Published : 17 Feb 2026, 07:47 PM
অবসান হল এক দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের। চলে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কিংবদন্তি নেতা এবং দু’বারের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী রেভারেন্ড জেসি জ্যাকসন।
মঙ্গলবার তার পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ৮৪ বছর বয়সি এই নেতার প্রয়াণের খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিবৃতিতে জ্যাকসন পরিবার বলেছে, “আমাদের বাবা শুধু আমাদের পরিবারেরই অভিভাবক ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিশ্বজুড়ে নিপীড়িত, কণ্ঠহীন ও অবহেলিত মানুষের নেতা।”
২০১৭ সালে পার্কিনসন রোগে আক্রান্ত হওয়া এই নেতার মৃত্যু এমন এক সময়ে হল, যখন ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন জাদুঘর থেকে শুরু করে জাতীয় উদ্যান পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ‘যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী’ আদর্শ সরানোর নামে গৃহযুদ্ধকালীন কনফেডারেট স্ট্যাচু পুনঃস্থাপন এবং দাসত্ববিরোধী প্রদর্শনীগুলো সরিয়ে দিচ্ছে।
নাগরিক অধিকার কর্মীদের মতে, এসব পদক্ষেপ কয়েক দশকের সামাজিক অগ্রগতিকে উল্টে দিতে পারে।
মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত জেসি জ্যাকসনের মৃত্যুতে কেবল যুক্তরাষ্ট্রে নয়, শোকের ছায়া নেমে এসেছে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে। তার প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিশ্বনেতারা।
কিংয়ের হাত ধরে উত্থান:
দক্ষিণের বর্ণবাদী পরিবেশ থেকে উঠে আসা জেসি জ্যাকসন ১৯৬০-এর দশকে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব মার্টিন লুথার কিং জুনিয়ারের ছায়াসঙ্গী হয়ে ওঠেন।
১৯৬৮ সালে মেমফিসের সেই লোরেইন মোটেলের বারান্দায় মার্টিন লুথার কিং আততায়ীর গুলিতে যখন লুটিয়ে পড়েন, জ্যাকসন তখন তার ঠিক এক তলা নিচেই ছিলেন। কিং-এর হত্যার পর জ্যাকসনই হয়ে ওঠেন যুক্তরাষ্ট্রের শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের প্রধান কণ্ঠস্বর।
পরবর্তীতে সত্তরের দশকে তিনি শিকাগোভিত্তিক নাগরিক অধিকার সংস্থা ‘অপারেশন পুশ’ এবং ‘ন্যাশনাল রেইনবো কোয়ালিশন’ প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৯৬ সালে সংস্থা দুটি একীভূত হয়। দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় নেতৃত্ব দেওয়ার পর ২০২৩ সালে তিনি রেইনবো-পুশ কোয়ালিশনের প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরে দাঁড়ান।
ওবামা-হ্যারিসের পথপ্রদর্শক:
বারাক ওবামার আগমনের আগে জেসি জ্যাকসনই ছিলেন প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নেতা যিনি হোয়াইট হাউজের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন।
তিনি ১৯৮৪ এবং ১৯৮৮ সালে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট মনোনয়নের দৌড়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলেন।
১৯৮৪ সালের প্রাথমিক লড়াইয়ে তিনি ৩৩ লাখ ভোট পেয়েছিলেন, যা ছিল মোট ভোটের ১৮ শতাংশ। সে সময় তিনি ওয়াল্টার মন্ডেল ও গ্যারি হার্টের পেছনে থেকে তৃতীয় হন।
১৯৮৮ সালের লড়াইয়ে তিনি আরও চমক দেখান। মোট ১১টি রাজ্যে জিতে দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে লড়াই শেষ করেন। সেবার তিনি ৬৮ লাখ বা ২৯ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন।
তার সেদিনের লড়াই না থাকলে, ২০০৮ সালে হোয়াইট হাউজে হয়ত পা দেওয়া হতো না বারাক ওবামার। হোয়াইট হাউজে হয়ত জায়গা করে নিতে পারতেন না কমলা হ্যারিস। এর বীজ বপন করেছিলেন জেসি জ্যাকসনই।
নির্বাচনী সংস্কার:
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রতিনিধি নির্বাচন পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছিলেন জ্যাকসন। তার আন্দোলনের হাত ধরেই ‘উইনার-টেক-অল’ ব্যবস্থার পরিবর্তে ‘প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন’ বা সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা চালু হয়। ফলে দলের গণতান্ত্রিক কাঠামো আরও শক্তিশালী হয়।
জ্যাকসনের ছিল বহুত্ববাদী চেতনা। তিনি বলতেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পতাকায় লাল, নীল ও সাদা— এই ৩ রঙ থাকলেও, দেশটির আত্মা আসলে রামধনু রঙা। সেখানে সাদা, কালো, ল্যাটিনো, এশিয়ান এবং এলজিবিটিকিউ— সব সম্প্রদায়ের মানুষের সমান অধিকার আছে।
ব্যক্তিগত কূটনীতি:
রাজনীতির বাইরেও জ্যাকসন তার ব্যক্তিগত কূটনীতির জন্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছেন।
১৯৮৪ সালে সিরিয়া থেকে এক মার্কিন নাগরিকের মুক্তিসহ ১৯৯০ সালে ইরাকের কুয়েত আক্রমণের পর সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে দেখা করে শত শত মার্কিন নাগরিক ও অন্যান্যদের মুক্তি নিশ্চিত করেছিলেন তিনি।
১৯৮৪ সালে তিনি কিউবার জেল থেকেও কয়েক ডজন আমেরিকান এবং কিউবান নাগরিকের মুক্তির ব্যবস্থা করেছিলেন। ১৯৯৯ সালে তিনি সারবিয়া থেকে তিন মার্কিনির মুক্তিতেও অবদান রাখেন।
২০০০ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তাকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অফ ফ্রিডম’-এ ভূষিত করেন।
১৯৪১ সালে দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় জন্মগ্রহণ করা জ্যাকসন সারাজীবন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের কথা বলেছেন।
জীবনের শেষ দিনগুলোতেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। ২০২০ সালে পুলিশের হাতে জর্জ ফ্লয়েড ও অন্যান্য কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার নিন্দা জানিয়েছিলেন জ্যাকসন।