা জরুরি।
হাকুবেসি গ্রামে তামাংয়ের স্বজনসহ বহু মানুষ এখনো খাদ্যসংকটে ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আটকা পড়ে আছেন। ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ পৌঁছাতে বিলম্ব হওয়ায় তাদের দিন কাটছে চরম আতঙ্কে।