মিয়ানমারের ‘অশান্ত’ সীমান্তে কেন বেড়া দিতে চায় ভারত

২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে সংঘাত বেড়ে যাওয়া ভারতের জন্য উত্তরোত্তর ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 30 Jan 2024, 02:25 PM
Updated : 30 Jan 2024, 02:25 PM

মাত্র এক সপ্তাহ আগে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের সঙ্গে উন্মুক্ত সীমান্তে বেড়া দেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন।

ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তের মতোই মিয়ানমার সীমান্ত বেড়া দিয়ে ঘিরে দেওয়ার পরিকল্পনা জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, ভারত পুরো ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার সীমান্ত একইভাবে বেড়া দিয়ে সুরক্ষিত করবে।

ভারত সরকার ছয় বছরের পুরনো অবাধ চলাচল চুক্তিও বাতিল করার কথা ভাববে বলে জানান তিনি। এ চুক্তির আওতায় দুই দেশের সীমান্ত অঞ্চলের বাসিন্দারা কোনও ভিসা ছাড়াই একে অপরের ভূখন্ডের ভেতরে ১৬ কিলোমিটার পর্যন্ত যাতায়াত করতে পারে।

বিবিসি জানায়, ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বেড়া দেওয়ার কথা বললেও কীভাবে তা দেওয়া হবে এবং কবে নাগাদ কাজ সম্পন্ন করা হবে সে ব্যাপারে বিশেষ কিছু বলেননি।

কিন্তু এই বেড়া দেওয়ার কাজ খুব সহজ হবে না। কিছু বিশেষজ্ঞ বলছেন, এলাকাটি পাহাড়ি হওয়ায় বেড়া তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। এছাড়া, ভারতের এ পরিকল্পনা সীমান্ত এলাকার জনগণের মাঝে কয়েক দশকব্যাপী বিদ্যমান ভারসাম্য নস্যাৎ করতে পারে। পাশাপাশি প্রতিবেশীদের সঙ্গে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। 

বেড়া দিতে গেলে উত্তর-পূর্ব ভারতের চারটি রাজ্য ওই এলাকার মধ্যে পড়বে। সেগুলো হচ্ছে- অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর এবং মিজোরাম। স্থানীয়রা এই উদ্যোগ মেনে নেবে তেমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

দক্ষিণ মিজোরামের সিয়াহা ও লাওয়ালাই জেলার বাসিন্দারা ভারতের কেন্দ্র সরকারের সীমান্ত বেড়া নির্মাণের প্রস্তাবে কোনওভাবেই সায় দিতে চাইছেন না। তাদের এই আপত্তির কারণ হচ্ছে- দুটি জেলাই একেবারে মিয়ানমার লাগোয়া।

বছরের পর বছর ধরে তিয়াইয়ু ও ছিমটুইপুই নদীর ধারে স্থানীয়রা বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদ করেন। এমনকী সেখানকার জঙ্গল থেকে বনজ সম্পদও আহরণ করেন। দুটি নদীই একেবারে সীমান্ত ঘেঁষা। সেখানে বেড়া দেওয়া হলে সামগ্রিকভাবে স্থানীয়দের চাষাবাদের সমস্যা হবে। ফলে জীবন জীবিকাও ঝুঁকিতে পড়বে।

স্থানীয়দের একাংশের দাবি, সেখানে বেড়া দেওয়া হলে বিরাট জায়গা চলে যাবে। এর জেরে সেখানকার মানুষের জীবন জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে শুধু যে স্থানীরাই এনিয়ে আপত্তি জানাচ্ছে তা নয়, মিজো জিরলাই পাওল নামে একটি ছাত্র সংগঠনও এনিয়ে আপত্তি জানাচ্ছে। এ সংগঠনটি ওই রাজ্য়ের অন্য়তম প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠন হিসাবে পরিচিত। তারাও চায় না ওখানে বেড়া দেওয়া হোক।

ওদিকে, নাগাদের সর্বোচ্চ সংস্থা ‘ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল’ও মিয়ানমার সীমান্তে বেড়া দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে। তারা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে স্মারকলিপিও জমা দিয়েছে। বিভিন্ন নাগা সুশীল সমাজ সংগঠনও কেন্দ্র সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বলেছে, এ পদক্ষেপ নেওয়া হলে সীমান্তের দু’পাশে বাস করা নাগারা আলাদা হয়ে যাবে।

তারপরও ভারত কেন মিয়ানমার সীমান্ত বেড়া দিয়ে ঘিরে দিতে চায়? এর প্রধান কারণ হল: ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশটিতে সংঘাত বেড়ে যাওয়া ভারতের জন্য উত্তরোত্তর ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

জাতিসংঘের হিসাবমতে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে লড়াই-সংঘাতে প্রায় ২০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সম্প্রতি সেখানে জাতিগত বিদ্রোহীরা মিয়ানমারের দুটি গুরুত্বপূর্ণ শহর চিন এবং পালেতওয়া দখল করেছে। এতে মিয়ানমার থেকে ভারতে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি রুট অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। সেখান থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ভারতের মণিপুরে জাতিগত সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। মনিপুরের সঙ্গে মিয়ানমারের প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। মণিপুরে মেইতেই সম্প্রদায়ের সঙ্গে কুকি সম্প্রদায়ের জাতিগত সহিংসতা শুরুর পরে এখন পর্যন্ত ১৭০ জনের বেশি প্রাণ গেছে এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছে কয়েক হাজার মানুষ। 

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন মণিপুর সরকার সেখানে অবৈধ শরণার্থীর ঢলের কথা বলেছে। তারা আরও বলেছে, “মিয়ানমার থেকে মণিপুরে আসা প্রভাবশালী অবৈধ পপি চাষী ও মাদক সম্রাটদের কারণে ওই এলাকায় সহিংসতা বেড়ে যাচ্ছে।”

ভারতের মিজোরামেও আশ্রয় নিয়েছে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা ৪০ হাজারের বেশি শরণার্থী।

গত জুলাইয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর মিয়ানমারের জান্তা সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থান শয়ে-কে বলেছিলেন, ভারতের সীমান্ত এলাকাগুলোর পরিস্থিতি ‘মারাত্মকভাবে গোলযোগপূর্ণ’। সীমান্ত পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয় এমন যে কোনও কর্মকাণ্ড এড়িয়ে চলা উচিত। মানব পাচার ও মাদক পাচার রোধ করতে মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্তও বন্ধ করা দরকার।

আমেরিকান থিংক ট্যাংক উইলসন সেন্টারের মাইকেল ক্লুগম্যান বলেছেন, তার ধারণা, ভারত তাদের পূর্ব সীমান্তে দ্বিমুখী নিরাপত্তা হুমকি বাড়তে থাকার দৃষ্টিকোণ থেকে সীমান্তে বেড়া নির্মাণের পদক্ষেপ নিয়েছে।

বিবিসি-কে তিনি বলেন, “মিয়ানমারে ঘোঁট পাকিয়ে উঠতে থাকা সংঘর্ষ সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে চাইছে ভারত। একইসঙ্গে মিয়ানমার থেকে মণিপুরে শরণার্থীদের অবৈধ অনুপ্রবেশের ঝুঁকি কমাতে চাইছে তারা।”

যদিও বেড়া নির্মাণের পেছনে শরণার্থীদের অবৈধ অনুপ্রবেশকে কারণ হিসাবে দেখা কতটা যুক্তিযুক্ত তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। মনিপুর সরকার বলছে, মিয়ানমার থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে কুকি শরণার্থীর ঢুকে পড়ার কারণে সেখানে সহিংসতা বাড়ছে। অথচ সরকারের নিজস্ব প্যানেলই গতবছর এপ্রিল নাগাদ মিয়ানমার থেকে রাজ্যটিতে মাত্র ২,১৮৭ জন শরণার্থী চিহ্নিত করেছে।

মিয়ানমারে নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত গৌতম মুখপাধ্যায় বলেছেন, মিয়ানমার থেকে ব্যাপক অবৈধ শরণার্থী ঢুকে পড়ার বিষয়টি মিথ্যা। আসলে কুকিরা ‘বিদেশি’ এবং অবৈধ অভিবাসী, তারা মণিপুরের নয়- এ বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এমন কথা বলা হচ্ছে। তাছাড়া, তাদের প্রতিরোধ লড়াইয়ে মিয়ানমারের সমর্থন থাকাটাও এর আরেকটি কারণ।

ওই অঞ্চলের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ঊর্ধ্বতন একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাও নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, বেড়া দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা শরণার্থী অনুপ্রবেশের কারণে নয়,বরং উত্তর-পূর্বের কয়েকটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী মিয়ানমার সীমান্তের কয়েকটি গ্রাম ও শহরে শিবির গেড়েছে বলেই বেড়া দেওয়ার এমন সিদ্ধান্ত।

তিনি বলেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কয়েক দশক ধরেই বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহী তৎপরতা চলে আসছে। এই বিদ্রোহ মোকাবেলায় কাজ করা আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ারস অ্যাক্ট (এএফএসপিএ) নামের একটি নিরাপত্তা বাহিনী সেখানে অভিযান চালাতে গিয়ে বেসামরিক মানুষ হত্যায় জড়িয়ে পড়ে বিতর্কিত হয়েছে। মিয়ানমারে লুকিয়ে থাকা ভারতীয় বিদ্রোহীরা সহজেই সীমান্ত পেরিয়ে চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য সহিংস তৎপরতা চালাতে পারছে।

এসব কারণেই ভারত বেড়া নির্মাণ করতে চাইছে। তবে বিশেষজ্ঞরা তারপরও বলছেন, পাহাড়ি এবং ঘন জঙ্গলে ছাওয়া এলাকায় বেড়া দেওয়া খুবই চ্যালেঞ্জিং। সুপরিচিত এক মিয়ানমার বিশেষজ্ঞ বলেন, “বেড়া দেওয়া অবাস্তব বিষয়। কোনও কোনও জায়গায় সেটি নির্মাণ করতে বছরের পর বছর লেগে যাবে। আর স্থানীয়রাও কোনও না কোনওভাবে বেড়ার আশপাশ দিয়ে রাস্তা বেরই করে নেবে।”

তাছাড়া, এখানে সূক্ষ্ম একটি কূটনৈতিক প্রশ্নও আছে। উইলসন সেন্টারের ক্লুগম্যানের মতে সেটি হচ্ছে, মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে যে সময়টিতে ভারতের সতর্ক থাকা প্রয়োজন ঠিক সে সময়েই সীমান্ত বেড়া নির্মাণ উস্কানিমূলক হতে পারে।

তিনি বলেন, “ভারতের অন্যান্য অগ্রাধিকারের বিষগুলোর মধ্যে আছে সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য মিয়ানমার জান্তার সমর্থন লাভ করা। সেক্ষেত্রে এককভাবে সীমান্তে বেড়া দিয়ে বিরোধিতার সম্মুখীন হওয়ার চাইতে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করে বেড়া নির্মাণ করা হলে উত্তেজনার ঝুঁকি কমবে।”

চূড়ান্তভাবে বলতে গেলে, বেড়া নির্মাণের পদক্ষেপ ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তায় চ্যালেঞ্জকেই সামনে নিয়ে এসেছে। ভারত তাদের ঘোর শত্রুদেশ পাকিস্তান এবং চীনের সঙ্গেও সীমান্তে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি, ভূখন্ডগত বিরোধ, যুদ্ধ, সন্ত্রাস কিংবা এসবকিছুর সম্মিলিত সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনকে মোকাবেলা করে চলেছে ভারত। ওদিকে, ভারতের চেয়ে মিয়ানমারের সঙ্গেই চীনের অনেক বেশি অর্থনৈতিক লেনদেন আছে।