Published : 28 Aug 2026, 12:12 AM
ভোটকোশি নদীর আকস্মিক বন্যায় ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ থাকার পরও বিভিন্ন দেশের উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে নেপাল।
দেশটির সরকার বলছে, নেপালের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীই এই উদ্ধার অভিযান পরিচালনায় ‘সক্ষম’।
কাঠমান্ডু পোস্ট এক প্রতিবেদনে লিখেছে, এর পরিবর্তে ‘ওয়ান-ডোর মেকানিজম’ এর মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা চাইছে নেপাল।
কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি বলছে, ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার পর পুনর্গঠন পর্যায়ে অতিরিক্ত আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তা চাওয়া হবে।
ইতোমধ্যে কিছু দেশ আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে, অন্যরা তল্লাশি, উদ্ধার ও পুনর্বাসন প্রচেষ্টায় সহায়তার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।
নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার থেকে নিখোঁজদের মধ্যে ১৭৮ জন ভারতীয়, ৬৫ জন মার্কিন, ৫৩ জন ইউক্রেনীয়, ৫১ জন মালয়েশীয়, ৩৫ জন অস্ট্রেলীয়, ৩৩ জন ব্রিটিশ, ২৫ জন কানাডীয় এবং আরও তিন ডজনের বেশি দেশের নাগরিক রয়েছেন।
চীনা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের অন্তত ১০০ জন নাগরিক নেপালে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছেন।
অন্যদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্যায় আটকে পড়া দুই শতাধিক ভারতীয় নাগরিক উদ্ধারের অপেক্ষায় আছেন।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে কাঠমান্ডু পোস্ট লিখেছে, বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে নিজস্ব উদ্ধারকারী দল পাঠানোর আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেয়েছে নেপাল সরকার। তবে তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, নেপালের নিজস্ব বাহিনী পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম।
ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ থেকে উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাব এসেছিল বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের সময়ের অভিজ্ঞতার আলোকেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সে সময় বিদেশি উদ্ধারকারী দলগুলোর আধিক্য এবং দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার কারণে সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক জটিলতা দেখা দিয়েছিল। মূলত নেপালের সেনাবাহিনী ও পুলিশের সুপারিশেই সরকার এবার বিদেশি দল না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বন্যা পরিস্থিতির অবনতির পর ভারতের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্স (এনডিআরএফ) মোতায়েনের অনুমতি চাওয়া হলেও নেপাল তা ফিরিয়ে দেয়।
ওই কর্মকর্তা বলেন, "আমরা চীন এবং অন্যান্য দেশের কাছ থেকেও একই ধরনের অনুরোধ পেয়েছি, কিন্তু তাদের ‘না’ বলে দেওয়া হয়েছে।"
এদিকে বন্যা কবলিত বিদেশি নাগরিকদের সহায়তায় একটি ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম (ইআরটি) গঠন করেছে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, এই দল মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী সংস্থা হিসেবে কাজ করবে, যা বিদেশি নাগরিকদের তল্লাশি, উদ্ধার, তথ্য যাচাই এবং কনস্যুলার সহায়তা দেবে।
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর পৌডেল ছেত্রী জানান, নিখোঁজ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বিদেশিদের অবস্থান জানতে রসুয়া জেলার তিমুরে আরেকটি বিশেষ টিমের কাছে একজন আন্ডার সেক্রেটারিকে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, “তিনি মাঠে থাকা নিরাপত্তা দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করছেন। আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে আমরা প্রচুর প্রশ্ন পাচ্ছি, তাই তিনি যেসব তথ্য সংগ্রহ করবেন তা সরাসরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।”
এটি এমন একটি একক প্ল্যাটফর্ম যেখানে নিখোঁজদের স্বজনরা সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবেন। রসুয়ার আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বা নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের বিষয়ে যে কোনো তথ্যের জন্য নির্ধারিত হটলাইন ও ইমেইলে যোগাযোগের অনুরোধ করা হয়েছে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিবদের বিদেশি সরকারগুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে এবং নিখোঁজ নাগরিকদের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে তাদের অবহিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
মন্ত্রণালয় বিদেশে থাকা মিশনগুলোকেও নির্দেশ দিয়েছে যেন কেবল ‘প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল’-এর মাধ্যমেই আর্থিক সহায়তা চাওয়া হয়।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, নেপালে ৪৭.৫ টনের বেশি ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে ভারত। বেইলি ব্রিজ ও প্রিফ্যাব ট্রাস ব্রিজ পাঠানোরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও বিশ্ব ব্যাংক এরই মধ্যে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রেসিডেন্ট মাসাতো কান্দা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, তিনি নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহর সঙ্গে যোগাযোগ করে পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক এক্স পোস্টে জানিয়েছেন, নেপাল সরকারকে মানবিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানালের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মিলিব্যান্ড নেপাল সরকারের প্রতি যুক্তরাজ্যের জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করেছেন এবং নিখোঁজ ব্রিটিশ নাগরিকদের অনুসন্ধানসহ চলমান উদ্ধার তৎপরতার খোঁজখবর নিয়েছেন।
বিদেশে নেপালি মিশনগুলোও বন্যা কবলিতদের উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য আর্থিক সহায়তার আবেদন জানিয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছে।