দুয়ারে মধ্যবর্তী নির্বাচন: কংগ্রেসে ক্ষমতার পরিবর্তন কীভাবে বদলে দেয় যুক্তরাষ্ট্রের নীতি?
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে দলীয় নিয়ন্ত্রণ বদলে গেলেই ধাক্কা খায় প্রেসিডেন্টের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি। আইন পাসে বাধা, বাজেট আটকে যাওয়া আর জবাবদিহিতা বেড়ে মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে গোটা দৃশ্যপট।
প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের চার বছরের মেয়াদের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে মধ্যবর্তী নির্বাচন। ভোটাররা দেশটির কংগ্রেস সদস্যের পাশাপাশি রাজ্যগুলোর গভর্নর এবং অন্যান্য রাজ্য ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের নির্বাচন করবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা ভিন্ন। তাদের শাসনব্যবস্থা বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মতো নয়, যেখানে জনগণ সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য ভোট দেয় এবং যে দল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তারাই সরকার গঠন করে এবং তাদের নেতা প্রধানমন্ত্রী হন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং কংগ্রেস নির্বাচন সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে দেশের প্রেসিডেন্ট বেছে নেওয়ার জন্য আলাদা ভোট হয় এবং সংসদের সদস্যদের (সেনেট ও হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) নির্বাচিত করার জন্য সম্পূর্ণ আলাদা ভোট হয়। একটির ফলের ওপর অন্যটি সরাসরি নির্ভর করে না।
প্রেসিডেন্ট নির্দিষ্ট চার বছরের মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন এবং কংগ্রেসে তার দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষমতাচ্যুত হন না। তারপরও মধ্যবর্তী নির্বাচন কোনও প্রেসিডেন্টের আইন পাস করা, বাজেট বরাদ্দ অনুমোদন করা এবং তার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার ক্ষমতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেট দল প্রতিনিধি পরিষদে আবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পেতে পারে, যদিও সেনেটে জয়লাভ করাটা তাদের জন্য তুলনামূলকভাবে কঠিন।
কংগ্রেস বিভক্ত (অর্থাৎ, যদি কংগ্রেসের দুটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ভিন্ন ভিন্ন দলের হাতে থাকে) থাকলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য ট্রাম্প প্রশাসন চাইলেই সহজে সরকারি খরচ বাড়ানো বা ট্যাক্স কমাতে পারবে না; তাদের ওপর নানা বাধা আসবে।
যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে এখনও এমন কিছু ক্ষমতা আছে যা দিয়ে তিনি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শেয়ার বাজারে বড় পরিবর্তন আনতে পারেন। এর জন্য তার মার্কিন কংগ্রেস সদস্যদের অনুমতি লাগবে না।
ট্রাম্প নিজেই তিনটি কাজ করতে পারবেন। যেমন: বিদেশ থেকে আসা পণ্যে শুল্ক বাড়ানো, ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়মকানুন কড়া করা এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বা নীতি নির্ধারণ করা।
আগামী ৩ নভেম্বর কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের (হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) সবকটি (৪৩৫টি) আসন এবং ১০০টি সেনেট আসনের মধ্যে ৩৩টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বাচনের আগ মূহূর্ত পর্যন্ত যে কোনও সময় জনমত বদলানোর সম্ভাবনা থাকলেও ঐতিহাসিক ধারা এবং বর্তমান অর্থনৈতিক পটভূমি বিনিয়োগকারীদের জন্য দিকনির্দেশনা দেয়। শেয়ার বাজার বা বিনিয়োগের লাভ-ক্ষতি মূলত দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি ও কোম্পানিগুলোর আয়ের ওপর নির্ভর করে।
তবে নির্বাচনের ফলের ওপর ভিত্তি করে সরকারের খরচ বা কর নীতিতে পরিবর্তন আসতে পারে, যার ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তার মেয়াদের শেষের দিকে আইন পাসের চেয়ে সরাসরি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কাজ চালাতে হতে পারে।
বিভক্ত কংগ্রেস
মধ্যবর্তী নির্বাচন ঐতিহাসিকভাবে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের কাজের ওপর এক ধরনের গণভোট বা পরীক্ষা। গত একশ বছরে মাত্র তিনটি নির্বাচন ছাড়া বাকি সব মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে আসন হারিয়েছে।
বর্তমানে রিপাবলিকানদের আসন সংখ্যা সামান্য বেশি থাকায়, অতীত ইতিহাস অনুযায়ী এবার ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সম্ভাবনা বেশি। তাছাড়া জিনিসপত্রের দাম ও পেট্রোলের দাম বাড়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার দলের ওপর সাধারণ মানুষ কিছুটা অসন্তুষ্ট।
এর বিপরীতে, সেনেটের নির্বাচনি পরিস্থিতি রিপাবলিকানদের জন্য বেশি অনুকূল। যে নির্দিষ্ট আসনগুলোতে নির্বাচন হচ্ছে এবং ৫০-৫০ টাই হওয়ার পরিস্থিতিতে ভাইস প্রেসিডেন্টের দেওয়া শেষ ভোটের ক্ষমতার কথা ভাবলে, রিপাবলিকানদের ক্ষমতা ধরে রাখার ভালো সুযোগ আছে।
তবে কংগ্রেস যদি বিভক্ত হয় অর্থাৎ, সেখানে যদি প্রেসিডেন্টের বিরোধী দলের আধিপত্য থাকে, তবে কর বা বাজেট সংক্রান্ত নতুন কোনো আইন পাস করা প্রেসিডেন্টের জন্য কঠিন হবে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য আগেই দেখিয়ে দিয়েছে যে, আইন পাস করতে না পারলেও তারা প্রেসিডেন্টের বিশেষ ক্ষমতা (নির্বাহী আদেশ) কাজে লাগিয়ে শুল্ক বসানো বা ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার মতো বড় বড় সিদ্ধান্ত একাই নিতে পারে।
আর্থিক সীমাদ্ধতা
বড় বড় বাজেট বা আর্থিক আইন সহজে পাস করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সরকারগুলো 'বাজেট রিকনসিলিয়েশন' (বাজেট সমন্বয়) -এর বিশেষ নিয়ম মেনে চলে। এর সুবিধা হল, সাধারণ নিয়মে বিল পাস করতে যেখানে ৬০ ভোটের প্রয়োজন হয়, সেখানে এ নিয়মে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই সেনেটে বিল পাস করা যায়।
২০২৫ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পাস করা 'ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট' এই নিয়মেই পাস হওয়া একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ।
ডেমোক্র্যাট দল মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসলে সরকারের জন্য বাজেট বা কোনও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত সহজে পাস করানো কঠিন হবে। কারণ, যে কোনও আর্থিক বিল বা প্যাকেজ পাস করতে হলে প্রথমে এই পরিষদের অনুমোদন লাগবে, আর তখন বিরোধী ও সরকারি উভয় দলেরই সম্মতির প্রয়োজন পড়বে।
ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে কর্পোরেট কর আরও কমানো, প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো বা সামাজিক খাতের ব্যয় কমানোর মতো নীতিমালা ডেমোক্র্যাট আইন প্রণেতাদের কাছ থেকে তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফলে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের কোনও অবনতি না ঘটলে অতিরিক্ত আর্থিক প্রণোদনা পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে।যদিও ট্রাম্প প্রশাসন গৃহস্থালির খরচ বাড়ানোর জন্য ইতোমধ্যেই অনুমোদিত তহবিলের কিছু অংশ অন্য খাতে সরিয়ে ব্যবহার করতে পারে।
তাছাড়া, কংগ্রেসে ক্ষমতার পরিবর্তনের ফলে রাজস্বের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। কারণ করের হারে বড় বদল আসতে পারে। যেমন: কর্পোরেট কর বা ধনীদের করের হার কমিয়ে দিলে সরকারের রাজস্ব কমে যেতে পারে, যা বাজেট ঘাটতি বাড়াতে পারে এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে।
রাজস্ব ঘাটতি অনেক বেশি কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও কম থাকবে। কারণ, এই ঘাটতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমাতে হলে কর বাড়াতে হবে। আর রিপাবলিকান দলের নিয়ন্ত্রণে থাকা সেনেট হয়ত সেই কর বাড়াতে দেবে না।
কর নীতি বারবার পরিবর্তন হলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে অনিরাপদ বোধ করে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীর করে দেয়।
তাছাড়া, আগের কংগ্রেসের পাস করা বহু আর্থিক অনুদান বা মেগা প্রজেক্টের তহবিল নতুন কংগ্রেস আটকে দিতে বা বাতিল করতে পারে।
কংগ্রেসে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বা নীতি নির্ধারণে অনিশ্চয়তা থাকলে শেয়ার বাজার এবং বন্ড মার্কেট অস্থির হয়ে ওঠে।
দুই কক্ষ হাউজ এবং সেনেটের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে নিয়মিত বাজেট পাস করাও কঠিন হয়ে পড়ে। সাময়িক তহবিল দিয়ে দেশ চালাতে হয়, যা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করে।
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যে পরিমাণ গোলাবারুদ খরচ হয়েছে, তা আবার নতুন করে কিনতে সরকারের অনেক অর্থ ব্যয় হবে। পাশাপাশি, বিভিন্ন শুল্ক বা করের বিরুদ্ধে আইনি মামলার কারণে সরকারের আয় কমে যেতে পারে, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিকে বাধাগ্রস্ত করবে।
সর্বপোরি, বর্তমানে মার্কিন সরকারের যে বিশাল বাজেট ঘাটতি রয়েছে, তার একটা বড় কারণ হল ঋণের পেছনে সুদের খরচ দেওয়া।
ঋণ সীমা (একটি দেশের সরকার আইনিভাবে সর্বোচ্চ কত অর্থ ঋণ নিতে পারবে তার নির্ধারিত সীমা) নিয়ে অচলাবস্থা বা অনিশ্চয়তা আরেকটি শঙ্কার বিষয়। ২০২৫ সালের ওবিবিবিএ আইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ নেওয়ার সর্বোচ্চ সীমা ৫ ট্রিলিয়ন ডলার বাড়িয়ে মোট ৪১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার করা হয়েছে।
তবে 'সেন্টার অন বাজেট অ্যান্ড পলিসি প্রায়োরিটিজ'-এর হিসাব বলছে, সরকারের খরচের যে গতি, তাতে ২০২৭ সালের মধ্যে এই নতুন সীমাও পার হয়ে যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত ঋণের সীমা বাড়ানো হবে তা নিশ্চিত, যাতে দেশ দেউলিয়া না হয়। কিন্তু সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে যে তর্ক-বিতর্ক ও কাদা-ছোড়াছুড়ি করবে, তার কারণে বন্ড মার্কেট বা শেয়ার বাজারে অস্থিরতা ও শঙ্কা কাজ করতে পারে।
নির্বাহী আদেশের ওপর বেশি নির্ভরশীলতা
কংগ্রেসে ভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছে ক্ষমতা গেলে সরাসরি প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশ কাজে লাগানোর প্রবণতা বাড়ে। কারণ, হোয়াইট হাউজ এবং কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ আলাদা দলের হাতে থাকলে স্বাভাবিক আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়ে।
আইন প্রণয়নের পথ বন্ধ বা কঠিন হওয়ায় সরকার নিজের সরাসরি ক্ষমতাই (যা আদালতের বা সংসদের অনুমতি ছাড়াই ব্যবহার করা যায়) বেশি ব্যবহার করবে। বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অভিবাসন সক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো সরকারের এই সরাসরি ক্ষমতার ভেতরেই পড়ে।
যদিও সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন (আইইইপিএ)-এর অধীনে আরোপ করা শুল্ক বেআইনি, তবুও বিকল্প আইনি পথ অনুসরণ করে শুল্ককে বৈধ ও স্থায়ী করার চেষ্টা করা হচ্ছে। মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ এবং বাণিজ্য প্রতিনিধি দল যদি অন্যায্য ব্যবসার বিরুদ্ধে তদন্ত করে, তবে সেই শুল্ক বসানোর জন্য আরও মজবুত বা স্থায়ী আইনি ভিত্তি পাওয়া যেতে পারে।
কংগ্রেসে যে দলই আধিপত্য পাক অভিবাসনের নিয়মকানুন কঠোর থাকবে। ফলে নতুন শ্রমিকের সংখ্যা বাড়বে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান উভয় দলই সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং অভিবাসনের নিয়মকানুন কঠোর করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ফলে আইনি বা বেআইনিভাবে নতুন শ্রমিক প্রবেশের সুযোগ সীমিত থাকতে পারে।
ওদিকে, পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপারে সরকারের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হিসেবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট বা নির্বাহী বিভাগকে ব্যাপক স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। ফলে সরকার চাইলে ইরানের মতো শত্রু দেশের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তিও ব্যবহার করতে পারবে।
শত্রুভাবাপন্ন দেশগুলোর ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের নীতি সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া বা জরুরি পরিস্থিতিতে সীমিত সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা সরকারের রয়েছে, যা ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবহার করা হতে পারে।
অন্যদিকে, বাণিজ্য ও অভিবাসন নীতি কড়া হলে, অর্থাৎ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিদেশি শ্রমিক আসার নিয়মকানুন যদি বেশি কড়া হয়, তবে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়া বা মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা থাকে। আর জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকলে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে সুদের হার কমিয়ে মুদ্রানীতি সহজ করা সম্ভব হবে না।
অর্থনৈতিক মৌলিক বিষয়গুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ
মধ্যবর্তী নির্বাচন খবরের শিরোনামে আধিপত্য বিস্তার করলেও, সামগ্রিক অর্থনীতিই বাজারের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বজায় থাকে। ঐতিহাসিকভাবে, অনিশ্চয়তার কারণে নির্বাচনের আগে বাজারে অস্থিরতা বাড়ে, কিন্তু ফল জানা হয়ে গেলে যে দলই জয়ী হোক না কেন তা আবার কমে আসে।
সরকার যখন রাজনৈতিক কোন্দলের কারণে নতুন কোনও বড় খরচের সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, তখন সরকারের নতুন করে বড় ঋণে পড়ার ভয় থাকে না। এটি দীর্ঘমেয়াদী সরকারি বন্ডের জন্য ভাল। কিন্তু সরকার যখন ঋণ নেওয়ার সর্বোচ্চ সীমা বাড়ানো নিয়ে আলোচনা করে, তখন বন্ড বাজারে সাময়িকভাবে অস্থিরতা বা দামের ওঠানামা দেখা দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে বাজেট তৈরি, কর নির্ধারণ এবং খরচের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে থাকায় সেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন সরাসরি অর্থনৈতিক মৌলিক বিষয়গুলোকে প্রভাবিত করে।
কর নীতিমালা: রিপাবলিকানরা সাধারণত কর কমানোর নীতিতে বিশ্বাসী। তারা কর্পোরেট কর এবং উচ্চ আয়ের মানুষের ওপর কর কমিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে চায়। ফলে সাময়িকভাবে শেয়ার বাজার এবং কর্পোরেট মুনাফা বৃদ্ধি পেলেও জাতীয় ঘাটতি বাড়ার ঝুঁকি থাকে।
ওদিকে, ডেমোক্র্যাটরা সাধারণত কর্পোরেশন এবং ধনীদের ওপর উচ্চ কর আরোপের পক্ষে। তারা এই কর দিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং জনকল্যাণমূলক খাতগুলো শক্তিশালী করতে চায়।
সরকারি ব্যয় ও বাজেট বরাদ্দ: রিপাবলিকানরা সাধারণত প্রতিরক্ষা এবং সীমান্ত সুরক্ষায় বাজেট বাড়ানোর পক্ষপাতি। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা জলবায়ু পরিবর্তন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোকে গুরুত্ব দেয়।
বাণিজ্য নীতি অনেকটাই প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশের ওপর নির্ভর করলেও কংগ্রেসের অনুমোদন বাণিজ্য চুক্তিগুলোর স্থায়ীত্ব নির্ধারণ করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রিপাবলিকানরা সংরক্ষণবাদী বাণিজ্য নীতি এবং আমদানি পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের দিকে বেশি ঝুঁকেছে, যা সরবরাহ শৃঙ্খল এবং মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করে।
ডেমোক্র্যাটরাও শুল্ক ব্যবহার করে। তবে তারা বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে পরিবেশগত মানদণ্ড এবং শ্রমিক অধিকারের বিষয়গুলোকে বেশি প্রাধান্য দেয়।
নিয়মকানুনের যে কোনও বড় পরিবর্তনের জন্য সরকারের কংগ্রেসের অনুমতি লাগে, বিশেষ করে যখন নতুন কোনও আইন তৈরি করতে হয়।
তবে আইন বা নিয়ম যা-ই হোক না কেন, প্রশাসন চাইলে নিজেদের নিয়ম এবং তা প্রয়োগের উপায়ে কিছুটা হেরফের করে পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে।
যেমন: নিয়মনীতি তৈরি করার দায়িত্ব যাদের, তারা নতুন কোনও আইন ছাড়াই ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ের নিয়মকানুন পরিবর্তন করতে পারে। এ কারণে, নির্বাচনে যে দলই জয় পাক না কেন, ব্যাংকিং খাতের মূল নিয়মনীতিতে হঠাৎ করে খুব বড় কোনও পরিবর্তন আসে না।
সংক্ষেপে বলতে গেলে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বা কংগ্রেসে ক্ষমতার পরিবর্তন হলে সরকারের নিয়মনীতিতে বড় বদল আসে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বাজারে এর প্রভাব খুব একটা পড়ে না।
কংগ্রেসে যখন নতুন কোনও দল ক্ষমতায় আসে, তখন তারা তাদের আদর্শ অনুযায়ী নতুন আইন তৈরি করে, কর বাড়ায় বা কমায় এবং বিভিন্ন খাতে সরকারি বরাদ্দ পরিবর্তন করে নীতিগত পরিবেশের পরিবর্তন ঘটায়।
তবে বাজার কোনো রাজনৈতিক দলের নীতি অনুযায়ী চলে না; বাজার চলে অর্থনৈতিক চক্রের ওপর ভিত্তি করে। দেশের জিডিপি, কর্মসংস্থান, মুদ্রাস্ফীতির মতো বিষয়গুলো বাজারের প্রকৃত গতিপথ নির্ধারণ করে। আর শেয়ার বাজারের মূল চালিকাশক্তি হল কোম্পানিগুলোর লাভ বা আয়।
কংগ্রেসে যে দলই থাকুক না কেন, দেশের বড় বড় কোম্পানিগুলোর বিক্রি ও মুনাফা বাড়তে থাকলে তাদের শেয়ারের দামও বাড়ে।
রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে সাময়িকভাবে কোনও খাত কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত বা লাভবান হতে পারে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে কোম্পানিগুলোর উদ্ভাবন ও ব্যবস্থাপনাই তাদের টিকিয়ে রাখে।
