১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

লস অ্যাঞ্জেলেসে গুদাম পুড়ে পচা খাবারের দুর্গন্ধে দমবন্ধ জীবন

গত ১৭ জুন বয়েল হাইটসে এক বিশাল কোল্ড-স্টোরেজ গুদামে আগুন লাগার পর ভেতরে আটকে পড়ে প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ কেজি গরু, শূকর ও মুরগির মাংসের পাশাপাশি বিভিন্ন সামুদ্রিক খাদ্য।

লস অ্যাঞ্জেলেসে গুদাম পুড়ে পচা খাবারের দুর্গন্ধে দমবন্ধ জীবন
ছবি: লস অ্যাঞ্জেলেস দমকল বিভাগ/এবিসি নিউজ

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 09 Aug 2026, 08:06 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:48 PM

যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের বয়েল হাইটস এলাকায় পা রাখার ঠিক পরের মুহূর্তেই এক তীব্র, দমবন্ধ করা দুর্গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা মারে। মনে হবে যেন পচা লাশের ওপর দাঁড়িয়ে। দুই মাস আগের এক অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে পুরো এলাকা জুড়ে এখন ভেসে বেড়াচ্ছে পচা খাবারের গন্ধ। বাতাসে থিকথিক করছে বিষাক্ত মাছি, আর রাস্তার মোড়ে মানুষের চলাচলের বদলে নেমে এসেছে জনমানবহীন নীরবতা। 

গেল ১৭ জুন এই এলাকার এক বিশালাকার কোল্ড-স্টোরেজ গুদামে আগুন লাগার পর ভেতরে আটকে পড়ে প্রায় ৮ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড (৩ কোটি ৯০ লাখ কেজি) গরু, শূকর ও মুরগির মাংসের পাশাপাশি বিভিন্ন সামুদ্রিক খাদ্য। টানা দুই মাস ধরে গ্রীষ্মের খরতাপে সেই পাহাড়সম বর্জ্য পচতে থাকায় পুরো বয়ল হাইটস এখন পচনের গন্ধে নরককুণ্ডে পরিণত হয়েছে।

‘লাশের মতো’ দুর্গন্ধ আর মাছি-ইঁদুরের উপদ্রব:

“গন্ধটা যে কতটা বাজে, তা বলে বোঝানো যাবে না... একদম বমি আসার মতো অবস্থা,” বলছিলেন ৩৭ বছর বয়সী নিরাপত্তারক্ষী মেশা। একটি মারিজুয়ানা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সামনে ডিউটিরত মেশা এই বিচ্ছিরি গন্ধকে তুলনা করলেন ‘পচা লাশের গন্ধে’র সঙ্গে।

কফি স্টল ‘ব্রিউ স্টিং’-এর মালিক ৩০ বছর বয়সী আলেকসিস সিকাইরোসের কাছে লড়াইটা টিকে থাকার। আগে তার দোকানে গুদামের শ্রমিকসহ খদ্দেরদের দীর্ঘ লাইন থাকলেও আগুনের পর পরিস্থিতি বদলে গেছে।

“আগুনের কারণে গুদামের লোকজনের বড় অংশই আর এখানে নেই। ফলে সেই খদ্দেরদের আমরা হারিয়েছি। আর যারা আসতে পারতেন, তারা এই পচা গন্ধ, ধোঁয়া আর মাছির উপদ্রবের কারণে দূরে থাকছেন,” আক্ষেপ সিকাইরোসের। “তাদের ক্ষোভটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের তো সংসার আর দোকানের বিল চালাতে হবে, তাই আমরা টিকে থাকার চেষ্টা করছি।”

এখন বয়ল হাইটসের পথ ধরে হাঁটতে গেলে প্রতি পদক্ষেপে হাত দিয়ে মাছি তাড়াতে হয়। কালো, নীল, গাঢ় সবুজ-ছোট-বড় নানা মাছি বাতাসে উড়ছে। সিকাইরোস যখন তার কফি স্টল গোছাচ্ছিলেন, টেবিলের ওপর এবং তাঁর শরীরেও অনবরত এসে বসছিল এসব মাছি। 

খাবার বা পানীয় কেনার সময় মাছি ভনভন করা নিশ্চিতভাবেই কোনো খদ্দের পছন্দ করবেন না।অবস্থা কেবল দুর্গন্ধ বা মাছির ভনভনানি পর্যন্তই আটকে নেই। 

স্থানীয় এনবিসি অধিভুক্ত একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক পেস্ট কন্ট্রোল কোম্পানির প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, চরম গরম এবং জমে থাকা বর্জ্যের কারণে বিষাক্ত মাছির বংশবৃদ্ধি দ্রুত ঘটছে। এসব মাছি মানুষ ও পশু-পাখির খোলা ক্ষতস্থানে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

শুধু মাছিই নয়, রাস্তায় এখন দেখা মিলছে বিশালাকার ইঁদুরের। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসন ফুটপাতে ইঁদুর ধরার জন্য যেসব ফাঁদ পেতেছে, এই 'দানবীয়' ইঁদুরগুলো সেগুলোর চেয়ে আকারে অনেক বড়।

কোম্পানির ব্যর্থতা ও মেয়রের কড়া পদক্ষেপ

অগ্নিকাণ্ডের পর চারপাশ পরিষ্কার করার ধীরগতি এবং তথ্যের অস্পষ্টতা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের তো বটেই, নগর কর্তৃপক্ষের ক্ষোভও গিয়ে পড়েছে গুদাম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘লিনেজ’-এর ওপর।

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরির দায়ে কাউন্টির জনস্বাস্থ্য বিভাগ সম্প্রতি লিনেজকে দৈনিক ৫০০ ডলার করে জরিমানা করেছে। সেইসঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা লঙ্ঘনের নোটিশ জারি করেছে নগর কর্তৃপক্ষ।

লিনেজ জানিয়েছে, পচা বর্জ্য অপসারণের কাজ দিনরাত ২৪ ঘণ্টা চলছে। সোমবার নাগাদ তারা ৮০ শতাংশ বর্জ্য সরিয়ে ফেলতে পেরেছে, যা গত ৩১ জুলাই ছিল ৬০ শতাংশ। পুরো পরিষ্কার অভিযান শেষ করতে ৮০ থেকে ১০০ মিলিয়ন (৮ থেকে ১০ কোটি) ডলার খরচ হবে বলে ধারণা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

তবে লস অ্যাঞ্জেলেস নগর কর্তৃপক্ষ বলছে, কোম্পানির এই পদক্ষেপ ‘যথেষ্ট নয়’। পুনর্বাচনের মুখোমুখি হতে চলা লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র কারেন ব্যাস স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী ১৩ আগস্টের মধ্যে সাইট থেকে মূল বর্জ্য পুরোপুরি সরিয়ে নিতে হবে।

মঙ্গলবার লিনেজের শেয়ারহোল্ডারদের উদ্দেশ্যে পাঠানো এক কড়া চিঠিতে মেয়র কারেন ব্যাস লিখেছেন, “পরিষ্কার অভিযান, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের তথ্যের জন্য বাসিন্দারা ও জনপ্রতিনিধিরা বারবার যোগাযোগ করলেও কোম্পানি থেকে পর্যাপ্ত সাড়া মেলেনি। তাদের তথ্যের অভাব ও ধীরগতি হতাশাজনক।”

বিবিসি-কে দেওয়া এক বিবৃতিতে মেয়র বলেন, “বাসিন্দাদের ক্ষুব্ধ হওয়া স্বাভাবিক। তাদের কাছে পরিষ্কার তথ্য পৌঁছানো এবং সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।”

মেয়র এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে উদ্ধার তৎপরতা ত্বরান্বিত করেছেন। এলাকায় মোবাইল হেলথ ক্লিনিক পাঠানো হয়েছে এবং বাসিন্দাদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে হাজার হাজার এয়ার পিউরিফায়ার। এমনকি স্বাস্থ্য সুরক্ষার নিশ্চয়তা না দেওয়া পর্যন্ত লিনেজের ওই গুদাম পুনর্নির্মাণের অনুমতি স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন মেয়র।

গুদামের ধ্বংসস্তূপের বাইরে এখন হেলমেট ও ফ্লুরোসেন্ট ভেস্ট পরা কয়েক ডজন কর্মী মাস্ক মুখে দিয়ে দিনরাত ময়লা সরানোর কাজ করছেন।

লিনেজের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, দুর্গন্ধ কমানোই এখন তাদের প্রধান অগ্রাধিকার, তবে এটি জটিল এক অভিযান।

ততক্ষণ পর্যন্ত, বয়ল হাইটসের বাসিন্দাদের জন্য প্রতিটি সকালই বয়ে আনছে পচা মাংসের সেই একই দমবন্ধ করা দুর্গন্ধ।