Published : 30 Mar 2026, 07:01 PM
পশ্চিম তীরের জেনিনের দক্ষিণে নিজের জমিতে কয়েক দশক আগে নিজের হাতে যে জলপাই গাছগুলো লাগিয়েছিলেন, সম্প্রতি সেগুলো কেটে ফেলার মতো দুঃসহ এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে ৬৫ বছর বয়সী আবদুল রহমান আজমকে।
অবৈধ এক বসতির রাস্তা নির্মাণে ওই জমিটি জব্দে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের পর তিনি নিজেই ওই গাছগুলো কেটে ফেলেন।
গত ডিসেম্বরে ইসরায়েল ৫১৩ ডুনামের (৫১ দশমিক ৩ হেক্টর) বেশি জমি করায়ত্ত করেছিল, তার মধ্যে ৪৫০ ডুনামই ছিল আল-ফান্দাকুমিয়া গ্রামের, বাকিটুকু সিলাত আদ-দাহর ও আল-আত্তারার মতো পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোর।
ফিলিস্তিনিরা যখন এ বছর ভূমি দিবসের ৫০ বছর পালন করছে, তখনও, বিশেষ করে এরিয়া সি অংশে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, ভূমি বেদখল, নিজের জমিতে সীমিত প্রবেশাধিকারের মতো চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে, বলছে আল জাজিরা।
অন্যদিকে ইসরায়েল সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, বসতি সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবেই, এটি না মেনে উপায় থাকবে না।
১৯৭৬ সালের ৩০ মার্চ ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ গ্যালিলি অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ ফিলিস্তিনি জমি নিজেদের দখলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল; তার প্রতিবাদে একাধিক গ্রাম ও শহরে বিস্তৃত ধর্মঘট ও নানান কর্মসূচি নেওয়া হয়। বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এই প্রতিবাদ গুড়িয়ে দেয় ইসরায়েল, প্রাণ হারান ছয় ফিলিস্তিনি, আহত হন অনেকে, গ্রেপ্তার কয়েকশ।
এর প্রতিবাদে প্রতিবছর ৩০ মার্চকে ‘ভূমি দিবস’ হিসেবে পালন শুরু করে ফিলিস্তিনিরা। দিনটি হয়ে ওঠে তাদের জাতীয় পরিচয়ের অনুষঙ্গ, জমির সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের সম্পর্ক ও জমি বেদখল প্রত্যাখ্যানের প্রতীক।
দুইবার বেদখল
বাবা, চাচা, দাদাদের সঙ্গে শৈশব থেকেই জলপাই গাছ লাগানো ও চাষবাসের কাজ করে আসছেন আজম। চাষের সঙ্গে গড়ে ওঠে তার গভীর সম্পর্ক, ২০০২ সাল পর্যন্ত তিনি এ কাজই করেন। সে বছর তাদের জমি পড়ে ইসরায়েলি বসতি তারসালা ও সানুর সামরিক ঘাঁটির মধ্যে। এরপর আজম ও তার পরিবার আর জমিতে যেতে পারতেন না।
২০০৫ সালে ইসরায়েল ওই দখল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সেনাবাহিনী সামরিক ক্যাম্প গুটিয়ে নেয় এবং তারসালা বসতিও সেখান থেকে সরে যায়। আজম ও অন্যান্য জমির মালিকরা তাদের জমিতে ফেরেন, সেসময় তাদের যে আনন্দ হয়েছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।
কিন্তু সম্প্রতি ওই জমি আবার ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে, ফিলিস্তিনি জমির মালিকদের ফের তাদের নিজেদের জমিতেই ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।
ইসরায়েলি সেনাদের বুলডোজারে গাছগুলো ধ্বংস হওয়ার আগেই আজম নিজের জমিতে চলে যান এবং নিজেই সেগুলো কেটে ফেলেন। সেসময় তার চোখ দিয়ে দরদর করে পানি পড়ছিল। পরে তিনি খেয়াল করেন যে কেবল তিনিই নন, সব জমির মালিকই একই কাজ করেছেন।
“সেনা বা সেটলাররা গাছগুলো কেটে ফেলার চেয়ে আমরা নিজেরা কেটে ফেলেছি সেটাই ভালো হয়েছে। এ জমি আমাদের, আমাদের গাছগুলো আমাদের সন্তানের মতো, আমরা তাদের সযত্নে বড় করেছি, তাদের লালন পালন করেছি, আমরা কষ্ট করে এগুলো লাগিয়েছি, বড় করেছি,” বলেছেন আজম।
নানা উপায়ে জমি দখল
১৯৯৩ সালে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের সঙ্গে ইসরায়েলের স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী পশ্চিম তীরকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে এরিয়া এ থাকার কথা পুরোপুরি ফিলিস্তিনিদের নিয়ন্ত্রণে, পশ্চিম তীরের ১৮ শতাংশের মতো এলাকা এ অঞ্চলভুক্ত। ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের যৌথ নিয়ন্ত্রণে থাকবে এরিয়া বি, এটি পশ্চিম তীরের ২২ শতাংশ। বাকি ৬০ শতাংশই এরিয়া সি, যা পুরোপুরিভাবে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে আছে।
বসতি সম্প্রসারণ পরিকল্পনা কার্যকরের প্রস্তুতিস্বরূপ ইসরায়েল ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পশ্চিম তীরের এরিয়া সি এলাকায় একের পর এক ফিলিস্তিনি জমি জব্দের আদেশ এত দ্রুতগতিতে দিয়ে যাচ্ছে, তাতে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে এ বিশ্বাস পোক্ত হয়েছে যে—আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিলেও ইসরায়েল পুরো এলাকায় নিজেদের বসতি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা জোর কদমে এগিয়ে নিচ্ছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কমিশন অ্যাগেইনস্ট ওয়াল অ্যান্ড সেটেলমেন্টসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সামরিক কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে জমি জব্দের ৯৪টি আদেশের মাধ্যমেই ইসরায়েল ৫ হাজার ৫৭২ ডুনাম জমি দখল করেছে। এর বাইরে রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহারে জমি নেওয়ার তিনটি আদেশ ও কিছু জমিকে রাষ্ট্রীয় ভূমি ঘোষণার চারটি আদেশও জারি করা হয়েছে।
এসব আদেশ বিচ্ছিন্ন বা এলোমেলোভাবে দেওয়া হয়নি। বরঞ্চ বসতি সম্প্রসারণ, তাদের সীমানার নিরাপত্তা, রাস্তা নির্মাণ এবং ফিলিস্তিনিদের জমিকে খণ্ড খণ্ড করে এর স্বাভাবিকতা নষ্ট করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলেই মত কমিশনের।
একইসঙ্গে ইসরায়েল আগে থেকে দখল করা ১৬ হাজার ৭৩৩ ডুনাম জমিও গবাদি পশু চরানোর জন্য সেটলারদের দিয়ে দিয়েছে, যাকে বিপজ্জনক পদক্ষেপ বলছে কমিশন অ্যাগেইনস্ট ওয়াল অ্যান্ড সেটেলমেন্টস।
অন্য আরেক প্রতিবেদনে কমিশন জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে ইসরায়েল ৫৫ হাজার ডুনাম জমি দখল করেছে। এর মধ্যে ২০ হাজার ডুনাম দখল করেছে প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকার সীমানা সংশোধনের অজুহাতে। জেরুজালেম, নাবলুস, রামাল্লা, বেথেলহেম ও কালকিলিয়া শহরের ২৬ হাজার ডুনাম নিয়েছে ১৪টি ‘রাষ্ট্রীয় ভূমি’ ঘোষণার মাধ্যমে।
বিভিন্ন বসতির আশপাশে সামরিক টাওয়ার, নিরাপত্তা সড়ক ও নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১০৮টি সামরিক ব্যবহারের উদ্দেশ্যে জমি দখল আদেশের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে মোট এক হাজার ৭৫৬ ডুনাম।
তবে সামরিক আদেশের বাইরেও যে প্রতিনিয়ত অনেক জমিই দখল হচ্ছে তাও এখন ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। সেনা ও সেটলাররা অনেক জায়গাতেই ফিলিস্তিনি জমির মালিকদের নিজ নিজ জমিতে ঢুকতে দিচ্ছেন না, আগাম কোনো নোটিস ছাড়াই এসব জমি দখল হয়ে যাওয়ায় অনেক ফিলিস্তিনিই ‘আকাশ থেকে পড়ছেন’।
যেমনটা হয়েছে ৫৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ ফুয়াদের ক্ষেত্রে। বুধবার তিনি দেখতে পান, রামাল্লার পূর্বে আইন ইয়াবরুদ শহরে তার জমিতে ইসরায়েলি সেনাদের বুলডোজার চলছে। পরে তিনি কাছাকাছি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নিজের জমিতে থাকা গাছ উপড়ে ফেলার সাক্ষী হন। সেটলারদের জন্য একটি রাস্তা বানানোর লক্ষ্যে ওই জমিটি পরিষ্কার করা হচ্ছিল বলেই তার ধারণা।
তার জমিতে যে সেনাবাহিনী কাজ করবে সে সম্বন্ধে আগে থেকে কিছুই জানতেন না ফুয়াদ। কাছাকাছি থাকা এক কৃষকের কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি দৌড়ে সেখানে যান। এরপর সেখানে থাকা সশস্ত্র লোকদের কাছে জানতে চাইলে তারা নিজেদেরকে ইসরায়েলি সেনা ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য বলে পরিচয় দেয় এবং ফুয়াদকে তার জমি থেকে সরিয়ে দেয়।
গত দুই বছরে ইসরায়েলের একাধিক নীতি পশ্চিম তীরে জমি দখলের কাজ সহজ করে দিয়েছে। বসতি স্থাপনকারীরা বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে জর্ডান উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের জমির চারপাশে বেড়া টেনে দিচ্ছে। এতে হাজার হাজার ডুনাম চারণ ও কৃষিজমিতে ফিলিস্তিনিরা যেতে পারছে না।
ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেট জমির মালিকানার তথ্য গোপন রাখার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় বসতি স্থাপনকারীরা এখন আরও সহজে জমি দখল ও কিনতে পারছে—এমনকি এরিয়া-এ-তেও, বলেছেন ল্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের গবেষক রায়েদ মুকাদি।
চলছে উচ্ছেদও
কেবল পশ্চিম তীরের জমি দখলই নয়, আক্রমণের মুখে কোথাও কোথাও পুরো ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ই নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছে।
রামাল্লার পূর্বে অবস্থিত আল মুগায়ির গ্রামের আল-খালাইল এলাকার বাসিন্দা, ২৩ বছর বয়সী বেদুইন, কুসে আবু নাইম আল জাজিরাকে বলেন, সেটলারদের আক্রমণের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই তিনি ও অন্য অনেক বাসিন্দাই ফেব্রুয়ারিতে গ্রামটি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। সেটলারদের আক্রমণে ওই গ্রামের অনেক আহত হয়েছিল বলেও তিনি জানান।
তিনি জানান, ২১ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলি সেটলাররা তাদের গ্রামে থেমে থেকে হামলা চালায়, নারী-পুরুষ ও শিশুদের মারধর করে। তাদের হামলায় এক পরিবারের দুই শিশুসহ চারজন আহতও হয়।
এরপর ওই সেটলাররা সেনাবাহিনীর কাছে গিয়ে অভিযোগ করে যে ফিলিস্তিনিরা তাদের কাজে বাধা দিয়েছে। এ অভিযোগের ভিত্তিতে ইসরায়েলি সেনারাও হামলায় যোগ দেয়। তাদের গুলিতে ১২ ও ১৩ বছর বয়সী আরও দুই শিশু আহত হয়।
“ওটাই ছিল ধৈর্যের শেষ সীমা। আক্রমণ নিয়মিত হতে থাকায় আমরা এলাকা ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। পরে যখন আমরা ঘর থেকে জিনিসপত্র নিয়ে যেতে হাসপাতাল থেকে ফিরে আসি, দেখি সেটলাররাই আমাদের ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলেছে, জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে গেছে,” বলেন আবু নাইম।
তাদের সম্প্রদায়ের ওপর হামলা শুরু হয় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে। লক্ষ্যই ছিল—আল মুগায়িরে তাদের এলাকার জমি দখল করা। সেজন্য সেটলাররা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নারীদের ওপর হামলা চালাত, তাদের মারধর করতো এবং ভেড়া চুরি করে নিয়ে যেত যেন বাসিন্দারা জায়গাজমি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
শেষে ওই এলাকার বাসিন্দারা বাধ্য হয়েই দেইর জারিরসহ পাশের গ্রাম এবং আল-মুগায়িরের ভেতর অন্যত্র চলে যান।
“এখন কোনো ফিলিস্তিনির জন্য আল-খালাইল এলাকায় যাওয়া অনেকটাই নিষিদ্ধ, ওই এলাকাটি এখন সেটলার ও ইসরায়েলি সেনাদের নিয়ন্ত্রণে। আমরা ছেড়ে এসেছি ঠিকই, কিন্তু ওই জমি অবশ্যই তার প্রকৃত মালিকদের কাছেই ফিরবে,” বলেছেন আবু নাইম।
কোঅর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটারিয়ান এফেয়ার্স (ওসিএইচএ) কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেটলারদের হামলায় ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৯৭টি জায়গার অন্তত ৪ হাজার ৭৬৫ ফিলিস্তিনিকে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হয়েছে।
বাড়িঘর ছেড়ে পালানোদের বেশিরভাগই এরিয়া সি অঞ্চলের বেদুইন ও পশুপালক সম্প্রদায়ের সদস্য। এ বছরের শুরুতেই জর্ডান উপত্যকায় বেদুইন গ্রাম আইন আল-আউজা ছাড়তে বাধা হয়েছে ৬০০ মানুষ।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি ইউএনডিপির তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম তীরে থাকা ফিলিস্তিনি বেদুইনের সংখ্যা আনুমানিক ৪০ হাজার। এদের বেশিরভাগই ছিল নাকাব মরুভূমিতে, ১৯৪৮ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় তাদেরকে সেখান থেকে পালাতে হয়। এরপর ১৯৬৭ সালের পর ফের বাস্তুচ্যুত হয় তারা, পরে ১৯৮০-র দশকে আবার। আজ পর্যন্ত তাদের ক্ষেত্রে এই একটা শব্দই ধ্রুবক, আর সেটা হল—উচ্ছেদ।