১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

চীনের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি: মার্কিন সাংবাদিকের ২ বছরের কারাদণ্ড

মার্কিন সাংবাদিক থমাস পাউকেনকে এই দণ্ডাদেশ দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া প্রদেশের আলেকজান্দ্রিয়া ফেডারেল আদালত।

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 02 Sep 2026, 10:30 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:53 AM

যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে চীনের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করা এবং বেইজিংয়ের জন্য ‘গোপনীয় তথ্য’ সংগ্রহে সহায়তার অপরাধ স্বীকার করা এক মার্কিন সাংবাদিককে দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।

মার্কিন পত্রিকা পলিটিকো লিখেছে, মঙ্গলবার ৫০ বছর বয়সী থমাস পাউকেনকে এই দণ্ডাদেশ দেয় ভার্জিনিয়া প্রদেশের আলেকজান্দ্রিয়া ফেডারেল আদালত।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনের একটি হোটেল থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তাকে চীনা এক নারী গোয়েন্দা এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

বেইজিংয়ে বসবাসকালে চীনের বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমে সম্পাদক ও ভাষ্যকার হিসেবে কাজ করতেন পাউকেন। গত জুনে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অৗবধ চীনা এজেন্ট হিসেবে কাজ করার অপরাধ আদালতে স্বীকার করেন।

মার্কিন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে শুনানি চলাকালে সরকারি আইনজীবী এলি রস জানান, চীন সরকারের হয়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ওপর প্রতিবেদন তৈরির জন্য বেইজিংয়ের কাছ থেকে সাত বছরে ১ লাখ ডলার গ্রহণ করেছিলেন পাউকেন। 

অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘পলিটিকো’ প্রথম এই খবরের তথ্য প্রকাশ করে। আদালতের নথি অনুযায়ী, পাউকেনকে নিয়ন্ত্রণকারী চীনা ব্যক্তি তার মিথ্যা শনাক্তকরণ পরীক্ষা নিয়েছিলেন এবং পাউকেনকে বলা হয়েছিল যে, তার তৈরি প্রতিবেদনগুলো প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সহ চীনা শীর্ষ নেতাদের কাছে পাঠানো হতো।

আইনজীবী রস জানান, পাউকেন ওই চীনা ব্যক্তির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞদের যোগাযোগের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেছিলেন। গ্রেপ্তারের ঠিক আগে তিনি যে ট্রাম্প কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করেন, তিনিও তাদের একজন ছিলেন।

রস বলেন, “চীনা গোয়েন্দাদের সঙ্গে চুক্তির অংশ হিসেবেই পাউকেন যুক্তরাষ্ট্রে এসব সম্পর্ক গড়ে তুলছিলেন। তিনি এটি অর্থের জন্য করেছিলেন এবং প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছেন।”

শুনানিতে সরকারি আইনজীবী ইঙ্গিত দেন, এফবিআই একপর্যায়ে পাউকেনকে ‘ডাবল এজেন্ট’ বা দ্বৈত-এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিল।

পাউকেন এফবিআইয়ের সঙ্গে নিজের কাজ নিয়ে আলোচনা করলেও পরে তাদের নির্দেশনা মানতে ব্যর্থ হন। তবে চীনা ব্যক্তির সঙ্গে তার যোগাযোগ অব্যাহত ছিল।

কৌসুঁলি এবং বিবাদী পক্ষের আইনজীবী চার্লস বার্নহাম উভয়েই একমত ছিলেন যে, পাউকেন কোনো গোপন তথ্য চিনে পাচার করেননি। তবে পাউকেন নিজে তার অপরাধের গুরুত্ব স্বীকার করেন।

বিচারক লিওনি ব্রিংকেমাকে পাউকেন বলেন, “আমি অনেক গোপন তথ্য জেনেছি এবং সেসব গোপন কথা চীনাদের বলেছি।”

নিজের আচরণকে “ভুল”, “আতঙ্কজনক” ও “ভয়াবহ” হিসেবে উল্লেখ করেন পাউকেন। তবে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক উন্নয়নের আন্তরিক ইচ্ছা থেকেই তিনি এটি করেছিলেন।

সবুজ রঙের কয়েদির পোশাক পরা পাউকেন বলেন, “আমি ভেবেছিলাম আমি সাহায্য করছি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, আমি আরও বড় ক্ষতি করতে পারতাম, এমনকি যুদ্ধও বাধিয়ে দিতে পারতাম।”

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের আমলে নিযুক্ত বিচারক লিওনি ব্রিংকেমা পাউকেনের এই কাজকে “অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ” হিসেবে বর্ণনা করেন।

বিচারক বলেন, পাউকেন নিজে কোনো গোপন তথ্য পাচার না করলেও তিনি জানতেন যে, তার নিয়ন্ত্রক চীনা ব্যক্তি সেই ধরনের তথ্যই খুঁজছেন। আর তাই তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে তার সংস্পর্শে আনার চেষ্টা করেছিলেন।

৭ বছরে ১ লাখ ডলারকে “জীবন বদলে দেওয়ার মতো অর্থ নয়” বলে বিবাদী পক্ষের দেওয়া যুক্তিও খারিজ করে দেন বিচারক। তিনি বলেন, “চীনের প্রেক্ষাপটে ১ লাখ ডলারের মূল্য অনেক বেশি।”

কৌসুঁলিরা পাউকেনের ৩৩ মাসের কারাদণ্ড দাবি করেছিলেন। তবে বিবাদী পক্ষ প্রবেশন বা কোনো সংশোধনাগারে সাজা ভোগের আবেদন জানান।

আদালতের নথিতে “পারসন ১” (প্রথম ব্যক্তি) হিসেবে চিহ্নিত সেই প্রশাসনিক কর্মকর্তার পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

এফবিআই সূত্রে জানা গেছে, ওই কর্মকর্তা কর্মজীবনে উচ্চ পদের প্রত্যাশী ছিলেন। বিচারক জানান, এই ঘটনাটি ওই কর্মকর্তার ক্যারিয়ারে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে সেই ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা প্রকাশ করে বিচারক বলেন, “আমার কোনো ধারণাই নেই পারসন ১ কে।”

পাউকেনের পরিচিতরা জানান, চীনে থাকাকালে তিনি আর্থিক সংকটে ছিলেন এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছিলেন। চীনে জনপ্রিয় অ্যাপ উইচ্যাটে তিনি ট্রাম্প সমর্থকদের একটি গ্রুপ চালাতেন।

পাউকেন টেক্সাসের এক প্রভাবশালী রিপাবলিকান পরিবারের সন্তান। তার বাবা থমাস পাউকেন সিনিয়র ভিয়েতনাম যুদ্ধে সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ছিলেন এবং পরবর্তীতে রিগান প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত টেক্সাস রিপাবলিকান পার্টির চেয়ারম্যান এবং পরে টেক্সাস ওয়ার্কফোর্স কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালে তিনি টেক্সাসের গভর্নর পদেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

ছেলের রায়ের সময় ৮২ বছর বয়সী বাবা আদালতে উপস্থিত থাকলেও গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনও কথা বলেননি।