জ্বালানি সংকটে বিকল্প হয়ে উঠছে কয়লা, পরিবেশের কী হবে?

ইউক্রেইনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরু হওয়ার চতুর্থ মাসের মধ্যেই বিশ্বব্যাপী কয়লার চাহিদা ১১গুণ বেড়ে গেছে।

রয়টার্স
Published : 20 Sept 2022, 05:14 PM
Updated : 20 Sept 2022, 05:14 PM

কয়লাকে বলা হয় সবচেয়ে বেশি পরিবেশ দূষণকারী জীবাশ্ম জ্বালানি। যেটির ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধে একবছর আগেও নানা উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলা হচ্ছিল। এখন সেই কয়লার খোঁজে ছুটছে নানা দেশ, হু হু করে বাড়ছে দাম। 

পূর্ব আফ্রিকার দেশ তানজানিয়ার মাতওয়ারা বন্দর দিয়ে গত বছরের শেষভাগ পর্যন্তও খুব বেশি জাহাজ চলাচল করতো না। ছিলো না কোনো ব্যস্ততা। ওই বন্দর দিয়ে মূলত কাজুবাদামের চালান যেত। কিন্তু ইউক্রেইন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বন্দরের দৃশ্যপট পুরোপুরি পাল্টে গেছে। ঘুমন্ত বন্দরটি যেন হঠাৎ করে পুরোপুরি সজাগ হয়ে উঠেছে। 

একের পর এক কয়লা বোঝাই জাহাজ মাতওয়ারা বন্দর থেকে ছেড়ে যাচ্ছে। 

গত ফেব্রুয়ারিতে রুশ বাহিনী ইউক্রেইনে আগ্রাসন শুরু করলে শাস্তি হিসেবে পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার সব ধরনের জ্বালানির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ফলে বিশ্ববাজারে রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, রেকর্ড উচ্চতায় উঠে যায় জ্বালানির দাম। 

যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুরো বিশ্বে। বিশেষ করে রাশিয়ার গ্যাস ও কয়লার উপর নির্ভরশীল ইউরোপ পড়েছে সবচেয়ে বেশি বিপদে। ইউরোপের দেশগুলো এখন চাহিদা মেটাতে বিশ্বের ‍অন্যান্য দেশ থেকে জ্বালানি পণ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করছে। 

তানজানিয়া এতদিন সাধারণত পূর্ব আফ্রিকার প্রতিবেশী দেশগুলোতে থার্মাল কয়লা রপ্তানি করত। প্রতিবেশী দেশগুলোর বাইরে কয়লা রপ্তানির কথা এতদিন তানজানিয়া সরকার চিন্তাও করতে পারতো না। 

কারণ, দেশটির দক্ষিণপশ্চিমের খনিগুলো থেকে সবচেয়ে কাছের বন্দর মাতওয়ারায় কয়লা আনতেও তাদের ছয়শ কিলোমিটারের বেশি সড়কপথ পাড়ি দিতে হয়। তানজানিয়ার মাতওয়ারা বন্দর ভারত মহাসাগরে। 

থার্মাল কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার হয়। জ্বালানির অভাবে পুরো বিশ্বেই এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন সংকটে পড়েছে। যার ফলে কয়লার চাহিদা বেড়ে গেছে। ইউক্রেইন যুদ্ধের কারণে থার্মাল কয়লার দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। 

ইউরোপ এবং অন্যান্য দেশের ক্রেতারা এখন তানজানিয়া, বতসোয়ানা এমনকি মাদাগাস্কারের মত দেশগুলোর অপেক্ষাকৃত দুর্গম কয়লা খনি থেকেও উচ্চমূল্যে কয়লা কিনতে রাজি আছে। 

এই যে কয়লার চাহিদা পুনরায় বেড়ে যাওয়া, তা এক বছর আগেও করা জলবায়ু পরিকল্পনার সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। বিভিন্ন দেশের সরকার এখন রাশিয়ার জ্বালানির উপর নির্ভরতা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে চাইছে। 

এদিকে বিদ্যুতের বাড়তে থাকা দামের উপরও লাগাম টানার চেষ্টা করছে। এজন্য তারা আবারও সবচেয়ে বেশি পরিবেশ দূষণকারী জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। 

তানজানিয়ার একটি কয়লা খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিজওয়ান আহমেদ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘‘রাশিয়ার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইউরোপের ক্রেতারা এখন কয়লার জন্য যেকোনো জায়গায় যাচ্ছে। 

‘‘তারা অনেক ভালো দাম দিতেও চাইছে।” 

গত কয়েকমাসে ইউরোপমুখী কয়লার চালান অনেক বেড়ে গেছে বলে জানায় কমোডিটিস ট্রেডার ‘কার্গিল’। 

কার্গিলের সমুদ্র পরিবহন বিভাগের প্রেসিডেন্ট জন ডিলেমান বলেন, ‘‘ইউরোপ এখন অন্যান্য ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামছে। বিকল্প জ্বালানি গ্যাস অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।

‘‘ইউরোপকে এখন অবশ্যই কয়লার উৎস খুঁজে পেতে হবে এবং আমরা শিগগিরই কলম্বিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এমনকি আরো দূরের দেশ থেকেও ইউরোপে অনেক বেশি কয়লার চালান যেতে দেখতে পাব।” 

যদিও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি যে কোনো সময় পরিবর্তন হতে পারে। ফলে কয়লার চাহিদা বেড়ে যাওয়া এবং উচ্চমূল্যে তা বিক্রির সুযোগ খুব বেশি দিন নাও থাকতে পারে। তারপরও কয়লা সমৃদ্ধ দেশগুলো একে তাদের জন্য খুব ভালো সুযোগ হিসেবে দেখছে, যে সুযোগ তারা হাতছাড়া করতে চায় না। 

তানজানিয়া সরকার আশা করছে এ বছর তাদের কয়লা রপ্তানি দ্বিগুণ হবে এবং তা প্রায় ছয় লাখ ৯৬ হাজার ৭৭৩ টনে পৌঁছে যাবে। 

দেশটির মাইনিং কমিশন থেকে রয়টার্সকে বলা হয়, এ বছর তাদের কয়লা উৎপাদন ৫০ শতাংশ বেড়ে ১৩ লাখ ৬৪ ‍হাজার ৭০৭ টনে পৌঁছাবে বলে তারা আশা করছেন। 

মাইনিং কমিশনের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী সচিব ইয়াহইয়া সেমাম্বা বলেন, কয়লা রপ্তানির এই উল্লম্ফন থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আয় হবে বলে আশা করছে সরকার। 

ওই অর্থ দিয়ে একটি রেলপথ নির্মাণের কথা চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। যে রেলপথ কয়লা উৎপাদনকারী রুভুমা অঞ্চলের সঙ্গে মাতওয়ারা বন্দরকে জুড়বে। 

তানজানিয়ার খনি কোম্পানি ‘রুভুমা কোল’ এরই মধ্যে একটি ট্রেডারের মাধ্যমে অন্তত চার লাখ টন কয়লা রপ্তানি করেছে। গত নভেম্বর থেকে কয়লার ওই চালান নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স ও ভারতে গিয়েছে। 

এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত জানতে রুভুমা কোল’র সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল রয়টার্স। কিন্তু তারা কথা বলতে রাজি হননি। 

চাহিদা বেড়ে যাওয়া এবং যোগান স্বল্পতার কারণে কয়লা নিয়ে আবারও বাণিজ্যের পথ খুলেছে। ব্রেমার রিসার্চের তথ্যানুযায়ী, গত জুলাই মাসে বিশ্বব্যাপী জীবাশ্ম এ জ্বালানির চাহিদা এবং যোগান রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। 

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে থার্মাল কয়লা আমদানি করছে। আগে যেগুলো এশিয়ার বাজারে যেত। ইউক্রেইনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরু হওয়ার চতুর্থ মাসেই বিশ্বব্যাপী কয়লার চাহিদা ১১গুণ বেড়ে গেছে। 

ইউক্রেইন যুদ্ধের কারণে ইইউর দেশগুলো রাশিয়া থেকে গ্যাস পাচ্ছে না। এদিকে তারা রাশিয়া থেকে কয়লা আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ফলে ইইউর দেশগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মক চাপে পড়েছে এবং ওই চাপ দিন দিন বাড়ছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে জ্বালানির বিকল্প উৎস খুঁজছে। 

ইউক্রেইন যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে রাশিয়া ইইউর থার্মাল কয়লার চাহিদার ৭০ শতাংশ মেটাতো। ইইউর মোট গ্যাসের চাহিদার ৪০ শতাংশের সরবরাহও আসতো রাশিয়া থেকে। 

এসব বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন ইউরোপের দেশগুলো পরিবেশ নিয়ে আর চিন্তা করতে পারছে না। জলবায়ু রক্ষায় এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে তারা যেসব লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল সেগুলো এখন পাশে সরিয়ে রেখে তারা জ্বালানি মজুদের দিকে অধিক মনযোগ দিয়েছে। 

সামনে শীত আসছে। সেসময় ইউরোপজুড়ে জ্বালানির চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। কীভাবে তারা ওই চাহিদা সামাল দেবে, কীভাবে তারা নাগরিকদের ঘর গরম রাখবে সেই চিন্তাতেই দিশেহারা ইউরোপের বড় বড় এবং শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলোও। 

বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে তারা এখন বন্ধ করে দেয়া কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালু করার ব্যবস্থা নিয়েছে। 

ইউরোপ নিয়ে ব্যাংক অব আমেরিকার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ‘‘শক্তিশালী প্রণোদনা কয়লা এবং লিগনাইট উৎপাদনকে এক বছর আগের স্তরের চেয়ে ২৫ শতাংশ উপরে ঠেলে দিয়েছে। গত তিন বছর ধরে সম্পূর্ণ প্ল্যান্ট বন্ধ থাকা সত্ত্বেও।” 

এনার্জি থিংক-ট্যাঙ্ক এম্বার এর তথ্যানুযায়ী, থার্মাল কয়লা পোড়ানো বেড়ে গেলে তা জলবায়ু রক্ষায় কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গমন হ্রাসের যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল তার সঙ্গে নানা দেশকে সাংঘর্ষিক অবস্থায় নিয়ে যাবে। 

এক ইউরোপীয় ইউনিয়নে যদি রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায় এবং দেশগুলো যদি আরো কয়লা পোড়ানো শুরু করে তবে এক বছরেই কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গমন ১ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। 

যদিও ইউরোপের দেশগুলোর সরকার বলছে, এ পরিবর্তন অস্থায়ী। যদিও জ্বালানি সংকট কতদিন থাকবে তার উপর সম্পূর্ণ পরিস্থিতি নির্ভর করছে। 

ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ জার্মানি পর্যন্ত তাদের বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কয়েকটি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা পিছিয়ে দিয়েছে। 

বতসোয়ানার একটি কয়লা কোম্পানি আশা করছে, অন্তত আগামী বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত কয়লার বাজার এমন শক্তিশালী থাকবে। যদি তাই হয়, যদি তারপর কয়লার বাজার পড়তে শুরু করে তবুও তারা তাদের কয়লা উৎপাদন ক্ষমতা দ্বিগুণ করবে। 

কোম্পানির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘‘কয়লাকে ঘিরে যেসব নেতিবাচক কথা বলা হতো এখন সেগুলো পরিত্যাগ করা হয়েছে। যুদ্ধের কারণে যে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে সে পরিস্থিতিতে কয়লাকে শক্তির একটি উৎস হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক