Published : 03 Sep 2025, 10:25 PM
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন তার কিশোরী মেয়েকে এ সপ্তাহে চীন সফরে সঙ্গে নিয়ে গেছেন। এটিই তার প্রথমবার দেশের বাইরে প্রকাশ্য উপস্থিতি। সে কারণে গুঞ্জন জোরাল হয়েছে এবং কানাঘুষা শোনা যাচ্ছে যে, এই মেয়েই হতে চলেছেন কিমের উত্তরসূরি।
কিম পরিবারে বংশানুক্রমিক শাসন টিকিয়ে রাখতে কিমের মেয়েকেই হয়ত পরবর্তী নেতা হিসেবে প্রস্তুত করা হচ্ছে। যদিও উত্তর কোরিয়ার বংশপরম্পার শাসনে পুরুষতান্ত্রিকতারই ধারাবাহিকতা প্রবহমান।
গোপনীয়তায় মোড়া উত্তর কোরিয়া কখনও কিমের মেয়ের নাম বা বয়স প্রকাশ করেনি। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দারা মনে করেন, তিনিই সেই জু আয়ে, যার নাম প্রকাশ করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক বাস্কেটবল তারকা ডেনিস রডম্যান।
২০১৩ সালে কিমের পরিবারের সঙ্গে কিছুদিন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল ডেনিসের। তখন জু শিশু ছিলেন বলে তিনি জানিয়েছিলেন। শিশু জু আয়ে-কে কোলে নেওয়ার কথাও বলেছিলেন তিনি।
বুধবার বেইজিংয়ে আয়োজিত বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজে অংশ নিতে চীন সফরে গিয়ে কিম যখন তার বিলাসবহুল ‘চলমান দূর্গ’ গ্রিন ট্রেন থেকে নামেন, তখন ঠিক পেছনেই ছিলেন তার মেয়ে জু।
এদিন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে জাপানের আত্মসমর্পণের স্মরণে চীনের বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজে অংশ নিয়েছেন কিম জং-উন। কুচকাওয়াজের পর দুপুরের ভোজসভাতেও কিমের পাশেই ছিল তার মেয়ে।
মেয়েকে উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আত্মপ্রকাশ করানো কিমের এই চীন সফরের আরেকটি উদ্দেশ্য হয়ে থাকতে পারে বলেই মনে করছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো।
“এই মুহূর্তে জু আয়ে উত্তর কোরিয়ার পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার দৌড়ে সবার আগে,” বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের উত্তর কোরিয়া নেতৃত্ব বিশেষজ্ঞ মাইকেল ম্যাডেন।
তিনি বলেন, “এই প্রথম জু বাবা কিম জং উনের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার বাইরে সফর করছে। সে এখনই ব্যবহারিক প্রটোকল শিখছে, যা পরবর্তীতে নেতা হিসেবে কিংবা কেন্দ্রীয় অভিজাত শ্রেণির অংশ হিসেবে তাকে সাহায্য করবে।”
ম্যাডেন আরও বলেন, “এ অভিজ্ঞতা তার বাবা কিংবা প্রভাবশালী ফুফু কেউই পাননি। “বিদেশি নেতৃত্ব ও অভিজাতদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত ও যোগাযোগের অভিজ্ঞতা জু আয়ের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, কিম জং-উন কখনও তার বাবা কিম জং-ইলের বিদেশ সফরে সঙ্গী হননি। তবে জং-ইল অবশ্য ১৯৫০-এর দশকে তার বাবা, উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল সুং-এর সঙ্গে বিদেশ সফর করেছিলেন।
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ২০২২ সালে প্রথমবার কিম জং-উনের সন্তানকে দেখায়—একটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ অনুষ্ঠানে কিমের পাশে দাঁড়ানো অবস্থায়। তার অন্য সন্তানদের বিষয়ে এখনও খুব সামান্যই জানা যায়।
দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা মনে করে, জু আয়েই এ পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে সম্ভাব্য উত্তরসূরি। তবে পুরুষশাসিত রাজনীতিতে সে শেষ পর্যন্ত কতদূর যেতে পারবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
জু আয়ের বয়স প্রায় ১৩ বছর বলে ধারণা করা হয়। গত কয়েক বছরে ক্রমেই উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন জু। মে মাসে রুশ দূতাবাসের এক কূটনৈতিক আয়োজনে হাজির হয়ে তিনি প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক মঞ্চে প্রবেশ করেন।
স্টিমসন সেন্টারের আরেক গবেষক র্যাচেল মিনইয়ং লি বলেন, “বছরের পর বছর ধরে তার প্রকাশ্য উপস্থিতির পরিসর এখন সামরিক ক্ষেত্র ছাড়িয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনুষ্ঠানেও বিস্তৃত হয়েছে।”
“যদি এটি (চীন সফর) জু আয়েকে উত্তরসূরি হিসাবে প্রচারের অংশ হয়, তবে এ সফর সেই প্রচেষ্টায় অবশ্যই সহায়ক হবে এবং চীনে জু এর সফরকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার অভিষেক হিসেবেই দেখা হবে।”
তবে লি মনে করেন, চীনে জু আয়ের এই সফর মানেই যে সে উত্তর কোরিয়ার উত্তরসূরি তেমনটি চূড়ান্তভাবে বলার সময় এখনও আসেনি। তবে এই সফর তার দিগন্ত প্রসারিত করতে সহায়ক হবে। আর চীনে জু আয়ের সফরকে উত্তর কোরিয়ার গণমাধ্যম কীভাবে উপস্থাপন করছে, তা দেখলেই বিষয়টি আরও ভালভাবে উপলব্ধি করা যাবে।”