Published : 25 Feb 2026, 05:08 PM
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে একাধিক জরিপে প্রেসিডেন্টের প্রতি ভোটারদের আস্থা কমে যাওয়া এবং ব্যাপক অসন্তোষের ইঙ্গিত মেলার পরও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তার স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে নিজের সফলতার গুণগান করে বলেছেন, তার হাত ধরেই ‘যুক্তরাষ্ট্রে স্বর্ণযুগের’ সূচনা হয়েছে।
বছরের শেষদিকের নির্বাচনে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো লাগতে পারে, রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের এ উদ্বেগ কমাতে ট্রাম্প মঙ্গলবার তার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভাষণের প্রথম ঘণ্টা ব্যয় করেছেন অর্থনীতি নিয়েই। বলেছেন, তিনি মূল্যস্ফীতি শ্লথ করেছেন, স্টক মার্কেটকে রেকর্ড উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, ব্যাপক কর কমানো ও ওষুধের দাম কমানোর আদেশে স্বাক্ষর করেছেন।
কিন্তু তার এসব মিষ্টি মিষ্টি কথা জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষুব্ধ ভোটারদের আশ্বস্ত করতে পারবে কিনা তা স্পষ্ট হওয়া যায়নি। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামের জন্য ট্রাম্প বারবারই পূর্বসূরী জো বাইডেনকে দায়ী করে এসেছেন। তবে জনমত জরিপগুলোতে ভোটাররা ব্যয় সাশ্রয়ে তেমন কিছু না করার জন্য ট্রাম্পকেই দায়ী করছেন; যদিও এই ব্যয় সাশ্রয়ের অঙ্গীকার করেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ট্রাম্প টানা প্রচার চালিয়ে গেছেন।
“আমাদের দেশ আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে আরও বৃহৎ, চমৎকার, ধনী ও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে,” রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের ‘ইউএসএস ইউএসএ’ উল্লাসধ্বনির মধ্যে ভাষণ দিতে উঠে ট্রাম্প এ কথা বলেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
এদিন ডেমোক্র্যাটদের অনেক আসনই ফাঁকা ছিল, তারা বাইরে ট্রাম্পবিরোধী সমাবেশে অংশ নিতে গিয়ে স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণ বর্জন করেন।
এমন এক সময়ে ট্রাম্প কংগ্রেসে এ বার্ষিক ভাষণ দিলেন যখন জনমত জরিপগুলোতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিনিদের তার কর্মদক্ষতায় অনাস্থা জানাতে দেখা যাচ্ছে; ইরানে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিয়ে অনেকের উদ্বেগের পাশাপাশি মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট মাত্রই তার ‘সিগনেচার’ শুল্ক নীতিতে বড় ধাক্কাও দিয়েছে।
ভাষণের বড় অংশজুড়ে ট্রাম্প অস্বাভাবিক রকমের সংযত ছিলেন; তিনি বেশিরভাগ সময়েই লিখিত বক্তব্য পড়েছেন, এড়িয়ে গেছেন স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক এবং তাৎক্ষণিক ও প্রসঙ্গচ্যুত মন্তব্য। তবে অভিবাসনবিরোধী কঠোর অবস্থান নিয়ে কথা বলার সময় তিনি খানিকটা আক্রমণাত্মক রূপে হাজির হন, কয়েকজন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতার সঙ্গে অপমানজনক মন্তব্যও বিনিময় হয় তার।
সাবেক এ রিয়েলিটি টেলিভিশন তারকা এদিন যুক্তরাষ্ট্রের পুরুষ আইস হকি দল এবং অনেককে নানান পুরস্কারেও ভূষিত করেন। ৭৯ বছর বয়সী ট্রাম্পের এ দিনের ভাষণ ছিল এক ঘণ্টা ৪৭ মিনিটের, যা গত বছর কংগ্রেসে দেওয়া তার দীর্ঘ ভাষণের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
ইরান নিয়ে ‘ধোঁয়াশা’ থাকলই
ট্রাম্প বলছেন, মূল্যস্ফীতি ‘দ্রুত নামছে’, অথচ যুক্তরাষ্ট্রে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য, বাড়ি ভাড়া, বীমা ও পরিষেবার বিল কয়েক বছর আগের তুলনায় এখনও অনেক বেশি। শুক্রবার প্রকাশিত নতুন তথ্যউপাত্ত দেখাচ্ছে, গত তিন মাসে অর্থনীতি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক ধীরগতিতে অগ্রসর হচ্ছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতিও চড়ছে।
রয়টার্স/ইপসোসের জরিপ বলছে, ট্রাম্প যেভাবে অর্থনীতি সামলাচ্ছেন, তাতে সায় আছে মাত্র ৩৬ শতাংশ মার্কিনির।
এ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয়কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আশা করছে ডেমোক্র্যাটরা।
নভেম্বরের নির্বাচনে উচ্চকক্ষ সেনেটের এক-তৃতীয়াংশ আর নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫ আসনের সবগুলোতে ভোট হবে।
নভেম্বরে ভার্জিনিয়ার গভর্নর নির্বাচনে জেতা ডেমোক্র্যাট আবিগেইল স্পেনবার্গার এদিন ট্রাম্পের ভাষণ নিয়ে দলের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেন। তিনি জীবনযাপনের ব্যয় মেটাতে ‘হিমশিম খাওয়া মার্কিনিদের পরিত্যাগ করায়’ প্রেসিডেন্টের কড়া সমালোচনাও করেন।
“প্রেসিডেন্ট কি আপনার এবং আপনার পরিবারের জীবনযাত্রার খরচ আরও সাশ্রয়ে কাজ করছেন? এর উত্তর যে ‘না’, তা আমরা সবাই জানি,” বলেছেন আবিগেইল।
শুক্রবার মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্টে প্রেসিডেন্টের দেওয়া শুল্ককে ‘এখতিয়ার বহির্ভূত’ ঘোষণা করার পর ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও মঙ্গলবার তাকে এ বিষয়ে কিছু বলতে দেখা যায়নি। তিনি কংগ্রেস কক্ষে ঢোকার সময় উপস্থিত চার বিচারকের সঙ্গে হাতও মিলিয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টের রায়কে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ আখ্যা দেওয়া ট্রাম্পের ভাষ্য, সর্বোচ্চ আদালতের রায় তার শুল্ক নীতিতে খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারবে না।
এদিনের ভাষণে ট্রাম্প কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও কোনো কথা বলেননি। অথচ এই প্রযুক্তি এরই মধ্যে স্টক মার্কেট এবং চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় থাকা অনেকের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজের শক্তি-সামর্থ্যের বেশিরভাগই পররাষ্ট্র সংক্রান্ত বিষয়ে কাজে লাগালেও এবারের স্টেট অব দ্য ইউনিয়নের ভাষণে এ বিষয়ে খুব বেশি কিছু বলেননি ট্রাম্প।
তবে আগের মতোই ‘আটটি’ যুদ্ধ থামানোর কৃতিত্ব দাবি করেছেন। সেদিন ইউক্রেইনে রাশিয়ার ‘বিশেষ সামরিক অভিযানের’ চতুর্থ বর্ষপূর্তি হলেও কিইভকে নিয়ে খুব বেশি কথা খরচ করেননি ট্রাম্প। বলেননি যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীন বা গ্রিনল্যান্ড নিয়েও কিছু।
ইরান নিয়েও ‘ধোঁয়াশা’ রেখে দিয়েছেন।
“কূটনীতির মাধ্যমে সমস্যার সমাধানকে প্রাধান্য দিচ্ছি আমি। কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত- আমি এখন পর্যন্ত বিশ্বে সন্ত্রাসের এক নম্বর মদদদাতাকে পারমাণবিক অস্ত্র পেতে দিব না,” বলেছেন তিনি।