১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

৭০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনিওর শঙ্কা

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, “আমাদের চোখের সামনেই এল নিনিও অতি শক্তিশালী রূপ নিচ্ছে।”

৭০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনিওর শঙ্কা
ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 03 Sep 2026, 06:27 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:54 AM

এল নিনিওর প্রভাব বিশ্বব্যাপী অনুভূত হতে শুরু করায় বিশ্ব ‘চরম আবহাওয়ার এক বিপদসীমায়’ প্রবেশ করেছে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংগঠনের (ডব্লিউএমও) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, এল নিনিও ৭০ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী রূপ নিতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, এর প্রভাব অন্তত ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বজায় থাকবে।

এল নিনিও পৃথিবীর আবহাওয়ার ধরণ বদলে দেয়, যার ফলে কিছু অঞ্চলে তীব্র খরা দেখা দেয় এবং অন্য অঞ্চলে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা হয়।

পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, মানুষের কারণে পৃথিবীতে যে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে এবং যার প্রভাবে বিশ্বজুড়ে গরম বাড়ছে, তার সঙ্গে এখন 'এল নিনিও’ যোগ হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বের কিছু কিছু অঞ্চলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে আরও অনেক বেশি বেড়ে যাবে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, “আমাদের চোখের সামনেই এল নিনিও অতি শক্তিশালী (সুপারসাইজড) রূপ নিচ্ছে। বিজ্ঞান নিয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই, আমাদের গ্রহটি এখন অচেনা এক চরম পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে এবং মহাসাগরগুলো দ্রুত উত্তপ্ত হচ্ছে।”

প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি ও পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি কমাতে বিশ্বজুড়ে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে বিভিন্ন দেশের সরকার ও বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি।

অনেক দেশেই আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং আগাম চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে এই এল নিনিওর ভয়াবহ রূপ বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিয়ে মারাত্মক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

ডব্লিউএমও-র মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো সতর্ক করে বলেন, “বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও অর্থনীতির ওপর মারাত্মক আঘাত হানার সক্ষমতা রয়েছে এই এল নিনিওর।”

বিবিসি লিখেছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, যা শক্তিশালী এল নিনিওর স্পষ্ট লক্ষণ। প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে গেছে। এর ফলে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনিও তৈরি হতে চলেছে। প্রশান্ত মহাসাগরের প্রধান পর্যবেক্ষণ অঞ্চলে সম্প্রতি কয়েক সপ্তাহে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গড় তাপমাত্রার চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি ওপরে রয়েছে।

তবে তাপমাত্র এই সীমও ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, সমুদ্রের পৃষ্ঠদেশের মাসিক তাপমাত্রা গড় তাপমাত্রার চেয়ে প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। এমন হলে তা ১৯৫০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনিও হবে, এবং আগের সব রেকর্ডকে পেছনে ফেলে দেবে।

প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশের তাপমাত্রা আরও বেশি অস্বাভাবিক — কিছু কিছু স্থানে তা গড় তাপমাত্রার চেয়েও ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি উপরে।

ভারত মহাসাগর, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আটলান্টিক মহাসাগর এবং অস্ট্রেলিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলসহ বিশ্বের অন্যান্য অংশেও সমুদ্রের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞান সংস্থার প্রধান গবেষক ড. অ্যালিস্টেয়ার হবডে বিবিসি-কে বলেছেন, এল নিনিও কোনও কৃত্রিম বিষয় নয়, এটি প্রকৃতির একটি স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু এর কারণে তাপমাত্রা এতটাই অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় যে খরা, দাবানল বা তীব্র গরমের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো দেখা দেয় বা আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।

এর প্রভাবে বিশ্বের এক অঞ্চলে যেমন তীব্র খরা ও দাবানল দেখা দেবে, তেমনি অন্য অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও ভয়াবহ সামুদ্রিক ঝড়ের সৃষ্টি হবে।

আগামী মাসগুলোতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চলে বৃষ্টিপাত মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সেখানে তীব্র খরা ও দাবানল ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বৃষ্টিপাত কমার আশঙ্কায় পানামা খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল ১০ শতাংশেরও বেশি কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে বছরে প্রায় ১৪ হাজার জাহাজ চলাচল করে, যা পানামা সরকারকে বছরে প্রায় ৩০০ কোটি (৩ বিলিয়ন) ডলার আয় এনে দেয়।

অন্যদিকে, ১ লাখ ৭ হাজার হেক্টরেরও বেশি বনভূমির আগুন নিয়ন্ত্রণে চরম সংকটে পড়েছে ইন্দোনেশিয়া। বিমান থেকে কৃত্রিম বৃষ্টি বা ‘ক্লাউড সিডিং’ করে আগুন নেভানোর চেষ্টা চলছে।

মধ্য কালিমান্তানের বাসিন্দা ডারউইন রুমি জানান, ধোঁয়ার কারণে চোখ জ্বালাপোড়া করছে এবং এক মাসেরও বেশি সময় ধরে তারা এই দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।

জমি পরিষ্কারের নামে আগুন দেওয়ার অভিযোগে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির সরকার।

প্রশান্ত মহাসাগরের পাশাপাশি ভারত মহাসাগর এবং দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার উপকূলেও সমুদ্রের তাপমাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ফলে সামুদ্রিক দাবদাহ বা ‘মেরিন হিটওয়েভ’-এর ঝুঁকিতে পড়েছে এসব অঞ্চল।

চলতি বছর গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ সাময়িকভাবে বড় ক্ষয়ক্ষতি থেকে রেহাই পেলেও দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় আলজি বা শৈবালের বিস্ফোরণ এবং বার্ড ফ্লুর প্রাদুর্ভাব সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে।

সংকট সামলাতে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ও অর্থায়ন চালু করেছে অস্ট্রেলিয়া।

সুপার এল নিনিওর প্রভাবে এ বছর চীনে অন্তত ৭টি শক্তিশালী টাইফুন আঘাত হানতে পারে বলে সতর্ক করেছেন আবহাওয়াবিদরা। কেবল জুলাই মাসেই টাইফুন বাভি, নোউল ও মেসাকের আঘাতে দেশটিতে বহু মানুষের মৃত্যু হয়।

আর অগাস্টে আঘাত হানা টাইফুন ডলফিনের কারণে ১০ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, পূর্ব আফ্রিকা, দক্ষিণ ব্রাজিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হতে পারে। পেরু ও ইকুয়েডরে পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সংকট মোকাবেলায় এল নিনিও চূড়ান্ত রূপ নেওয়ার আগেই পেরুর উপকূলে নিজেদের হাসপাতাল জাহাজ ‘ইউএসএনএস কমফোর্ট’ পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

তবে উন্নয়ন সংস্থা ‘প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন’-এর জলবায়ু ঝুঁকি কর্মকর্তা মিগুয়েল আরেস্তেগুই মনে করেন, এল নিনিওর চেয়েও বড় সংকট হল এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ আবাসন, দুর্বল স্যানিটেশন ও নাজুক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, যা এমন প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে আরও ভয়াবহ করে তোলে।